| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শ্রাবণধারা
" আমাদের মতো প্রতিভাহীন লোক ঘরে বসিয়া নানারূপ কল্পনা করে, অবশেষে কার্যক্ষেত্রে নামিয়া ঘাড়ে লাঙল বহিয়া পশ্চাৎ হইতে ল্যাজমলা খাইয়া নতশিরে সহিষ্ণুভাবে প্রাত্যহিক মাটি-ভাঙার কাজ করিয়া সন্ধ্যাবেলায় এক-পেট জাবনা খাইতে পাইলেই সন্তুষ্ট থাকে......."

আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ ছিল, শরতের হিমেল বাতাসটাও আজ ছিল না, তাই কনকনে ঠান্ডা নেই। তার ওপর আজ শনিবার হওয়ায় ছুটির দিনের সাথে মিলিয়ে হ্যালোইনের আয়োজন ছিল উৎসবমুখর।
ছয়-সাত বছর আগে, যেবার প্রথম আমরা হ্যালোইনে বাচ্চাদের নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, সেবার অনুভব করেছিলাম যে হ্যালোইন পৃথিবীর সুন্দরতম উৎসবগুলোর একটি। বিশেষ করে শিশুদের জন্য হ্যালোইনের মতো সৃজনশীল উৎসব আর নেই।
হ্যালোইনের পোশাক ও সাজসজ্জার কথা ধরা যাক। হ্যালোইনে শিশুরা কল্পনা ও সৃজনশীলতা দিয়ে নিজেদের নানাভাবে উপস্থাপন করে। কেউ ভূত, কেউ সুপারহিরো, কেউ সিনেমা বা কার্টুনের কোন চরিত্রের আদলে নিজেকে সাজায়। কেউ পোশাকের সাথে মিলিয়ে মুখের সাজ পাল্টায়, কেউ চুলের ধরন বদলায়, আবার কেউ ছোট ছোট খুঁটিনাটি দিয়ে নিজের ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। খাতার পাতায় আমরা যে ছবিগুলো আঁকি বা আঁকতে চাই, সেই কল্পনার জগৎই এখানে সাজপোশাক ও অবয়বের সাথে মিশে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
কয়েক বছর আগে, একবার অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার মেয়ের পছন্দমতো একটা হ্যালোইনের পোশাক কিনে দিয়েছিলাম; কিন্তু স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে সে ফিরলো মন খারাপ করে। কারণটা হলো, ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীরা পোশাক ছাড়াও আরও অভিনব সব ধারণা দিয়ে নিজেদের অনেক বেশি সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করেছিল, যা আমার মেয়ে আগে ভেবে দেখেনি।
এখন মেয়ে অনেকটা বড় হয়েছে, হ্যালোইনের পোশাকে তার খুব বেশি আগ্রহ নেই। পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর আয়োজনেও সে আর যোগ দেয় না। এখন শুধু ছেলেকে নিয়ে মহল্লার বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বের হই। যেসব বাড়ির সামনে হ্যালোইনের সজ্জা আছে কিংবা যেসব বাড়ির সদর দরজায় সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে, বাচ্চারা সেসব বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে। গৃহকর্তীকে মজার ছলে ভয় দেখিয়ে তারা ক্যান্ডি সংগ্রহ করে, আর এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে বেড়ায়।
এই আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের পরিবারের বাইরের মানুষের সাথে পরিচিত হয়। অপরিচিত মানুষের দরজায় গিয়ে কথা বলে, চাইতে শেখে ও ধন্যবাদ জানাতে শেখে। অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করার প্রথম অভিজ্ঞতাটা তারা এভাবে অর্জন করে। হ্যালোইনে শিশুরা এই সামাজিক শিক্ষাটা পায় যে, উৎসবের দিনে আমাদের ঘরের দরজা শুধু নিকট আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের জন্যই খোলা থাকে না, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্যই খোলা থাকে। আর তারা শেখে যে, আনন্দ ভাগ করে নিতে হলে নিজের গণ্ডির বাইরের মানুষের কাছে যেতে হয়।
আমার ক্লাস ফোরে পড়া ছেলের এক বন্ধুর বাবা সকালে ফোন করে জানালেন যে, তাঁর ছেলে নাকি আমার ছেলের সাথে ট্রিক অর ট্রিটে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তিনি নিজেই আজ বাচ্চাদের তদারকি করবেন। আমার জন্য এতে সুবিধা হলো; বিকেলে ছেলেকে বন্ধুর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরলাম।
কিন্তু আমার স্ত্রীর হ্যালোইন উপলক্ষে পরিকল্পনা ছিল। কয়েক দিন ধরে দোকান ঘুরে ঘুরে তিনি সাজসজ্জার জিনিস কিনেছেন। বাড়ির সামনে সেগুলো লাগানোর পরে মনে হয়েছিল, সাজসজ্জাটিকে আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। দোকান থেকে খোদাই করা কুমড়ো, কৃত্রিম কঙ্কাল আর কাকতাড়ুয়া কিনে এনে বাড়ির সামনে সাজিয়ে দিলাম। কেনা ক্যান্ডি ও চিপসের প্যাকেটগুলো ভূতুড়ে নকশার একটি বালতিতে ঢেলে ট্রিক-অর-ট্রিটের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো।
সন্ধ্যা নামতেই বাচ্চারা আসতে শুরু করল। তিনি খুবই উৎসাহ নিয়ে একে একে সবাইকে ক্যান্ডি দিতে লাগলেন। কোনো কোনো বাচ্চার পোশাক, বয়স কিংবা ছোটখাটো কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি খুবই আনন্দ পাচ্ছিলেন। তিনিও একটি ছোটখাটো সাজ পরেছিলেন। মাথায় একটি হেডব্যান্ড লাগিয়ে হরিণ বা এ জাতীয় কোনো প্রাণীর সাজ নিয়েছিলেন।
ক্যান্ডি বিলানোর ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাচ্চাদের কাণ্ডকারখানার নানা গল্প আমাকে শোনাচ্ছিলেন। কেউ এত ছোট যে একেবারে কুটিকুটি, কেউ একটু বড়, আবার কোনো কোনো দলে বড় বাচ্চারাও এসেছে - এসব গল্প আমাকে শোনাচ্ছিলেন। আমি তখন লেখালেখিতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার ডাক পড়ল। বললেন, "অনেকক্ষণ ধরে আমি ক্যান্ডি বিলাচ্ছি, এবার তোমার পালা।" অগত্যা ক্যান্ডি বিলানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত হলাম।
সারা বছর আমরা যে ঘরের কোণে নিজেদের গুটিয়ে রাখি, উৎসব সেই গণ্ডি থেকে আমাদের বের করে আনে এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আপন-পরের বিভাজন অতিক্রম করে সমাজকে আপন করে নেওয়ার মধ্যেই উৎসবের সার্থকতা। উৎসব মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য জাগিয়ে তোলে এবং পারস্পরিক সংযোগ গড়ে তোলে।
যখন দেখি, একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী প্রতিটি উৎসবের ক্ষেত্রেই নানা অদ্ভুত যুক্তি হাজির করে মানুষকে তাতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে, তখন তাদের এই সংকীর্ণতা উৎসবের আনন্দকেই শুধু খর্ব করে না, বরং মানুষের সহজাত প্রেম, উদারতা ও মঙ্গলবোধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যে উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনে, সেটাকেই বিভাজনের উপলক্ষ করে তোলা এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অনেক সমস্যার একটি। অথচ তা উৎসবের মূল উদ্দেশ্যেরই পরিপন্থী।
০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:২৮
শ্রাবণধারা বলেছেন: ধন্যবাদ স্বপ্নের শঙ্খচিল।
"স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: আমাদের ইসলামেও বলা আছে উৎসবে, কোরবাণীতে প্রতিবেশীর খবর নাও প্রয়োজনে সাহায্য করুন ।
আমাদের দেশে হয়তো এখন আর চালু নেই , আমাদের সভ্যতা ধংশ করে ফেলেছি । আমাদের আবারও এইসব কালচার ফিরিয়ে আনা উচিৎ।"
আমিও এমনটাই বিশ্বাস করি। উৎসব মানেই হল নিজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে অন্য সকলের সাথে মেলা। অসভ্য ও বর্বরেরা এর মানেটাকেই বিকৃত করেছে।
২|
০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪০
খায়রুল আহসান বলেছেন: শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো ভালো লাগল। +
কিছুক্ষণ টরন্টো প্রবাসী আমার এক বন্ধু প্রফুল্লচিত্তে তার প্রিয় নাতনি'র একটি হ্যালোয়ীন কর্মে্র ছবি পাঠালোঃ
শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা কথাগুলো ভালো লাগল। +
কিছুক্ষণ আগে টরন্টো প্রবাসী আমার এক বন্ধু প্রফুল্লচিত্তে তার প্রিয় নাতনি'র একটি হ্যালোয়ীন কর্মে্র ছবি পাঠালোঃ
০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৩৫
শ্রাবণধারা বলেছেন: ধন্যবাদ, খায়রুল আহসান ভাই।
আপনার বন্ধুর নাতনির হ্যালোইনের ছবি দেখে আনন্দ পেলাম। এবার আমরাও বাসার সামনের বারান্দায় খোদাই করা কুমড়ো রেখেছিলাম। অনেকের বাড়িতেই দেখেছি, খোদাই করা সেই কুমড়োর ভেতরে আলো জ্বলে-নেভে। আগামী বছর আমাদেরও এমন আলো জ্বলা-নেভা কুমড়ো রাখার ইচ্ছা আছে।
৩|
০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫০
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: যারা মানুষকে উৎসব এবং আনন্দ থেকে বিরত রাখতে চায় এরা বনমানুষ । আপনার পরিবারের হ্যালোইন স্মৃতি পড়ে বেশ ভালো লেগেছিলো।
০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৩৯
শ্রাবণধারা বলেছেন: হ্যাঁ, সত্যিই তাই। মানুষকে উৎসবের আনন্দ থেকে বিরত রাখতে চাওয়া এই বনমানুষগুলো অন্য সাধারণ মানুষের জন্যও সমস্যা তৈরি করেছে। আর এর প্রথম ভুক্তভোগী হয় শিশুরা। শিশুদের বলা হয়, তোমরা এটা করতে পারবে না, এটা হারাম। এমনটা করে তারা শিশুদের যে কত বড় ক্ষতি করছে, তা তারা নিজেরাও জানে না।
৪|
০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:২৭
কলিমুদ্দি দফাদার বলেছেন:
হ্যালোইন একটি কেল্টিক উৎসব। একদল আইরিশ অধিবাসী ইহাকে আমেরিকাতে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে উইনটারে
ব্যাবসা-বানিজ্য ধীর গতি হওয়ার কারনে ট্রিক এন্ড ট্রিটের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করে এই উৎসবকে আমেরিকাতে বানিজ্য করন করা হয়। হ্যালোইন নিয়ে ইহাই আমার জ্ঞান।
হ্যালোইন একটি পেগ্যান রিচুয়াল এবং ইহার মধ্যে শ্যাতানিক অনেক ম্যাকানিজম আছে এমন কিছু ইসলামিক ভিডিও আমি ও দেখেছি। তবে আপনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে পুড়োটাই আসলে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। ছোট ছোট বাচ্চাদের ক্যান্ডি কুড়ানোর ও মানুষের সাথে পরিচিতির ব্যাপারটি ভালো লেগেছে....
©somewhere in net ltd.
১|
০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: হ্যালোইনে শিশুরা এই সামাজিক শিক্ষাটা পায় যে, উৎসবের দিনে আমাদের ঘরের দরজা
শুধু নিকট আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের জন্যই খোলা থাকে না, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্যই খোলা থাকে।
আর তারা শেখে যে, আনন্দ ভাগ করে নিতে হলে নিজের গণ্ডির বাইরের মানুষের কাছে যেতে হয়।
............................................................................................................................
আমরাও ছোট বেলায় উৎসবে বাড়ী বাড়ী গিয়ে মা /চাচীদের বাসায় খেয়েছি বা মা এর দেয়া
পিঠা, পুলি বিতরন করছি । আমাদের ইসলামেও বলা আছে উৎসবে, কোরবাণীতে প্রতিবেশীর খবর নাও
প্রয়োজনে সাহায্য করুন ।
আমাদের দেশে হয়তো এখন আর চালু নেই , আমাদের সভ্যতা ধংশ করে ফেলেছি ।
আমাদের আবারও এইসব কালচার ফিরিয়ে আনা উচিৎ।