নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে পড়া এক রাইড শেয়ার চালক।

১৪-১৮ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা শুধু সময়ের হিসাব নয়, শরীরেরও পরীক্ষা। দুপুরের রোদে তার মুখটা পুড়ে গাঢ় হয়ে গেছে, হেলমেট খুললে কপালে স্পষ্ট দাগ পড়ে থাকে। বাইকের পেছনের সিটে একটা পুরোনো ব্যাগ—তার ভেতরে নোটবুক, কয়েকটা ক্লাস লেকচার, আর অর্ধেক লেখা স্বপ্ন। মাঝেমধ্যে সে বই খুলে, আবার বন্ধ করে। চারপাশে হর্ন, গালিগালাজ, অস্থিরতা—পড়ার মতো মন থাকে না।

লাইনটা শুধু মানুষের না, বিরক্তিরও। কেউ চিৎকার করছে, কেউ তর্কে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই রিদম দাঁড়িয়ে থাকে, যেন স্থির এক বিন্দু।

একদিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে সে বাইকের ওপর মাথা নিচু করে বসেছিল। চোখে ঝাপসা লাগছিল। ঠিক তখনই ঠান্ডা কিছুর স্পর্শে সে চমকে উঠে তাকাল। সামনে এক মেয়ে—হাতে পানির বোতল।

“এই নিন… অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, খুব ক্লান্ত লাগছে আপনাকে।”

রিদম কিছুক্ষণ বোতলের দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর মৃদু হেসে বলল, “ধন্যবাদ… সত্যিই দরকার ছিল।”

মেয়েটির নাম নীরা। রাস্তার ওপাশের বিল্ডিংয়ের বারান্দা থেকে সে অনেকদিন ধরেই রিদমকে দেখছিল—একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে লড়াই করে যাওয়া এক মানুষ।

সেদিনের পর থেকে তাদের কথা শুরু। লাইনের গালিগালাজ, তর্ক, হর্ন—সবকিছুর মাঝেও তাদের কথাগুলো যেন আলাদা এক জগৎ তৈরি করে। চারপাশের বিশৃঙ্খলার ভেতরে নীরা হয়ে ওঠে রিদমের ছোট্ট শান্তির দ্বীপ।

রিদম বলে, “জানো, এই লাইনটা যেন শেষই হয় না।”
নীরা হাসে, “কিন্তু তবুও তুমি দাঁড়িয়ে থাকো।”
“কারণ না দাঁড়ালে চলবে না… আর এখন তো আরেকটা কারণ আছে।”
“কি কারণ?”
রিদম একটু তাকিয়ে বলে, “তুমি।”

নীরার চোখে তখন একটুখানি আলো জ্বলে ওঠে—নরম, নিশ্চুপ, কিন্তু গভীর।

দিন যায়। সংকট কমে না। কিন্তু তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে গাঢ় হয়। অপেক্ষার সময়টা আর শুধু কষ্টের থাকে না—ওটা হয়ে ওঠে দেখা হওয়ার সময়, স্বপ্ন দেখার সময়।

একদিন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর রিদম তেল পায়। মিটারটা ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। ফুল ট্যাঙ্ক। সে অনুভব করে, যেন বুকের ভেতর জমে থাকা একটা ভার হালকা হয়ে গেল।

সে ফোন করে নীরাকে—
“যাবে?”
“কোথায়?”
“গন্তব্য ঠিক নেই… তবে আজ আর লাইনে দাঁড়াতে হবে না।”

নীরা নিচে নেমে আসে। বাইকের পেছনে বসে। রিদম ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। আজ তার হাত কাঁপে না। গিয়ার পাল্টানোর সময় অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস কাজ করে।

শহরের ভিড় পেরিয়ে তারা এগিয়ে যায়। বাতাসে চুল উড়ে যায়, নীরা একটু শক্ত করে ধরে রিদমকে। সে অনুভব করে—এই স্পর্শ, এই মুহূর্ত—সবকিছুই বাস্তব।

তেলের মিটারটা পূর্ণ, আর মনটাও।
রাস্তা কোথায় শেষ হবে জানা নেই, কিন্তু আজ আর কোনো তাড়া নেই।

পেছনে পড়ে থাকে লম্বা লাইন, ক্লান্তি, অপেক্ষা। সামনে শুধু খোলা রাস্তা।

আর সেই রাস্তায়, দুইজন মানুষ—একটা বাইক—আর একটুকরো স্বাধীনতার স্বপ্ন, যা আর মাঝপথে থেমে থাকবে না।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮

ঢাকার লোক বলেছেন: সুন্দর গল্প !
মনে পড়লো সপ্তপদী সিনেমায় হেমন্তের সে বিখ্যাত গান, এই পথ যদি না শেষ হয় ...

২| ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:১৫

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: মানুষের ক্সাপিত জীবন খুব ভালোভাবে আপনার লেখায় ফুটে উঠেছে ।

৩| ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

লোকমানুষ বলেছেন: ভালো লিখেছেন! ‌
গল্পের রিদম আর বাস্তব জীবনের কঠিন লড়াই মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী আবহ তৈরি করেছে, বিশেষ করে সঙ্কটের লাইনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখার অংশটুকু মন ছুঁয়ে গেল। যান্ত্রিক এই শহরে যখন সব স্বপ্ন ফুরিয়ে আসতে চায়, তখন নীরাদের মতো মানুষদের ছোট ছোট মানবিক স্পর্শগুলোই আসলে বেঁচে থাকার আসল জ্বালানি হয়ে দাঁড়ায়।

রিদমের 'ফুল ট্যাঙ্ক' স্বপ্নের মতোই আমাদের সবার যাত্রা হোক এমন কোনো গন্তব্যহীন সুন্দর রাস্তার দিকে, যেখানে আর কোনো ক্লান্তি থাকবে না।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.