| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইউনুসের খতি
(শামীম জাহাঙ্গীর)
ইউনুস আলী দশ গ্রামের মাঝে একমাত্র ডাক্তার । হোমিওপ্যাথ । লক্ষীপুর গ্রামের একেবারে শেষদিকে ইউনুসের ছোট দোচালা বাড়ি । সে শুধু ডাক্তারই নয় সাধারণ গৃহস্থও বটে । পৈতৃক আমলের জমি হইতে বর্গাদারের দেওয়া ধান ও পাট হইতেও কম বেশী আয় হয় তার । সংসার ও বেশ বড় । চার ছেলের দুইজনই চাকরিতে ঢুকেছে এই মাসে । সরকারি চাকরী । ইউনুস আলী কোমর থেকে খতিটা খুলে টাকা গুনে ।
এলোপ্যাথি চিকিত্সার তখনো প্রসার হয়নি এই এলাকায় । কোন সাইনবোর্ড টানানো হয়নি তবুও এটা "ডাক্তার বাড়ি" । রুগী বলতে ভাই বেরাদর আত্মীয় স্বজন । দূর দূরান্ত থেকেও যে কালে ভদ্রে রুগী আসে না তা নয় । বাড়ির বাইরে বৈঠকখানা । রুগী আসলে বৈঠকখানার সামনে রিক্সা থামে । রিক্সার টুংটাং বেল বাজিয়ে রিক্সাওয়ালা হাক দেয় । "ডাক্তার সাব বাড়িত আছুইন্" ?
ডাক্তার ইউনুস বাড়িতেই থাকে । সাধ্যমত বই ঘেটে ঘোটে চিকিত্সা করে । ডাক্তারের ফি হিসাবে চাল ডাল তরি তরকারি এমনকি হাস মুরগিও দেয় রুগিরা ।
এ গাঁয়ের লোকদের নগদ টাকার বড় অভাব । তবে কখনো সখনো কোন কোন রুগী নগদ টাকা দেয় । সেই টাকা ইউনুস খুব যত্নে তার টাকার থলিতে ঢুকিয়ে রাখে । টাকার এই বিশেষ থলিকে এই এলাকায় টাকার খতি বলে । এটা কোমরে বেঁধে রাখা যায় ।
গত বিশ বছর এই খতি ট্রাংকে থাকে। প্রতিদিনই তো আর টাকা আয় হতো না । যখন টাকা পয়সা আসতো হাতে তখন ট্রাংক থেকে খতি বের করতো । টাকা খতির ভিতর রেখে খতিটা আবার আগের জায়গায় রেখে দেয় । কতো ঝড় তুফান বয়ে গেছে তার উপর দিয়ে । তবুও খতির ভিতর থেকে একটা কানা পয়সাও বের হয়নি ।
আজকেও বের করার ইচ্ছা ছিল না । বিশেষ কারণেই করেছে । আজ রাতে তার দুই ছেলেই বেতনের টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে । পিঠাপিঠি দুই ছেলে একদিনেই চাকরীতে ঢুকেছে । ছেলেদের বলে দিয়েছে যেন নতুন টাকা আনে । এই পুরাতন ছেঁড়া ফাড়া টাকা গুলো বদলিয়ে নতুন টাকা আনিয়ে নিতে হবে । সর্বমোট বাইশ টাকা চার আনা । চার আনাটা অবশ্য চকচকে ।
খতিটা নিজ হাতে সাবান দিয়ে পরিস্কার করে ধুঁয়ে বৈঠকখানার সামনের রোদে শুকাতে দিল । খুব খেয়াল রাখছে চারদিকে । দূর থেকে কাউকে আসতে দেখলেই খতিটা লুকিয়ে ফেলে । সে ভাবে তার এই খতির কথা কেউ জানে না । সে ভুল জানে ।
ইউনুস আলীর খতির খবর সবাই কম বেশী জানে । এলাকায় এই খতি রীতিমত আলোচনার বিষয় এটা ইউনুস আলী মোটেও বুঝতে পারে না । সে নিজে কারো খবর রাখে না । মানুষ নিজেকে দিয়েই চারপাশের মানুষকে বিচার করে । এটা আসলেই সত্য । অন্তত ইউনুসের কাছে ।
ইউনুস দিনের বেলায় দরজা বন্ধ করে খতি হতে মুঠ ভরে টাকা বের করে । তবে সব টাকা বের করে না । কচকচে টাকা গুনার মজাই আলাদা । ইউনুস সেই মজাটা নেয় । মোট কতো জমল তার হিসাব সে করে না ।
এতদিনে দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়েছে ইউনুস আলী । তিনটা মেয়ের মাঝে দুইটারও বিয়ে দেয়া শেষ । বড় ছেলে শমসেরের দুইটা ছেলে । আজহারের এক ছেলে । দুই ছেলের জন্যে আলাদা আলাদা ঘর । বড় ছেলের ঘর লাগোয়া ঘরে ইউনুস থাকে ছোট দুই ছেলে নিয়ে । ইউনুস বিপত্নীক ।
দেশে দূর্ভিক্ষ চলছে তখন । চারিদিকে আকালের মাঝে আশে পাশের কেউই যখন ঠিকমত একবেলা ভাত খেতে পায় না সেখানে ইউনুস আলীর ঘরে তিন বেলা গরম ভাত । তার দুই দুইটা ছেলে সরকারি চাকরিওয়ালা বলে কথা । এতদিন শুধু গল্পই হতো ইউনুসের খতি নিয়ে । কিন্তু অভাবে স্বভাব নষ্ট হয় বলে কথা আছে না ?
এখানেও কেউ কেউ ইউনুসের খতির লোভে পড়ে । সাইদুল তাদের মাঝে একজন । দূরের কেউ নয় সে । ইউনুসকে চাচা বলে ডাকে । পাশাপাশি বাড়ি । সাইদুল দেখতেও যেমন সুন্দর তার আদব লেহাজ ও ভাল । এমনিতে চাচা বলে ডাকলেও আজ ডাকল ডাক্তার চাচা হিসাবে ।
ইউনুস দুপুরের খাবার খেয়ে এই সময়টা শুয়েই থাকে । কখনো ঘুম আসে । ঘুম আসলে সে ঘুমায়ও। ঘুম হল আল্লাহর শ্রেষ্ট নিয়ামত । আজও চোখটা লেগে আসছিল এমন সময় দরজার বাইরে টোকা পড়ল ।
ডাক্তার চাচা বাড়িতে আছেন ? কার কণ্ঠ বুঝতে পারল না ইউনুস । তবে কাছের কেউ হবে । দূরের কেউ হলে বৈঠকখানার সামনে থেকেই ডাক দেয়ার কথা ।
কে ? শুয়া অবস্থায়ই প্রশ্ন করল ইউনুস ।
আমি সাইদুল সরকার । নামের শেষে সরকারটা একটু গম্ভীর স্বরে বলে । ছেলেটার গা টা গরম সকাল থেকে ।
আচ্ছা । তুমি বৈঠকখানায় বস গিয়ে । আমি আসতেছি ।
সাইদুল কথা বাড়ায় না । কথা বাড়ানো যেত । কিন্তু চাচাকে সশরীরে দেখতে পারবে না বলে আপাতত সবুর করে সে । জ্বী চাচা আমি বৈঠকখানায় বসতেছি । আপনি আস্তে ধীরে আসেন ।
আস্তে ধীরেই দরজা খুলল ইউনুস । এলোমেলো টাকা গুলো গুছিয়ে খতিটা কোমরে বেঁধে তারপর দরজা খুলে সে ।
দরজা খুলতেই বড় উঠোন । উঠোনের পশ্চিমে দ্বিতীয় ছেলের ঘর । সেই ঘরের পাশে রান্না ঘর । রান্নাঘরের পিছনে নিজস্ব টিউবওয়েল । টিউবওয়েলেরও পিছনে জঙ্গল । সেই জঙ্গল তাদের বাড়ির সীমানা । নিজের ঘরের ডানদিকে বড় ছেলের ঘর । তার পিছনে অনেকটা খালি জায়গা ধান মাড়ানোর জন্যে । বৈঠকখানা হলো আরেক সীমানা ।
বৈঠকখানায় ইউনুসকে ঢুকতে দেখে সাইদুল উঠে দাড়ায় । বুড়োর চেহারা দিন দিন সুন্দর হচ্ছে । সাইদুল চিন্তিত হবার ভান করে । ছেলের জ্বর তো বাহানা মাত্র ।
বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকে ইউনুস । ভাল করে নাড়ি পরীক্ষা করে । থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপে । সব তো ঠিকই আছে সাইদুল । জ্বর মনে হয় কমে গেছে ।
ডাক্তার চাচার শরীর ঠিক আছে তো ? সাইদুল যেন ইউনুসের কথা শুনেনি । আপনার পেটটা কেমন ফোলা ফোলা লাগে । সাইদুল আসলে খাতির অবস্থান রেকি করার দায়িত্ব পালন করতে এসেছে এবং তাই করছেও ।
ইউনুস আলী সাইদুলের কথায় চমকে উঠলেও বুঝতে দেয় না । অবশ্য সাইদুল যেভাবে এক দৃষ্টিতে ইউনুসের পেটের দিকে তাকিয়ে আছে, সে চমকালেও টের পেত না সে ।
তুমি কি ছেলের চিকিত্সার জন্যে আসছ ? সাইদুলের গতিবিধি ভাল না লাগলেও প্রকাশ করে না ইউনুস ।
জ্বী চাচা । ইউনুস আলী বিরক্ত হচ্ছে সাইদুল বুঝতে পারে । বিরক্ত হলেই তার কী এমন ভাবে কথাটা বলল সে । অবশ্যই ছেলের চিকিত্সার জন্যে আসছি ।
কিন্তু তোমার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে তুমি আমার চিকিত্সা করতে আসছ ! ইউনুসের হাহাহা করে হাসিতে সাইদুল থতমত খেয়ে যায় এইবার ।
শুন সাইদুল সরকার । ইউনুস কথা ঘুরিয়ে ফেলে । তোমার ছেলে ভাল আছে । ছেলেকে মাছ শাক সব্জি মাছ মাংস ডিম ও দুধ খাওয়াইবা । আর ছেলের হাতটা মাঝে মাঝে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুঁয়ে দিবা । হাত দিয়েই বাচ্চাদের রোগ-জীবানু মুখ হয়ে শরীরে প্রবেশ করে । শুধু হাত পরিস্কার থাকলে বাচ্চাদের অসুখ বিসুখ অনেক কম হয় । আর আমিতো আছিই ।
জ্বি চাচা । আপনি আছেন বলেই তো নিশ্চিন্তে আছি । সাইদুলের কণ্ঠের কুটিলতাটা ইউনুস টের পেল কি না বুঝা যায় না ।
প্রতিদিন এশার নামাজ শেষে মুসুল্লিরা যাওয়ার পর মসজিদে তালা দিয়ে তবেই মোয়াজ্জিন এমদাদ বাড়ী যায় । এমদাদ কোরানে হাফেজ । খুব বিনয়ি ও কর্মঠ ছেলে এমদাদ ইউনুসের আপন চাচাত ভাইয়ের ছেলে । ইউনুসের ঘরের বাম দিকে এমদাদ দের ঘর । এশার নামাজের পর এমদাদ ঘরে ফিরে কোরান তেলাওয়াত করে । ইউনুসের ভাল লাগে বিষয়টা । তারও ইচ্ছা ছিল তার একটা ছেলেকেও আরবি লাইনে পড়াবেন । আল্লাহ হয়তো চায়নি । এ নিয়ে তার একটা হালকা আফসোসও আছে ।
আজকে মসজিদে তালা মেরে বেরুতে একটু দেরী হয়ে গেছে এমদাদের । এরই মাঝে এই অভাবী মানুষদের পুরো গ্রামের সব ঘরের বাতি নিভে গেছে । যারা জেগে আছে এবং যে কারনে জেগে আছে তাদেরও আলোর প্রয়োজন নাই । সাথে অমাবস্যার তিথি চলছে বলে চারিদিকে ঘন অন্ধকার । পরিচিত জায়গাটাও তাই খুবই অচেনা লাগছে এমদাদের কাছে । অনেকক্ষন হেটেও যখন বাড়ি খুঁজে পেল না তখন মাকে ডাক দিল ।
মায়া । মাকে মায়া বলে ডাকে এমদাদ । বাতিডা লইয়া বাইর অও মায়া গো । আমারে মনে অয় কানাওয়ালা ধরছে । গ্রামের মানুষের কাছে কানাওয়ালা হল অন্ধকারের এক তীব্র আতংকের নাম । এরা মানুষকে ভুল ঠিকানায় নিয়ে যায় বলে মানুষ বিশ্বাস করে ।
খুব কাছেই দরজা খোলার শব্দ হয় । এমদাদ আলো দেখে বুঝতে পারে ঘরের খুব কাছেই ছিল । হয়ত একই জায়গায় চক্কর দিছে এতক্ষন । কানাওয়ালার পাল্লায় পড়ে কত মানুষ মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে ফেলে তার হিসাব নেই । ভাবতে ভাবতে এমদাদ ঘরে ঢুকে । দরজা খোলা থাকায় ঘরের আলো রাস্তায় পড়ে। সেই আলোতে কয়েকটা কালো আবছায়া মতো কিছু সরে যেতে দেখল যেন এমদাদ । এমদাদ ভাবছে এরাই হয়ত কানাওয়ালা । হয়ত তাকে ঘরে ঢুকে পড়তে দেখে হতাশ হয়ে অন্য দিকে শিকার খুঁজতে গেল । বড় বাঁচা বেঁচে গেছে ভাবতে ভাবতে ঘরের দরজায় খিল দিল এমদাদ ।
শমসেরের ঘরে টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে । আলোতে তার ঘুম আসে না । আবার ছোট ছেলেটা ঘর অন্ধকার করলেই ট্যা ট্যা করে বাড়ি মাথায় তুলে । অগত্যা এই দূর্মূল্যের বাজারে শমসেরের ঘরে হারিকেন জ্বলে । টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের আলোতে ঘুমিয়ে থাকা বউকে আরো রূপবতী লাগে । আগুনের মত সুন্দর বউটাকে হারিকেনের আলোতে আরও সুন্দর লাগে। সেই বউ আর তার মাঝে দুই ছেলে শুয়া । ছোট ছেলেটা মনে হয় আজ আর ঘুমাবে না । এইটা কিভাবে জানি টের পেয়ে যায় । মায়ের দিকে হাত বাড়ালেই কান্না করে জেগে উঠে । জহুরা মুচকি হেসে উপাশ ফিরে শুয় । ছেলেও যেন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুম দেয় । শমসেরেরও চোখে ঘুম আসি আসি করছে এখন । সারাদিনের কর্ম ক্লান্ত শমসেরকে শান্ত করতে জহুরা ওই হাসিটুকুই বরাদ্ধ করতে পারে মাত্র ।
বারেকের মা বারো মাস অসুখে ভুগে । প্রতি রাতে তার কাশি উঠে । ভয়াবহ কাশি । রাত যত বাড়ে কাশিও তত বাড়ে । শেষ রাতে বমি টমি করে টরে অতঃপর ঘুমায় সে । তার ক্রমাগত কাশির শব্দে বাচ্চাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় । আশেপাশের কুকুর গুলি ঘেউ ঘেউ করতে থাকে ।
বারেকের মা যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমায় তখন সকাল হতে তেমন বাকী থাকে না । বারেকের মায়ের সাথে সাথে কুকুর গুলিও শান্ত হয়ে ঘুমায় । আজ এখন পর্যন্ত বারেকের মায়ের টানা কাশি শুরু হয়নি । বিরতি দিয়ে দিয়ে কাশছে । তার মানে রাত এখনো গভীর হয়নি । বারেকের মা রাতের বেলায় একটা জ্যান্ত ঘড়ি যেন ।
বারেকের মা কাঁশছে না অথচ কুকুরগুলি খুব ঘেউ ঘেউ করছে । ঘেউ ঘেউ করতে করতে কুকুরগুলি ইউনুসের উঠোনের দিকে আসছে । প্রতিদিন রাতের মতো আজও কুকুরের চিত্কারে ঘুম ভেঙ্গে যায় ইউনুসের । আর প্রতি রাতের মতো আজকেও বারেকের মার গুষ্টি উদ্ধার করছে সে । করবেই না কেন ? বারেকের মা ইউনুসের চাচাত ভাবী, বিধবা । তার বিশ্বাস হোমিওপ্যাথ ঔষধ মদ দিয়ে বানানো । তাই সে কবিরাজ ডেকে ঝাড় ফুঁকের চিকিৎসা নেয় । ডাক্তার বাড়িতে কবিরাজ আসাটা তার জন্য বড়ই অপমানের যে !
অতীব রক্ষণশীল এই মহিলা ইছা(চিংড়ি) মাছকে বিয়ের পর থেকেই হুংগা উলা মাছ বলে ডাকে কারণ তার স্বামীর নাম ইছব আলী । ইছা মাছকে ইছা মাছ বললে নাকি তার স্বামীর নাম মুখে আনা হয়ে যায় ।
রাতে যদি কখনও হারিকেনের আলো বাড়াতে হয় তবে ঘুমন্ত শমসেরের চোখের উপরে পাতলা কাঁথা মেলে দেয় তার বউ । যেদিন দিতে মনে থাকে সেদিনতো সব ঠিকই থাকে । আর তাড়াহুড়ার মাঝে যেদিন আলো বাড়ানোর আগে শমসেরের চোখের উপর কিছু দিতে ভুলে যায়, টিমটিম করে জ্বলা হারিকেনের সলতা বাড়াতেই ঘুম ভেঙ্গে যায় শমসেরের । ঘুমের মাঝে বিরক্ত করলে খুবই রাগ করে সে ।
ইস্ ! আলোর তীব্রতায় চোখ কুঁচকে গেল শমসেরের । বউয়ের উপর চরম একটা তপ্ত মেজাজ নিয়ে চোখ খুলল সে । চোখে চোখ ঝলসানো আলো ! তার চোখ অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেল আবার । ভয়ার্ত একটা চিৎকারের শব্দ বের হবার আগেই তার মুখে গামছা গুঁজে দিল কেউ । শমসেরের বুকে বল্লম ঠেকিয়ে একজন মোটা গলায় হুকুম করল "একদম চুপ" । শমসের বুঝতে পারল তার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে ।
ডাকাতদের সাথে মৃদু দস্তদস্তিতে তার পাশে ঘুমানো চার বছর বয়সী বড় ছেলে ফরহাদের ঘুম ভেঙ্গে যায় । চোখ মেলে ঘরে এত গুলো মামা দেখে আনন্দে চোখ গোল গোল করে তাদের দেখে । এই বাড়িতে এমন প্যান্ট শার্ট পড়ে কেবল তার মামারাই আসে । মামারা নিশ্চয়ই অনেক কিছু নিয়ে এসেছে ভেবে "মামা" বলে বিছানা থেকে নামতে গেলে ডাকাতদের একজন ফরহাদের কচি গালে একটা থাপ্পর বসায় এবং বুকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয় । ফরহাদ ভ্যা ভ্যা করে কাঁদা শুরু করে । কান্না থামানোর জন্য ধমক দিলে আরো কান্না বাড়ে তার ।
"মা" এমনই এক চরিত্র যা চিরায়ত নারীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা । জহুরার কথাই ধরা যাক । বিয়ের পর এমনও হয়েছে যে খুব বৃষ্টি হচ্ছে••• । জহুরা ঘুমুচ্ছে••• । হঠাত্ টিনের চালের ছিদ্র দিয়ে জহুরার উপর পানি পড়া শুরু••• । শমসের টের পেলেও জহুরাকে ডাকে না । ততোদিনে তার জানা হ্য়ে গেছে বউকে ডেকে লাভ হবে না । তাই সে বউকে টেনে খাটের একপাশ থেকে অন্য পাশে নিয়ে যায় । তবুও ঘুম ভাঙ্গত না জহুরার । এমনই কুম্ভকর্ণের ঘুম ছিল তখন । •••আর এখন ? রাত দুপুরে তার বড় ছেলের একটা আচমকা চিত্কারে সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে যায় জহুরার ।
চিত্কার দিতে চেয়েও থেমে যায় জহুরা । তার স্বামীর বুকে ধরে রাখা বল্লম তাকে চুপ করিয়ে দেয় । ফরহাদ মায়ের বুকে লোকায় । কান্না থামিয়ে মাকে প্রশ্ন করে । মা এরা কারা ? মা'ও তাকে বলে এরা তার মামা । ফরহাদ অবাক । এরা ভাল না মা । এরা পঁচা মামা ।
ডাকাতদের মধ্যে কেউ একজন হো হো করে অট্টহাসি দেয় । তারপর এক কান ফাটানো ধমক । একদম চুপ । তাড়াতাড়ি আলমারির চাবি বের কর । আমরা ভাল মানুষ । ভয়ংকর হবার আগে ভদ্রভাবে সব দিয়ে দে । কথা বলতে বলতে বল্লম দিয়ে আস্তে করে শমসেরের বুকে খুঁচা দেয় ।
বল্লমের ধারালো চিকন অগ্রভাগ শমসেরের বুকে ঢুকে যেতে চাইলে শমসের পিছনে কাত হয়ে যায় । সাদা গেঞ্জিতে ভিজা দাগ দেখে চমকে উঠে জহুরা। রক্ত••• ? জহুরা চিত্কার করে উঠে । আপনারা সব নিয়া যান । তবুও এই মাসুম বাচ্চাদের এতিম কইরা দিয়েন না । জহুরা আর সময় নষ্ট করে না । কথা বলতে বলতে আঁচল হতে চাবি খুলে ছুঁড়ে দেয় । সব নিয়া যান । জহুরার কাছে তার স্বামীর চাইতে দামী আর কিছুই নাই যে ।
আলমারির জিনিসে মন ভরে না ডাকাত দলের । একজন হুংকার দেয় । অলংকার কই ?
শমসের শুধু এটুকুই বলে যে, যা আছে সব ওই আলমারিতেই আছে । আর এটুকু বলতেই শমসেরকে পিছ মোড়া করে বেঁধে ফেলে এক ডাকাত । এক ডাকাত টান মেরে শমসেরকে বিছানা থেকে টান মেরে মাটিতে ফেলে দেয় । শমসেরের গলায় ছুরি দিয়ে পোছ দিবে এমন সময় জহুরা ডাকাতের পা জড়িয়ে ধরে । সিলিংয়ে আরেকটা ট্রাংক আছে দেখেন । আপনে আমার ধর্মের বাপ লাগেন । এত বড় সর্বনাশ কইরেন না আমার ।
জহুরা যৌবনবতী কন্যা । ভারী বুক থেকে আঁচল সরে যায় । সেদিকে তার খেয়াল করার সময় না এখন । স্বামীর জীবন আশংকায় পড়লে মেয়েদের মাথা ঠিক থাকে না । মাথার সাথে কাপড়ের একটা সম্পর্ক আছে আদিকাল থেকেই । মাথা ঠিক তো কাপড় ঠিক । মাথা ঠিক নাই তো কাপড়ও ঠিক নাই ।
এবার ট্রাংক খুলে সন্তুষ্টই মনে হলো ডাকাত দলকে । একজন শমসেরকে টেনে তুলে তার পিঠে ডেগার চেপে ধরে বলে, চল্•••। যেন হালের গরু ঠেলছে । তোর বাপের ঘরে নিয়ে চল্ । শমসের বাধ্য ছেলের মতো তার পিছনের নির্দেশে সামনে হাটে । শমসেরের ঘর থেকে তার বাবার ঘরে যাওয়ার একটা করিডোর আছে । বাজান এতোক্ষনে নিশ্চয়ই পালিয়ে গেছে ভাবতে ভাবতে বাবার ঘরে ঢুকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো।
ইউনুসের নাকে মুখে রক্ত, চিৎ হয়ে পড়ে আছে মাটিতে । ছোট দুই ভাইকে পিছমোরা করে বেঁধে রাখা হয়েছে । এবার তাকেও পিছমোরা করে বাঁধা হলো । এবার মনে হয় তাকে জবাই করেই ফেলবে । চিৎকার করে শমসের । তোমরা কেউ আইলানা ? ডাকাইতে আমরারে জবাই কইরা ফেললো ! জহুরা গগণ বিধারী চিত্কার করে তার শ্বশুরের ঘরের দিকে দৌড় দিল । তার দুই কোলে দুই ছেলে । ফরহাদ ও মজনু ।
তোর বাপকে বল্ ভালয় ভালয় টাকার খতিটা দিয়ে দিতে, না হলে সত্যই সবগুলারে জবাই করব ••• হুংকার দেয় এক ডাকাত । এই ডাকাতটা বেশ বড়সড় ও মোটাসুটা । এটা বোধ হয় ভয়ংকর ডাকাত । না হলে এই বয়স্ক মানুষটাকে এভাবে মারে কেউ ? এদের নিষ্ঠুরতা দেখে তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, খতি না পেলে এরা হয়ত সত্যি সত্যি আজ তাদের জবাই করে ফেলবে । এই কয়টা টাকার জন্যে শমসেরের এভাবে জীবন দিতে ইচ্ছা করে না । বাপকে জোরে জোরে ডেকে বলে, বাজান গো । ওরা যা চায় দিয়া দেও । বাঁইচা থাকলে টাকা পয়সা আবার হইব ।
ইউনুস আলী চোখ বুঝে পড়ে আছে । কোন সাড়া শব্দ নাই । পেট নড়ছে দেখে বুঝা যাচ্ছে বেঁচে আছে । এক ডাকাত এসে ইউনুসের পেটে, লুঙ্গীর নীচে কিছু খুঁজল । তারপর তার পেটে জোরে জোরে আঙুলুঁ দিয়ে খোঁচা দেয় আর বলে, ওই বুইড়া উঠ, আমরা তর চিকিৎসা করতে আসছি । নাইলে কিন্ত তোর চার পোলারেই খতম করবাম কইলাম । এবার একটা রাম খোঁচা দিল ইউনুসের পেটে ।
যে জোরে খুঁচাটা দিল তাতে অজ্ঞান হলে জ্ঞান ফিরে আসতো । ইউনুস আলী অজ্ঞান হবার ভঙ্গি করছে । সে দাতে দাত কামড়ে পড়ে আছে । যা হবার হোক আমি চোখ খুলব না এমন সিদ্ধান্তে অটল পাহাড় হয়ে পড়ে রয়েছে । জীবন গেলেও খতির খবর সে দিবে না । এরই মাঝে মনে মনে সাইদুলকে একটা ধন্যবাদও দেয় সে । সাইদুলের দূপুরের আচরনই যে সাবধান করে দিয়েছিল ইউনুসকে ।
এবার ইউনুসের পেটে বিশাল এক ঘুসি দেয় । তাতেও জ্ঞান ফিরানো যায়নি দেখে সব রাগ গিয়ে পড়ে শমসেরের উপর । উপুড় হয়ে পড়ে থাকা শমসের পিঠে তার হাতের ডেগার চেপে ধরে । আগাটা একটু ঢুকতেই মরণ চিত্কার দেয় শমসের । এটা দেখে জহুরা পাগলের মতো একবার শ্বশুরকে ডাকছে আবার ডাকাতের পায়ে পড়ছে । বাজানরা, আর একটু সময় দেন, আমি খুঁইজা দেখি••• । আব্বারতো দাতি লাগছে । বেহুশ হওয়াকে এই এলাকায় দাতি লাগা বলে । দুই পাটি দাত খুব শক্ত হয়ে একে অন্যের সাথে লেগে থাকে বলে এই নাম ।
এমদাদ অনেকক্ষন আগেই টের পেয়েছে । রাতে কানাওয়ালার ভয়ে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ায় ঘুমটা বেশ গভীর হলেও পাশের ঘর থেকে এত জোরে চিত্কার চেঁচামেচি শুনে ঘুম না ভাঙ্গার কোন কারণ নাই । দরজা খুলতে গিয়ে বুঝতে পারল ডাকাতেরা বাইরে থেকে আটকে দিয়েছে । দরজা আটকে কি আর সবাইকে আটকানো যায় ?
এমদাদের কাছে গরু জবাই করার ছুড়ি আছে । সেটা দিয়ে ঘরের খাম থেকে বেড়া কেটে ছুড়ি হাতেই বেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ে । জঙ্গল পেরুলেই ফয়জুদ্দি মোড়লের বাড়ি । মোড়ল বাড়ির সবাইকে ডেকে তুলল এমদাদ । ডাকাত পড়ছে গো ইউনুস চাচার বাড়ি••• । চলো সবাই•••। ফয়জুদ্দির ছোট ভাই বিরাট পালোয়ান । সেই লোকমান সবার আগে ।
ইউনুসের তবু জ্ঞান ফিরে না । এদিকে ডাকাতের ডেগার শমসের পিঠে আধা ইষ্ণির মতো ঢুকে গেছে । শমসেরের রক্ত দেখে জহুরা বাক শক্তি হারিয়ে ফেলল । শমসেরের মুখ থেকে ঘুঙ্গানির মত শব্দ বেরুচ্ছে এখন ।
এমন সময় বাইরে লোকজনের ডাকাত ডাকাত বলে চিত্কার শুনা গেল । চিৎকার শুনে ডাকাতেরা পিঠ টান দেয় । মানুষজন আসতাছে রে, চল্ আজ আর না ! কোনমতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া রক্তাক্ত শমসের ওভাবেই পড়ে আছে ।
জঙ্গলের দিক থেকে হৈচৈ শুনতে পেল জহুরা । ডাকাতরা অন্ধকারে মিলিয়ে যায় নিমিষেই । নিশ্চিত অন্ধকারে ছেঁয়ে যেতে থাকা তার ও তার দুই সন্তানের ভবিষ্যতের উঠোনে আবার আলো জ্বলে উঠলো যেন । ছেলে দুটোকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে এতক্ষন দম ফাটানো পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্লান্ত জহুরা ।
সমাপ্ত•••
২|
১১ ই মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:৫৫
কবীর বলেছেন: ভাল লাগলো।ধন্যবাদ ভাই
৩|
১১ ই মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:১৪
শামীম জাহাঙ্গীর বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ ভাই
৪|
১১ ই মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:১৫
শামীম জাহাঙ্গীর বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ
©somewhere in net ltd.
১|
১১ ই মার্চ, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:২১
আমিই মিসির আলী বলেছেন: চমৎকার কাহিনী!
ভালো লাগলো।