নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায় আর বেঁচে থাকলে বদলায়

সৈয়দ কুতুব

নিজের অজ্ঞতা নিজের কাছে যতই ধরা পড়ছে প্রচলিত বিশ্বাসের প্রতি ততই অবিশ্বাস জন্মাছে!

সৈয়দ কুতুব › বিস্তারিত পোস্টঃ

শহীদ আলেমকে ভুলে গেলাম, আর যুদ্ধাপরাধীকে দিলাম স্বাধীনতা পদক

১৮ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৯


উনিশশো ছেষট্টি সালের কোনো এক সকালে ঢাকার বিমানবন্দরে এসে নামলেন এক ব্যক্তি। নাম আবুল আলা মওদুদী। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান সদ্যই ঘোষণা করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক ছয় দফা। মওদুদী সাংবাদিকদের সামনে স্পষ্ট ভাষায় বললেন, তিনি এর ঘোর বিরোধী। তাঁর দাবি, এই ছয় দফা মেনে নিলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

মওদুদীর এই বক্তব্য কেবল বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকল না। রাষ্ট্রযন্ত্রের ইন্ধনে তা বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ল পূর্ব পাকিস্তানের মসজিদে মসজিদে, মাদ্রাসার আঙিনায় আর জুমার খুতবায়। সাধারণ, ধর্মপ্রাণ মানুষের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হতে লাগল, ছয় দফা আসলে ইসলামের বিরুদ্ধে এক সুগভীর ষড়যন্ত্র, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত। বাঙালি যখন নিজের অধিকারের দাবিতে ফুঁসে উঠছে, ঠিক তখনই ধর্মের এই জুজু সাধারণ মানুষের মনে একটা তীব্র বিভ্রান্তি আর দোলাচল তৈরি করল। মানুষ ভাবতে শুরু করল, তবে কি সত্যিই বাঙালির স্বাধিকারের লড়াই ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়িয়েছে?

এই চরম বিভ্রান্তি আর অন্ধকারের বুক চিরে তখন উঠে দাঁড়ালেন একজন মানুষ। তাঁর নাম মওলানা অলিউর রহমান। সিলেটের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি নিজের মেধা আর পরিশ্রমে আলিম, ফাজিল ও দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি মাদ্রাসায় পড়াতেন, কোরআনের তাফসির লিখে সাধারণ মানুষের কাছে একজন সজ্জন আলেম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। মওদুদীর রাজনৈতিক চাল যখন বাংলার মানুষকে বিভ্রান্ত করছিল, মওলানা অলিউর রহমান তখন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি তুলে নিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, কলম।

তিনি লিখলেন এক পুস্তিকা, ‘শরীয়তের দৃষ্টিতে` ছয় দফা। কোরআন ও হাদিসের দলিল দিয়ে প্রমাণ করলেন, ছয় দফা কোনোভাবেই ইসলামের বিরোধী নয়, বরং এটি একটি শোষিত জাতির বেঁচে থাকার ন্যায্য দাবি। এখানেই ক্ষান্ত হননি তিনি, মওদুদীকে সরাসরি চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন বাঙালির এই ন্যায্য লড়াইয়ের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে। এরপর তিনি গঠন করলেন আওয়ামী উলামা পার্টি। পায়ে হেঁটে, গ্রামে গ্রামে গিয়ে তিনি সাধারণ আলেম ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে বোঝাতে শুরু করলেন, বাঙালির এই স্বাধিকার আন্দোলন কেন পুরোপুরি শরিয়তসম্মত।

কিন্তু এই সত্য উচ্চারণের চড়া মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছিল নিজের জীবন দিয়ে। উনিশশো একাত্তরের ডিসেম্বর। বিজয়ের আলো যখন বাংলার আকাশে উঁকি দিচ্ছে, ঠিক তখন আলবদর বাহিনীর একটা জল্লাদ দল তুলে নিয়ে গেল মওলানা অলিউর রহমানকে। রাতের পর রাত তাঁর ওপর চলল মধ্যযুগীয় বর্বর নির্যাতন। উপড়ে ফেলা হলো তাঁর দুটো চোখ, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিশত করা হলো শরীর। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে, চৌদ্দই ডিসেম্বর, তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আজ পর্যন্ত তাঁর মরদেহের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

স্বাধীনতার পর মুজিবুর রহমান এই বীর আলেমকে ভোলেননি। সেনাপ্রধানকে নিজের হাতে চিঠি লিখে নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর পরিবারকে পুনর্বাসন ও সাহায্য করতে। দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকাতেও স্থান পেয়েছিল মওলানা অলিউর রহমানের নাম। কিন্তু এরপরই যেন এক অদৃশ্য জাদুবলে সময় থমকে গেল। দীর্ঘ পঞ্চাশটা বছর পার হয়ে গেছে। দেশ আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করেছে, অথচ এই বীরের পরিবার আজও অপেক্ষা করছে একটা স্বাধীনতা পদকের জন্য। তাঁর ছেলে আজও রাষ্ট্রের দরবারে চিঠি লেখেন, আর আশা করেন, হয়তো কোনো একদিন রাষ্ট্র তাঁর বাবার এই ঋণ স্বীকার করবে ।

তবে মুক্তিযুদ্ধে মওলানা অলিউর রহমানের ঠিক বিপরীত একটা চরিত্রও ছিল। আর সেই চরিত্রটি এতটাই কুৎসিত যে, তা পুরো জাতির বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

একাত্তরে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠিতে বাস করতেন ছারছীনার তৎকালীন পীর আবু মোহাম্মদ সালেহ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই তিনি পাকিস্তানের প্রতি তাঁর অন্ধ আনুগত্য প্রকাশ করলেন। তাঁকে বানানো হলো স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। পীরের সেই ছারছীনা মাদ্রাসাই হয়ে উঠল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু হলো রাজাকার আর আলবদরদের। শুধু তা-ই নয়, ঢাকার লালকুঠিতে বসে যখন সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোকে রাজাকার ক্যাম্পে রূপান্তর করার নীল নকশা তৈরি হচ্ছিল, সেই কুখ্যাত বৈঠকের অন্যতম প্রধান কুশীলব ছিলেন এই পীর।

পীরের নির্দেশ আর ফতোয়া পেয়ে স্থানীয় রাজাকাররা ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রায় তিরিশটা গ্রামের ওপর। নির্বিচারে মানুষ হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ আর লুটতরাজ চালানো হলো। আর সেই লুণ্ঠিত সম্পদ গনিমত বা যুদ্ধের মাল হিসেবে জমা হতে লাগল পীরের নিজস্ব কোষাগারে। পীর একটা ভয়ানক ফতোয়া জারি করলেন, বাঙালি হিন্দু নারীরা নাকি গনিমতের মাল, তাই তাদের ভোগ করা জায়েজ। এই ফতোয়ার পর ওই পুরো অঞ্চলে শুরু হলো এক নারকীয় ধর্ষণের উৎসব।

পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিজের বাবাকে হারিয়ে, ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে একটু আশ্রয়ের খোঁজে ছারছীনা দরবারে হাজির হয়েছিলেন তরুণ হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু এই পীর তাঁদের ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অথচ সেই দরবারেই পাকিস্তানি সেনারা যখন আসত, তাদের জন্য প্রস্তুত থাকত রাজকীয় আতিথ্য আর ভোজের আয়োজন।

একাত্তরের নভেম্বর মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ছারছীনার এই কুখ্যাত ঘাঁটি আক্রমণ করেন। কয়েক দিনের তুমুল যুদ্ধে দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পীরের নির্দেশে রাজাকাররা সেই দুই শহীদের লাশ গুম করে ফেলে, যার খোঁজ আজও মেলেনি। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে, পাঁচ শতাধিক সশস্ত্র রাজাকার সঙ্গীসহ পীর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গণহত্যার অন্যতম প্রধান খলনায়ক হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, পত্রিকার পাতায় ছবি ছাপা হয়, গণহত্যার নায়ক ধরা পড়েছেন। কিন্তু পীর সাহেবের ইতিহাস এখানেই শেষ হয়নি।

শেখ মুজিব খুন হওয়ার পর ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলো। দালাল আইন বাতিল হলো, সাধারণ ক্ষমার আড়ালে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে এলেন ছারছীনার পীর। আর তারপর ঘটল নির্লজ্জ ও অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা । উনিশশো আশি সালে, এই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী পেলেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা, স্বাধীনতা পদক। উসিলা দেখানো হলো, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান। এখানেই শেষ নয়, এর পাঁচ বছর পর তিনি আবারও একই পদকে ভূষিত হন।

দশক পেরিয়ে গেল। ইতিহাসকে মুছে ফেলার খেলা চলল সমানে। ২০১৭ সালে ছারছীনা দরবারের বর্তমান পীর এক ধর্মীয় মাহফিলে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে দাবি করে বসলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নাকি তাঁদের মাদ্রাসায় মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেওয়া হতো এবং তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান নাকি পীর সাহেকে হজে পাঠিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে ।

এরকম বয়ান শোনামাত্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। বরিশাল জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যে কমান্ডার নিজে একাত্তরে ছারছীনা ঘাঁটি আক্রমণের সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি তীব্র ধিক্কার জানিয়ে বললেন, সব মনে আছে আমাদের। কীভাবে পীরের নির্দেশে আমাদের দুই সহযোদ্ধাকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল, তা আমরা ভুলিনি। তিনি প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন, পীর যদি সত্যিই স্বাধীনতাকামী হন, তবে আমাদের সেই দুই শহীদের কবর কোথায়, তা দেখান। আজ পর্যন্ত ছারছীনা দরবার থেকে সেই চ্যালেঞ্জের কোনো জবাব আসেনি।

দুই হুজুরের জীবনী যখন পাশাপাশি রাখবেন, তখন মনের মাঝে হাজারো রকম প্রশ্ন উদয় হবে। যে মানুষটি নিজের জীবন, পরিবার আর ভবিষ্যৎ বাজি রেখে ধর্মের অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন, দেশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়লেন, রাষ্ট্র তাঁকে ছুড়ে ফেলল বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। আর যাঁর হাত একাত্তরের গণহত্যা, ফতোয়া আর মা-বোনের রক্তে রাঙানো, তাঁকে রাষ্ট্র দু-দুবার বরণ করে নিল সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে।

আজ মওলানা অলিউর রহমানের ছেলে যখন এক টুকরো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য রাষ্ট্রপতির দপ্তরে চিঠি লেখেন, তখন আসলে তিনি কোনো অনুগ্রহ ভিক্ষা করেন না, বরং রাষ্ট্রকে তার নিজের ক্ষতের দিকে আঙুল তুলে লজ্জিত করেন। অন্যদিকে, ছারছীনার পীরের সেই রক্তাক্ত স্বাধীনতা পদক আজও প্রত্যাহার না হওয়া প্রমাণ করে, আমাদের রাষ্ট্র কতটা আদর্শচ্যুত।


ছারছীনা পীরের স্বাধীনতা পদক বহালই রয়েছে-সমকাল

শহীদ বুদ্ধিজীবী মাওলানা অলিউর রহমান: ৬ দফার পক্ষে গড়ে তোলেন জনসমর্থন- ডেইলি স্টার

ছারছিনার পীর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মিথ্যাচার করছেন-প্রথম আলো

পীর আবু জাফর সালেহ : দু'বার স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন তিনি" - লেখক শওকত মিলটন, সংগ্রামের নোটবুক থেকে।

1966.02.17 | শেখ মুজিবের ৬-দফার ঘোর বিরোধী | দৈনিক ইত্তেফাক





মন্তব্য ৮ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (৮) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৫

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: তাঁর নাম মওলানা অলিউর রহমান।
...................................................................
উনার জীবনি নিয়ে আরও আলোচনা হউক এবং প্রকৃত
ঘটনা নূতন প্রজন্ম জানুক , সে ব্যবস্হা করা উচিৎ ।

১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫৬

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: নতুন প্রজন্ম সবই জানতে পারবে ধীরে ধীরে।

২| ১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৮

কলাবাগান১ বলেছেন: ঝিনাইদহে রাস্তা প্রশস্ত্ করার নামে বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুল রহমানের সৌধ ভাঙ্গছে প্রশাসন

১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫৬

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: নতুন করে তৈরি করা হবে ।

৩| ১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৯

কলাবাগান১ বলেছেন:

১৮ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫৭

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আগের টা পুরোপুরি ভাবে করা হয় নি । সমকালে এসেছে ।

৪| ১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:১৯

কলাবাগান১ বলেছেন: পুরাপুরি ভাবে করতে টেন্ডার আহ্ববান করা হবে ১ বছর লাগিয়ে, কিন্ত আমলাতান্তিক জঠিলতায় ওয়ার্ক অর্ডার জামাতি আমলে আর হবে না...।

সাভারের সৃস্তিসৌধ পরিবেশ কে নস্ট করছে, পুরাপুরি ভাবে করার জন্য ভাংগা হোক।

১৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:২৯

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: না হলে কি করার আছে ? বাঙালি মুসলিমরা এমনিতেই ভাস্কর্য পছন্দ করে না । তাদের পছন্দ মসজিদ নির্মাণ ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.