| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
চলতি বছরের ০৮ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে চীনের চন্দ্র পঞ্জিকার প্রথম মাসের প্রথম দিন, অর্থাৎ বসন্ত উৎসবের প্রথম দিন।
খ্রীষ্টানদের বড় দিনের মতো কিংবা মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা উৎসবের মতো এই বসন্ত উৎসব হচ্ছে চীনা এবং চীনা বংশোদ্ভূতদের জন্য সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘতম জাতীয় উৎসব, যাকে বর্ষ বরণ উৎসবও বলা হয়। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বসন্ত উৎসব উদযাপনের বিষয়-রীতি-বৈচিত্র্যে কিছু পরিবর্তন হলেও চীনা নাগরিকদের জীবন-চেতনায় এ উৎসবের আবেদন আগের মতোই তীব্র আবেগ তাড়িত এক বিশেষ প্রথা হিসেবে লালিত। ঐতিহ্য আর রীতি অনুসারে বসন্ত উৎসব চীনের চন্দ্রবর্ষের শেষ মাসের ২৩ তারিখ থেকে নতুন বছরের প্রথম মাসের ১৫ তারিখ অর্থাৎ লন্ঠন উৎসব পর্যন্ত প্রায় তিন সপ্তাহ ব্যাপী স্থায়ী হয়। বসন্ত উৎসবের ঠিক আগের দিন অর্থাৎ পুরনো বছরের শেষ দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বসন্ত উৎসবের প্রথম দিন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি দিন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে চীনাদের বসন্ত উৎসবের ইতিহাস চার হাজার বছরেরও বেশী দীর্ঘ । তবে তখন এই উৎসবের নাম বসন্ত উৎসব ছিল না , উৎসবের দিন তারিখও স্থির করা হয় নি । খৃষ্টপূর্ব দু হাজার এক শ' সালের সময় তখনকার অধিবাসীরা বৃহষ্পতিগ্রহের একবার প্রদক্ষিণের সময়কে এক সুই বলে অভিহিত করতেন , সেই সময় বসন্ত উত্সবের নাম ছিল সুই ।
খৃষ্টপূর্ব এক হাজার সালের কাছাকাছি সময় তখনকার অধিবাসীরা বসন্ত উৎসবকে চীনা ভাষায় ' নিয়েন ' বলে ডাকতেন । ' নিয়েন ' অর্থ বছর , তবে তখনকার বছরের অর্থ ছিল সুফসল ।যে বছর খাদ্য-শস্যের ভালো ফসল হতো সে বছরকে "ইউয়ো নিয়েন" বলা হতো। আর যে বছর খুব ভালো ফসল হতো সেই বছরকে "দা ইউয়ো নিয়েন" বলা হতো। আর বসন্ত উৎসব উদযাপন করাকে চীনা ভাষায় 'কোও নিয়ান' বলা হয়।
এই 'নিয়ান' নিয়ে চীনে অতি প্রচলিত একটি কিংবদন্তী রয়েছে।
প্রাচীনকালে 'নিয়ান' নামে ছিল এক দানব, দেখতে মস্ত বড়, ভয়ংকর হিংস্র আর মাথায় ছিল সুঁচালো দুটি শিং। গভীর সমুদ্রগর্ভে ছিল তার বাস। কেবল একবার, বছরের ঠিক শেষ দিনের শেষ রাতের অন্ধকারে ওপরে উঠে আসতো আর সামনে মানুষ বা প্রাণী যা পেত সব খেয়ে ফেলতো। ফলে ভয়ংকর এই দানব 'নিয়ানে'র ভয়ে প্রতি বছরের ঐ শেষ দিনটিতে গ্রামের সকল মানুষ যে যার মত করে আর যত তারাতারি সম্ভব পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে পালিয়ে থাকতো।
একবার বছরের শেষ দিনে ঐ গ্রামে অচেনা এক ভিক্ষুক আসে। কিন্তু গ্রামবাসীরা তখন দানবের ভয়ে ঘর ছেড়ে পাহাড়ে চলে যাচ্ছিল আর ভিক্ষুকের দিকে ফিরে তাকানোরও সময় ছিল না তাদের। তবে গ্রামের পূর্বদিকের একজন বৃদ্ধা ভিক্ষুককে কিছু খাবার দিয়ে বলল-
'তুমি তাড়াতাড়ি পাহাড়ে চলে যাও, কাল সুর্য ওঠার আগে নিচে আসবে না'।
একথা শুনে ভিক্ষুক হাঁসতে হাঁসতে বললো, "আমাকে যদি আপনার বাড়িতে এক রাত থাকতে দেন, তাহলে ঐ দানব 'নিয়ান'কে আমি তাড়িয়ে দিতে পারি।" বৃদ্ধা ভিক্ষুকের কথা বিশ্বাস করাতো দূরে থাক উল্টো তখনই তাকে পালিয়ে যেতে বললো। উত্তরে সেই ভিক্ষুক একটু মৃদু হেসে আর কিছুই বললো না।
রাত তখন গভীর আর ঘুট ঘুটে অন্ধকার, দানব 'নিয়ান' গ্রামে ঢুকে লক্ষ্য করলো- "কি ব্যাপার! সব কিছু তো ঠিক আগের মতো মনে হচ্ছে না! বৃদ্ধার ঘরের দরজায় লাল কাগজ টাঙানো আর ভিতরে মোমবাতির উজ্জ্বল আলো?" দানব 'নিয়ান' ভয়ে একটু কেঁপে উঠল যেন। ব্যাপারটা বোঝার জন্য চুপে চুপে যেই না দরজার কাছে গেল ওমনি ঘরের ভিতর থেকে 'ধ্রুম ধ্রাম পিং পাং' বিস্ফোরণের আওয়াজ আসতে থাকলো। আওয়াজের কারনে দানব 'নিয়ানের' মস্তিস্কে ভীষণ যন্ত্রণা তৈরী হয় আর ভয়ে কাঁপতে থাকে। কারণ 'নিয়ান' লাল রং, অগ্নিকুণ্ডলী আর বিস্ফোরণ সহ্য করতে পারে না, এগুলোকে ভয় পায় ভীষণ। এ সময় ঘরের দরজা খুলে গাঁয়ে লাল পোশাক পড়া একজন বৃদ্ধ হা-হা করে হেসে উঠলো দানবটির সামনে। এতে দানব 'নিয়ান' নিজেই মৃত্যুর ভয়ে পড়িমড়ি করে প্রাণ নিয়ে দৌড়ে পালায়, ফিরে যায় গভীর সমূদ্রগর্ভে ।
বসন্ত উৎসবকে স্বাগত জানানোর জন্য চীনের শহরাঞ্চল ও পল্লী অঞ্চলের অধিবাসীরা নানা ধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ করেন । চীনের পল্লী অঞ্চলে প্রস্তুতির কাজ বছরের শেষ মাসের প্রথম দিক থেকেই শুরু হয় । কৃষকরা বাড়ীঘর পরিষ্কার করেন , লেপতোষক ধুয়ে পরিষ্কার করেন , বাজার থেকে বসন্ত উৎসবের খাওয়া ও মেহমানকে খাওয়ানোর খাদ্যদ্রব্য কিনেন , যেমন মিষ্টিজাতীয় খাদ্য , কেক , ফলমুল , মাছ-মাংস ইত্যাদি । বড় বড় শহরে উৎসবের প্রস্তুতিও উৎসবের অনেক দিন আগে থেকে শুরু হয় । সাংস্কৃতিক বিভাগগুলো ও বিভিন্ন শিল্পী দল উৎসব কালের সাংস্কৃতিক কর্মসূচী তৈরীর কাজে ব্যস্ত, টেলিভিশন কেন্দ্র বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নেয় , বিভিন্ন পার্কে নানা ধরনের মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেয় আর বিভাগীয় দোকানগুলো নাগরিকদের চাহিদা মেটানোর জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তথা বিদেশ থেকে পন্যদ্রব্য জোগাড় করার প্রচেষ্টা করে। একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে , বসন্ত উৎসবকালে চীনাদের কেনাকাটা তাদের গোটা বছরের কেনাকাটার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশী ।
চীন একটি বড় দেশ , কাজেই বিভিন্ন জায়গায় বসন্ত উৎসব উদযাপনের রীতিনীতি ভিন্ন । তবে বসন্ত উৎসবের আগের দিন রাত্রে অর্থাৎ পুরনো বছরের শেষ দিন রাত্রে পরিবারের সবাই এক সংগে মিলে বছরের শেষ খাওয়া সম্পন্ন করার প্রথা সমগ্র দেশে প্রায় একই ।
দক্ষিণ চীনে বছরের শেষ খাবারের টেবিলে দশ-বারোটি তরিতরকারী আছে , এগুলোর মধ্যে টোফু অর্থাৎ সয়াবীনের দই ও মাছ থাকতে হবে । কারণ এই দুটি খাবারের চীনা উচ্চারণের সংগে ঠিক সমৃদ্ধির চীনা শব্দের উচ্চারণের অনেক মিল আছে । এতে নতুন বছরে চীনাদের আশা-আকাংখা প্রতিফলিত হয়েছে । উত্তর চীনে বছরের শেষ খাবারের টেবিলে চিয়াও চি নামক এক খাবার অবশ্যই থাকতে হবে । সেদিন সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই এক সংগে মিলে চিয়াও চি তৈরী করেন । চিয়াউ চি চীনের এক জনপ্রিয় খাবার , চিয়াও চি মাংসের পুর দেয়া এক কুলী পিঠে , বছরের শেষ রাতে পরিবারের সকল সদস্য মিলিতভাবে চিয়াও চি তৈরী করে ফুটন্ত পানির মধ্যে সেদ্ধ করে ভিনেগা ও অন্যান্য মশলার সঙ্গে খান ।
বছরের শেষ রাতে সারারাত জেগে কাটানোও বসন্ত উৎসবের এক রেওয়াজ । সেই রাতে লোকেরা নাচগান ও গল্প করার মধ্য দিয়ে বছরের শেষ রাত কাটান ।
বসন্ত উৎসবের প্রথম দিন অর্থাৎ চান্দ্র বর্ষের প্রথম দিন সকালে পরিবারের সবাই নতুন জামা-পোশাক পরে মেহমানদের স্বাগত জানান অথবা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাড়ীতে যান । সেদিন সবাই পরস্পরের সংগে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং চা , বাদাম ও মিষ্টি খেয়ে গল্প করেন । চীনে এরকম রেওয়াজও আছে যে গত এক বছরে যদি আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ঝগড়া বা গন্ডগোল হয় , বসন্ত উৎসবের সময় এক পক্ষ আরেক পক্ষের বাড়িতে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে গেলে দুজনের বিরোধ মিটে গেছে বলে মনে করা হয় ।
বসন্ত উৎসবের কর্মসুচী বৈচিত্র্যময় । স্থানীয় অপেরা ও চলচ্চিত্র অনুষ্ঠান , সিংহনাচ, ড্রাগণ লন্ঠন জ্বালানো, বিভিন্ন ধরনের মেলা ইত্যাদি কর্মসুচীর কল্যানে সর্বত্রই উত্সবের আনন্দমুখর পরিবেশ বিরাজ করে । অবশ্য বেশীর ভাগ লোক বসন্ত উতসবের প্রথম দিন সানন্দে অতিবাহিত করে রাতে পরিবারের সবাই একসাথে মিলে বিশেষ টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকেন। সিসিটিভি এদিন বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যাতে সারা চীনের জনপ্রিয় তারকাদের পাশাপাশি বিদেশি শিল্পীরাও অংশ নেয়। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে নাচ, গান, মজার নাটিকা, এক্রোব্যাটিক ইত্যাদি অংশ থাকে।
বসন্ত উৎসব চলাকালে বাড়ীর প্রবেশদ্বারে দ্বি-চরণ শ্লোক ও নতুন বছরের দেওয়াল চিত্র এঁটে দেয়া আর বাড়ীর ফটকে অথবা সদর দরজায় নানা ধরনের চীনা লন্ঠন ঝুলানোও বসন্ত উৎসবের এক রেওয়াজ । বসন্ত উৎসবের আগে বাজারে প্রচুর দেওয়াল চিত্র ও দ্বি-চরণ শ্লোক পাওয়া যায় , নাগরিকদের সুখী জীবনের ছবি , সুন্দর ফুল ও মনোরম দৃশ্যের চিত্র অত্যন্ত জনপ্রিয় । বসন্ত উৎসবের লন্ঠন প্রদর্শনীও দেখার মতো , চীনা লন্ঠন চীনের এক ঐতিহ্যিক শিল্পকর্ম , সেগুলোর কোনোটার আকার খরগোসের মতো , কোনোটা ছাগলের মতো , কোনোটা টেলিভিশন কার্টুনের কোনো জনপ্রিয় চরিত্রের আকার ।
যুগ পরিবর্তনের সংগে সংগে বসন্ত উৎসবের বিষয়বস্তুর কিছু পরিবর্তন হয়েছে , নাগরিকদের বসন্ত উৎসব পালনের কায়দারও কিছু পরিবর্তন হয়েছে , কিন্তু চীনা নাগরিকদের জীবনে ও চিন্তাভাবনায় বসন্ত উৎসবের অবস্থানের এখনো পরিবর্তন হয় নি ।
যদিও বসন্ত উৎসব চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব তবে তার ইতিহাস কিন্তু খুব দীর্ঘ নয়। আসলে চীনের বসন্ত উৎসবের ইতিহাস ১০২ বছরের। আগে লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ উদযাপন করা হতো তবে সেটিকে বসন্ত উৎসব বলা হতো না।
১৯১২ সালে তখনকার সরকার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পয়লা জানুয়ারিকে একটি বছরের সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু চীনারা তাকে নববর্ষ হিসেবে মনে করেন না।
তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। লুনার ক্যালেন্ডার নববর্ষ, ড্রাগন নৌকা উৎসব, শারদীয় উৎসব ও শীতকালীন অয়ন এ চারদিন যথাক্রমে বসস্ত উৎসব, গ্রীষ্ম উৎসব, শরত উৎসব ও শীত উৎসব হিসেবে পালন করা হবে এবং সারা দেশ ছুটিতে থাকবে। এভাবে লুনার ক্যালেন্ডার নববর্ষ মানে বসন্ত উৎসবের নাম পায়।
লুনার ক্যালেন্ডারের শেষ মাসকে চীনারা লা ইউয়্যু বলে ডাকেন এবং প্রথম মাসকে ডাকেন চেং ইউয়্যু। পুরো বসন্ত উৎসব লা ইউয়্যু ২৩ থেকে চেং ইউয়্যু ১৫ পর্যন্ত এবং প্রতিদিন কি কি করতে হবে তার জন্য নিয়মও রয়েছে।
লা ইউয়্যু ২৩ রান্নাঘরের ঈশ্বরকে পূজা করা। কিংবদন্তীতে বলা হয়, প্রতি বছরের লা ইউয়্যু ২৩ এদিন রান্নাঘরের ঈশ্বর আকাশে ফিরে যান এবং গত বছরের এ পরিবারের সবকিছু রাজার সামনে তুলে ধরেন। রান্নাঘরের ঈশ্বর যেন রাজার সামনে ভাল কথা বলেন সেজন্য মানুষ সাধারণত উয়্যু ২৩ রান্নাঘরের ঈশ্বরকে পূজা করেন।
লা ইউয়্যু ২৪ বাড়ি পরিষ্কার করা। চীনা ভাষায় ধূলিকণাকে বলা হয় চেন এবং পুরাতনকে বলা হয় চেন। তাই ধূলিকণা দূর করা মানে পুরাতন জিনিস দূর করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো।
আগেই বলেছি, চীনের বসন্ত উৎসব হচ্ছে চীনের চান্দ্র বর্ষের নববর্ষ উৎসব এবং চীনা নাগরিকদের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যিক উৎসব। বসন্ত উৎসব উদযাপন উপলক্ষে নানা ধরনের কর্মসূচী গ্রহন করা হয়। চান্দ্র বর্ষের প্রথম মাসের ১৫তম দিন ইউয়েন সিয়াও খাওয়া বসন্ত উৎসব উদযাপনের শেষ কর্মসূচী। সেই দিন সমগ্র চীনের সবাই ইউয়েন সিয়াও নামে এক ধরনের মিষ্টি খাবার খান। তবে দক্ষিণ চীনের অধিবাশীরা এই ধরনের মিষ্টি খাবারকে ‘ থান ইউয়েন ‘ বলেন আর উত্তর চীনের অধিবাশীরা তাকে ইউয়েন সিয়াও বলেন। উত্তর ও দক্ষিণ চীনের নাগরিকদের ইউয়েন সিয়াও তৈরীর পদ্ধতিও ভিন্ন ।
বসন্ত উৎসবের সময় প্রতিটি চীনা মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে। এ উৎসবের মাধ্যমে চীনাদের আত্মীয়স্বজনের পুনর্মিলন, বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে মৈত্রী জোরদার এবং শান্তি ও সুখ কামনাসহ আগামী দিনের পথ চলার দিক নির্দেশিকা হিসাবে কাজ করে। তাদের জীবনে পরিবারের সবার সাথে মিলেমিশে আনন্দে থাকার এক শক্তিশালী অনুপ্ররণা। এ দিন যে যেখানে, অর্থাৎ যত দূরেই থাকা হোক না কেন, সবাই বাড়ি ফিরে আসে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
বসন্ত উৎসবের সময় সুপার মার্কেটসহ সব দোকান পাটে নতুন জিনিসে ভরে যায়। ইলেক্ট্রোনিক মার্কেট গুলোও নতুন নতুন আধুনিক পণ্যে ভরে যায়। ফলমূল ও এত বেশি বৈচিত্রময় খাবার থাকে যে বলে শেষ করা যাবে না। এত বেশি সুস্বাদু খাবার থাকে যা দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। কেনাও হয় প্রচুর।
এ উৎসবের মাধ্যমে চীনাদের আত্মীয়স্বজনের পুনর্মিলন, বন্ধুবান্ধবীদের সঙ্গে মৈত্রী জোরদার এবং শান্তি ও সুখ কামনাসহ সাংস্কৃতিক মর্ম। অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করে যে, বসন্ত উৎসবের ঐতিহ্য ও তাৎপর্য হারিয়ে যেতে বসেছে। আসলে তা ঠিক নয়। মূল জিনিস ঠিক আগে মতই রয়েছে।
চীন সরকার বসন্ত উৎসবের সংস্কৃতি রক্ষার জন্য অনেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যেমন এর আগে বসন্ত উৎসবে শুধু তিন দিনের ছুটি থাকতো।২০০০ সালে ছুটির দিন বাড়িয়ে সাত দিন করা হয়েছে। সবাই যাতে পরিবারের সদস্যের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে আনন্দ করতে পারেন। অপরদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘ শীতকালীন ছুটি থাকায় শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ছুটি পেয়ে থাকে।
বসন্ত উৎসব উপলক্ষে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানানো চীনের ঐতিহ্যবাহী ভালো রীতিনীতি।
চীনাদের রীতি হলো প্রতি বছরই বসন্ত উৎসবগুলোকে কোন প্রাণির নামে বর্ষ নামকরন করা। এটাতে কল্যান রয়েছে বলে তাদের ধারনা। পূর্বের বছরগুলোতে যে সকল বর্ষ পালন করা হয়েছে তা হলো-
২০১২- ড্রাগন বর্ষ
২০১৩- সাপ বা সর্প বর্ষ
২০১৪- ঘোড়া বর্ষ
২০১৫- ছাগল বা ভেড়া বর্ষ
২০১৬ সাল হচ্ছে চীনের 'বানর বর্ষ'। এটা বৃদ্ধি, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের প্রতীক। নতুন বছর চীনের জনগণের জীবনে অনেক সুখ ও আনন্দ বয়ে আনবে বানর বর্ষের কল্যানে।
চীনা মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত পরিবহন হলো রেলগাড়ি। দেড়শ কোটি মানুষের দেশের রেল ব্যবস্থা অবকাঠামোগত দিক থেকে নিঃসন্দেহে সারা বিশ্বে প্রথম। রেল ব্যবস্থা সারা চীনকে অত্যাধুনিক সড়ক যোগাযোগের আওতায় এনেছে। চীনে রেলভ্রমণ সবচেয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং সব রেলই ঘড়ির কাঁটা মেপে চলে যা যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বড় প্রয়োজন। বসন্ত উৎসব উপলক্ষ্যে সাধারণত সব মানুষ তাদের পরিবারের সাথে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণে রেল ব্যবস্থার উপর প্রচন্ড চাপ পড়ে। এসময় প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করে এবং বিশেষ ট্রেন সংযোজন করা হয়। এ বছর বহু সংখ্যক মানুষ টিকিট না পেয়ে বাড়িতে যেতে পারেনি এবং অনেকে তাদের মোটর বাইক নিয়ে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। বিশাল এ মোটর যাত্রায় চীনা পুলিশ মহাসড়কে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে।
পুরনো বছরের শেষ দিনটিতে মূলত নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য নানা কার্যক্রম পুরোমাত্রায় শুরু হয়ে থাকে। এদিনে সারা বাড়ি জুড়ে 福(fu) লেখা রং-বেরংয়ের কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়। ফু শব্দের অর্থ হলো সুখ। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সুখ এবং সুন্দর আগামী প্রত্যাশা করা হয়। ফু এর পাশাপাশি প্রচুর পরিমানে লাল রংয়ের পেপার কাটিং সাঁটানো হয়। বাড়ির মূল গেট থেকে শুরু করে বাইরের দেওয়াল, ঘরের দরজা-জানালা, ভেতরের দেওয়াল, আসবাবপত্র সর্বত্র এধরণের পেপার কাটিং, স্টিকার বা বিখ্যাত কবিতাংশ লেখা কাগজ লাগানো হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে বাড়িতে খাবার অনুষ্ঠানের আয়োজন করার নিয়ম থাকলেও বর্তমানে পারিবারিক পুনর্মিলনের এই সান্ধ্যভোজটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রেস্টুরেন্ট এ হয়ে থাকে। এই রাতে ছোট ছেলেমেয়েরা বড়দের কাছ থেকে লাল রংয়ের নকশা করা খামে নগদ টাকা উপহার পায় এবং বড়দের সম্মান জানায়। এর অর্থ পরস্পরের প্রতি শুভকামনা এবং উজ্বল আনন্দময় আগামীর প্রত্যাশা।
চীনে মুসলমান, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্মের মানুষ যেমন আছে তেমনি স্থানীয় তাও ধর্মের অনুসারীও আছে। তবে চীনের অধিকাংশ মানুষই কোন ধর্মে বিশ্বাস করে না। কোন ধর্মের অনুসারী না হয়েও, সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস না থাকার পরও ঐতিহ্যগতভাবে তারা প্রতিবছর ঘরে স্থাপিত 'প্রভূ'র প্রতিকৃতির সামনে নানা ধরণের খাদ্যদ্রব্য, মোমবাতি, আগরবাতি এমনকি প্রভু'র খাবার সুবিধার্থে চপস্টিক পর্যন্ত সাজিয়ে রেখে তার সামনে সেজদা করে থাকে। এ সময় বাড়িতে প্রচুর পরিমাণে পটকা ফোটানো হয়। এ রাতে প্রচুর পরিমাণে চীনা টাকা এবং পয়সার প্রতিলিপি পোড়ানো হয়। এর মাধ্যমে পরলোকগত পরিবারের সদস্যদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।
বসন্ত উৎসবের সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য বিষয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পটকা ও আতশবাজির ব্যবহার। সারা চীনে কি পরিমাণ আতশবাজি আর পটকা'র ব্যবহার হয় তা বোধহয় কেউ আন্দাজও করতে পারবে না। সারা দিন রাত এখানে সেখানে পটকা আর আতশবাজির আওয়াজ পাওয়া যায়।অতীতে বছরের শেষ রাতে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানোর জন্য নাগরিকরা ব্যাপকহারে পটকাবাজি ফাটালেও , নিরাপত্তা ও পরিবেশ দুষনের কারণে পেইচিংসহ চীনের কিছু বড় শহরে পটকাবাজি ফাটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে ।
বছরের শেষ রাতে সারা রাত পুরো বাড়িতে আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। 'প্রভু'র সামনে যথারীতি খাদ্যদ্রব্য, মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়, বাজতে থাকে উপাসনা সঙ্গীত। বাড়ির বড়রা সারা রাত নির্ঘুম কাটায়, ছোটরা মধ্যরাত অবধি জেগে থাকে। এদিন সন্ধ্যায় পরের দিন সকালে খাওয়ার জন্য বিশেষ ডাম্পলিং তৈরী করা হয়। এই ডাম্পলিংয়ে মাংস এবং তেল ব্যবহার করা হয় না। তাদের বিশ্বাস, প্রভু মাংস এবং তেল খান না, তাই প্রভুকে খুশি রাখতে এদিন বিশেষ ডাম্পলিং তৈরী করা হয়।
বছরের প্রথম দিন ভোর বেলায় বাড়ির সদর দরজা খুলে দেওয়া হয়। সদর দরজা থেকে ড্রয়িংরুম পর্যন্ত লাল গালিচা বিছানো হয়। এর মাধ্যমে অতিথিকে স্বাগত এবং সম্মান প্রদর্শন করা হয়। সকাল হতেই নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশিরা একে অপরের বাড়িতে কুশল বিনিময় করতে যান এবং আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে বসন্ত উৎসব তথা ১৫ দিন ব্যাপী নতুন বছরের উদযাপনী অনুষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এ সময়ের মধ্যে তারা মূলত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং প্রতিবেশিদের সাথে কুশল বিনিময় এবং একসাথে খাবার খেয়ে থাকেন।
বসন্ত উতসব উপলক্ষ্যে উপহার বিনিময়ের মধ্যে কমলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। সাধারণত 福 ফু লেখা কাগজে মুড়ে চারটি কমলা দেওয়া হয় যার মধ্যে দুইটি কমলা আবার ফেরত দেওয়া হয়। এর অর্থ অনুরূপ ভালোবাসা এবং সম্মান প্রদর্শন। ভোজের পর তারা একসাথে আনন্দময় ইনডোর গেমস-এ অংশ নিয়ে থাকেন।
দীর্ঘ পনের দিনের এই বসন্ত উৎসব উদযাপন পূর্ণিমা রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়। সমাপনী উদযাপনের নাম লন্ঠন উৎসব।
এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য কেবলই একটি নতুন বছরের আগমনে আনন্দ প্রকাশ নয়, এর উদ্দেশ্য মানুষে মানুষে পারস্পরিক সমঝোতা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন এবং সকলের সুন্দর ভবিষ্যত প্রত্যাশা। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এই উদ্দেশ্যের কোন পার্থক্য নেই।
[রচনাটি ফেব্রুয়ারি,২০১৬ চীনের বসন্ত উৎসব উপলক্ষে চীন আন্তর্জাতিক বেতার, বাংলা বিভাগের স্মরনিকার জন্য রচিত]
১৩ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ৮:০৯
রেমাশ বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ। মন্তব্যের জন্যও।
২|
১২ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:১৪
শায়মা বলেছেন: খুবই ভালো লাগলো ভাইয়া। চীনের এই বসন্ত উৎসবে যেতে ইচ্ছা হচ্ছে। এই লেখা আমি প্রিয়তে রেখে দিচ্ছি।
১৩ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ৮:১৫
রেমাশ বলেছেন: আমারও যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু.............। অবশ্য দুধের সাধ ঘুলে মিটিয়েছি। ঢাকায় চায়না দূতাবাসের আয়োজনে বসন্ত উৎসবের অনু্ষ্ঠানে এবং কনফুসিয়াস ক্লাসরুম আয়োজিত উৎসবে একাধিকবার অংশ নিয়েছি। আপনার সুযোগ থাকলে ঢাকায় এ আয়োজনগুলোতে অংশ নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। ধন্যবাদ, মতামতের জন্য।
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১২:২৪
প্রামানিক বলেছেন: চমৎকার পোষ্ট। ধন্যবাদ