নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

\"জীবন শেখায়, আমি লিখে রাখি। গল্প অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার মিশেলে এটাই আমার ছোট্ট জগৎ\" গতানুগতিক সাধারণ মানুষ

মহিউদ্দিন হায়দার

শব্দে আমার আশ্রয়, লেখায় আমার মুক্তি। এখানে আমি লিখি, ভেবে দেখি, আর খুঁজি মানুষের মনের গল্প।

মহিউদ্দিন হায়দার › বিস্তারিত পোস্টঃ

অবিনশ্বর প্রেমের মনস্তাত্ত্বিক দহন: ‘লা নুই বেঙ্গলী’ ও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০



পাঠ প্রতিক্রিয়া:

​বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের কলকাতা। একপাশে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার হাতছানি, অন্যপাশে ভারতীয় ঐতিহ্য ও রক্ষণশীলতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর। এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রোমানিয়ান দার্শনিক, তাত্ত্বিক ও লেখক মির্চা এলিয়াদ রচনা করেছিলেন তাঁর আধা-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘লা নুই বেঙ্গলী’ (বাংলার রাত)। ইউরোপীয় এক তরুণের চোখে প্রাচ্যের এক রহস্যময়ী তরুণীর প্রতি মুগ্ধতা, প্রেম এবং তার করুণ ব্যর্থতার এই আখ্যান বিশ্বসাহিত্যে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি দুই বাংলার পাঠকমহলেও তৈরি করেছে এক চিরন্তন কৌতূহল। ব্যক্তিগতভাবে মৈত্রেয়ী দেবীর কাউন্টার-ন্যারেটিভ ‘ন হন্যতে’ পড়ার পর মির্চা এলিয়াদের এই বহুচর্চিত উপন্যাসের অন্তর্নিহিত সত্য ও মনস্তত্ত্ব উন্মোচনে আমার এই চতুর্থ বারের পাঠ।


​উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যালেন—এক তরুণ ফরাসি প্রকৌশলী, যে ভারতবিদ্যার প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণে কলকাতায় আসে। আশ্রয় মেলে ভবানীপুরে বিখ্যাত দার্শনিক ও অধ্যাপক নরেন্দ্র সেনের পরিবারে। সেখানেই অ্যালেনের পরিচয় ঘটে নরেন্দ্র সেনের বিদুষী, কবি-কন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে। মুক্ত সংস্কৃতির আবহ থেকে আসা অ্যালেন এবং কঠোর পারিবারিক অনুশাসনে বড় হওয়া মৈত্রেয়ীর প্রেম তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় কেবল নিষিদ্ধই ছিল না, ছিল অসম্ভবের নামান্তর।
​অ্যালেনের দাবি অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যকার প্রেম কেবল মনস্তাত্ত্বিক আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা গড়িয়েছিল শারীরিক ঘনিষ্ঠতায়। কিন্তু এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হতেই নরেন্দ্র সেনের কঠোর আত্মসম্মানবোধের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তাঁদের স্বপ্ন। অ্যালেনকে আকস্মিকভাবে গৃহচ্যুত করা হয়। পরবর্তীতে স্বদেশে ফিরে গিয়ে ফরাসি ভাষায় মির্চা এলিয়াদ লেখেন তাঁর এই প্রেম ও দহনের স্মৃতিচারণ। বছরের পর বছর পর, সেই বইয়ের কথা জানতে পেরে এবং নিজের চরিত্রের ওপর আনা শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ খণ্ডন করতে মৈত্রেয়ী দেবী লেখেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ন হন্যতে’। সাহিত্যের এই দ্বৈরথই মূলত বই দুটিকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে এক অবশ্যপাঠ্য দলিলে পরিণত করেছে।


​‘লা নুই বেঙ্গলী’ কেবল একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প নয়, এটি দুটি ভিন্ন গোলার্ধের সংস্কৃতি, লিঙ্গভাবনা এবং মনস্তত্ত্বের এক জটিল কোলাজ। ইউরোপের মুক্ত বাতাসে বেড়ে ওঠা এক যুবকের কাছে তৎকালীন ভারত ছিল একাধারে রহস্যময় ও অবরুদ্ধ। নরেন্দ্র সেনের বাড়িটিকে অ্যালেনের প্রথম প্রথম মনে হতো এক সুবর্ণ কারাগার।
​১৬-১৭ বছরের মৈত্রেয়ী এবং ২০-২২ বছরের অ্যালেনের প্রেমপর্বের দিনগুলো বিশদভাবে লক্ষ করলে এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক খেলা চোখে পড়ে। সামান্য খুনসুটি, তুচ্ছ বিষয়ে ঝগড়া আর চোখের ভাষায় পরস্পরের সান্নিধ্য খোঁজা—এ যেন যেকোনো মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রেমেরই শ্বাশত রূপ। লেখক এখানে প্রেমের এক চিরন্তন দর্শন তুলে ধরেছেন:
​বড় প্রেম নদীর মতো, যা মোহনার দিকে ধাবিত হয়ে শান্ত হয়; আর ক্ষুদ্র প্রেম শরীর আচ্ছন্ন করলেও শেষ পর্যন্ত কেবল স্বার্থপরতার চোরাবালিতে হারিয়ে যায়।
​তবে এই প্রেমের সমান্তরালে চলেছে অ্যালেনের তীব্র আত্মদ্বন্দ্ব ও সন্দেহপ্রবণতা। অ্যালেনের অবচেতন মন বারবার ভেবেছে, নরেন্দ্র সেনের এই অতিরিক্ত আতিথেয়তা হয়তো এক সাজানো ফাঁদ, যার উদ্দেশ্য মৈত্রেয়ীকে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া। মৈত্রেয়ী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যকার পবিত্র গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, কিংবা দূরসম্পর্কের আত্মীয় খোকার সঙ্গে মৈত্রেয়ীর সহজ রসিকতা—এ সবকিছুই অ্যালেনের ভেতরে এক বিষাক্ত ও সূক্ষ্ম ঈর্ষার ফণা তুলেছিল, যা উপন্যাসের নাটকীয়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।


​মির্চা এলিয়াদের বর্ণনাশৈলী অত্যন্ত সরল অথচ চাক্ষুষ। যেহেতু এটি লেখকের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত, তাই অতি ক্ষুদ্র ঘটনাগুলোও এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সামান্য একটি শুকনো ফুল, বারান্দার আলতো স্পর্শ কিংবা মধ্যরাতে মৈত্রেয়ীর ঘর থেকে ভেসে আসা গুঞ্জন—সবকিছুই এক মায়াবী কুয়াশা তৈরি করে।
​তবে সমালোচকের দৃষ্টিতে একটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়া যায় না—তা হলো যৌনতার বর্ণনা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা। অ্যালেনের কাছে যা ছিল মুক্ত প্রেমের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ, প্রাচ্যের রক্ষণশীল সমাজে একটি মেয়ের জন্য তা ছিল সামাজিক মৃত্যুর শামিল। মৈত্রেয়ীর তীব্র প্রতিবাদের কারণও ছিল এটিই। পরবর্তীতে নরেন্দ্র সেন যখন অত্যন্ত শীতল ও বিদ্রূপাত্মক ভাষায় কোনো পূর্বনোটিশ ছাড়াই অ্যালেনকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেন, তখন সেই আকস্মিকতার পেছনেও ছিল এক গভীর আশাভঙ্গ ও কন্যার সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চরম আকুলতা। মারধর বা কলহ না করে ভদ্রতার আবরণে মিস্টার সেন যে কঠোরতা দেখিয়েছেন, তা তৎকালীন উচ্চ-শিক্ষিত বাঙালি মনস্তত্ত্বের যথার্থ প্রতিফলন।


​সাহিত্যিক মানদণ্ডে মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’ যতটাই শৈল্পিক ও আবেগঘন হোক না কেন, *‘লা নুই বেঙ্গলী’*র ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অস্বীকার করার উপায় নেই। মির্চার এই লেখাটি না থাকলে বাংলা সাহিত্য হয়তো ‘ন হন্যতে’-র মতো এমন এক অপরাজেয় সৃষ্টি পেত না।
​প্রেমের পরিভাষা আধা-মানসিক ও আধা-শারীরিক। কিন্তু এর ঊর্ধ্বে গিয়ে এই উপন্যাসের শেষাংশে আমরা এক আধ্যাত্মিক প্রেমের সন্ধান পাই। সমাজ ও ভূগোলের দূরত্ব যাদের শরীরকে বিচ্ছিন্ন করেছে, আত্মিক স্তরে তারা এক হয়ে থেকেছে। উপন্যাসের শেষে মৈত্রেয়ীর চিঠির সেই আকুলতা—“তুমি আমাকে নারীত্বে উত্তীর্ণ করে দিয়েছিলে...”—তা মির্চার কল্পনা হোক কিংবা বাস্তব, তা প্রমাণ করে যে প্রেম ভাঙনের অবশিষ্টাংশেও এক অলৌকিক সুষমা টিকে থাকে। ‘লা নুই বেঙ্গলী’ মূলত সেই মানব-মানবীর অবিনশ্বর ও ক্ষতবিক্ষত ভালোবাসার এক অনন্য আখ্যান, যা যুগ যুগ ধরে পাঠকদের ভাবিয়ে যাবে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.