নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

তাই-ফি

আমি বাংলাদেশের একজন দালাল বলছি !!

তাই-ফি › বিস্তারিত পোস্টঃ

সৌদি আরব! বালুর ওপর গড়া এক রাজত্ব।

০১ লা জুন, ২০২৬ সকাল ৭:৪১




২০১১ সাল আরব বিশ্ব এক প্রলয়নকারী ঝড়ের কবলে পড়লো ইউনিশিয়ায় একজন ফল বিক্রেতা নিজের গায়ে আগুন লাগালেন। আর সে আগুন ছড়িয়ে পড়লো পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। মিশরে ৩০ বছরের হোস্নি মোবারক ১৮ দিনে পড়ে গেলেন।

লিবিয়ায় গাদ্দাফি ৪২ বছর ক্ষমতায় থেকে একটা ড্রেন পাইপে লুকিয়ে ধরা পড়লেন। তারপর মারা গেলেন। ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়া সবখানে মানুষ রাস্তায় নামল। এ ঢেউ সৌদি আরবে আছড়ে পড়ল। রিয়াদে কিছু মানুষ বিক্ষোপ করার চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুই হলো না। এলো ঢেউ চলে গেল। সৌদি রাজ পরিবার ঠাই দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক যেমনটা ছিল তেমনি।

এটা কিভাবে সম্ভব? মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশ কাঁপলো। কিন্তু সৌদি আরব কাঁপলো না কেন? সৌদি আরবের আল সাউদ পরিবার ১৯০২ সাল থেকে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায়। ছোট বিশ্বযুদ্ধ তেলের মূল্য পতন, আরব বসন্ত, পারমাণবিক হুমকি। কিভাবেই তারা টলেনি? কারন সৌদি আরব এমন এক রাজনৈতিক ল্যাবে যেখানে আনুগত্য কেনা হয় ডলারে। যেখানে ক্ষমতাকে পাহারা দেয় ধর্ম। আর যেখানে নিরাপত্তার চাদর বিছানো থাকে ওয়াশিংটন। কেন সৌদি রাজ পরিবারের কিছু হয় না? এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের অদ্ভুত এক জীবন রক্ষাকারী কাঠামোতে।

রাজপরিবার, একটি বিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেল:
সৌদি রাজপরিবার বলতে যদি আপনি ভেবে থাকেন চার পাঁচ জন রাজকুমার আর একটা প্রাসাদ তবে আপনি ভুল করছেন। বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। সৌদি রাজ পরিবারে এই মুহূর্তে কতজন সদস্য আছেন সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। রাজপরিবার না বলে এটিকে একটি বিশাল কর্পোরেশন বলাটাই ঠিক হবে। এ রাজপরিবারের সদস্য সংখ্যা ১৫০০০ থেকে ২৫০০০। এদের মধ্যে অন্তত ৭০০০ রাজকুমার সরাসরি ক্ষমতার অংশীদার। এ বিশাল সংখ্যার রহস্য কি?

প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ যখন মরুভূমির গোত্রগুলোকে এক করে বর্তমান সৌদি আরব গঠন করেন। তিনি প্রতিটি শক্তিশালী গোত্রের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। তার সন্তানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৫ জন পুত্র। এ পুত্ররা বড় হয়ে আরবে বিয়ে করেন এবং বংশবিস্তার করেন। প্রশ্ন করা যেতে পারে এত বড় পরিবারের রাজনৈতিক সুফল কি?

যখন একটি রাজপরিবার এত বড় হয় তারা রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে মিশে যায়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তেলের কোম্পানি, আরামকোর বোর্ড মেম্বার, এমনকি ছোট একটি প্রদেশের গভর্নর। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদের চেয়ারে কে বসে আছে? উত্তর একটাই রাজকুমার। এক কথায় একে আমরা বলতে পারি রাজতন্ত্রের ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেল। রাজতন্ত্র টিকে থাকলে এই ১৫,০০০ মানুষের দামি গাড়ি, প্রাসাদ এবং রাজকীয় ভাতা নিশ্চিত থাকে। রাজতন্ত্র পড়ে গেলে এরা সবাই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। তাই এই ১৫,০০০ সশস্ত্র ও প্রভাবশালী মানুষ এ সিস্টেমকে রক্ষা করতে জান দিয়ে লড়ে। এটা কোন একক ব্যক্তি শাসন নয়। এটি একটি বিশাল সঙ্গবদ্ধ বাহিনীর শাসন। এটাই প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ।

তেলের অর্থ এবং ‘নো ট্যাক্স’ চুক্তি (রেন্টিয়ার স্টেট):
১৯৩৮ সাল সৌদি আরবের মাটির নিচে তেল পাওয়া গেল। সেইদিন থেকে এই দেশের রাজনীতির হিসাবটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। তেলের আগে সৌদি আরব ছিল একটি দরিদ্র মরুরাজ্য। মানুষ বাঁচতো যাবৎ জীবনে বাণিজ্যে আর হজ যাত্রীদের সেবায়। রাজাকে কর দিতে হতো না। কিন্তু রাজাও খুব বেশি দিতে পারতেন না। কিন্তু তেল রাজ পরিবারের হাতে তুলে দিল এক জাদুকরী চেরাক।

রাজনীতিতে একটা পরিচিত নীতি আছে “নো ট্যাক্সেশন উইদাউট রিপ্রেজেন্টেশন”। মানে হলো সরকার যদি জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স বা কর নেয় তবে জনগণ ভূমিকা চায়। গণতন্ত্র চায়। সৌদি আরব এ ফাঁদে পড়েনি। তারা জনগণের কাছ থেকে কর নেয় না উল্টো তারা জনগণকে দেয়। সৌদি আরবের নাগরিক হওয়া মানে এক বিশাল বীমার অংশ হওয়া। সৌদি নাগরিকরা পায় বিনামূল্যে শিক্ষা, বিনামূল্যে চিকিৎসা, সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার, বিদ্যুৎ ও পানিতে ভারী ভর্তুকি, বাড়ি কেনায় সুদম মুক্ত ঋণ, বিয়ে করলে সরকার থেকে টাকা পাওয়া যায়, হজ করতে গেলে খরচ কম লাগে, রমজান মাসে খাবারের দাম কমানো হয়।

২০১১ সালে যখন বিক্ষোবের হাওয়া বইছিল, তখন রাজা আব্দুল্লাহ এক ঘোষণায় ১৩০ বিলিয়ন ডলারের জনকল্যাণ প্যাকেজ উন্মোচন করেছিলেন। মানুষের পকেটে যখন টাকা থাকে এবং পেটে যখন খাবার থাকে তখন তারা স্বাধীনতার চেয়ে স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই অলিখিত চুক্তিতে রাজা নাগরিকদের বলেন তুমি আমার রাজত্ব নিয়ে প্রশ্ন করো না। আমি তোমার জীবনযাত্রা নিয়ে তোমাকে ভাবতে দেবো না। এই কৌশলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন রেন্টিয়ার স্টেট।

অর্থ যে রাষ্ট্র ভাড়া খেয়ে নাগরিকদের কিনে রাখে। সোজা কথায় তেল বেজে যে অর্থ আসে তা নিয়ে নাগরিকদের কিনে রাখা। বিনিময়ে নাগরিকরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। চুক্তিটা অলিখিত কিন্তু স্পষ্ট। তুমি প্রশ্ন করো না। আমি তোমাকে ভালো রাখব। বেশিরভাগ সৌদি নাগরিক এই চুক্তি মেনে নিয়েছেন। কারণ তাদের হাতে বিকল্প নেই।

ধর্মের সাথে আদিম চুক্তি এবং ১৯৭৯ সালের মক্কা অবরোধ:
সৌদি আরবের স্থায়িত্বের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো ধর্ম। ১৭৪০ সালে মোহাম্মদ ইবনে সৌদ এবং কট্টরপন্থী ইসলামিক পন্ডিত মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। চুক্তিটা ছিল সহজ। ইবনে সউদ বললেন, আমাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দাও। আমি তোমার ধর্মীয় আদর্শ সমর্থন করব। অন্যদিকে ইবনে আব্দুল ওয়াহাব বললেন, আমি ধর্মীয় বৈধতা দেব। তুমি আমার আদর্শ রক্ষা করো। ২৮০ বছর পেরিয়ে গেলেও এ যুক্তি আজও চলছে।

আজকের সৌদি আরবে রাজার প্রতিটি কাজকে ধর্মীয় সিলমোহর দেয় ওয়াহাবী আলেমরা। রাজার বিরুদ্ধাচরণ করা মানে হলো ইনুল আমর বা শাসকের অবাধ্য হওয়া। যা ইসলামের দৃষ্টিতে মহাপাপ হিসেবে প্রচার করা হয়। এই ধর্মীয় বৈধতা এমন এক কবজ যা সাধারণ মানুষের মনে রাজ পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলতে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভয় তৈরি করে। সৌদি রাজ পরিবার নিজেদের বলে খাদিমুল হারামাইন বা পবিত্র দুই মসজিদের সেবক। এই টাইটেলটি কেবল সমানের নয়। এটি তাদের শাসনের সবচেয়ে বড় ঢাল।

১৯৭৯ সাল জুহাইমান আল উতাইবি নামের এক কট্টরপন্থী মক্কায় মসজিদুল হারাম দখল করে নিলেন। দাবি করলেন রাজপরিবার দুর্নীতিগ্রস্ত। পশ্চিমের দাস এবং ইসলাম থেকে বিচ্যুত। দুই সপ্তাহ মসজিদ অবরুদ্ধ ছিল। এ ঘটনাটা রাজ পরিবারকে দুটো শিক্ষা দিয়েছিল। প্রথম শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সবসময় পাশে রাখতে হবে।

দ্বিতীয় শিক্ষা, যারা ধর্মের নামে বিরোধিতা করবে তাদের আগে থেকে নিস্তার করতে হবে। সেই থেকে সৌদি আরবের ধর্মীয় শিক্ষায় আরো বেশি বিনিয়োগ হলো। কিন্তু সে শিক্ষা যাতে রাজ পরিবারের সমর্থনেই থাকে। এটা একটা সূক্ষ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। রাজ পরিবার বুঝেছিলেন ধর্ম যেমন ঢাল হতে পারে তেমনি তলোয়ারও হতে পারে। সে থেকে তারা ধর্মকে কেবল লালন নয়, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

আল-মুখাবারাত এবং রিৎজ কার্লটন হোটেলের সেই রাত:
কল্যাণ রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় বৈধতা। এ দুটো দিয়ে বেশিরভাগ মানুষকে সামলানো যায়। কিন্তু যারা তেলের সুবিধা আর ধর্মের কথা শুনেও শান্ত থাকে না। তাদের জন্য আছে সৌদি আরবের কুখ্যাত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল পুলিশ নয়। আর মুখাবারাত বা গোয়েন্দা সংস্থা এখানে এতটাই শক্তিশালী যে বলা হয় আপনার ড্রয়িংরুমেও তাদের কান আছে। সামাজিক মাধ্যমে একটিও বিরূপ টুইট বা পোস্ট আপনাকে গুম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু শুধু পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে একটা দেশ দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। সৌদি আরবের আসল কাজটা হয় সামাজিক নজরদারিতে। এখানে পরিবার পরিবারকে দেখে। গোত্র পুরুষকে দেখে। কমিউনিটির মধ্যে এমন একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে বিরোধিতা করা সামাজিকভাবেই কঠিন।

মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতায় আসার পর একটা কাজ করলেন যা দেখে পুরো পৃথিবী হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে রিয়াদের বিরাটবহুল রিচ কার্টন হোটেলে ডাকা হলো সৌদি আরবের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষদের। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজকুমার, ব্যবসায়ী ও সামরিক কর্মকর্তারা। তারপর হোটেল ঘিরে ফেলা হলো। গ্রেফতার করা হলো প্রায় ২০০ জনকে। বলা হলো এটি একটি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। কিন্তু এটা ছিল একটা “ইনার কু”। যারা ভবিষ্যতে এমবিএস এর প্রতিদ্বন্ধী হতে পারতেন তাদের একসাথে দুর্বল করা হলো। তাদের সম্পদ নেয়া হলো। তাদের আত্মসম্মান নষ্ট করা হলো। তাদের নেটওয়ার্ক ভাঙ্গা হলো। মাত্র কয়েক মাসে এমবিএস সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রাউন প্রিন্স হয়ে গেলেন। এর মাধ্যমে এমবিএস বুঝিয়ে দিলেন রাজ পরিবারের ভেতরের কেউই নিরাপদ নয় যদি সে রাজার কথার বাইরে যায়। এ কঠোর নিয়ন্ত্রণেই নিশ্চিত করে যে ভেতরে কোন বিভাজন যেন দানা বাধতে না পারে।

আমেরিকার সামরিক ছাতা ও পেট্রোডলারের ইকুয়েশন:
সৌদি রাজ পরিবারের পতন কেন হয় না? তার বড় একটা কারণ সমুদ্রের ওপারে আটলান্টিকের তীরের হোয়াইট হাউসে লুকিয়ে আছে। বাইরে থেকে যদিও কেউ সৌদি রাজ পরিবারকে উৎখাত করার চেষ্টা করে তাহলে কি হবে? উত্তরটা সহজ। আমেরিকা আসবে। আমরা একটু অতীতে ফিরে যাই। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজফেল্ড সুয়েজখালে একটা জাহাজে বসে সৌদি রাজা আব্দুল আজিজের সঙ্গে দেখা করলেন। সেই বৈঠকে একটা অলিখিত চুক্তি হলো। চুক্তিটি এরকম। আমেরিকা সৌদির তেল পাবে এবং সৌদি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।

১৯৪৫ সালের সেই ঐতিহাসিক চুক্তির পর থেকে আমেরিকা সৌদি আরবের নিরাপত্তার বীমা হিসেবে কাজ করছে। সূত্রটা সহজ। আমেরিকা নিরবিচ্ছিন্ন তেল পাবে এবং তেলের বাজার ডলারে নিয়ন্ত্রিত হবে। বিনিময়ে আমেরিকা সৌদি রাজ পরিবারকে বাইরের যেকোনো হামলা থেকে বাঁচাবে। ৮০ বছর ধরে এ চুক্তি চলছে।

১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন যখন কুয়েত দখল করেছিলেন তখন আমেরিকা ৫ লাখ সৈন্য পাঠিয়েছিল কেবল সৌদি আরবকে রক্ষা করার জন্য। আমেরিকার সামরিক খাঁটি এখনো সৌদি আরবে এবং আশেপাশে আছে। যদি কোন বাইরের শক্তি সৌদি আরবে হামলা করতে চায় সেটা ইরান হোক বা যেই হোক সরাসরি আমেরিকার সাথে লড়তে হবে। এই নিরাপত্তা ছাতাটা পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ইন্স্যুরেন্স পলিসি।

একটা প্রশ্ন আসতে পারে আমেরিকা কেন এত বিনিয়োগ করে? কারণ সৌদি আরব শুধু তেল দেয় না। সৌদি আরব তেলের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। উবেকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য সৌদি আরব। তেলের দাম বাড়াতে বা কমাতে হলে সৌদি আরবকে রাজি করাতে হয়। পেট্রো ডলার সিস্টেম যেখানে তেলের কেনার বেচা হয় ডলারে। এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সৌদি আরবের ভূমিকা অপরিহার্য। সৌদি রাজ পরিবার পড়ে গেলে এ পুরো কাঠামো ঝুঁকিতে পড়বে। তাই আমেরিকার স্বার্থ আছে তাদের টিকিয়ে রাখার। মানবাধিকার নিয়ে হাজারো বিতর্ক থাকলেও জামাল খাসগুচি হত্যাকাণ্ডের মত চরম ঘটনা ঘটলেও, আমেরিকার কাছে সৌদি আরবকে ত্যাগ করার কোন উপায় নেই। কারণ সৌদি আরবের পতন মানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস এবং তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। এ বাহ্যিক সমর্থনী সৌদি রাজপরিবারকে বিশ্বের দরবারে এক ধরনের অনসুরক্ষা দেয়।

বৈবাহিক কূটনীতি, গোত্র থেকে সিংহাসন:
সৌদি আরবের আধুনিকতার নিচে একটি শক্তিশালী মধ্যযুগীয় কাঠামো আছে। সেটা হলো ট্রাইবুনাল রয়ালিটি বা গোত্রীয় আনুগত্য। এক কথায় সৌদি আরব একটা গোত্রভিত্তিক সমাজ। হাজার বছরের ইতিহাসে এখানকার মানুষ পরিচিত ছিলেন গোত্র দিয়ে। আল সামার, আল রশিদ, আল কাহতার গোত্রের নেতাই সব সিদ্ধান্ত নেন। এখানে গোত্রের সম্মানই সবচেয়ে বড়। আল সৌদ পরিবার এই গোত্র কাঠামোকে ভেঙে দেয়। বরং জ্ঞান ধরে নিজেদের ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিভাবে? তারা প্রতিটি বড় গোত্রের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ক্ষমতাবান গোত্রের মেয়েদের সাথে রাজকুমারদের বিয়ে। রাজকন্যাদের বিয়ে গোত্র প্রধানদের ছেলেদের সাথে হয়। এভাবেই সৌদি রাজ পরিবার গোত্রে গোত্রে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করেছে। এই নেটওয়ার্কটা অদৃশ্য কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। কোন গোত্র যদি বিদ্রোহ করতে চায় তবে তাদের মনে পড়ে যে রাজপরিবারের কোন না কোন রাজকুমারের মা তাদেরই গোত্রের মেয়ে। এই বৈবাহিক কূটনীতি রাজপরিবারকে একটি দুর্ভেদ্য সামাজিক দুর্গ এনে দিয়েছে। ফলে বিদ্রোহ মানে শুধু রাজার বিরুদ্ধে যাওয়া নয়। পরিবারের বিরুদ্ধে যাওয়া।

সৌদি আরবের রাজনীতিতে একটা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মজলিস। এটা এমন একটা বৈঠক যেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি রাজা বা গভর্নরদের কাছে আসতে পারেন। কথা বলতে পারেন, সমস্যা জানাতে পারেন। এ ব্যবস্থাটা গণতন্ত্র নয়। এখানে মানুষের সিদ্ধান্ত মানুষ নেন না। কিন্তু এটা একটা ভাল। যা মানুষের মনের ভেতরে জমে থাকা চাপা ক্ষোভ বের করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়। মানুষ মনে করে রাজার কাছে যাওয়া যায়। তার সাথে কথা বলা যায়। এ বিশ্বাসটাই অনেক বিক্ষোপ আগেই থামিয়ে দেয়।

মোহাম্মাদ বিন সালমান (MBS) ও সামাজিক স্বাধীনতার ফর্মুলা:
মোহাম্মদ বিন সালমান বিশ্বে পরিচিত এমবিএস নামে। তিনি ২০১৫ সালে তার বাবা রাজা সালমানের ক্ষমতায় আসার পর থেকে দ্রুত উঠে এসেছেন। এখন তিনি মূলত সৌদি আরবের কার্যকর শাসক। এমবিএস পুরনো ব্যবস্থায় একটা মোড় এনেছেন। আগে রাজ পরিবারের ভেতরে ক্ষমতা ভাগ হতো। সিনিয়র রাজকুমারদের মধ্যে ঐক্যমত্বে সিদ্ধান্ত হতো। একা কেউ সব নিতেন না। এভিএস সেই মডেল বাতিল করলেন। রিচ কার্টনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আটকে রাখলেন। নিজের চাচাতো ভাই যিনি আগে ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন তাকে সরিয়ে দিলেন। একে একে সম্ভাব্য সকল প্রতিদ্বন্ধীদের দুর্বল করলেন। কিন্তু শুধু দমন করলেন না। সাথে দিলেন পরিবর্তনের আভাস। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পুরনো কৌশলে আর বেশিদিন টেকা যাবে না। তেলের চাহিদা একদিন কমবে। আর তরুণ প্রজন্ম কেবল তেলের টাকায় খুশি থাকবে না। তাই তিনি নতুন ফর্মুলা আনলেন।

সামাজিক স্বাধীনতা দাও। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা হরণ করো। সৌদিতে সিনেমা হল খুলে দেয়া হলো। মহিলারা গাড়ি চালানোর অনুমতি পেলেন। কনসার্ট শুরু হলো। তরুণরা এই পরিবর্তনে এতটাই মুগ্ধ যে তারা রাজনৈতিক অধিকারের কথা ভুলে গেছে। এমবিএস আসলে রাজতন্ত্রের একটা সফট ভার্সন তৈরি করেছে। যেখানে বিনোদন আছে কিন্তু ভিন্নমত নেই।

ভিশন ২০৩০ এর মাধ্যমে তিনি অর্থনীতিকে তেলের উপর থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। যদি তিনি সফল হন তবে এ রাজতন্ত্র আরো ১০০ বছর টিকে থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ইস্তামবুলে সৌদি দূতাবাসের সাংবাদিক জামাল খাসুগজি নিহত হলেন। সারা পৃথিবী ক্ষুদ্র হল। এ ঘটনায় এপিএস সরাসরি সমালোচনার মুখে পড়লেন। আমেরিকার কংগ্রেসে তার বিরুদ্ধে রেজুলেশন পাশ হলো। পশ্চিমা নেতারাও দূরত্ব রাখলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে বাইডেন যাকে পারিয়া বলেছিলেন তার সাথেই ফিস্ট বাষ্প করে ছবি তুললেন। এই ঘটনাটা আবার প্রমাণ করে তেলের উপর নির্ভরশীল বিশ্ব সৌদি রাজ পরিবারকে শাস্তি দিতে পারে না। শুধু কুসুম কুসুম সমালোচনা করতে পারে।

সিংহাসনের কাঁটা! তেলের পরে কী? (ভিশন ২০৩০):
সৌদি রাজ পরিবারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে।

এক, তেল শেষ হলে কি হবে? সৌদি আরবের পুরো মডেল তেলের উপর দাঁড়িয়ে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার হলে সব ঠিকঠাক। তেলের দাম ৩০ ডলারে নামলে বাজেটে ঘাটতি হয়। নাগরিক সুবিধা কাটতে হয়। ২০১৪-১৫ সালে তেলের দাম পড়ে গিয়েছিল। সৌদি আরবের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কম ছিল। এটাই ভয়ের জায়গা। যদি ২০৪০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ইলেকট্রিক কারের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে। তবে সৌদি আরবের খাজান্সি খানা শূন্য হয়ে যাবে। নাগরিকদের তখন সুবিধা কারচার করতে হবে। আর তখনই শুরু হবে গণবিদ্রহ। ভিশন ২০৩০। এমবিএস এর এই পরিকল্পনা মূলত এই ভয় থেকে জন্ম নিয়েছে।

দুই রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ। সৌদি আরবের ক্ষমতার হস্তান্তর এতদিন ভাই ভাই বা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে হয়ে আসছিল যা রাজ পরিবারের হাজার হাজার সদস্যের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখত কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমান ওই ঐক্যমত্বের রাজনীতি ভেঙে ক্ষমতাকে নিজের হাতে কুক্ষিগত করেছেন। ২০১৭ সালের রিচ গার্জন হোটেলে নিজ বংশের প্রভাবশালী রাজকুমারদের বন্দী করা এবং সাবেক রাউন্ড প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি রাজ পরিবারের প্রবীণ ও প্রভাবশালী সদস্যদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও অপমানের জন্ম দিয়েছে। বংশের বয়জেষ্ঠরা মনে করছেন এমবিএস কেবল ক্ষমতা দখল করেননি। বরং রাজ পরিবারের চিরাচরিত সম্মান ও ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। এই অবদমিত ক্ষোভ যেকোনো সময় প্রাসাদের ভেতরে গুপ্ত ষড়যন্ত্র বা বিশৃঙ্খলার রূপ দিতে পারে। বিশেষ করে রাজা সালমানের অনুপস্থিতিতে এই উত্তরাধিকার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তিন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভূরাজনীতি। সৌদি আরবের ভৌগোলিক সীমানার ঠিক পাশেই ইরান ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হুমকি। তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকি। গত কয়েক বছর ধরে হুতিরা সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগার এবং বিমানবন্দরগুলোতে সফলভাবে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পশ্চিমা অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের আকাশ সীমা ও তেল সম্পদ পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। পাশাপাশি ইরানের সাথে ছায়া যুদ্ধ যদি সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয় তবে সৌদি আরবের পুরো অর্থনীতি ধষে পড়বে।

বালুর ওপর গড়া রাজত্বের শেষ বিন্দু:
সৌদি রাজ পরিবার কেন পড়ে না? এ প্রশ্নের উত্তর একটা নয়। অনেকগুলো ১৫,০০০ পরিবারের সদস্যের ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে সিস্টেম টিকিয়ে রাখায়। এখানে তেলের টাকায় নাগরিকদের কেনা হয়। ধর্মীয় বৈধতা দেয়া হয়। বোথিয়া নেটওয়ার্কে আত্মীয়তা তৈরি হয়। আমেরিকার সামরিক ছাতা বাইরের হুমকি ঠেকায় এবং যারা তারপরেও বিদ্রোহ করতে চায় তাদের জন্য রিচ কার্টুন আছে। কিন্তু এইসব কাঠামো একটা মৌলিক সত্যের উপর দাঁড়িয়ে তেল। তেল যেদিন শেষ হবে বা তেলের চাহিদা যেদিন শেষ হবে সেদিন এ পুরো কাঠামো পরীক্ষায় পড়বে। সে পরীক্ষার জন্য ভিশন ২০৩০ তৈরি হচ্ছে। পর্যটন বাড়ছে বিনোদন শিল্প বাড়ছে। প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হচ্ছে। এমবিএস জানেন তেলের যুগ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ভিত্তি তৈরি করতে হবে। সেটা হবে কিনা, সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে দুটো বিশ্বযুদ্ধ, শীতল যুদ্ধ, আরব বসন্ত, তেলের দাম পতন, সন্ত্রাসবাদ, মহামারী সব পার করে এখন পর্যন্ত সৌদি রাজ পরিবার টিকে আছে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই টিকে থাকার বিজ্ঞান শেখার আছে। হোক ভালো উদ্দেশ্যে, হোক খারাপ। ক্ষমতা কিভাবে নিজেকে রক্ষা করে এ পরিবার তার সবচেয়ে বড় জীবন্ত উদাহরণ কিন্তু ইতিহাস বলে কোন দেওয়ালেই চিরস্থায়ী নয়।

বালুর উপর গড়া এই রাজত্ব কতদিন টিকবে তা নির্ভর করছে তেলের ড্রামের শেষ বিন্দুটি আর তরুণ প্রজন্মের শেষ ধৈর্যের উপর। ক্ষমতা নিজেকে রক্ষা করার যে পাঠ এ পরিবার বিশ্বকে দিয়েছে তা যেমন বিশ্বয়কর তেমনি ভয়াবহ।



আশরাফুল মাহমুদ তাইফ
ঢাকা, বাংলাদেশ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.