| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে কোনো এক বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় চলে যান সদরঘাটে। সেখান থেকে উলানিয়াগামী কোনো একটি লঞ্চে উঠে পড়ুন। লঞ্চের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে এক পাশের একটি কেবিন নিয়ে নিন—সিঙ্গেল বা ডাবল, আপনার সুবিধামতো।
কেবিনে উঠে চাইলে পোশাক পাল্টে নিতে পারেন। এরপর চলে যাবেন লঞ্চের একেবারে সামনে, রেলিংঘেরা ছোট্ট অর্ধবৃত্তাকার জায়গাটিতে। দেখবেন, আপনার মতো আরও কিছু মানুষ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো পরিবারের বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই মিলে; কেউ বা জোড়ায় জোড়ায়—জোড়া কবুতরের মতো; আবার কেউ একজন, একা পথিক।
রেলিং ধরে দাঁড়াবেন। পুরো সদরঘাট তখন আপনার চোখের সামনে—একটি বার্ডস-আই ভিউ। হরেক রঙের মানুষ ছুটে আসছে লঞ্চের দিকে, যেন কী এক অমোঘ টানে। হকাররা চিৎকার করে তাদের পণ্য বিক্রি করছে। লঞ্চের খালাসিরা গন্তব্যের নাম ধরে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এমনই কোনো এক খালাসির ডাকেই আপনিও এই লঞ্চে উঠেছেন।
একই লঞ্চে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির যাত্রীদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা—ডেক → সোফা → স্লিপিং সোফা → কেবিন → এসি কেবিন → ফ্যামিলি কেবিন → লাক্সারি স্যুট।
পয়সার বিনিময়ে গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তে পুঁজিবাদের এক চমৎকার উদাহরণ—এত স্বল্প আয়োজনে, এত ক্ষুদ্র পরিসরে।
তবে এত কিছুর মাঝেও আরেকটি শ্রেণি রয়েছে, যা অফিসিয়াল নয়। ডেক, সোফা আর কেবিনের মাঝামাঝি কয়েকটি স্তর। এগুলো লঞ্চের কর্মচারীদের সৃষ্টি। যেসব কর্মচারীর নিজস্ব কেবিন বা ছোট্ট থাকার জায়গা আছে, তারা সেগুলোও ভাড়া দিয়ে থাকেন। আর ঈদ, কোরবানির ঈদ কিংবা দীর্ঘ সরকারি ছুটির মতো পিক সিজনে যোগ হয় আরও একটি স্তর—কেবিনে যাওয়ার করিডরও তখন অস্থায়ী বিছানায় ভরে যায়। চাহিদার ওপর নির্ভর করে এসব বিছানা বা সিটের ভাড়াও ওঠানামা করে।
লঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে দেখবেন, কিছু লোক মোবাইল ক্যামেরা হাতে অপেক্ষা করছে। উদ্দেশ্য একটাই—কেউ যদি লঞ্চে উঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়, তাহলে একটি ভাইরাল রিল হবে ফেসবুক বা টিকটকে। এমন ঘটনা নাকি প্রায়ই ঘটে। আর কনটেন্ট-শিকারিরা পেয়ে যায় তাদের কাঙ্ক্ষিত শিকার।
আপনি যদি কবি, গল্পকার, গীতিকার কিংবা ভাবুক হন, তবে এখানেই হয়তো পেয়ে যাবেন নতুন কোনো ভাবনার রসদ, গল্পের প্লট, কিংবা গানের সুর।
ভেপু বাজতেই একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। দূর থেকে কোনো এলিয়েন দেখলে হয়তো ভাবতেই পারে, স্রোতের টানে কতগুলো সূচ ভেসে যাচ্ছে।
আপনার লঞ্চও ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে ঘাট দূরে সরে যাচ্ছে। ছোট থেকে ছোট হয়ে যাচ্ছে মানুষগুলো। ঝাপসা হয়ে আসছে ঘাট, নিয়ন আলো, শহরের কোলাহল। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ঢাকার আলো।
হঠাৎই নাকে এসে লাগবে এক ঝলক সতেজ বাতাস।
হ্যাঁ, আপনি অবশেষে বুড়িগঙ্গা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন।
অভিনন্দন।
রাতে লঞ্চের হোটেলেই খেয়ে নিন। ইলিশ পেলে ইলিশ, না পেলে অন্য যা-ই পান, সেটাই সই। তবে তার আগে ক্যান্টিন বয়ের কাছ থেকে জেনে নেবেন, রাত কতটা পর্যন্ত চা বা কফি পাওয়া যায়।
তারপর রাত বারোটার দিকে ক্যান্টিন থেকে এক কাপ গরম চা কিংবা কফি নিয়ে চলে আসুন ডেকের পাশে রাখা একটি চেয়ারে। পাশে একটি ছোট টেবিলও পাবেন। নিজেই টেনে নিন।
অতঃপর অফুরন্ত অবসর।
রাত বারোটা। লঞ্চ পদ্মার বুকে ভেসে চলছে। আকাশে চাঁদ থাকুক কিংবা না-ই থাকুক, আপনার হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। আয়েশ করে বসে ধীরে ধীরে চায়ে
চুমুক দিন, আর বুকভরে টেনে নিন পদ্মার মিঠে পানির গন্ধ। চোখের সামনে দিগন্তজোড়া আকাশ, মাথার ওপরে তারার মেলা, আর নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা জেলেদের ভাসমান নৌকাগুলো মুক্তোর মতো ঝিলমিল করছে।
আপনি যদি কখনো এক লাইন কবিতাও না লিখে থাকেন, ঠিক এই মুহূর্তটাই হয়তো আপনার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কবিটাকে জাগিয়ে তুলবে। মনে হতেই পারে—দুটি লাইন লিখি।
বাতাসের তীব্রতায় শরীর হিম হয়ে আসা পর্যন্ত সেখানেই থাকুন। সময়ের হিসাব না-ই বা করলেন।
ভোররাতে লঞ্চ এসে ভিড়বে উলানিয়া ঘাটে। দুপুর হতে তখনও অনেক বাকি। তাই পুরো সকালটাই আপনার।
একবার দাঁড়িয়ে দেখুন, কীভাবে একটি নদীবন্দর ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে। লঞ্চঘাটের পাশেই সিমেন্টের ব্লক আর বালুর বস্তা দিয়ে তৈরি বাঁধ—মেঘনার করাল গ্রাস থেকে বন্দরকে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা। সেই বাঁধে বসেই দেখুন মেঘনার বুক চিরে সূর্য উঠছে।
এদিকে পদ্মা থেকে একে একে ফিরছে ইলিশ ধরা নৌকাগুলো। আশপাশে হাঁটলেই চোখে পড়বে মাছের আড়ত। ভেতরে ঢুকে দেখুন নদীর সদ্য ধরা মাছ—চেনা, অচেনা, ছোট, বড়, রঙিন, অদ্ভুত। নদী যেন নিজের ভাণ্ডার খুলে বসে আছে।
এর কিছুক্ষণ পরই শুরু হবে মাছের ডাক। এটা খোলা ডাক। চাইলে আপনিও অংশ নিতে পারেন। তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন—কেউ যেন বুঝতে না পারে আপনি নতুন। বুঝে ফেললে আর রেহাই নেই।
মাছের কেনাবেচা শেষ হলে হেঁটে ঘুরে দেখুন আশপাশের এলাকা।
ক্ষুধা পেলে বাজারের ভেতরে ঢুকে পড়ুন। সেখানে একটি ছোট্ট মিষ্টির দোকান আছে। কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হবে। একেবারে ঘুপচি ঘর। ছোট ছোট মিষ্টি বানায়। বাহারি কিছু নয়, কিন্তু স্বাদ এমন যে প্রথম কামড়েই মনে হবে—এই সফর সার্থক।
উলানিয়ায় রয়েছে একটি প্রাচীন জমিদারবাড়ি। বন্দরের কাছেই। পুরোটা আর অক্ষত নেই, তবু যা টিকে আছে, তা-ই আপনাকে কয়েক দশক, হয়তো শতাব্দী পেছনে নিয়ে যাবে। অন্য অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মতো এখানেও অযত্ন আর অবহেলার ছাপ স্পষ্ট।
সময় থাকলে কাছেই ঘুরে আসতে পারেন কবি আসাদ চৌধুরীর বাড়িও।
দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের মধ্যে রওনা দিন পাতারহাট বন্দরের উদ্দেশে। বাইক কিংবা মাহেন্দ্র—যেটা সুবিধাজনক। ভাড়া অন্য বন্দরের তুলনায় একটু বেশি, তবে যাওয়াটা সার্থক।
বন্দরে গিয়ে কাঠপট্টির কথা বললেই যে কেউ পথ দেখিয়ে দেবে। চাইলে রিকশায়ও যেতে পারেন। পথে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাশে চোখে পড়বে এক সময়ের ব্যস্ত, আজকের নীরব এক পরিত্যক্ত সিনেমা হল।
তারপর পৌঁছে যাবেন মুন্সির হোটেলে।
ক্যাশে বসে থাকবেন মুন্সি সাহেব।
এখানে পাবেন নদীর পাঙাশ, ইলিশ, খাসি, দেশি মুরগি, আর নানান রকম নদীর মাছ। পেট ভরে খেয়ে নিন। আপনি যতক্ষণ খাবার খাবেন, ততক্ষণ দেখবেন আরও কয়েকজন পাশে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে—একটি আসনের অপেক্ষায়।
তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার ফিরে আসুন উলানিয়ায়।
এবার একটি ট্রলার ভাড়া করুন। চলে যান কাছের কোনো একটি চরে।
দিগন্তজোড়া বালুচর। বিশাল খোলা আকাশ। জনমানবহীন নির্জনতা। হাঁটুন, দৌড়ান, খালি পায়ে নেমে পড়ুন মেঘনার অগভীর তীরে। নদীর বাতাস, নরম বালি আর চারপাশের নিস্তব্ধতা—এই মুহূর্তগুলোই হয়তো আপনার পুরো ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে ফিরে আসুন উলানিয়া লঞ্চঘাটে।
বর্ষা, হেমন্ত আর শীতে মেঘনাকে তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে পাবেন এই ঘাটে।
রাতের ফিরতি লঞ্চে উঠে আবার ফিরে যান ঢাকায়।
হয়তো সঙ্গে করে কিছুই নিয়ে ফিরবেন না,
হয়তো সংগে নিয়ে ফিরবেন অনেক কিছু
২|
০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৬
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: একটি ট্রলার ভাড়া করুন। চলে যান কাছের কোনো একটি চরে।
.............................................................................................
আপনি যেভাবে লিখেছেন তাতে মনে হয় এই দেশটি সোনার বাংলা হয়ে গেছে ।
আমাদের স্বপ্ন তাই ছিল , কিন্ত বর্তমান অবস্হা অনেক শোচনীয়
কোথাও ভ্রমনে গেলে পরিচিত কেউ না থাকলে বিপদে পড়তে সময় লাগেনা,
বিভিন্ন রকম হেনেস্হার মধ্যে পড়তে হয় ।
বেশী নির্জন হলে ছিনতাই, ধর্ষন ঘটনাও ঘটছে ।
০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৩৬
মৌন পাঠক বলেছেন: পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না নিয়া এসব স্থানে যাওয়া একদমই ঠিক হবে না।
৩|
০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৬
খায়রুল আহসান বলেছেন: চমৎকার লিখেছেন। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী বেড়িয়ে আসার ইচ্ছেটা বারে বারে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।
৪|
০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৪৭
ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা বলেছেন: লঞ্চযাত্রার সুক্ষ্ম সব বিবরণ—যেমন ডেকে মানুষের ভিড়, কেন্টিনের চা, আর ভোরের আলোয় উলানিয়া ঘাটে পৌঁছানোর অনুভূতি—খুব সুন্দরভাবে উঠে এসেছে লেখায়। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি একটি চমৎকার লেখা। শুভকামনা রইল!
©somewhere in net ltd.
১|
০২ রা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:১২
সৈয়দ মোজাদ্দাদ আল হাসানাত বলেছেন: খুব লোভ হচ্ছে এখনই বেড়িয়ে পরতে। সুন্দর ভ্রমন কাহিনী।