| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রূপক বিধৌত সাধু
মন রে, কৃষিকাজ জানো না; এমন মানবজমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা! রামপ্রসাদ সেন ([email protected])

মেম্বার বাড়ি আর সরকার বাড়ির শত্রুতা দীর্ঘদিনের। জমিজমা লইয়া আজ এমন একখানি ঘটনা ঘটিয়া যাইবে, কেহ বোধহয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই।
সকাল আটটায় কাঠের ব্যাপারী খসরু আসিয়া হাজির। দলিল লেখক আবু জাকারিয়া মিন্টু সবেমাত্র নাস্তা করিতে বসিয়াছেন। নাস্তার পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছা ছিল, আজ আর হইল না। খসরু জানাইলেন, তিনি গাছ দেখিতে যাইবেন।
সরকার বাড়ি হইতে বেশ দূরেই চন্ডিভিটা। মেম্বার বাড়ির সন্নিকটে। রাস্তার একটু পরেই শালবন। পাশাপাশি দুই-তিনটি। খসরু আর মিন্টু ভিতরের দিকে ঢুকিলেন। মিন্টু প্রায় দিনই আসেন। কোনো ভয়ের কারণ নাই। তাহা ছাড়া মিন্টু সরকার বাড়ির ছেলে। বেশ সাহসী। চোর-ডাকাত পিটানোর অভ্যাস আছে।
আজ একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগিতেছে চারিপাশ। প্রতিদিন এইখানে অনেক মানুষজন থাকে। বোরো মৌসুম শুরু হওয়ায় সবার কাজ বাড়িয়া গিয়াছে। অনেকে চারা রোপণ করিতে আসে। কেহ ধান বীজ বপন করে, নিড়ানি দেয় কেহ কেহ। কিন্তু আজ দূরে একজনকে মাত্র দেখা যাইতেছে। পরিচিত- রফিজ। বয়সে বড়- মিন্টু তাহাকে মিয়া ভাই বলিয়া ডাকে।
খসরু বলিল, ‘চলো ভিতরে যাই, গাছ দেহি।’
মিন্টু বলিলেন, ‘হুঁ! চল।’ তাহারা আরও ভিতরে প্রবেশ করিল।
খসরু ঘুরিয়া ফিরিয়া গাছ দেখিতে লাগিলেন। কয়েকটি গাছ ইঙ্গিত করিয়া খসরু বলিল, ‘এই গাছগুলো বেশ বড়। ওদিকে আরও কয়েকটা আছে।’ হাত দিয়ে দূরে আরও কয়েকটা গাছ দেখাইল খসরু।
খসরুর দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ। লক্ষ্য করিয়া মিন্টু জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কী অইছে? কোনো সমস্যা?’ খসরু ঘাবড়াইয়া গেল; নিজেকে সামলাইয়া লইয়া বলিল, ‘না! কিচ্ছু না।’
অকস্মাৎ বৃষ্টি নামিল। ঝুম বৃষ্টি! প্রকৃতি গরম সহ্য করিতে পারে না বোধহয়। গরমের মাত্রা অসহ্য পর্যায়ে পৌঁছিলে তাই গগন ভাঙ্গিয়া পড়ে। নিজে প্রশান্ত হয়, পরিবেশকেও সুশীতল করিয়া তোলে। মানুষকে স্বস্তি দেয়।
সারি সারি লোকজন অরণ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল। সবাই মেম্বার বাড়ির। মিন্টু সবিস্ময়ে তাকাইয়া রহিলেন। খসরু দৌড়াইয়া পালাইল। মিন্টু বুঝিলেন, আজ তাহার মৃত্যু সুনিশ্চিত। উপস্থিত সকলের হাতেই ধারালো দেশি অস্ত্র। মহিলারাও দা, বঁটি লইয়া আসিয়াছে। দীর্ঘদিনের শত্রুকে আজ কতল করা হইবে।
মিন্টু দৌড়ানোর প্রস্তুতি নিলেন। কোন পাশ দিয়া দৌড় দিবেন তিনি? তিন পাশই ঘেরা। আর একপাশে ধানখেত। ধানখেতের মধ্য দিয়াই দৌড় দিলেন তিনি। জীবন তো বাঁচাইতে হইবে।
রফিজের সম্মুখে আসিয়া মুখ থুবড়াইয়া পড়িলেন মিন্টু। রফিজ তখন আইলে বসিয়া বিশ্রাম লইতেছিলেন। ‘রফিজ ভাই, আমারে বাঁচাও! আমারে মাইরা ফালাব।’ মিন্টু উচ্চস্বরে ক্রন্দন আরম্ভ করিলেন।
রফিজ বলিলেন, ‘চিন্তা করিস না! কিচ্ছু অইত না!’ রফিজ মিন্টুকে আগলাইয়া রাখিলেন।
ততক্ষণে ফরিদ খলিফা, মাসুদ, মতিন, ছামাদ, মোসারফ, মোফাজ্জল, তোফাজ্জল, নাজমুল,মোকলেছুর, শাহজাহান, আতিকুল, সিদ্দিকসহ সকলেই আসিয়া পড়িয়াছে। রফিজকে উদ্দেশ্য করিয়া ফরিদ বলিল, ‘ওরে ছাইড়া দে, নইলে তরেও মাইরা ফালামু!’
হুমকিতে হার্টের রোগী রফিজ মূর্ছা গেলেন। মিন্টুর বাঁচিবার শেষ আশাও আর রইল না।
মিন্টুকে জায়গায়-বেজায়গায় বেধড়ক পিটানো ও কোপানো হইল। মাথা, ধড়, পিঠ, বুক, হাত, পা, কোনো অংশই বাদ পড়িল না। হাড়- মাংস সব সমান হইয়া গেল।
মিন্টু হাতড়াতে হাতড়াতে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন; বলিলেন, ‘আমার বউ, ছোট ছোট দুইডা পোলা-মাইয়া আছে। আমারে প্রাণে মারিস না, প্রাণ ভিক্ষা দে!’
ছামাদ মুরব্বিগোছের; বলিলেন, ‘এর প্রাণ ভিক্ষা দে!’
ফরিদ কাহারও কথা শুনিল না। মৃতপ্রায় মিন্টুর গায়ে সীমারের মতো আঘাত করিতে লাগিল। যেন শত যুগের ক্ষোভ তাহার উপর ঝাড়া হইল। দুইজন মহিলা আসিয়া তাহার পায়ের রগ কাটিয়া দিল। সহসা আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হইয়া কাঁদিয়া উঠিল। বৃষ্টি অজোরে ঝরিতে লাগিল। প্রবল বাতাসে গাছপালা ভাঙ্গার উপক্রম হইল।
অনেকক্ষণ পর ঐ পথে দুইজন নারী যাইতেছিল। রফিজের পরিচিত। তাহারা রফিজকে সঙ্গে লইল এবং সরকার বাড়ি খবর দিল। মিন্টুকে সাথে লইবার সাহস হইল না। সবাই কেন জানি বিতর্ক এড়াইতে চায়।
ভালুকা জেনারেল হাসপাতালে মিন্টু মারা গেলেন। জানা যায়, প্রচণ্ড- রক্তক্ষরণ হইয়াছিল।
মিন্টুর শ্বশুর কোটিপতি ব্যক্তি; বলিলেন, ‘এই খুনের প্রতিশোধ নিতে এক কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করব।’
মামলার প্রস্তুতি চলিতেছে। মেম্বার বাড়ির লোকজন আপাতত ঘরছাড়া। এই খুনের মাশুল অবশ্যই তাহাদিগকে দিতে হইবে।
পরিশিষ্ট
১৩ বছর পরের কথা। মিন্টুর ছেলেমেয়েরা এতদিনে প্রাপ্তবয়স্ক হইয়াছে। তাহারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। পিতৃ হত্যার বিচার নিশ্চিতে তাহাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হইল। আজ ময়মনসিংহের আলোচিত দলিল লেখক আবু জাকারিয়া মিন্টু হত্যা মামলায় দুই আসামি ফরিদ খলিফা ও মো. মাসুদ মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়াছেন আদালত।
একই মামলায় মতিন, ছামাদ, মোসারফ, মোফাজ্জল, তোফাজ্জল, নাজমুল মিয়া, মোকলেছুর, শাহজাহান, আতিকুল ও সিদ্দিককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১০ আসামিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাসুদ ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সিদ্দিক হত্যাকাণ্ডের পরপর বিদেশে চলিয়া গিয়াছিল। বাকিরা পুলিশ হেফাজতে। আসামিদের মধ্যে মাসুদ ও মতিন ছামাদের ছেলে। শাহজাহান ও আতিকুল আপন ভাই। বাকিরাও একই বংশের।
আদালত প্রাঙ্গণে এক মিশ্র পরিবেশ লক্ষ্য করা গেল। বাদী পক্ষ রায়ে খুশী। অপরদিকে আসামিদের স্বজনেরা কেঁদেকুটে পরিবেশ ভারী করিয়া তুলিলেন। আসামিরা বুক চাপড়াইতে লাগিলেন। ক্ষণিকের জেদে নিজেদের জীবন ও সংসার বরবাদ হইয়া গেল।
১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৯
রূপক বিধৌত সাধু বলেছেন: আসামিরা সবাই বলতে গেলে ভদ্রলোকগোছের। এরা যে এমন ঘটনা ঘটাবে, অবিশ্বাস্য লেগেছিল আমার কাছে।
২|
১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৬
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: এরকম একটা ঘটনা চিটাগাং শহরে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছিলো। একজন খুন হন আমাদের এলাকায় ; তার রক্ত ধুইতে আমাদের বাসা থেক বালতি ভরে পানি নিয়েছিলো পুলিশ । বিভৎস ঘটনা ...
১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০০
রূপক বিধৌত সাধু বলেছেন: একটা খুন অনেক পরিবার ধ্বংস।
©somewhere in net ltd.
১|
১৭ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৩
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: ক্ষণিকের জেদে নিজেদের জীবন ও সংসার বরবাদ হইয়া গেল।
.............................................................................................
মানবতা বলে ক্ষমাই মহৎ লক্ষণ,
আমাদের পূর্ব পুরুষদের মাঝে দেখেছি, এক ধরনের জিঘাংসা কাজ করে,
একক ভাবে সাহসী না হলেও দলগত ভাবে হিংস্র হতে সময় নেয়না ।
এখনো কিছু কিছু গ্রাম আছে ডাল সড়কি নিয়ে কাইজ্জ্যা করতে নেমে পড়ে
যা অত্যন্ত ভয়ংকর ।