নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সাহিত্য, সংস্কৃতি, কবিতা এবং সমসাময়িক সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে গঠনমুলক লেখা লেখি ও মুক্ত আলোচনা

ডঃ এম এ আলী

সাধারণ পাঠক ও লেখক

ডঃ এম এ আলী › বিস্তারিত পোস্টঃ

তাসালসুল (অনন্ত পশ্চাদগমন), প্রথম সৃষ্টি ও ‘আকল’: কুরআন-সুন্নাহর আলোকে একটি সতর্ক অনুসন্ধান

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭


ভূমিকা
সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের অন্যতম প্রাচীন প্রশ্ন হলো,সবকিছুর শুরু কোথায়? যদি প্রতিটি সৃষ্ট বস্তুর অস্তিত্বের জন্য তার আগে আরেকটি সৃষ্ট বস্তুর প্রয়োজন হয়, এবং সেই নির্ভরতার ধারা কখনো শেষ না হয়, তাহলে এই সমগ্র নির্ভরশীল অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোথায়?

দর্শনের ভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় তাসালসুল বা infinite regress তথা একটির অস্তিত্বের কারণ হিসেবে তার আগের আরেকটি কারণ, তারও আগের আরেকটি কারণ—এভাবে কারণের ধারা অনন্তকাল পিছিয়ে যেতে থাকা। ইসলামী তাওহিদ এই প্রশ্নের একটি মৌলিক উত্তর দেয়: সৃষ্টিজগতের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়; বরং এমন এক স্রষ্টার মধ্যে, যিনি নিজে সৃষ্ট নন এবং কারও ওপর নির্ভরশীল নন,তিনি আল্লাহ।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: আল্লাহ প্রথমে কী সৃষ্টি করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা, দার্শনিক ব্যাখ্যা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণাকে একত্র করে একটি নির্দিষ্ট মহাজাগতিক ক্রম দাঁড় করানো কতটা গ্রহণযোগ্য? বিশেষ করে বহুল প্রচলিত ‘আকলই প্রথম সৃষ্টি’,এই দাবিটির ভিত্তি কতটা শক্ত?

এই আলোচনায় মূল লক্ষ্য হলো,যেখানে কুরআন ও সহিহ হাদিস স্পষ্ট, সেখানে দৃঢ় থাকা; আর যেখানে দলিল অনিশ্চিত, সেখানে অনুমানকে নিশ্চিত আকীদা হিসেবে উপস্থাপন না করা।
তাসালসুলের সমস্যা এবং আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা
যদি বলা হয়, ‘এই সত্তাটি কেন অস্তিত্বশীল?’,উত্তর আসে, ‘তার আগে আরেকটি সত্তা ছিল।’ আবার প্রশ্ন করা হলে,‘সেটি কেন অস্তিত্বশীল?’,উত্তর আসে, ‘তারও আগে আরেকটি সত্তা ছিল।’ এভাবে যদি নির্ভরতার ধারা অনন্তকাল চলতে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সমগ্র নির্ভরশীল ধারাটির অস্তিত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কী?

ইসলামী তাওহিদের মৌলিক বক্তব্য হলো, এই চূড়ান্ত নির্ভরতা এমন এক সত্তায় গিয়ে থামে, যিনি নিজে কারও মুখাপেক্ষী নন।
কুরআন ঘোষণা করে:اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ‘আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা।’,সূরা আয-যুমার, ৩৯:৬২
আরও বলা হয়েছে: هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ‘আল্লাহ ছাড়া কি কোনো স্রষ্টা আছে?’,সূরা ফাতির, ৩৫:৩
সূরা আত-তূরে প্রশ্ন করা হয়েছে:أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ
‘তারা কি কোনো কিছু ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারাই স্রষ্টা?’,সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫
অর্থাৎ ইসলাম এমন কোনো সৃষ্ট বস্তুকে চূড়ান্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কারণ হিসেবে গ্রহণ করে না। সৃষ্টিজগত নির্ভরশীল; আল্লাহ নির্ভরশীল নন।

সূরা আল-ইখলাসে এই সত্যটি আরও সংক্ষিপ্তভাবে এসেছে:
اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।’এবং:لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ‘তিনি জন্ম দেননি এবং তাঁকে জন্ম দেওয়া হয়নি।’
সুতরাং তাসালসুলের আলোচনায় ইসলামের মৌলিক অবস্থান হলো,চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কোনো সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে নয়; বরং অকারণ ও অমুখাপেক্ষী স্রষ্টা আল্লাহর মধ্যে।

‘কুন ফায়াকুন’ এবং সৃষ্টির জন্য পূর্ববর্তী উপাদানের প্রয়োজন প্রসঙ্গ
আল্লাহ যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তাঁর সৃষ্টিশক্তি কোনো পূর্ববর্তী সৃষ্ট বস্তুর ওপর নির্ভরশীল নয়। কুরআন বলে:
إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ ‘তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, তিনি তাকে বলেন,‘হও’, আর তা হয়ে যায়।’,সূরা ইয়াসীন, ৩৬:৮২ এখানে ‘কুন ফায়াকুন’কে কোনো যান্ত্রিক শব্দ উচ্চারণের অর্থে না নিয়ে আল্লাহর পরম ইচ্ছা ও সৃষ্টিশক্তির প্রকাশ হিসেবে বোঝা অধিক যথাযথ।অতএব কোনো সৃষ্টিই আল্লাহকে সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য ‘কাঁচামাল’ সরবরাহ করে,এমন ধারণা ইসলামী তাওহিদের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাহলে কি ধরে নেয়া যায় ‘আকল’ই প্রথম সৃষ্টি? এখানেই আমাদের আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আকল সৃষ্টি করেছেন’,এই বক্তব্যটি মুসলিম সমাজের কিয়দংশে বহুল প্রচলিত হলেও এটিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অকাট্য সহিহ হাদিস হিসেবে উপস্থাপন করা নিরাপদ নয়। ‘أول ما خلق الله العقل’,এই বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে হাদিসবিশারদদের মধ্যে গুরুতর আপত্তি রয়েছে; একাধিক মুহাদ্দিস এটিকে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত নয় বলে বিবেচনা করেছেন।

একইভাবে, ‘সর্বপ্রথম সৃষ্টি হলো মুহাম্মদ (সা.)এর নূর’,এই বহুল প্রচলিত বক্তব্যকেও সহিহ হাদিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। ফলে রাসূল (সা.)এর মর্যাদা, আহলে বাইতের মর্যাদা কিংবা ‘নূর’সংক্রান্ত আধ্যাত্মিক আলোচনা এক বিষয়; আর কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্টিতত্ত্বকে ‘সহিহ হাদিস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
এই পার্থক্যটি বজায় রাখা জরুরি।

‘আকল’ গুরুত্বপূর্ণ,কিন্তু তাই বলে প্রথম সৃষ্টি এটি প্রমাণিত হয় না
ইসলামে আকলের মর্যাদা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে, উপলব্ধি করতে এবং বুদ্ধি ব্যবহার করতে আহ্বান করেছে।কিন্তু এখান থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্ত আসে না যে, আকলই মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম সৃষ্টি ।কারণ কোনো কিছুর বিশেষ মর্যাদা থাকা এবং সেটিই কালানুক্রমিকভাবে প্রথম সৃষ্টি হওয়া,দুটি আলাদা দাবি।
অতএব:আকলের মর্যাদা ইসলামী সত্য।কিন্তু: আকলই প্রথম সৃষ্টি,এটি একটি পৃথক ঐতিহাসিক ও হাদিসগত দাবি; এর জন্য পৃথক নির্ভরযোগ্য দলিল প্রয়োজন।

‘আকল’ বলতে আমরা কী বোঝাচ্ছি সেটিও এখন একটু দেখে নিই ।


‘আকল’ শব্দটি নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আকল, মস্তিষ্ক, চেতনা ও জ্ঞান,এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হলেও অভিন্ন বিষয় নয়।যদি ‘আকল’ বলতে মানুষের চিন্তা, বিচার, উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বোঝানো হয়, তাহলে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের আলোচনায় এই cognitive function মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপ একটি জটিল জৈবিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু এখান থেকে বিপরীত দিকেও অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে কোনো metaphysical ‘আকল’ এর অস্তিত্ব অসম্ভব,এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
কারণ ইসলামী কালাম ও দর্শনে ‘আকল’ কখনো জ্ঞান ও বোধশক্তি, কখনো বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, আবার কখনো একটি স্বতন্ত্র অশরীরী সত্তা বোঝাতে ব্যবহৃত হতে পারে।তাই প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে,কোন অর্থে ‘আকল’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

অবস্তুগত হলেই কি তা অকারণ ( কার্যকারণবাহীন) বা প্রথম সৃষ্টি?
ধরা যাক, ‘আকল’ বলতে একটি অশরীরী বা অবস্তুগত বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে বোঝানো হচ্ছে। তাহলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার।

অবস্তুগত হলেই কি তা অকারণ ( কার্যকারণবাহীন) বা প্রথম সৃষ্টি?
একটি সত্তা বস্তুগত উপাদানে গঠিত না হয়েও সৃষ্ট, সীমিত এবং অন্য কিছুর ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। Material composition এবং ontological dependence একই বিষয় নয়।
তাই:
অবস্তুগত ≠ অকারণ ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ স্বয়ংসম্পূর্ণ ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ প্রথম সৃষ্টি ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
অবস্তুগত ≠ অন্যান্য সৃষ্টির উৎস ( ≠ সমান হতেও পারে কিংবা নাও হতে পারে )
প্রতিটি দাবির জন্য পৃথক প্রমাণ প্রয়োজন।

এখানে ইসলামী আকীদার মৌলিক সীমারেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।’
কোনো সৃষ্টি বস্তুগত উপাদানহীন হলেও তাকে আল্লাহর মতো অমুখাপেক্ষী বলা যায় না।
আকল’ প্রথম সৃষ্টি হলে আরও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়
ধরা যাক, ‘আকল’ সত্যিই প্রথম সৃষ্টি। তাহলে প্রশ্ন আসে,এই আকল কীভাবে কার্যকর হলো?
যদি বলা হয়, তার কার্যকারিতার জন্য কোনো মাধ্যম বা কাঠামোর প্রয়োজন নেই, তাহলে সেই দাবির প্রমাণ প্রয়োজন।

আর যদি বলা হয়, তার কার্যকারিতার জন্য পরবর্তী কোনো সৃষ্ট কাঠামো প্রয়োজন, তাহলে বোঝা যায় কার্যকরী আকল এবং সেই কাঠামোর মধ্যে কোনো না কোনো নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে।
অবশ্য এই যুক্তি মানুষের মস্তিষ্ক-নির্ভর আকলের ক্ষেত্রে বেশি প্রাসঙ্গিক। ফেরেশতা বা কোনো অদৃশ্য সৃষ্টির জ্ঞানীয় কার্যক্রম মানুষের মস্তিষ্কের মতোই হবে,কুরআন আমাদের এমন কথা বলেনি। তাই ‘আকল মানেই ৮৬ বিলিয়ন নিউরন’,এমন বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়।
বরং সীমিত ও সতর্ক বক্তব্য হওয়া উচিত।

যদি ‘আকল’ বলতে মানুষের cognitive faculty বোঝানো হয়, তাহলে সেটি মানুষের সৃষ্ট দেহ ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কার্যগতভাবে সম্পর্কিত। আর যদি ‘আকল’ বলতে কোনো স্বতন্ত্র metaphysical সত্তা বোঝানো হয়, তাহলে তার অস্তিত্ব, প্রকৃতি এবং প্রথম সৃষ্টি হওয়ার দাবির জন্য নির্ভরযোগ্য ওহিগত দলিল প্রয়োজন।

‘কলম’ সংক্রান্ত হাদিস: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা

‘প্রথম সৃষ্টি’ প্রসঙ্গে একটি সুপরিচিত হাদিস হলো কলম সম্পর্কিত বর্ণনা। উবাদাহ ইবনুস সামিত (রা.)এর বর্ণনায় সুনান আবু দাউদ ৪৭০০-এ এসেছে: ‘নিশ্চয় আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন,লিখ।’
উক্ত বর্ণনাকে আলবানী সহিহ বলেছেন। তিরমিযী ৩৩১৯-এ অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে এবং ইমাম তিরমিযী সেটিকে হাসান সহিহ বলেছেন।
এখানে উদ্দেশ্য ‘কলমই নিশ্চিতভাবে সর্বপ্রথম সৃষ্ট বস্তু’,এমন একটি দীর্ঘ মহাজাগতিক তত্ত্ব দাঁড় করানো নয়। বরং বিষয়টি হলো, যখন ‘প্রথম সৃষ্টি’ নিয়ে হাদিসভিত্তিক বক্তব্য দেওয়া হবে, তখন প্রচলিত কিন্তু বিতর্কিত ‘আকল প্রথম সৃষ্টি’ বর্ণনার পাশাপাশি বিদ্যমান গ্রহণযোগ্য হাদিসগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যান্য সৃষ্টি সম্পর্কে যা জানা যায়

সহিহ মুসলিমে আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে ফেরেশতাদের নূর থেকে, জিনদের আগুনের শিখা থেকে এবং আদম (আ.)কে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত উপায়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।
কুরআনে আরও এসেছে:وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ‘তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল।’,সূরা হূদ, ১১:৭
এসব বক্তব্য আমাদের সৃষ্টিজগত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কিন্তু এগুলোকে নিজেদের অনুমান দিয়ে জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ cosmological sequence বানিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
যেমন, আকল -⟩ নূর -⟩ ফেরেশতা -⟩ আরশ -⟩ পানি/বায়ু -⟩ কণা -⟩ পরমাণু -⟩ অণু -⟩ মস্তিষ্ক -⟩ মানুষ
এই সম্পূর্ণ ক্রম কুরআন বা সহিহ হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়নি।

ওহি ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে অযথা জোরপূর্বক সমন্বয়

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, পরমাণু বা অন্যান্য ধারণাকে গতানুগতিক ধর্মীয় বর্ণনার ‘পানি’, ‘নূর’ বা ‘বায়ু’-এর সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবে ঘোষণা করতেও আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন।
কোনো হাদিসে ‘পানি’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বলেই সেখানে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট particle বোঝানো হয়েছে,এমন দাবি করতে হলে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।

বিজ্ঞান ও ওহি, দুটির নিজস্ব ক্ষেত্র ও পদ্ধতি রয়েছে। তাই ওহিতে যা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তা গ্রহণ করা যেমন জরুরি, তেমনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক মডেলকে জোর করে প্রতিটি ধর্মীয় বর্ণনার ওপর বসিয়ে দেওয়াও অনুচিত।
আকীদার ক্ষেত্রে জ্ঞানের সীমা স্বীকার করা জরুরী , কুরআন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি দিয়েছে:
‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।’
,সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬

এই নীতিটি সৃষ্টিতত্ত্বের আলোচনায় বিশেষভাবে প্রযোজ্য।আমাদের তাই আলাদা করতে হবে,
১. কোন বক্তব্য সরাসরি কুরআনে আছে।
২. কোন বক্তব্য সহিহ হাদিসে আছে।
৩. কোন বর্ণনা দুর্বল বা বিতর্কিত।
৪. কোনটি সাহাবি বা তাবেঈর বক্তব্য।
৫. কোনটি পরবর্তী দার্শনিক ব্যাখ্যা।
৬. আর কোনটি আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা interpretation।
এই স্তরগুলো একাকার হয়ে গেলে ‘ইসলামী আকীদা’, ‘ইসলামী দর্শন’ এবং ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’,তিনটি ভিন্ন বিষয়কে
একই সত্য হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাহলে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?সবচেয়ে সতর্ক ও দলিলসম্মত অবস্থান হলো,
প্রথমত, আল্লাহ সৃষ্ট নন; তিনিই স্রষ্টা।
দ্বিতীয়ত, সমস্ত সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল; তিনি কোনো সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন।
তৃতীয়ত, তাসালসুলের সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান কোনো সৃষ্ট বস্তুকে ‘চূড়ান্ত কারণ’ বানানো নয়; বরং অমুখাপেক্ষী স্রষ্টা আল্লাহকে
স্বীকার করা।
চতুর্থত, আকল ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘আকলই সর্বপ্রথম সৃষ্টি’,এটিকে অকাট্য সহিহ হাদিসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত
আকীদা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
পঞ্চমত, ‘প্রথম সৃষ্টি’ প্রসঙ্গে কলম-সংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য হাদিসের মতো প্রাসঙ্গিক দলিলগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
ষষ্ঠত, ‘আকল’ যদি মানবিক cognitive faculty বোঝায়, তবে তা মানুষের সৃষ্ট দেহ ও স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে কার্যগতভাবে সম্পর্কিত।
আর যদি কোনো স্বতন্ত্র metaphysical সত্তা বোঝায়, তবে তার প্রকৃতি ও প্রথম সৃষ্টি হওয়ার দাবির জন্য আলাদা নির্ভরযোগ্য
দলিল প্রয়োজন।
সপ্তমত, কোনো সৃষ্টিকে,তা আকল, নূর, কলম বা অন্য যা-ই হোক,আল্লাহর মতো অমুখাপেক্ষী, স্বয়ংসম্পূর্ণ বা চূড়ান্ত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

উপসংহার

সৃষ্টির শুরু নিয়ে মানুষের কৌতূহল স্বাভাবিক। তাসালসুলের প্রশ্ন আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ইসলামী তাওহিদ এখানে একটি মৌলিক সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়: সৃষ্টির কোনো স্তরই চূড়ান্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।

তবে এই মৌলিক সত্য থেকে ‘প্রথম সৃষ্টি’ সম্পর্কে আমাদের ইচ্ছামতো একটি পূর্ণাঙ্গ মহাজাগতিক ক্রম তৈরি করার অনুমতি পাওয়া
যায় না। ‘আকল’ গুরুত্বপূর্ণ,এটি এক কথা; ‘আকলই প্রথম সৃষ্টি’,এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি। একইভাবে কোনো সত্তা অবস্তুগত হতে পারে,এটি এক কথা; সেখান থেকে তাকে অকারণ, স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রথম সৃষ্টি বা অন্যান্য সৃষ্টির উৎস বলে ধরে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আকীদার আলোচনায় তাই সবচেয়ে সুন্দর ও নিরাপদ পথ হলো, ওহিকে ওহির জায়গায়, সহিহ হাদিসকে সহিহ হাদিসের জায়গায়, দর্শনকে দর্শনের জায়গায় এবং বৈজ্ঞানিক hypothesis-কে hypothesis-এর জায়গায় রাখা।
যেখানে কুরআন স্পষ্ট,সেখানে দৃঢ় থাকা।
যেখানে সহিহ হাদিস আছে,সেটি গ্রহণ করা।
যেখানে বর্ণনা দুর্বল বা বিতর্কিত,সেখানে সতর্ক থাকা।
আর যেখানে ওহি নীরব,সেখানে নিজের অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না বলা।


শেষ পর্যন্ত তাসালসুলের দীর্ঘ দার্শনিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে কুরআনের একটি সংক্ষিপ্ত সত্যই সবচেয়ে মৌলিক:
اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।’
সৃষ্টির ধারায় যত স্তরই থাকুক, কোনো সৃষ্ট স্তরই চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে যেখানে জ্ঞান আছে সেখানে দৃঢ় থাকতে, আর যেখানে জ্ঞান নেই সেখানে বিনয়ের সঙ্গে থেমে যেতে তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য ৫ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (৫) মন্তব্য লিখুন

১| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: সবকিছুর শুরু কোথায়, এই প্রশ্নের আধুনিক বৈজ্ঞানিক উত্তর হলো বিগ ব্যাং (Big Bang)।
.......................................................................................................................
আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে একটি অতি ক্ষুদ্র, অসীম ঘন এবং অত্যন্ত উত্তপ্ত বিন্দু থেকে আকস্মিক প্রসারণের মাধ্যমে আমাদের এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছিল।
এই আদিম প্রশ্নের উত্তরটি মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়:

বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি (The Scientific View)সময়ের সূচনা:
বিজ্ঞানীদের মতে, বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমেই আমাদের চেনা 'সময়' (Time) এবং 'স্থান' (Space)-এর জন্ম হয়েছিল। এর আগে কী ছিল, তা বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

মহাজাগতিক প্রসারণ: বিগ ব্যাং কোনো শূন্যস্থানে মহাশূন্যের বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল স্থানের নিজেরই এক তীব্র এবং দ্রুত প্রসারণ, যা আজও চলছে।

দার্শনিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Philosophical & Religious View)পরম শক্তি বা স্রষ্টা: পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম এবং প্রাচীন দর্শনে বিশ্বাস করা হয় যে, এই মহাবিশ্বের পেছনে একজন সচেতন স্রষ্টা বা আদি চালিকাশক্তি রয়েছেন।

অনন্ত অস্তিত্ব: কিছু দার্শনিক মতবাদে মনে করা হয়, শক্তি বা প্রকৃতির কোনো শুরু বা শেষ নেই; এটি রূপান্তরের মাধ্যমে চিরকাল ধরে অস্তিত্বশীল।

২| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৭

আলামিন১০৪ বলেছেন: আমিই কাল, সুতরাং তোমরা সময়কে গালি দিও না"— কুদসি হাদিস, যা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে।

আমাদেরকে স্পেস-টাইম কস্টিনিউয়ামে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে- তাই আমাদের সময় সম্পর্কে একটা ধারনা তৈরী হয়েছে- যা আপেক্ষিক এবং পরম সত্য নয়- ভুল ধারনার বশবর্তী হয়ে আমরা প্রশ্ন করে বসি- এর পূর্বে কী ছিল- তার পূর্বে কী ছিল- এভাবে প্রশ্ন করতে করতে এক সময় এমন একটা কিছু বলে বসি- যা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে দেয়। কেউ যদি প্রশ্ন করে “সময়ের পূর্বে কী ছিল?” তা যেমন তার বোকামি প্রকাশ করে তেমনি সৃষ্টিকর্তা সর্বপ্রথম কী করেছেন- এই প্রশ্নও তেমনি ।

৩| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

দানবিক রাক্ষস বলেছেন: আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে (Observable Universe) আনুমানিক ২ট্রিলিয়নসংখ্যক গ্যালাক্সি থাকতে পারে। আমাদের নিজেদের Milky Way Galaxy-তেই রয়েছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। সেই বিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে আমাদের সূর্য মাত্র একটি সাধারণ নক্ষত্র।

আর সেই সূর্যের চারদিকে ঘুরে চলা ছোট্ট একটি গ্রহ হলো পৃথিবী।

মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় পৃথিবী এতটাই ক্ষুদ্র যে তাকে একটি বিন্দু বললেও যেন তার বিশালত্বকে বেশি করে বলা হয়।

অথচ এখন পর্যন্ত আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান অনুযায়ী, এই ক্ষুদ্র পৃথিবীই একমাত্র স্থান যেখানে আমরা জীবনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত। এখানেই মানুষের জন্ম, এখানেই সভ্যতার উত্থান, এখানেই আমাদের ধর্ম, দর্শন, ভালোবাসা, ঘৃণা, যুদ্ধ, রাজনীতি এবং ঈশ্বরকে খোঁজার হাজার বছরের ইতিহাস।

ধর্মগুলো বলে—ঈশ্বর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, মানুষের কাছে নবী বা বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন, দিয়েছেন ধর্মীয় বিধান, নৈতিকতা, পাপ-পুণ্য, বিচার এবং পরকালের ধারণা।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—

যদি মানুষের জন্যই ধর্মীয় বার্তা আসে, তবে এত অকল্পনীয় বিশাল মহাবিশ্ব সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য কী?

কেন শত শত বিলিয়ন গ্যালাক্সি?

কেন প্রতিটি গ্যালাক্সিতে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র?

কেন এমন সব গ্যালাক্সি আছে, যাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে বিলিয়ন বছর সময় লাগে?

যদি মানুষই সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্যের অংশ হয়, তাহলে আমাদের আবাসস্থলকে মহাবিশ্বের এত ক্ষুদ্র একটি কোণে রাখা হলো কেন?

আমরা কি সত্যিই এই মহাবিশ্বে একা?

যদি অন্য কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী থেকে থাকে, তাহলে তাদের কাছেও কি ঈশ্বর কোনো বার্তা পাঠিয়েছেন?

তাদেরও কি ধর্ম আছে?

তাদেরও কি নবী, পাপ-পুণ্য, স্বর্গ-নরক কিংবা পরকালের ধারণা রয়েছে?

আর যদি সমগ্র মহাবিশ্বে সত্যিই শুধু পৃথিবীতেই বুদ্ধিমান জীবন থাকে, তাহলে ট্রিলিয়নসংখ্যক গ্যালাক্সি, অসংখ্য নক্ষত্র ও গ্রহের প্রয়োজন কী ছিল?

আরও একটি প্রশ্ন—

ঈশ্বর যদি সমগ্র মহাবিশ্বের স্রষ্টা হন, তাহলে পৃথিবীতে কেন এতগুলো ভিন্ন ধর্মের জন্ম হলো?

কেন এক ধর্মের মানুষ বিশ্বাস করে তার ধর্মই সত্য, আবার অন্য ধর্মের মানুষ একই দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করে তার ধর্মই সত্য?

যদি সত্য একটাই হয়, তাহলে মানুষের কাছে সেই সত্য এত ভিন্ন ভিন্ন রূপে পৌঁছাল কেন?

কেন ঈশ্বর নিজের অস্তিত্ব এবং তাঁর প্রকৃত বার্তা এমনভাবে প্রকাশ করলেন না, যাতে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ—দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি ও জন্মস্থান নির্বিশেষে—একই সত্যকে সমানভাবে বুঝতে পারে?

কেন একজন মানুষ যে পরিবারে জন্মায়, সেই পরিবারের ধর্মকেই সত্য মনে করার সম্ভাবনা এত বেশি?

যদি মানুষের অনন্তকালের পরিণতি তার বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে জন্মস্থান, পরিবার, সংস্কৃতি ও ইতিহাস কেন তার বিশ্বাসকে এত গভীরভাবে প্রভাবিত করে?

৪| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০৯

কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত) বলেছেন: اللَّهُ الصَّمَدُ ‘আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী।’
সৃষ্টির ধারায় যত স্তরই থাকুক, কোনো সৃষ্ট স্তরই চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। চূড়ান্ত নির্ভরতার স্থান একমাত্র আল্লাহ।


ইহাই চরম ও পরম সত্য।

--আপনি অনেক সুন্দরভাবে যথেষ্ঠ মেধার পরিচয় দিয়েছেন। যাযাকাল্লাহ খাইরান।

৫| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৬

রাজীব নুর বলেছেন: ওকে।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.