| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

প্রতিবেদক: আশরাফুল ইসলাম
স্থান: প্রবর্তক মোড়, চট্টগ্রাম
সময়: সকাল ১০টা ৩০ মিনিট
ক্যামেরার লাল বাতিটা জ্বলছে। লেন্সের ওপর বৃষ্টির ছোট ছোট কণাগুলো অবাধ্য হয়ে জমছে। আমি মাইক্রোফোনটা শক্ত করে ধরে লেন্সের দিকে তাকালাম। আমার পেছনে প্রবর্তক মোড় এখন কোনো সড়ক নয়, যেন এক অশান্ত নদী। ঘোলাটে কালচে পানি হু হু করে বাড়ছে। নর্দমার বর্জ্য আর পলিথিন সেই পানিতে ভাসছে।
আমি লেন্সের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলাম, “দর্শক, এই মুহূর্তে আমি দাঁড়িয়ে আছি চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে। গতকালের ভারী বর্ষণ আর আজকের টানা বৃষ্টিতে থমকে গেছে এই বাণিজ্যিক রাজধানী। আমার পেছনে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, কোমর সমান পানি ডিঙিয়ে মানুষ চলছে। কিন্তু এই পানির নিচে চাপা পড়ে আছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অকেজো হয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর জীবন-মৃত্যুর লড়াই।”
আমি ইশারা করলাম ক্যামেরাম্যান রনিকে। রনি লেন্সটা প্যান করে সরিয়ে নিল বাম দিকে, যেখানে একটি ওষুধের দোকানের সামনে আবছা অন্ধকারে বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে আছেন এক যুবক।
এক: তলিয়ে যাওয়া পুঁজি
ক্যামেরা জুম করল যুবকটির ওপর। নাম তার আরিয়ান। বছর ছয়েক আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রবর্তক মোড়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘মেডিকম সার্জিক্যাল’। গতরাতের ১০ মিনিটের বৃষ্টি আরিয়ানের গত ছয় বছরের পরিশ্রমকে আক্ষরিক অর্থেই ডুবিয়ে দিয়েছে। আরিয়ান এখন দোকানের ঝাঁপ আধখোলা করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পানির চাপে পারছেন না।
লেন্সের ভেতর দিয়ে আমি দেখলাম আরিয়ানের মুখটা ফ্যাকাশে। সে থরথর করে কাঁপছে, হয়তো ঠান্ডায় নয়, আতঙ্কে। দোকানের ভেতরে দামি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, নেবুলাইজার আর জীবনরক্ষাকারী ওষুধের কার্টনগুলো এখন কচুরিপানার মতো ভাসছে। আরিয়ান বিড়বিড় করে বলছিলেন, “পূর্বাভাস ছিল না ভাই। ভেবেছিলাম বড়জোর হাঁটুপানি হবে, তাই তাকে মালামাল তুলেছিলাম। কিন্তু পানি ৫ ফুট উঁচু তাকও পেরিয়ে গেল।”
রনি লেন্সটা আরিয়ানের হাতের ওপর স্থির করল। তার হাতে একটা ভিজে যাওয়া ক্যাশ মেমো। আরিয়ানের চোখে আমি চট্টগ্রামের অন্তত ২০টি এলাকার সেই পাঁচ লাখ মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেলাম, যারা গত দুই দিনের জলাবদ্ধতায় পথে বসে গেছে। হিজড়া খালের সম্প্রসারণ কাজের ধীরগতি আর অস্থায়ী বাঁধগুলো আরিয়ানের মতো হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই: থমকে যাওয়া সংসার
ক্যামেরা এবার ঘুরে গেল একটি রিকশার দিকে। প্রবর্তক মোড় থেকে কাতালগঞ্জের দিকে যাওয়ার সেই রিকশায় বসে আছেন এক প্রৌঢ় দম্পতি আর তাদের সাথে দুই সন্তান। বাবা রিকশার হুডটা টেনে ধরে সন্তানদের বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করছেন। মা তার শাড়ির আঁচল গুটিয়ে রেখেছেন যাতে নোংরা পানি গায়ে না লাগে।
পরিবারটির বড় ছেলেটি সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সে রিকশা থেকে নেমে পেছনে ধাক্কা দিচ্ছে। পানি তার কোমরের ওপর। রিকশার চাকা নর্দমার গর্তে আটকে গেছে। লেন্সের জুম বাড়াতেই দেখলাম লোকটির মুখভঙ্গিতে এক চরম অসহায়ত্ব। দিনশেষে ঘরে চাল আছে কি না, বা বৃষ্টির পানি খাটের তলায় ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট করছে কি না—সেই দুশ্চিন্তা রিকশার প্রতিটি ঝাঁকুনিতে স্পষ্ট। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প এই মানুষটির কাছে এক নির্মম উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। লেন্স যখন তার অবয়ব থেকে সরে এল, তখন বৃষ্টির শব্দের চেয়েও তীব্র হয়ে কানে বাজল খালের উন্নয়নকাজের সেই ধীরগতির দীর্ঘশ্বাস।
তিন: কর্পোরেট যুদ্ধের জলাবদ্ধ লড়াই
রনি লেন্সটা এবার তাক করল একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির দিকে। পরিপাটি শার্ট-প্যান্ট, কাঁধে ল্যাপটপ ব্যাগ। নাম সায়েম। একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা। অফিস পৌঁছানোর শেষ সময় ছিল সকাল ১০টা। এখন ১০টা ৪০। সায়েম এক হাতে জুতো ধরেছেন, অন্য হাতে প্যান্ট গুটিয়ে পিলারের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
সায়েমের অফিসের বস হয়তো জিপিএস ট্র্যাকিং বা জুম মিটিংয়ে ব্যস্ত, কিন্তু সায়েম এখন আটকে আছেন কালচে রঙের বর্জ্য মিশ্রিত পানিতে। তার চোখে বিরক্তি আর অসহায়ত্বের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সায়েমের মতো হাজারো চাকরিজীবী প্রতিদিন এই জলাবদ্ধতার যুদ্ধে হার মানছেন। লেন্স জুম করে দেখালো সায়েমের দামী চামড়ার জুতো জোড়া এখন নর্দমার পানিতে সিক্ত। নগরের স্বাভাবিক গতি যে থমকে গেছে, সায়েমের নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকাটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চার: অ্যাম্বুলেন্সের আর্তনাদ ও স্তব্ধ নাগরিকতা
হঠাৎ লেন্সের ফোকাস ঘুরে গেল ডান দিকে। মাইলের পর মাইল যানজটের মাঝে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সটির চাকা পানির নিচে স্থির হয়ে আছে। রনি ক্যামেরা নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের কাঁচের দিকে এগিয়ে গেল।
ভেতরে একজন মুমূর্ষু রোগী। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। পাশে তার স্ত্রী দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটক মাত্র কয়েকশ গজ দূরে, কিন্তু এই কোমর সমান পানি অ্যাম্বুলেন্সের ইঞ্জিনকে অকেজো করে দিয়েছে। লেন্সের ফোকাস যখন রোগীর ফ্যাকাশে আঙুলের ওপর স্থির হলো, তখন প্রবর্তক মোড়ের পুরো কোলাহল যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জলাবদ্ধতা এখানে আর শুধু ভোগান্তি নয়, এটি এখন প্রাণের হন্তারক। প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অগ্রগতি এই রোগীর নিঃশ্বাসের গতির কাছে আজ প্রশ্নবিদ্ধ। সিডিএ চেয়ারম্যানের দাবি অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় জলাবদ্ধতা কম হওয়া এই পরিবারের কাছে কোনো সান্ত্বনা নয়।
লেন্সের ওপারে
আমি আবার মাইক্রোফোন হাতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি এখন আরও জোরে পড়ছে। লেন্সটা বৃষ্টির ঝাপটায় অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
“দর্শক, আপনারা দেখলেন লেন্সের চারদিকের চিত্র। আরিয়ান তার স্বপ্ন হারাচ্ছেন, সায়েম তার পেশাদারিত্বের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছেন, একটি পরিবার তাদের স্বাভাবিক জীবন খুঁজছে, আর একজন রোগী যমের সাথে লড়ছেন হসপিটালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। হিজড়া খালের সেই অস্থায়ী বাঁধগুলো হয়তো আজ খুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মানুষের মনের বাঁধ আজ ভেঙে গেছে।”
রনিকে ইশারা করলাম ক্যামেরা বন্ধ করতে। লেন্সের ঢাকনাটা লাগিয়ে দেওয়ার আগে শেষবারের মতো দেখলাম, কালচে কালির মতো পানি প্রবর্তক মোড়কে গিলে খাচ্ছে। চট্টগ্রাম যেন এক ডুবন্ত জাহাজ, যার নাবিকরা হিসেব মেলাতে ব্যস্ত, আর যাত্রীরা অতলে তলিয়ে যাওয়ার প্রহর গুনছে।
“ক্যামেরায় রনি ইসলামের সাথে, আমি আশরাফুল ইসলাম, ডিবিসি নিউজ, চট্টগ্রাম।”
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৬
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
২|
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৬
শায়মা বলেছেন: কি সাংঘাতিক অবস্থা!
এখানেও বৃষ্টি! সারাদিনে আলোর মুখ দেখা যায়নি।
কিন্তু চট্টগ্রামের এই অবস্থা এই লেখা পড়ে খুব ভালো ভাবেই বোঝা গেলো। ![]()
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:২৯
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আসলেই ওখানে খারাপ অবস্থা চলছে। আগে এক ঘন্টা বৃষ্টি হলে ঢাকা তলিয়ে যেতো, এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
৩|
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৪
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আরিয়ান বিড়বিড় করে বলছিলেন, “পূর্বাভাস ছিল না ভাই।
......................................................................................
চট্টগ্রামে বেশি বৃষ্টি হলে এই জলাবদ্ধতা বিগত ২০ বৎসরের পূর্ব থেকে
দেখে আসছি ।
তখন মনে হয় ২০০৪ সাল, জামালখানে থাকি , গ্যারেজে গাড়ী ভরপূর;
প্রচুর বৃষ্টির পর দেখি সাগরের বন্যার পানির মতো পানি আন্ডারগ্রাউন্ডে যাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি ড্রাইভার ডেকে, গাড়ী সব উচুঁস্হানে পাঠালাম ।
সেই অভিজ্ঞতা আর টেনশন এখনও ভুলতে পারি নাই ।
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: “এগুলো খুবই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, যার হয়েছে শুধু সেই বুঝে।”
অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য।
৪|
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩
রাজীব নুর বলেছেন: ঢাকার চেয়ে করুন অবস্থা চট্রগ্রামের। এই সমস্যা নতুন না। বহু পুরোনো সমস্যা।
©somewhere in net ltd.
১|
৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:২৮
কিরকুট বলেছেন: ভালো লেগেছে আপনার লেখা ধরন ।