নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শামীম জাহাঙ্গীর

শামীম জাহাঙ্গীর › বিস্তারিত পোস্টঃ

মিসির আলীর পোস্টমর্টেম

১০ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১০:১১

ছোট গল্প :
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(প্রথম পর্ব)

(সব কিছুই স্বাভাবিক ভাবে নেয়ার ক্ষমতা হুমায়ুনের আগেও ছিল এখনও আছে । একান্তই গোপনে মন খারাপ করার দারুণ উস্তাদ ছিলেন তিনি । আর এই গুনের অধিকারীগন সাধারণত হৃদয়ে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ জনিত কারনে চটজলদি ইহকাল ত্যাগ করেন, হুমায়ুনও সেই একই পরিনতিই হলো। )

□□■■□□

এখন আর মন খারাপ করার কোনই সুযোগ নেই হুমায়ুনের । কারন মন খারাপের জন্য যে নির্দিষ্ট আবেগের প্রয়োজন সেটা মৃতদের নাই । আবেগ জিনিসটা শুধু জীবিত মানুষের সাথে সম্পর্কিত।মৃতদের মাথা ব্যথা হয় খুব । অনির্দিষ্টকালের এক অসহায় অপেক্ষার কারনে হুমায়ুনেরও খুব মাথা ব্যথা করছে ।

মিসির আলীর সাথে একজন খুব বদ মানুষের দেখা করার কথা শুধু এইটুকুই জানে হুমায়ুন । সেই লোকটার আগমনের অপেক্ষাটাও একা হুমায়ুনের । তার জানা নাই সেই বদ মানুষটা কবে, কখন মিসির আলীর কাছে পৌছাবে, এটাই তার খুব মাথা ব্যথার কারন। বদ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি তুলনামূলক ভাবে অনেকটাই বেশী থাকে । আর এই লোকটার বদ বুদ্ধি খুবই কাজের । তার দৃঢ় বিশ্বাস এই লোক মিসির আলীর কাছে খুব শীঘ্রই পৌছাবে, যে মিসির আলীর প্রায় অচল মস্তিস্কের পোস্টমর্টেম করবে।

মেজাজ খারাপ করা এই মাথা ব্যথার সময় এক কাপ কড়া লিকার হলে মন্দ হতো না, ভাবছে হুমায়ুন । হুমায়ুন জানে কিছুক্ষনের মাঝেই মিসির আলীও ঠিক চা নিয়ে চলে আসবে । হুমায়ুনের মন যা বলে মিসির আলী যেখানেই থাকুক তা টের পেয়ে যায় ! খুবই আশ্চর্যের কথা তবে ঘটনা সত্য । মিসির আলীর সাথে এখনও হুমায়ুনের একটা আত্মিক কানেকশন আছে ।

হুমায়ুনের মৃত্যুর পর আর সবাইকেই দেখা গেলেও একজনকে কোথাও দেখা যায়নি । সে হলো মিসির আলী । তাই বলে মিসির আলী যে মিসিং, তাও কিন্ত নয় । সে তখন খুবই অসুস্থ হয়ে মহাকালী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চেনা বেডে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল । যদিও অচেতন মিসির আলীর চোখেও সেদিন অশ্রু ঝরেছে অবিরাম । হুমায়ুনের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে পারলো না বলে মিসির আলীর জন্য সবাই আফসোস করেছে সেই দিন । কেউ যেটা জানল না সেটা হলো মিসির আলী তখন হুমায়ুনের সাথেই ছিল । হুমায়ুনের কফিন বিমান থেকে নামতেই সেই রানওয়ে থেকেই মিসির আলী হুমায়ুনের কফিনের ভিতরে । সবাই জানত মিসির আলী হুমায়ুনকে খুব পছন্দ করে কিন্তু এতটা হুমায়ুন অন্তপ্রাণ সেইটা মিসির আলী নিজেই জানত না । টানা তিনদিন হুমায়ুনের সাথে থেকে মিসির আলী আর পৃথিবীতে ফিরতে চায় না । কিন্তু হুমায়ুন চাইছে সেই মানুষটা মিসির আলীর কাছে পৌছানো পর্যন্ত সে থেকে আসুক । হুমায়ুনের কিছু বলতে হয় না । মিসির আলী নিজে থেকেই চলে যায় । এখন হুমায়ুনের মনস্তাত্ত্বিক ডাক পেলেই ছুটে আসে ।

বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সকল চিকিৎসকের চোখ কপালে তুলে মিসির আলী টানা তিনদিন অচেতন থাকার পর জ্ঞান ফিরতেই পুরোপুরি সুস্থ । নিজেই ডিসচার্জ করার কাগজে সই করে পায়ে হেঁটেই বাসায় ফিরলো সে । স্যারকে একা রেখে আসতে যদিও ইচ্ছা ছিল না তার তবে স্যার যখন চাইছেন•••। হাটতে হাটতে একটা বিষয় ভাবতে খুব ভাল লাগে মিসির আলীর, স্যার বলেছেন এটাই তার সর্বশেষ এসাইনমেন্ট !

□□■■□□

খুট করে একটা শব্দ হলো । হুমায়ুনের জন্য চা নিয়ে মিসির আলী ঠিকই এসে পড়েছে ! উঠুন স্যার । এতো সকালে চা এর দোকান টা খুলল না বলেই যৎসামান্য দেরী হয়ে গেল স্যার ।

চা হাতে নিয়ে মিসির আলীর কথা শুনছে আর মিটিমিটি হাসছে হুমায়ুন । মিসির আলীর কর্মকাণ্ডে সে খুবই অবাক। মিসির আলী তার বিষয়ে যতটা স্বতস্ফূর্ত ঠিক ততটাই অমনোযোগী বাকি সকল ক্ষেত্রে এমনকি তার নিজের ক্ষেত্রেও । তার মস্তিষ্কের যে অংশটি শুধুই তার হুমায়ুনের সেটুকু ছাড়া বাকী মস্তিষ্ক টুকু প্রায় অকর্মণ্য মিসির আলীর । মিসির আলীর দিকে মুখ তুলে তাঁকায় হুমায়ুন ! চোখ বন্ধ করে কথা বলা মিসির আলী কথা বলছে আর একটু পরপর হঠাৎ শিউরে উঠছে ।

ছোট গল্প :
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(দ্বিতীয় পর্ব)

কি ব্যাপার মিসির আলী সাহেব। আপনার শরীর খারাপ করেছে?

মিসির আলী চোখ খুলে স্যারকে বিচলিত দেখে খুবই শরমিন্দা, জিভে কামড় দিল সে ।

আপনার শরীর খারাপ ? উত্তর না পেয়ে দ্বিতীয় বার একই প্রশ্ন করলো হুমায়ুন । সে সত্য সত্যই বিচলিত!

না স্যার । আমার শরীর খুবই ভাল ।

তাহলে এভাবে শিউরে উঠছেন কেন একটু পরপর? একটু নিশ্চিন্ত কণ্ঠ হুমায়ুনের । হুমায়ুনকে নিশ্চিন্ত হতে দেখে তার শিউরে উঠার কারন বলছে মিসির আলী ।

আপনি কতো প্রশান্তি নিয়ে চা খাচ্ছেন স্যার অথচ আপনার মাথায় মনে হচ্ছে ড্রাম পিটাচ্ছে কেউ । সেই ব্যাথায় আমি কুঁকড়ে যাচ্ছি স্যার ! মিসির আলীর শিউরে উঠার কারন শুনে হুমায়ুন তখনও হাসছে দেখে মিসির আলীর কণ্ঠে রীতিমতো আর্তনাদ! আপনি তবুও হাসছেন স্যার?

হুমায়ুনের অবস্থা সত্য সত্যই খারাপ! যদিও চা খেয়ে এখন মাথা ব্যথাটা কিঞ্চিত কম। তবুও তার ঠোঁটে মুচকি হাসি লেগে থাকার কারন, পৃথিবীর প্রায় সবাই তাকে ভুল বুজলেও এই ভুল সহসা ভেঙ্গে যাবে । একদিন সবার ভুল ভেঙ্গে দিবে যে সেই মিসির আলী যদি ততদিন•••

আমাকে পারতেই হবে স্যার, পারতেই হবে আমাকে । একসাথে হুমায়ুনের চিন্তায় অস্থির মনকে স্বান্তনা দেয় মিসির আলী এবং সাথে সাথে সাহস দেয় নিজেকেও । আপনি কোনও চিন্তা করবেন না স্যার । আমি আছি । এখন তবে যাই স্যার, কেউ একজন সেই কখন থেকে আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে মনে হচ্ছে!

□□■■□□

শরিফুল মিসির আলীর শিয়রে বসে কথা বলেই যাচ্ছে, বলেই যাচ্ছে । তার মন বলছে মিসির আলীর কানের কাছে সারাক্ষন ঘ্যানঘ্যান করতে হবে আর তাতেই একসময় বিরক্ত হয়ে চোখ খুলবে মিসির আলী । শরিফুলের কাছে মন মসজিদ, মন মন্দির, মনের ইচ্ছা তাই শরিফুলের কাছে তার পথ নির্দেশিকা । মনের নির্দেশ পেয়েই সে মিসির আলীর কাছে এসেছে । মিসির আলী এখন পর্যন্ত অচেতনের মতোই তার তেল চিটচিটে বিছানায় পড়ে আছে, তবে তার পেটটা মৃদু উঠানামা করায় সে যে বেঁচে আছে তাতে কোনও সন্দেহ নাই শরিফুলের। শরিফুল অনর্গল কথা বলা শুরু করলো এভাবে•••

আমি শরিফুল আলম । আমার বাবার নাম জনাব আঃ করিম, সাকিন সোহাগী নীলগঞ্জ। আমি তিনার নির্দেশেই আসিয়াছি জনাব । জনাব আপনি কী আমার কথা শুনিতে পারিতেছেন? তিনি একটা চিঠিও দিয়েছেন সরাসরি আপনার হাতে পৌছাইয়া দিতে । চিঠিখানা আমার পকেটেই আছে জনাব তবে সেটা আমার পড়া নিষেধ তাই আমি জানি না জনাব তাহাতে কী লিখা আছে, চিঠিখানা কষ্ট করিয়া পড়িয়া দেখেন জনাব । তবে আমি অনুমান করেতেছি তিনি আপনার কাছে আমাদের বংশের বিগত তিন চার পুরুষের একটা বয়সে পাগল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা চেয়েছেন । ইহা ছাড়া সংসারের অন্য কোন বিষয়ে তার কোন প্রকার আগ্রহ কখনো দেখি নাই বলেই আমার এই রূপ অনুমানের হেতু জনাব ।

আমার বাবার দাদার পাগলামির শুরু রেলগেটের স্বনিযুক্ত ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন দিয়ে ! সকাল নয়টায় সেজেগুজে দুই পকেটে সবুজ লাল সিগন্যাল পতাকা নিয়ে সোহাগী ষ্টেশনের আগের রেলগেইটে চলে যেত আর বাড়ি ফিরতো সেই মধ্যরাতের ট্রেন চলে গেলে । তার ডান পকেটের সবুজ পতাকা উড়িয়ে প্রতিদিনের বাশি বাজানো সবার মুখস্ত, তার বাম পকেটের লাল পতাকাটা একদিনই ব্যবহার করেছিল, সেইদিন লাল পতাকা হাতে বাশী ফু দিতে দিতে লাইনের মাঝখান দিয়ে ষ্টেশনের দিকে দৌড়াতে দেখে হায় হায় করে উঠছিল সবাই। লাল পতাকাটা পাশে নিয়েই খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়েছিল সে । বাবা তখন খুব ছোট , বাবার বাবা তফিল উদ্দিন মানে আমার দাদাও তার বাবার পিছনে দৌড় দিয়েছিল সেটাও সবাই দেখেছে । তারও খোঁজও পাওয়া যায়নি আর কোনদিন । আপনি কি কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না জনাব মিসির আলী? আমার চিঠি পৌছিয়ে দেয়ার দায়িত্বটুকু আমাকে পালন করতে দিন দয়া করে । শরিফুলের মুখে কথার তুবড়ি ফুটছে। জাগতে হবেই মিসির আলীকে ।

ছোট গল্প :
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
তৃতীয় পর্ব

তার অনেকদিন পরের কথা, আমি তখন প্রাইমারীতে পড়ি । একদিন স্কুলে খবর গেল বাবা খেঁজুর গাছের উপরে বিছানা পেতেছে । সবাই চেষ্টা করলো সেখান থেকে তাকে নামাতে কিন্তু সে নির্বিকার, আরামে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে সেখানে । গাছের মাঝামাঝি বিশাল এক ব্যানারে বড় বড় করে লেখা "জীবনের জন্যে শুধুই বই এর প্রয়োজন, তথাকথিত মানুষের কোনই প্রয়োজন নাই আঃ করিমের ।"

বছর বছর খেঁজুর গাছের উপরে পক্ষকাল সময় কাটিয়ে দিলেও এইবার ঘটছে অন্য ঘটনা । একদিন পরেই খুব সকালে গাছ থেকে নেমে পড়ে বাবা । দরজায় ধাক্কা শুনে দরজা খুলতেই বাবা আমাকে ঠেলে ঘরে ঢুকে । আলমারিতে অনেক খোঁজে অবশেষে একটা চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, যাও এই চিঠিটা নিয়া ঢাকা যাও । চিঠিটা স্বয়ং মিসির আলীর হাতে দিবা । তাকে আমাদের ফ্যামিলির ইতিহাস বলবা, এমনকী সে চোখ বন্ধ করে রাখলেও তুমি থামবে না । এখন বুঝতেছেন জনাব আমার থামার আদেশ নাই ।

আমার আগের তিন পুরুষ পাগল । সত্যি কথা বলতে আমারও ইদানীং নিজেকে একটু পাগল পাগলই লাগে । এটুকু বলেই শরিফুল খেয়াল করে মিসির আলী একটু নড়ে উঠলো যেন ! শরিফুলের নিজস্ব সূত্রটা কাজে দিচ্ছে দেখে খুবই ভাল লাগে শরিফুলের । মিসির আলীর দীর্ঘদিনের অকার্যকর মস্তিষ্কের জট খোলার চেষ্টা হিসাবে তার মন যা করতে বলছে তাই করছে সে । প্রথম ধাপে তার কানের কাছে অবিরাম ভুলভাল গল্প বলে তাকে জাগানো হয়ে গেছে । এখন মিসির আলীকে দিয়ে কথা বলানোর ধাপ চলমান ।

কালো জোব্বায় পায়ের পাতা ঢেকে বসে আছে শরিফুল । গলার দুপাশে লাল সালু কাপড়ের ওড়না ঝুলানো শরিফুল মাজারে মাজারে ঘুরে ফিরে । টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে কোর্ট কাচারি এলাকায় চলে যায় । ক্যানভাসারদের কাছে সে আধ্যাত্মিক গুরু । তাদের গুরু হয়ে কিছুক্ষণ লেকচার দেয়, সামনে টাকার ব্যাগ খোলাই থাকে । তার জন্য কিছু টাকা খরচ করতে পারা তাদের ভাগ্যে সবসময় হয় না। মিসির আলীর সাথে অনবরত কথা বলতে গিয়ে সেই ক্যানভাসার স্টাইলেও কখনও কথা বলেছে কি না মনে করতে পারছে না শরিফুল । এটা হয়ে যায় নিজের অজান্তেই, জ্বী জনাব । মিসির আলী চোখ মিটমিটিয়ে তাকে দেখতে চেষ্টা করছে দেখে তবেই কথা বলায় সাময়িক বিরতি দেয় ।

মিসির আলী চোখ খুললেও তার দৃষ্টি বড্ড ঝাপসা । প্রত্যেকটা মানুষের কিছু সাধারণ ক্ষমতা থাকে, চোখের দৃষ্টিও তেমন একটা সাধারন ক্ষমতা । সেই ক্ষমতা গুলি একসময় কমতে থাকে । কমতে থাকা মানেই তার সময় শেষ হয়ে আসার আলামত । একজন মানুষের সব রিপুগুলো যখন একে একে ক্ষমতা হারিয়ে নিঃস্ব, তখনই সেই মানুষ আর মানুষ না, সে তখন মৃতদেহ ! মিসির আলীর একটু একটু দেখতে পাচ্ছে এখন । শরিফুলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এই এতক্ষণ কানের পাশে ঘ্যানঘেন করছিল । এর জন্যেই তাকে স্যারের কাছ থেকে তাড়াহুড়ো করে চলে আসতে হলো!

আমাকে কি সব বলছেন আপনি? কেনই বা বলছেন এসব? আমি কোন ব্যাখ্যা ট্যাক্ষা দিতে পারি না আর ! আমি দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী, আমার চিন্তা শক্তি শূণ্য প্রায় ! আমার দৃষ্টি শক্তিও প্রায় বিলীন । আপনার কোন কথা আমি মস্তিষ্ক পর্যন্ত নিতেই পারছি না ।

শরিফুলের এখন একটু মুচকি হাসতে ইচ্ছা করছে কারন মিসির আলীর প্রায় অচল মস্তিষ্ক কাজ করতে শুরু করেছে অবশেষে ! কিন্তু তার এই মুচকি হাসি দেখে ফেললে তার মাথা আবার থেমে যেতে পারে । শরিফুল বরং স্বাভাবিক থেকে কথা বলালোর চেষ্টাই করছে । মিসির আলী কিছুক্ষণ কথা বললেই তার মস্তিষ্কের সব জট খুলে যাবে । তারপর সর্বশেষ ধাপ ।

নিজের মনেই বিড়বিড় করছে মিসির আলী । আমার সময় শেষের দিকে, প্রকৃতির নিয়মেই আমি ক্ষমতা শূন্য হয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।স্যারেরও একই অবস্থা হয়েছিল, কতো বললাম স্যার, দরকার নাই বিদেশে চিকিত্‍সার ! শুনল না । একটার পর একটা ক্ষমতা হারাচ্ছিলেন তিনি । যে মানুষটা একের পর এক জটিল সমস্যার তুখোর সমাধান দিয়েছেন, সেই মানুষটা যখন তার ছোট একটা পারিবারিক সমস্যায় তালগোল পাকিয়ে ফেললেন, খুব অবাক হয়েছিলাম আমি ।

সারা জীবনের যোদ্ধা বিনা যুদ্ধে একের পর এক পরাজয় মেনে নিয়ে চুপচাপ আমার কাছে এসে বসে থাকতো । আমি মীমাংসার শত সহস্র পথ দেখালেও স্যার বিনা কারনে অভিযুক্ত হওয়ায় প্রচন্ড ক্ষোভ মিশ্রিত অভিমান নিয়েই বসে থাকতেন। তার অভিমান ছিল কাজী নজরুল ইসলামের মরণপণ অভিমানের মতো । কাজী নজরুলের গল্পটা স্যার আমাকে বহুবার বলেছিলেন । নার্গিসের সাথে কাজী নজরুলের বিচ্ছেদের পর তার এক বন্ধু মীমাংসার চেষ্টা করে নজরুলকে একখানি পত্র দেয়ায় নজরুল তার উত্তরে লিখেছিলেন " বন্ধু । তুমি কেন, স্বয়ং ঈশ্বরের চেষ্টাতেও এই বিচ্ছেদ মীমাংসার নয় ।"

ছোট গল্প :
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(চতুর্থ পর্ব)

শরীফুল মুগ্ধ শ্রুতা হয়ে চুপচাপ শুনছে, কতো চেষ্টার পর যে মিসির আলী কে কথা বলাতে পেরেছে । শরিফুলকে ভাল করে দেখছে সে ।

বাড়ি কোথায়? মিসির আলী কথাবার্তায় আরো একটু স্বাভাবিক ।

নীলগঞ্জ । নেত্রকোনা ।

অ । হুমায়ুন স্যারের এলাকায় ?

জ্বি । আপনি কি তাকে স্যার বলতেন?

হুম । স্যার অনেক আপত্তি করতেন, আমার স্যার ডাকে নাকি উনার খুব অস্বস্তি হতো !

আপনার স্যার বলাটার মাঝে এর বাংলা অর্থ প্রভূর ছাপ পড়ে আপনার চোখে এই জন্যেই হয়তো তিনি অস্বস্তি বোধ করতেন ।

আপনি চোখ পড়তে পারেন ? মিসির আলীর চোখে জেগে উঠা প্রাণের চিহ্ন শরিফুল দেখতে পায় না । কারন সে লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বৃদ্ধাঙ্গুলির নোখ দেখতে থাকে । পাগলরা প্রসংসায় খুব লজ্জা পায় ।

আপনি চোখ পড়তে পারেন? আবার মিসির আলীর কণ্ঠ খুব ক্লান্ত । অর্থাৎ মিসির আলী এখন আবার অচেতন অবস্থায় চলে যাচ্ছে । হুমায়ুনের ডাক পেলেই এমন হয় তার । অশরীরী মিসির আলী ইতিমধ্যেই হুমায়ুনের কাছে চলেও গেছে, এটা শরিফুল জানে না । মিসির আলীর দেহয়বয়বটা তো শরিফুলের সামনেই ।

স্যার । এই নিন চা । মিসির আলী স্যারের হাতে চা দিতে হাত বাড়ানো অবস্থাতেই কথা বলতে থাকলো । একটা ছেলে এসেছে স্যার । কী সব বলছে বুঝতে পারিনি এখনো । আপনার মাথা ব্যথাটা দেখছি নাই স্যার । এখনই চলে যাব স্যার? আচ্ছা ঠিক আছে স্যার আমি আসছি ।

অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরে আসে মিসির আলী । নড়েচড়ে উঠে মিসির আলীর শরীর । চোখ বন্ধ অবস্থায় কথা বলে সে । আপনার বাবার চিঠির কথা বলছিলেন না? চিঠিটা দেন ।

ছেলেটার চোখে কি যেন আছে বলল স্যার?, কি যেন নামটা? জানে মনে করতে পারবেও না তবুও চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ভাবছে মিসির আলী, কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার ভাবনা গুলো । স্যার আমার কোন কথাই শুনেননি । মিসির আলী কতো করে বললো স্যার আমি খুব ক্লান্ত । আপনার পাশে শুয়ে একটু ঘুমিয়ে নেই । তারপর যাই শরিফুলের কাছে ! স্যার পিঠ চাপড়ে তখনই ফিরত পাঠিয়ে দিলেন । যা করার শরিফুলই নাকি করবে! আচ্ছা দেখি চিঠিটা ।

অনেক আগের ভাঁজ করা একটা চিঠি যেমন হতে পারে এটা মোটেও তেমন কিছু নয়, মিসির আলী আগের মিসির আলী হলে চিঠির স্পর্ষেই বলে দিত শরিফুল মিথ্যা বলছে! মিসির আলী তার হাতে চিঠির স্পর্ষ পেয়ে চোখ খুলে । হাতে চিঠি নিয়ে উঠে বসে । চিঠির ভাঁজ খুলতে গিয়ে তার স্যারের কী একটা কথা মনে পড়েও পড়ল না মিসির আলীর। চিঠি খুলছে কিন্তু ভাবনায় সেই কথাটা মনে করার চেষ্ চিঠিটার প্রথম ভাঁজটা খুলতেই তার ভিতর থেকে কফিনের গন্ধ আসতে লাগলো । গাটা গুলিয়ে উঠলো মিসির আলীর ।

মিসির আলী ভয় পেলেও যুক্তি দিয়ে ভয় তাড়িয়ে দেয় । স্যারের কাছে গেলে এই গন্ধ পায় বলেই এখন তেমন মনে হচ্ছে । মিসির আলীর দিকে তাকিয়ে আছে শরিফুল । মিসির আলী চিঠি খুলতে খুব ভয় পাচ্ছে এটা মিসির আলীর চোখে দেখতেই পাচ্ছেই সে ! এতক্ষণে শরিফুলের ঠোঁটে মুচকি হাসি ।

কেমন একটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরলো মিসির আলী । চিঠি কই? এটাতো একটা ঝকঝকে তকতকে অফসেট পেপার । এটাতে কোন লেখাই দেখছে না মিসির আলী, দেখার কথাও না, কিছু লেখা থাকলে তো! এটাও শরিফুলের মনের নির্দেশে করা । মন বললো এত গুরুত্বপূর্ণ একটা চিঠি পড়তে গিয়ে যখন দেখবে একটা সাদা কাগজ তখন বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে বিস্মিত মিসির আলীর চোখ সর্বোচ্চ প্রসারিত হবে । চোখকে এই অবস্থায় আনতেই এতো মিথ্যা, এতো গল্প । মিসির আলীকে সে তেমন কোন সত্যই বলেনি আসলে ।

ছোট গল্প :
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(পঞ্চম পর্ব)

শরিফুল একদমই যে সাদা কাগজ তুলে দিয়েছে মিসির আলীর হাতে তা কিন্তু নয় । কাগজটার একেবারে শেষ কোনায় ছোট করে ইংরেজিতে লেখা, from Sorryfull, কেউ শরিফুলকে তার নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করলে সে তার নামের অর্থ Sorryfull বা "জনম দূঃখী" বলে থাকে ! মিসির আলীকে দেয়া কাগজে এটুকু লেখারও কারন আছে, বিনা কারনে কিছু করে না শরিফুল । এই লেখাটুকূ মিসির আলীর নজরে না পড়লেই শরিফুল নিশ্চিত হয়ে যাবে যে মিসির আলী শতভাগ বিস্মিত এমন একটা চিঠি পেয়ে। প্রবল বিস্মিত কেউই শেষ পর্যন্ত দেখার ধৈর্য রাখে না ।

শতভাগ বিস্মিত চোখেই শরিফুলের চোখের দিকে তাঁকায় মিসির আলী । এটাই ছিল শরিফুলের বিশাল কর্মযজ্ঞের তৃতীয় ও শেষ ধাপ । চূড়ান্ত ধাপের সফলতায় শরিফুলের ঠোঁটে এতক্ষণে এক চিলতে রহস্যময় মুচকি হাসি, যদিও তার দৃষ্টি মিসির আলীর চোখে স্থির । মিসির আলী যেন হুমায়ুন আহমেদের অপ্রকাশিত কিছু কষ্টের এক গ্রীন হাউজ । শরিফুল যেন সেই গ্রিন হাউজের আঙিনায় বসে বসে হুমায়ুনের শেষ কয়েকটা দিনের প্রতিচ্ছবি দেখছে !

হুমায়ুনের বুকের জমিন হতে তার ছায়াবৃক্ষ গুলিকে যখন উপড়ানো শুরু হল, রক্তাক্ত হুমায়ুন প্রথমবারের মতো মিসির আলীর স্মরনাপন্ন হলো । ঘটনার আকস্মিকতায় বিপর্যস্ত হুমায়ুনের মাথা কাজ করছে না তাই মিসির আলীকে বাধ্য হয়ে হুমায়ুন তার সব সিক্রেট বলে দেয় । বলে দেয় তার তিনটি ছায়াবৃক্ষের কথা । যে ছায়াবৃক্ষত্রয়ের মায়ায় বসেই হুমায়ুন তার জোছনার কথা জননীর কথা ভাবতো, লিখতোও এই ছায়াবৃক্ষত্রয়ের ছায়াতলে বসেই ।

স্বজনদের পরম ভালবাসার উল্টো পিঠ যে দেখেনি সে আসলে পৃথিবীর অর্ধেক নিষ্ঠুরতাই দেখেনি । ভালবাসার মানুষ যখন তার ভালবাসার পরিবর্তে একে একে তার নিষ্ঠুরতা গুলো প্রকাশ করতে থাকে, তখনই বুঝতে পারে হূমায়ুন, ভালবাসা অবিনাশী কোন বস্তু নয় । সে অপেক্ষা করে থাকে আরও নিষ্ঠুরতার ।

হুমায়ুন প্রথম যখন খেয়াল করলো তার মাথার উপর তার সেই শান্তির ছায়া নেই, আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাঁকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ । এই প্রথম হুমায়ুনের মনে হল সে একেবারেই একা, নিঃসঙ্গ । নিঃসঙ্গ হুমায়ুনের বুকে নিঃশব্দ রক্তক্ষরণের সেই শুরু । সে স্বপ্নেও ভাবেনি তার ছায়াত্রয় তাকে এভাবে ছত্রছায়াহীন করে দিবে এতটাই নিষ্ঠুরতায় ।

নিঃসঙ্গ সেই মানুষটাকে সবাই নিজের বানাতে অব্যাহত চেষ্টা করলেও কেউ আর তার হয় না । হুমায়ুন চোখ পড়তে পারে বলেই সে বুঝতে পারে সব । একে একে তাকে ঘিরে বেড়ে উঠা লতা গুল্ম আগাছাগুলোই কেবল বেড়ে উঠছে । কিন্তু তাদের ছায়া দেয়ার সক্ষমতা নেই ।

অথচ অবাক বিষয় হলো কেউই কিন্তু বিচ্ছেদ চায়নি বরং দূরত্ব কমাতে চেয়েছে সবাই। কিন্তু তাদের সেই দূরত্ব কমানোর সকল প্রচেষ্টার প্বার্শ প্রতিক্রিয়ায় দূরত্বই বেড়েছে শুধু । প্রথমে কথা বলা বন্ধ করে দিয়ে কষ্ট দিয়ে হুমায়ুনকে শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস । সেটা যখন ব্যর্থ তখন এক ঘরে রাত যাপন বয়কট করলো তার ত্রয়ী ছায়ার উৎসমুখ, তার সাথে এরূপ তৃতীয় শ্রেণীর কৌশল প্রয়োগে হুমায়ুন কতোটা দূরে চলে যাচ্ছে সে তা প্রথমে বুঝতে পারেনি । যতক্ষণে বুঝতে পারলো ততক্ষনে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হুমায়ুন বিশ্বাস ভঙ্গের যাতনার শ্রাবণ ধারায় ভিঁজতে শুরু করেছে । তার প্রতি এতটাই বেশী অবিচারে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আর থামেনি তাঁর ।

ছোট গল্প
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(ষষ্ঠ পর্ব)

বিকালের তীর্যক রোদের কুসুম কোমল উত্তাপে শরিফুল মফিজ পাগলার জোঁকের তৈলের উপর তার বিশেষজ্ঞ উপদেশ বয়ান করছিল । স্থান : হাইকোর্টের মাজারের বটতলায়। বুঝলেন কিনা জনাব? আমি শরিফুল জীবনেও প্রমাণ ছাড়া কোন কথা বলি না । আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি জনাব, এই তৈল হিমালয়ের বরফে মেখে দিবেন জনাব, দেখবেন সেই হিমালয়ও গলে গেছে, এর এতটাই উত্তাপ বলে নিজের উরুতে হাতের তালু দিয়ে ঠাপ ঠাপ শব্দ করে, আছেন কেউ জনাব, ওপেন চ্যালেঞ্জ বলে মজমার চারদিকে চোখ বুলাতেই তার চোখে পড়ে হুমায়ুনকে।

মজমা থেকে সামান্য দূরত্বে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ানো হুমায়ুনকে দেখেই শরিফুলের মন বলে দেয় এই লোকটা তার কাছে খুব জরুরি কোন কাজে এসেছে। লোকটার মুখটা শান্ত হলেও তার চোখ বলে দিচ্ছে সে খুবই অস্থির । শিষ্যের হাতে মজমার দায়িত্ব দিয়ে হুমায়ুনকে নিয়ে পাশের শাহী ঈদগাহ মাঠে চলে যায় সে । হুমায়ুন কিছু বলতে গেলে শরিফুল তাকে হাত ইশারায় থামিয়ে নিজেই কথা বলে ।

পৃথিবীটা একটা খোলা মাঠ হলে দেখা যেত সেখানে সবাই একাকীত্বের যন্ত্রণায় ছটফট করছে। একাকীত্ব হলো সেই মানুষের মাথার উপরে সূর্যের প্রচন্ড উত্তাপ । সেই উত্তাপ থেকে বাঁচতে সবাই প্রাণপণ দৌড়াচ্ছে, অথচ এক বিন্দু ছায়াও খুঁজে পাচ্ছে না কেউ । শুধু কয়েকজন ভাগ্যবানের চেহারায় দেখা যাবে দারুণ প্রশান্তি। তাদের মাথার উপর একাকীত্বের সূর্যের বদলে প্রশান্তির অদৃশ্য ছায়া বিরাজমান । তাদের নিজস্ব ছায়াবৃক্ষরা তাদেরকে ছায়ায়, মায়ায় ভালবাসায় ভাল রাখে সারাক্ষণ । আর এরা ভাল থাকলে তাদের চারিদিকও ভাল থাকে জনাব । আপনার উপরে থাকা ছায়া সরে যাওয়ায় আপনার উপরটা শান্ত দেখালেও আপনার ভিতরটাতো একাকীত্বের দাহে পুড়ছে জনাব । তবে মন বলছে আপনার জন্য আপাতত কিছুই করার নাই আমার। আপনার ছায়া আপনাকেই অর্জন করতে হবে জনাব। তবে আপনার সাথে আমার একটা যোগাযোগের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি আমি । সেটা কবে আমি জানি না জনাব ।

এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে হুমায়ুনের শরিফুলকে খুব মনে ধরে গেছে, যদিও বদ প্রকৃতির মানুষ শরিফুল তবু হুমায়ুন নিশ্চিত এই লোকটা তার বিশেষ কাজে দিবে কারন এই লোক চোখ পড়তে পারে এবং সেটা হুমায়ুনের চেয়েও অতি উন্নত শক্তি। সেই জন্য শরিফুলকে এই অভাবের জীবন ত্যাগ করে তার কাছে চলে যাওয়ার একটা প্রস্তাব দিতেই হেসে জবাব দিয়ে দেয় শরিফুল। জনাব আমি অতিশয় বদ প্রকৃতির মানুষ । বদ মানুষের কোন অভাব নাই, আর দোয়া করবেন জনাব, যেন মানুষের হক নষ্ট না করি । হাক্কুল ইবাদ্ বড় কঠিন বস্তু জনাব ।

আপনি যে হিমালয়ের গলে যাওয়ার কথা বলছিলেন । সেটাতে মানুষের হক নষ্ট হচ্ছে না? হুমায়ুনের মনে কথা থাকে না, বেরিয়ে আসে। এটাও বেরিয়ে আসলো ।

না । হক নষ্ট হচ্ছে না । এটা সাধারণ সরিষার তৈলের সাথে মধু মিশিয়ে বানানো, এই মিশ্রনে বরফ গলে যায় এটা মিথ্যা নয় জনাব। আর এতে উপকারও পাবে মানুষ । আমি আল্লার হক নষ্ট করি মানুষের হক নষ্ট করি না । আল্লাকে তো পাব, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব। বান্দাকে কোথায় পাবো জনাব, কেমনে চিনবো? এইজন্য আমি কাজ না করে অগ্রিম টাকা পয়সা বা ভালবাসা কিছুই নেই না জনাব । আপনি আমাকে দেনাদার করতে চাইলেও সেই সুযোগ বদ লোক হিসেবে আমি শরিফুল দিতে অপারগ জনাব । হুমায়ুন চলে যায় তারপর । জীবিত অবস্থায় এইটুকুই তাদের আলাপ ।

বাংলা সাহিত্যের দিকপাল সেই থেকে খড়কুটোর মতো ভেসে বেড়িয়েছে একটু ছায়ার আশায় । তারপর একদিন কেউ একজন একাকী অসহায় তাকে সাথে করে নিয়ে যায় । নির্জীব জড় পদার্থের মতো সে তার আশ্রয়ে বেঁচে থাকে । কিন্তু অল্প দিনের মাঝেই সে বুঝতে পারে এই বেঁচে যাওয়ার চেয়ে তার ভেসে থাকাই ভাল ছিল । কিন্তু ভেসে থাকার জল তার তলে তো আর নাই । হুমায়ুন অদৃশ্য জলের খোঁজে সারাক্ষণ ছটফট করলেও জলের খোঁজ আর মিলে না । ছায়াহীন মায়াহীন হুমায়ুনের ভিতরে ঘুনপোকারা বসত গড়ে মহানন্দে । তখন থেকেই হুমায়ুনের বুকের বাম পাশে খুব ব্যথা । তার ছায়াবৃক্ষরা তার কপালের বলি রেখা পড়তে পারতো । যদি তারা একবার ফিরে আসতো এই একটাই ভাবনা তার, একটাই পথ তার শান্ত শীতল হবার । কিন্তু ছায়াবৃক্ষের উৎসমুখ ছায়াপথের সব পথ রুদ্ধ করে দেয়।

ছোট গল্প
মিসির আলীর পোস্টমর্টেম
(শেষ পর্ব)

মমতাময়ী নারী যদি পাষাণী হয় তবে সেটা খুব দ্রুতই সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যায় । অভিমানী হুমায়ুন একটু ছায়ার জন্য ছটফট করতে করতে একদিন আবিষ্কার করলো তার সেই ছায়াবৃক্ষের উৎসমুখ চিরকালের মতো বন্ধ হয়ে গেছে । ঘটনার আকষ্মিকতায় হুমায়ুন হিমালয়ের মতো নিথর হয়ে যায় । কেউ জানতেও চায়নি, কেউ বুঝতেও চায়নি হুমায়ুনের হঠাৎ এমন নিথর হয়ে যাওয়ার কারন । শুধু মিসির আলী বুঝতে পারে নিরব অভিমানে তার স্যার হুমায়ুনের ক্রমশ শেষ হয়ে যাওয়া। মিসির আলী চেয়েছিল তাঁর সকল কষ্ট নিজের দখলে নিয়ে নিতে, কিন্তু হুমায়ুনের রাজসিক মনস্তত্ত্বের সাথে প্রজাতিক মনস্তত্ত্বের মিসির আলী কোনভাবেই পেরে উঠেনি । মিসির আলী তো হুমায়ুনের একটা অংশ ধারন করে মাত্র । সমগ্র হুমায়ুনের সাথে আংশিক হুমায়ুনের পেরে উঠার কথাও নয় ।

হুমায়ুনের কবি মন তার প্রতি এই অন্যায় দন্ডাদেশ কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না । জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় নিজেকে আর প্রমাণ করার কোন আগ্রহ নাই তার, এতো দিনের প্রমাণিত আপনজনকে শুধুই অনুমানের উপর ভিত্তি করে কেউ পর করে দিতে পারলে সেও অনেক অনেক দূরে চলে যাবে । এভাবেই অভিমানে অভিমানে তাদের মাঝখানে একটা বিশাল দেয়াল বেড়ে উঠে আর তার বুকের জমিনের ছায়াবৃক্ষ উপড়ে নেয়ার ক্ষতস্থান হতে রক্ত ঝরে অবিরাম ।

সেদিন হঠাৎ অজ্ঞান হবার আগে কেউ বুঝতেই পারেনি হুমায়ুন এতোটাই অসুস্থ। হুমায়ুনের ভাবনা সে অসুস্থ থাকলেই তার ছায়াবৃক্ষরা তার কাছে আসবে। সে সুস্থ হয়ে গেলে ওরা আর আসবে না এই কারনে সুস্থ হবার ইচ্ছাই নাই তার । অসুস্থ হয়েও তাই সে একবারও ডাক্তার ডাকেনি শুধু তার চোখের কোনে ক'ফোটা জল টলমল করে তার ছায়াবৃক্ষের আঁচলে ঝরতে চাওয়ার অভিলাষে। বড় দেরিতে চিকিৎসা শুরু হলো হুমায়ুনের।

প্রথম বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল এই উপলক্ষেও যদি তাকে এক নজর দেখা দিতে আসে তার ছায়াবৃক্ষরা। তখনও আসেনি তারা, তাদের মুখটা না দেখে চিকিৎসা নিয়েও অসুস্থতার পরিমাণ বাড়তেই থাকলো । তাই চিকিৎসার শেষ দিকে হুমায়ুন কয়েকদিনের জন্য এক প্রকার জোর করেই ফিরলো আমেরিকা থেকে, খুব মেজর একটা অপারেশনের মাত্র দিন কয়েক বাকি । এমন একটা জটিল অপারেশনের আগে ঐ শরীরে এতটা বিমান যাত্রার কারন ছিল একটাই, এই সময়ে অন্তত তাকে না দেখে থাকতে পারবে না তার প্রাণের ছায়াবৃক্ষত্রয়। এতোদিন বুকে জমানো সকল কষ্ট, রোগ, যম, যাতনা প্রিয় ছায়াতলে বসে এবার বৃষ্টির মতো জড়াবেই সে, নিলুয়া বাতাসে এবার মন প্রাণ জুড়াবে তার । তারা এলে হয়তো অপারেশন লাগবেই না হুমায়ুনের ।

দেশে আসার পর তার চারপাশে শুধু আগাছা আর পরগাছা দেখে দেখে ক্লান্ত হুমায়ুন চোখের জল লুকাতে আকাশ আর আকাশের তারা দেখে সময় কাটায়। কিন্তু যার লাগিয়া তার মন উচাটন ছুটিয়া আসা তার সেই ভালবাসার ছায়াবৃক্ষদের কোথাও দেখতে পেল না হুমায়ুন, ছায়াবৃক্ষের ছায়াহীনতায়ই যে তার একমাত্র পেরেশানী সেতো কেউ জানে না। সেই জানে শুধু তার প্রাণভোমরেরা একবার তাকে ছুঁয়ে দিলেই সে সুস্থ হয়ে যাবে !

ঘর ছেড়ে হুমায়ুন পুকুর পাড়ে এসে বসে ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত, পরদিন আমেরিকা যাবার ফ্লাইট। তার উদাস ক্লান্ত চোখ দুটি সারাবেলা কাকে যেন খুঁজেছে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত । সেই নিরব খুঁজা বিমানে উঠা পর্যন্ত চলেছে তার । খুব আশা ছিল তার বুক থেকে উপড়ে নেয়া তার তিন ছায়াবৃক্ষকে অন্তত দূর থেকে হলেও একবার দেখার! কিন্তু তার সকল আশা শেষ, সময় শেষ এটা হুমায়ুন বুঝে ফেলে চুপ হয়ে যায় ।

কোন অপারেশনই হুমায়ুনের বুকের রক্তক্ষরণ থামাতে পারবে না, মিসির আলী এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে বারবার মানা করছে আমেরিকা যেতে । মিসির আলী প্রয়োজনে ছায়াবৃক্ষেদের পায়ে ধরে হলেও তাঁর কাছে নিয়ে আনতে যেতে বহুবার উদ্যত হলেও হুমায়ুনের অভিমান ততদিনে আকাশ ছুঁয়েছে । সে মিসির আলীকেও এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে । বুকের অদৃশ্য রক্তক্ষরণ থামিয়ে হুমায়ুনকে বাঁচানোর আর কোন রাস্তা জানা নাই মিসির আলীর । কিন্তু মিসির আলীর সকল অনুরোধ উপরোধ অগ্রাহ্য করে দিয়ে হুমায়ূন যখন ফের বিমানে চড়লো তখন থেকেই মিসির আলী অচেতন ।

হুমায়ুনের বিমান আমেরিকা পৌছার আগেই মিসির আলীকে নিয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পৌছে গেল এম্ব্যুলেন্স । হুমায়ুনের মৃত্যুর তিনদিন পর হঠাৎ করেই সুস্থ মিসির আলী পায়ে হেঁটে নিজ বাসায় ফিরে আবারও শয্যাশায়ী । এখন বেশিরভাগ সময়ই সে অচেতন অবস্থায় থাকে । অচেতন সময়টুকু আসলে হুমায়ুনের সাথেই কাটে তার। যদিও দৈহিক ভাবে মিসির আলী তার সেই তেল চিটচিটে বিছানায় শায়িতই থাকে। এখন অবশ্য শরিফুলের আজব চিঠি হাতে নিয়ে বিস্ফারিত চোখে শরিফুলের সামনে বসে আছে মিসির আলী । শরিফুল শীতল চোখে মিসির আলীর চোখে চেয়ে আছে ।

শেষ বারের মতো বিমানে উঠার সিঁড়িতে পা দেয়ার আগে কয়েকবার পিছনে তাকালো হুমায়ুন । যদিও জানে তার উপরে তার শান্তির ছায়া পড়ার আর কোনোও সম্ভাবনা নাই । উপায়হীন হুমায়ুনের ঠোঁটে মুচকি হাসি মানে সে হাল ছাড়েনি বা হার মানেনি। সে জানে কিভাবে ফিরলে তার ছায়াবৃক্ষরা আর তার বুকে না এসে পারবে না । হুমায়ুন নিশ্চিত এবার তার ছায়াবৃক্ষরা তার উপরে কেঁদে কেটে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার এতদিনের বুকের জ্বালা জুড়িয়ে দিবে। তাই, এবার হুমায়ুন শুধুমাত্র তার ছায়াবৃক্ষত্রয়ের এইটুকু ছোঁয়া পেতেই কফিনে করে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । হুমায়ুনের বুকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে অদৃশ্য রক্তক্ষরণ আর ঠোঁটে এক চিলতে মুচকি হাসি ।

(আপাতত সমাপ্ত)

মন্তব্য ২ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (২) মন্তব্য লিখুন

১| ১০ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১০:২৩

আমিই মিসির আলী বলেছেন: কপিরাইট আইনের ১০২ ধারায় আপনার লেখায় পেলাস দেয়া হইলো।

২| ১১ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৫:৩৪

শামীম জাহাঙ্গীর বলেছেন: কেন ভাই?

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.