নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

শামীম জাহাঙ্গীর

শামীম জাহাঙ্গীর › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছোট গল্প : একটি শোক সংবাদ

১৪ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:২৩

গল্প : একটি শোক সংবাদ
(শামীম জাহাঙ্গীর)

সাজ্জাদ রহমান অফিস শেষ করে প্রতিদিনের মতো সরাসরি বাসায় ফিরে আজও । গেইট পেরিয়ে দরজার কলিং বেলের সুইচের দিকে হাত বাড়ানোর আগেই সে খেয়াল করে ঘরের মূল দরজা খোলা । কতোদিন কতো ভাবে সাবধান করেও এদের সাবধানী করা গেল না ভেবে মেজাজ খারাপ হয় সাজ্জাদের । চুরি হয়ে গেলে তখন চোখের জল ফেলেই দায় মিটাবে বউ কিন্তু সেটা কিনতে হবে তো তাকে । এমনেই কী মেজাজ খারাপ হয় তার? যদিও ঘরে ঢুকে চারপাশে খেয়াল করে সব ঠিক আছে দেখে একটু শান্ত হয় তার মেজাজ । তবে বউ বাচ্চাদের কোন সাড়া না পেয়ে চেঞ্জ না করেই ছাদে চলে যায় সে । ভাবে হয়ত পাশের বাসায় গেছে সবাই।

সারাদিনব্যাপী রুটি রুজির ক্লান্তিহীন দৌড় শেষে এই ছাদটাই তার প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার একমাত্র আশ্রয় । বাসায় ফিরেই ছাদে যাবার জন্য আকুপাকু করতে থাকে সাজ্জাদের কবি মন । চারদিক খোলা ছাদের মাঝে মাদুর বিছিয়ে বসে থাকা বা কখনও চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখার এই সময়টুকু একান্তই তার। এখানে বসেই ভাবনার জগতে হারিয়ে যায় সে। শরীরে শীতল পরশ বুলিয়ে দেওয়া দখিনা বাতাসে সে কখনও কবি কখনও বাউল কখনও প্রেমিক কখনও গাতক।

পাশের মসজিদে এশার আযান হচ্ছে শুনে হাতের সিগারেট নিভিয়ে চুপ করে আযান শুনে সাজ্জাদ । আযান শুনতে বরাবরই খুব ভাল লাগে তার। আযান শেষে আযানের দোয়া পড়া শেষে নিভানো সিগারেট ফের ধরানোর জন্য লাইটার জ্বালিয়েও সিগারেট না জ্বালিয়ে লাইটার নিভিয়ে ফেলে। মাইকে ঘোষনা হচ্ছে ।

একটি শোক সংবাদ। একটি শোক সংবাদ।

শোক সংবাদ শুনতে শুনতে সিগারেট টানলে মুর্দার অসন্মান হবে ভেবে সিগারেট না ধরালেও সাজ্জাদের মনটা আগের মতো শান্ত থাকে না আর। শোক সংবাদ শুনলেই বুকের ভিতর কেমন জানি লাগে তার । কার ঘরে না জানি স্বজন হারানোর আর্তনাদ হচ্ছে! না জানি কার বুকের ধন চলে গেল?

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। মিরপুর এক নম্বর ই ব্লক এক নম্বর রোড •••

এটুকু শুনে আত্মাটা ধ্বক করে উঠে সাজ্জাদের । এক নম্বর রোডের শেষের বাসায় সে থাকে । একটু আগেই এই রোড দিয়েই সে তার এই বাসায় ফিরেছে। কই? তেমন কিছু তো চোখে পড়ল না। বাকিটুকু শুনতে কান খাড়া করেও শান্তি পায় না মন, নিজেই উঠে দাড়ায়। টেনশনে পড়ে যাওয়ারই তো কথা । এই রোডের প্রতিটি মানুষের সাথে তার আত্মার সম্পর্ক। মোট আটটি করে রোডের দুই পাশে ষোলটি বাড়িতে তিহাত্তর জন বাসিন্দা। এর বাইরে সতেরো জন কাজের ছেলে/মেয়ে আর তিনজন সিকিউরিটি গার্ড । তবে এই বিশ জনের কারো মৃত্যুতে মসজিদের মাইকে শোক সংবাদ ঘোষনা হবার কথা না।

মানুষের মনের গতি আলোর গতির চেয়েও দ্রুত চলে। গত শুক্রবার এই রোডের পিকনিকে সবাই কতো আনন্দ করলাম। ভাবছে সাজ্জাদ । একটা সপ্তাহের মাঝে কে স্মৃতি হয়ে গেল গো! প্রাণটা ধুমরে মুচড়ে যাচ্ছে তার ।

নজরুল চাচা অনেক দিন যাবত বিছানায় পড়ে আছে । বাসায় ফিরার সময় তাকে নাক দিয়ে খাওয়াতে দেখে এসেছে । গত চার বছর যাবত তাঁকে এভাবে পাইপ দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে। তার জন্য খেটেখুটে অঙ্গার হয়ে যাওয়া পুত্রবধূর জন্য অনেকেই মায়া করে বৃদ্ধের মরণ কামনা করলেও সাজ্জাদ এটাও চায় না। বাঁচুক না আর কিছুদিন । বেঁচে থাকার স্বাদ মিটেনি তার। আর সবাই তরতাজা । এই জন্যই তার বাসা খালি? তবে কী অতি আপন কেউ?

ই ব্লক এক নম্বর রোড আট নম্বর বাসা নিবাসী•••

এবার আল্লাগো বলে চিৎকার করে উঠলো সাজ্জাদ । আট নম্বর বাসা তো তার নিজের ! দুই ছেলে মেয়ে স্ত্রী আর বূদ্ধ শ্বশুর শ্বাশুড়ী নিয়ে সাজ্জাদ রহমান "ই" ব্লকের এক নম্বর রোডের আট নম্বর বাসার স্থায়ী বাসিন্দা।

দাঁড়ানো সাজ্জাদ জায়গার মাঝেই ধুপ করে বসে পড়ে। তার বাসার পাঁচজনের মাঝে কেউ একজন মারা গেছে আর সে ছাদে বসে আছে?

নিজের স্ত্রী অথবা সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ এভাবে জানতে হচ্ছে তাকে? এই মুহূর্তে নিজেকে স্মরণকালের শ্রেষ্ঠ দূর্ভাগা ভাবা সাজ্জাদের ভিতরটা কেমন যেন অনুভূতি শূন্য ও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ । সে কোনই যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না বিষয়টার, তার মোবাইলে একটা ফোনও করতে পারল না কেউ? মোবাইলের কথা মনে পড়ায় সাজ্জাদ ঝট করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে মোবাইলের স্ক্রিন ভাঙ্গা । আজব! এটা আবার কখন হলো? ভাবছে সাজ্জাদ ।

অফিস থেকে ফিরতে সময় কোথাও ধাক্কা খেয়েছে কিনা ভাবতেই মনে পড়লো শাহবাগ মোড়ে প্রচন্ড জ্যাম দেখে বাস থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে রাস্তা পার হবার সময়••• মাইকের ঘোষনায় নিজের নাম শুনে সাজ্জাদের চিন্তা এলোমেলো হয়ে গেলো।

"ই" ব্লক "এক" নম্বর রোড "আট" নম্বর বাসার মালিক জনাব সাজ্জাদ রহমান সাহেব আজ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শাহবাগ মোড়ে গাড়ি চাঁপায় মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন । ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন।

হো হো আগে একচোট হেসে নেয় সাজ্জাদ । সন্তান বা স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়নি বলে এতক্ষণের সকল টেনশন মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সাজ্জাদের। এখন তার কাছে এটাও জলের মতো পরিস্কার যে তার এই ভূয়া মৃত্যুর সংবাদেই সবাই পাগল হয়ে ঘরবাড়ি উন্মুক্ত রেখেই শাহবাগ চলে গেছে । আহারে! সবাই না জানি কত আহাজারী করছে রে ! ওদের একটা ফোন করব সেই সুযোগও তো নাই। মোবাইলটা যে কিভাবে ভাঙলো! তার এই ভাবনার মাঝেই মাইকে শোক সংবাদ পুনঃপনঃ ঘোষিত হয়েই যাচ্ছে ।

আশ্চর্য! আমি তো শাহবাগ মোড়ের জ্যাম পেরিয়ে আরেকটা বাসে করে সেই কখন বাসায় ফিরে আসলাম আর তারা আন্তাজি আমার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেই চলছে । হঠাৎ চিন্তায় কপাল কুঁচকে সাজ্জাদের ! শাহবাগ থেকে কোন বাসে উঠার কথা মনে পড়ে না তার । সিএনজি অটোরিকশা নেওয়ার কথাও মনে পড়ে না সাজ্জাদের । আজ মাসের এক তারিখ। এখনও বেতন হয়নি । বেতন পাওয়ার আগে এই সময়ে সিএনজি নেওয়ারও তো কথা না তার। ও আচ্ছা ••• হঠাৎ করেই ব্যাপারটা মনে পড়ে যায় সাজ্জাদের । ওহ্ হো হো হা হা হা করে হেসে ফেলে সাজ্জাদ ।

আরে আজ যে এপ্রিলের এক তারিখ এটাই তো এতক্ষণ মনে পড়েনি তার । এই বদ্ধ উন্মাদ জেনারেশনের ছেলে পেলেদের নিয়ে আর পারি না । এই যে বলি এপ্রিল ফুল করিস না। এটা করা উচিত না।

কিছুই মানে না পোলাপানের দল
বুড়োদের প্রদেয় যতো জগদ্দল•••

তাই বলে কারো বাড়ির লোকজনকে এতটা কষ্ট দেয়ার এই ভয়ঙ্কর খেলাটার একটা বিহিত করতেই হবে এইবার। গতবার এপ্রিলের এক তারিখে পাশের বাসার শরিফের বিয়ে নিয়ে মজা করায় অবশ্য সেবার খুব মজা হয়েছিল। কিন্তু এইভাবে কারো মৃত্যু সংবাদ নিয়ে এমন মজা করা ভিষন অন্যায়। আগে সবাই বাসায় আসুক ভেবে নিভানো সিগারেটটা আবারও ধরানোর জন্য হাতে নেয় সাজ্জাদ ।

বাসার সামনে ট্রাক থামার শব্দ হওয়ায় আবার উঠে দাঁড়ায় সাজ্জাদ । ট্রাক নীরব হবার সাথে সাথেই চারদিকে কান্নার রোল শুনে ছাঁদ থেকেই বাসার সামনের রাস্তায় উঁকি দেয় সে।

একটা কফিন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক ধরে সবার সে কী কান্না । তার বউটা ট্রাকের বডিতে মাথা ঠুকে ঠুকে বিলাপ করছে আর মা'কে ধরে ফ্যালফ্যাল চোখে দাঁড়িয়ে আছে তার অতি আদরের ছোট মেয়েটা । কার না কার লাশ ধরে এরা এমন হাস্যকর কান্ড করছে আল্লা মাবুদ জানেন। এদের আহাজারী থামাতে ছাদ থেকেই ডাক দিল সাজ্জাদ । এই বউ! এই বউ! আরে আমি মরি নাই তো। এই তো আমি! ও বউ!

এতো কান্নার মধ্যে কেউ তার কথা শুনতে পারে না বলে সাজ্জাদ দৌড়ে নীচে নামে। ট্রাকের কাছে গিয়ে এই যে বউকে ডাকে । ও বউ! এই তো আমি! ও বউ! এর মাঝে তার বউ কান্নার চোটে মূর্ছা যায় । কফিনের মুখ খোলা দেখে উঁকি দিয়ে সাজ্জাদ দেখতে চায় কে এই দূর্ভাগা?

আহারে! মুখটা আর মুখ নাই রে । মুখটা মরিচ পিষার পাটার মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়ায় চেনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে মাথার উপর দিয়ে কোন গাড়ির চাকা চলে গেছে। আহারে বেচারা বলে বডি ঢেকে রাখা চাঁদরটা একটু একটু করে সরায় সাজ্জাদ । লোকটার পরনে হুবুহু তার পরনের শার্ট প্যান্ট দেখেই সাজ্জাদ বুঝতে পারে সকলে কেন একে সাজ্জাদ ভাবছে। আরে••• এবার শিউরে উঠে সাজ্জাদ! এর মানে কী? লোকটার গলায় ঝুলিয়ে রাখা তার অফিস আইডিতেও তার ছবি তার নাম!

সেখানে দাঁড়িয়েই চিৎকার করে সাজ্জাদ । এটা কার লাশ? কার জন্য তোমরা এভাবে কাঁদছো? এই তো আমি সাজ্জাদ! আমি বেঁচে আছি! অনেকক্ষণ একটানা চিৎকার করে তীব্র কাঁশি উঠে গেছে সাজ্জাদের তবুও তার কথায় কেউ কর্ণপাত করলো না। তাঁদের আহাজারী চলছেই।

সমাপ্ত

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ১৪ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:৪০

সুমন কর বলেছেন: প্লট পুরোনো কিন্তু উপস্থাপন ভালো লেগেছে।

২| ১৪ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:৪৫

ইমরাজ কবির মুন বলেছেন:
Sumon er comment tai actuaLLy korte aschiLam.
vaLo Likhsen.

৩| ১৫ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:৩১

শামীম জাহাঙ্গীর বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাদের

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.