নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আলহামদুলিল্লাহ! যা চেয়েছিলাম, তার চেয়েও বেশি দয়া করেছেন আমার পরম প্রিয় রব। যা পাইনি, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই—কারণ জানি, তিনি দেন শুধু কল্যাণই। সিজদাবনত শুকরিয়া।\n\nপ্রত্যাশার একটি ঘর এখনও কি ফাঁকা পড়ে আছে কি না, জানি না। তবে এটুকু জানি—

নতুন নকিব

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।

নতুন নকিব › বিস্তারিত পোস্টঃ

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:২৭

রমজান ও সিয়াম সাধনা: আধুনিক স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানের আলোকে একটি সমন্বিত গবেষণা-বিশ্লেষণ, পর্ব-১

ছবি, অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

ভূমিকা

রমজান মাসের ফরজ সিয়াম ইসলামের একটি মৌলিক ইবাদত। তবে সাম্প্রতিক দশকে এটি কেবল ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে নয়, বরং Intermittent Fasting (IF)-এর একটি স্বতন্ত্র ও প্রাকৃতিক মডেল হিসেবে আধুনিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে গবেষনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বহু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে, রমজান সিয়াম মানবদেহের বিপাক, হৃদ্রোগ-ঝুঁকি, হরমোনাল ভারসাম্য, মানসিক স্বাস্থ্য এবং কোষীয় পুনর্গঠনে (cellular repair) গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রমজানের রোজার গুরুত্ব, মহত্ত্ব ও ফজিলত

রমজান মাস ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার রহমত, ক্ষমা এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের মাস হিসেবে পরিচিত। এটি পাঁচটি ইসলামী মূল স্তম্ভের একটি, যা মুসলিমদের তাকওয়া (আল্লাহভীতি), ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। কুরআন মাজীদে রোজার ফরজিয়ত এবং এর মহত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে, যেখানে এটিকে পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরও ফরজ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রোজা রাখলে পাপমোচন হয়, জান্নাতের দরজা খুলে যায় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়। এছাড়া, এতে লাইলাতুল কদরের মতো রাত্রি রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। হাদিসে রোজার ফজিলত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মুসলিমদের আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ দেখায়।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

অর্থাৎ, হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন কর। -সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৩

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ ۚ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ ۖ وَمَنْ كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِنْ أَيَّامٍ أُخَرَ

অর্থাৎ, রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে মানুষের হিদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে, সে যেন এতে রোজা রাখে। আর যে অসুস্থ হবে বা সফরে থাকবে, তবে অন্য দিনগুলো থেকে সংখ্যা পূরণ করবে। -সুরা আল-বাকারাহ, ২:১৮৫

ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّآ أَنزَلْنَـٰهُ فِى لَيْلَةِ ٱلْقَدْرِ ١ وَمَآ أَدْرَىٰكَ مَا لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ ٢ لَيْلَةُ ٱلْقَدْرِ خَيْرٌۭ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍۢ ٣ تَنَزَّلُ ٱلْمَلَـٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍۢ ٤ سَلَـٰمٌ هِىَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ ٱلْفَجْرِ ٥

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আমি এটা (অর্থাৎ কুরআন) শবে কদরে নাযিল করেছি। আর আপনি কি জানেন শবে কদর কী? শবে কদর এক হাজার মাস অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হয়। সে রাত (আদ্যোপান্ত) শান্তি ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। -সুরা আল-কদর, ৯৭:১-৫

মুত্তাফাকুন আলাইহি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة، وغلقت أبواب النار، وصفدت الشياطين

অর্থাৎ, যখন রমজান আসে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।

সহিহ বুখারীর অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।

জামে তিরমিজীর অন্য এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:

الصيام جنة من النار

অর্থাৎ, রোজা হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল।

বায়হাকীর এক হাদিসে এসেছে:

الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام: أي رب، منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفِّعني فيه، ويقول القرآن: منعته النوم بالليل فشفعني فيه، قال: فيُشفَّعان

অর্থাৎ, রোজা এবং কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে: হে প্রভু! আমি তাকে দিনের বেলা খাদ্য এবং কামনা থেকে বিরত রেখেছি, তাই আমাকে তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিন। কুরআন বলবে: আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তাই আমাকে তার জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দিন। তখন তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে।

মুসনাদ আহমাদ এর এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

قَدْ جَاءَكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ افْتَرَضَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَيُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ وَتُغَلُّ فِيهِ الشَّيَاطِينُ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا قَدْ حُرِمَ

অর্থাৎ, তোমাদের কাছে রমজান মাস এসেছে, একটি বরকতময় মাস, যাতে আল্লাহ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এতে একটি রাত্রি রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়, সে সত্যই বঞ্চিত।

রমজানের রোজা মুসলিমদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, দানশীলতা এবং আল্লাহ তাআ'লার নৈকট্য লাভের মাধ্যম, যা পাপমোচন, জান্নাত লাভ এবং শয়তান থেকে রক্ষার সুযোগ প্রদান করে। এটি ধৈর্যের মাস হিসেবে পরিচিত, যা মানুষকে দুর্বলদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে।

শরীরের ওজন এবং কম্পোজিশনের উপর প্রভাব

রমজানের রোজা শরীরের ওজন এবং কম্পোজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজনযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ এবং মেটা-অ্যানালাইসিসে (Nutrients Journal, MDPI) দেখা গেছে যে রোজার সময় ওজন গড়ে ১.৩৪ কেজি কমে, ফ্যাট পার্সেন্টেজ ১.০৭% হ্রাস পায় এবং ফ্যাট ম্যাস ০.৯৮ কেজি কমে। ফ্যাট-ফ্রি ম্যাসও ০.৬৬ কেজি কমে, কিন্তু এটি ফ্যাট ম্যাসের চেয়ে ৩০% কম। সাবগ্রুপ অ্যানালাইসিসে স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে ফ্যাট পার্সেন্টেজ ১.৪৬% কমে, যেখানে স্বাভাবিক ওজনের লোকদের ক্ষেত্রে তা উল্লেখযোগ্য নয়। রোজার পর ২-৫ সপ্তাহে ওজন এবং কম্পোজিশন প্রায় প্রাক-রমজান অবস্থায় ফিরে আসে, যা দেখায় যে এই পরিবর্তনগুলো অস্থায়ী কিন্তু পুনরাবৃত্তিযোগ্য। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের করা ৩৫টি গবেষণা একত্র করে দেখা গেছে রমজানের রোজার পর গড়ে এক থেকে দেড় কেজি ওজন কমে।

শারীরিক পরিবর্তন

রক্ত ও বিপাকীয় পরিবর্তন

রমজানের রোজা শরীরে বিভিন্ন শারীরিক এবং বায়োকেমিক্যাল পরিবর্তন ঘটায়। একটি রিভিউ (PubMed) অনুসারে, রোজা রক্তের লাল কোষ (RBC), সাদা কোষ (WBC) এবং প্লেটলেটের সংখ্যা বাড়ায়। এটি HDL-কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং মোট কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড, LDL এবং VLDL কমায়। এছাড়া, শরীরের ওজন, কোমরের পরিধি, BMI, ফ্যাট, রক্তের গ্লুকোজ, রক্তচাপ এবং উদ্বেগের মাত্রা কমায়।

প্রদাহ হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধ

প্রদাহ এবং প্রো-ইনফ্ল্যামেটরি সাইটোকাইনস যেমন IL-1b, IL-6 এবং TNF-α হ্রাস পায়, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। স্বাস্থ্যকর ব্যক্তিদের জন্য এটি মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি এবং এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। রোজা একই সাথে দেহে রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রোজাব্রত পালনের ফলে দেহে রোগ জীবাণুবর্ধক জীর্ণ অন্ত্রগুলো ধ্বংস হয়, ইউরিক এসিড বাধাপ্রাপ্ত হয়।

চর্মরোগ এবং অন্যান্য রোগের প্রভাব

দেহে ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে বিভিন্ন প্রকার নার্ভ সংক্রান্ত রোগ বেড়ে যায়। রোজাদারের শরীরের পানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ফলে চর্মরোগের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

আধুনিক চিকিৎসায় রোজার ভূমিকা

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোজার ব্যবহারিক তাৎপর্য উপলব্ধি করেই জার্মান, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ব্যবস্থাপত্রে প্রতিবিধান হিসেবে এর উল্লেখ করা হচ্ছে। ডা. জুয়েলস এমডি বলেছেন, যখনই একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে। ডক্টর ডিউই বলেছেন, রোগজীর্ণ এবং রোগক্লিষ্ট মানুষটির পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেল, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, সত্যিকাররূপে উপবাস থাকছে রোগটি। তাই একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের বিধান দিতেন। রমজান মাসে অন্য মাসের তুলনায় খাওয়ার সুযোগ কম থাকে ফলে এই কম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হিসেবে কাজ করে।

দীর্ঘজীবন এবং অঙ্গ বিশ্রাম

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে দীর্ঘজীবন লাভের জন্যে খাওয়ার প্রয়োজন বেশি নয়। কম ও পরিমিত খাওয়াই দীর্ঘজীবন লাভের চাবিকাঠি। বছরে একমাস রোজা রাখার ফলে শরীরের অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্রাম ঘটে। এটা অনেকটা শিল্প-কারখানায় মেশিনকে সময়মত বিশ্রাম দেয়ার মত। এতে মেশিনের আয়ুষ্কাল বাড়ে। মানবদেহের যন্ত্রপাতিরও এভাবে আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়।

মানসিক শক্তি বৃদ্ধি

ডা. আলেক্স হেইগ বলেছেন, রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি এবং বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি পরিবর্ধিত হয়। প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি, অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। এটা খাদ্যে অরুচি ও অনিচ্ছা দূর করে। রোজা শরীরের রক্তের প্রধান পরিশোধক। রক্তের পরিশোধন এবং বিশুদ্ধি সাধন দ্বারা দেহ প্রকৃতপক্ষে জীবনীশক্তি লাভ করে। যারা রুগ্ন তাদেরকেও আমি রোজা পালন করতে বলি।

মনোবিজ্ঞানীদের মতামত

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড নারায়াড বলেন, রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্ক রোগ নির্মূল করে দেয়। মানবদেহের আবর্তন-বিবর্তন আছে। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির শরীর বারংবার বাহ্যিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি দৈহিক খিচুনী এবং মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয় না। প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী Macfadden মনের প্রগাঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে রোজার ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, রোজার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে কি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা হলো তার ওপর বুদ্ধিবৃত্তির কর্মক্ষমতা নির্ভর করে না। বরং কতিপয় বাধ্যবাধকতার উপরই তা নির্ভরশীল। একজন যত রোজা রাখে তার বুদ্ধি তত প্রখর হয়। ডা. এ এম গ্রিমী বলেন, রোজার সামগ্রিক প্রভাব মানব স্বাস্থ্যের উপর অটুটভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে এবং রোজার মাধ্যমে শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

পরিপাক এবং নির্দিষ্ট রোগ চিকিত্সা

ডা. আর ক্যাম ফোর্ডের মতে, রোজা হচ্ছে পরিপাক শক্তির শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী। ডা. বেন কিম তাঁর Fasting for health প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানী), শরীরের র্যাশ, দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তিনি বলেন, উপবাসকালে শরীরের যেসব অংশে প্রদাহ জনিত ঘা হয়েছে তা পূরণ (Repair) এবং সুগঠিত হতে পর্যাপ্ত সময় পেয়ে থাকে। বিশেষত খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার গায়ে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু পুনরায় তৈরি হতে পারে। সাধারণত দেখা যায় টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্ধপাচ্য আমিষ খাদ্যনালী শোষণ করে দুরারোগ্য (Auto une disease) সব ব্যাধির সৃষ্টি করে। ডা. বেন কিম আরো বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন উপবাস কিভাবে দেহের সবতন্ত্রে (system) স্বাভাবিকতা রক্ষা করে। প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জন ফারম্যান Fasting and eating for health প্রবন্ধে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় উপবাস এবং খাবার গ্রহণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে উপবাসের স্বপক্ষে মত দিয়েছেন।

খাদ্যাভ্যাস এবং সুফল

এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় রমজানের রোজা রাখার সুফল পাওয়া যায় না মূলত খাদ্যাভ্যাস ও রুচির জন্য। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম বলেছেন, রোজা মানুষের দেহে কোন ক্ষতি করে না। ইসলামে এমন কোন বিধান নেই, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। গ্যাষ্ট্রিক ও আলসার এর রোগীদের রোজা নিয়ে যে ভীতি আছে তা ঠিক নয়। কারণ রোজায় এসব রোগের কোন ক্ষতি হয় না বরং উপকার হয়। রমজান মানুষকে সংযমী ও নিয়মবদ্ধভাবে গড়ে তোলে।

বাংলাদেশী গবেষণা ফলাফল

১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডা. গোলাম মুয়াযযম সাহেব কর্তৃক মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব সম্পর্কে যে গবেষণা চালানো হয়, তাতে প্রমাণিত হয় যে, রোজার দ্বারা মানব শরীরের কোন ক্ষতি হয় না। কেবল ওজন সামান্য কমে। তাও উল্লেখযোগ্য কিছুই নহে, বরং শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে এরূপ রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ (Diet control) অপেক্ষা বহুদিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ। ১৯৬০ সালে তার গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে রোজা দ্বারা পেটের শূলবেদনা বেড়ে যায়, তাদের এ ধারণা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক। কারণ উপবাসে পাকস্থলীর এসিড কমে এবং খেলেই এটা বাড়ে। এ অতি সত্য কথাটা অনেক চিকিৎসকই চিন্তা না করে শূলবেদনার রোগীকে রোজা রাখতে নিষেধ করেন।

পাকস্থলী এসিড এবং পটাসিয়াম গবেষণা

১৭ জন রোজাদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা খুব কম রোজার ফলে তাদের এ উভয় দোষই নিরাময় হয়েছে। এ গবেষণায় আরো প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করেন রোজা দ্বারা রক্তের পটাসিয়াম কমে যায় এবং তাতে শরীরের ক্ষতি সাধন হয়, তাদের এ ধারণাও অমূলক। কারণ পটাসিয়াম কমার প্রতিক্রিয়া প্রথমে দেখা যায় হৃদপিন্ডের উপর অথচ ১১ জন রোজাদারের হৃদপিন্ড অত্যাধুনিক ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম যন্ত্রের সাহায্যে (রোজার পূর্বে ও রোজা রাখার ২৫ দিন পর) পরীক্ষা করে দেখা গেছে রোজা দ্বারা তাদের হৃদপিন্ডের ক্রিয়ার কোনই ব্যতিক্রম ঘটে নাই। সুতরাং বুঝা গেল যে, রোজার দ্বারা রক্তের যে পটাসিয়াম কমে তা অতি সামান্য এবং স্বাভাবিক সীমারেখার মধ্যে। তবে রোজা দ্বারা কোন কোন মানুষ কিছুটা খিটখিটে মেজাজী হয়। এর কারণ সামান্য রক্ত শর্করা কমে যায় যা স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই ক্ষতিকর নয়। অন্য কোন সময় ক্ষিধে পেলেও এরূপ হয়ে থাকে। বহুল আলোচিত ক্রনিক আমাশয় যাকে চিকিৎসা শাস্ত্রে ইরিটেবল বাউল সিন্ডোম বলে। এ রোগটা পেটের মধ্যে হলেও আসল কারণ কিন্তু মনের মধ্যে। রোজাদার যখন মনের পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে রোজা রাখে তখন মানসিক চাপ যন্ত্রণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকে। তাই এসব রোগী রোজা রাখা অবস্থায় সম্পূর্ণ উপসর্গ মুক্ত থাকে।

সাম্প্রতিক গবেষণা ফলাফল

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে রমজানের রোজা ইমিউন সিস্টেমকে পুনর্গঠন করে এবং ক্যান্সার চিকিত্সায় কেমোথেরাপির প্রভাব বাড়াতে পারে। এছাড়া, রোজা গুট মাইক্রোবায়োটার বৃদ্ধি ঘটায় এবং অটোফ্যাজি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

রেফারেন্স

১। Effect of Ramadan Fasting on Weight and Body Composition... - Nutrients Journal, MDPI.
২। Physiological changes during Ramadan fasting - PubMed.
৩। Ramadan intermittent fasting and endothelial/cardiovascular effects - Journal of Clinical Medicine, MDPI.
৪। Chronobiological and physiological changes during intermittent fasting - Karger Publishers.
৫। Mental health & sleep outcomes during Ramadan fasting - MDPI Health Sciences.
৬। Time-restricted feeding effects on metabolic outcomes - PubMed.
৭। Heterogeneous findings in dietary intake & health biomarkers - Nutrition Journal, SpringerLink.
৮। Quran Verses And Hadiths About Ramadan In Arabic And English - Click This Link
৯। Forty Hadith on Ramadan - Click This Link
১০। 40 Virtues of Ramadan - Click This Link
১১। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রোজা .........
১২। রোজা: স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের আলোকে - Daily Inqilab, ২০ মার্চ ২০২৫.
১৩। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে রোজার তাৎপর্য ও উপকারিতা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার যত উপকারিতা - মোঃ মামুনুর রহমান.
১৪। বিশ্ববিখ্যাত ২২ জন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রমজান ও রোজা! - জাগো নিউজ, ১২ জুলাই ২০১৫.
১৫। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে রোজার উপকারিতা - মুহাম্মাদ মিযানুর রহমান, ১৩ এপ্রিল ২০২৩.

পোস্ট পাঠ এবং সাথে থাকার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

পরবর্তী পর্বে সমাপ্য।

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:০৫

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: রেফারেনস দেয়ায় লেখা খুব ভালো হয়েছে ।

২| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১৯

ভুয়া মফিজ বলেছেন: সব্বোনাশ করছেন। এখনই ব্লগ-বিজ্ঞানীরা ঝাপায়ে পড়বে!!! :-B

তবে আবাল বিজ্ঞানীদের জানা নাই যে, কোরআন কোন বিজ্ঞান গ্রন্থ না। এখানে ব্জ্ঞিান এসেছে প্রাত্যাহিক জীবন-যাপনের অংশ হিসাবে। ঠিক যেভাবে আমাদের সবকিছুকেই বিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়, ঠিক সেভাবে।

রোযা শুরুর আগে রোযাকে বুঝতে, আর মাত্রাজ্ঞানসহ এর সঠিক প্রয়োগ করতে আপনার এই সিরিজটা কাজে লাগবে নিশ্চিতভাবেই। পোষ্টের জন্য ধন্যবাদ। :)

৩| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৫১

সাজিদ উল হক আবির বলেছেন: ভাই, সালাম। ধর্মীয় বিধিবিধানের আত্মিক আধ্যাত্মিক উপকারিতা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু কিছু লিখুন। অনুরোধ রইলো। শুভকামনা।

৪| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: প্রিয় নতুন নকিব ভাই,পোস্টটিতে৫০++।
রোজার আধ্যাতিক এবং শারীরিক দুটোই উপকার রয়েছে।
তারপরও অধিকাংশ মানুষ ভয় পায়।আবার অনেকেই গ্যাস্টিকের সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে বিরত থাকে,এর প্রতিকার কি হতে পারে।

৫| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

আরোগ্য বলেছেন: জাযাকাল্লাহ খাইরান। ইসলামের পক্ষে কলম কীবোর্ড চলতে থাকুক।

৬| ০২ রা জানুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৭

রাজীব নুর বলেছেন: চারিদিকে অসংখ্য মসজিদ।
এই মসজিদ মন্দ লোকদের ভালো করতে পারেনি। বছরে একবার রমজান মাস আসে। তাতেও মন্দ লোকজন ভালো হয় না। দুঃখ লাগে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.