| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মনিরা সুলতানা
সামু র বয় বৃদ্ধার ব্লগ

ঢাকা থেকে রাজশাহী শহর যাচ্ছেন, আপনার হাতে দুই ঘণ্টা সময় আছে আপনি কী করবেন? রাজশাহী সিল্ক শপিং নাকি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এ ডুব দেবেন ? একজন ভ্রমণ পিপাসু হিসেবে আমি আজ বেছে নিলাম রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি ভ্রমণ। কিভাবে কোথায় যাবেন সেসব অনলাইনে পেয়ে যাবেন আমি শুধু আমার সাথে আপনাদের নিয়ে ঘুরে আসব উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই দৃষ্টিনন্দন রাজবাড়ি। স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব এক নিদর্শন এই পুঠিয়া রাজবাড়ি যার নকশা ইন্দো ইউরোপীয় স্থ্যাপত্যের আদলে। ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবীর সময়কালে তৈরি এই এই স্থাপত্য চত্বরটি ৪ দশমিক ৩১ একর আয়তনের জমির উপর প্রতিষ্ঠি। এই প্রাসাদপম ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন, উনার শাশুড়ি মহারানি শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে। রাজশাহী থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে পুঠিয়া রাজশাহীর অন্তর্গত প্রাচীন ও সম্ভান্ত এলাকা। পুঠিয়া বাজার থেকে এর দূরত্ব দের কিমি' র মত চলার পথে শুরুতেই শিব মন্দির এর পর দোল মন্দির পার হয়ে দেখা মিলে রাজবাড়ির ।
জমিদার পরেশ নারায়ন এর স্ত্রী মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবী। এই একটা ব্যাপার কিন্তু এই রাজবংশের ব্যপারে প্রনিধান যোগ্য। কেউ রাজার নাম না জানলেও মহারানী ব্যক্তিত্ব দানশীলতা সামাজিক কাজের মাধ্যমে ইতিহাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রজাবৎসল দানশীলতায় শুধু পুঠিয়া নয় সমগ্র রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের মনে রয়ে গেছেন মহারানী। অনেকক্ষণ থেকেই আমার মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিলো বলা হচ্ছে জমিদার, কিন্তু বাড়ির নাম রাজবাড়ি এবং জমিদার পত্নীর নাম মহারানী ? কেন ? সেই প্রশ্নের উত্তর পেলাম উইকি ঘেঁটে, যদিও এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা জমিদার পীতাম্বর, পরবর্তীতে পীতাম্বরের উত্তরপুরুষ নীলাম্বর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে রাজা উপাধি লাভ করার পর থেকেই এই রাজবংশ এবং বাড়ি রাজবাড়ি নামে প্রসিদ্ধ হয়। সপ্তদশ শতকে মুঘল আমলে বিভিন্ন রাজবাড়ি র মাঝে পুঠিয়া রাজবাড়ি ছিলো প্রাতীনতম ।
পুঠিয়া রাজবাড়ি যা পাচঁআনি জমিদার বাড়ি নামেও পরিচিত, সেটা মহারানী হেমন্ত কুমারী দেবীর বাস ভবন। তবে আমি যেখান থেকে ভ্রমণ শুরু করেছি, সেটা মূলত জমিদারদের প্রশাসনিক ভবন। সিংহ দরোজার ঢুকতেই রথ যাত্রার রথ সাজানো দেখতে রেলাম। পাশেই দোতালায় যাবার সিড়ি, ৩০টাকা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবার পর সেখান থেকেই আমি একজন গাইড পেয়ে গেলাম। প্রাসাদের নীচ তলার রয়েছে ১২টি কক্ষ, সামনের অংশ এবং পিছনের পুরো ভবন মিলিয়ে দ্বিতীয় তলায় ১৫টি যা এখন প্রায় পুরোটাই জাদুঘর হিসেবে প্রদর্শনীর জন্য খোলা। সিড়ি বেয়ে উঠতেই লম্বা টানা ব্যালকনির নকশা দেখে মন ভালো হয়ে গেলো, সফেদ ভবনের সিড়ি কোঠা, রেলিং নকশা সবকিছুতেই মুগ্ধ। উপর তলায় কারুকাজ করা জোড়া থাম আর দুপাশেই সেই ইউরোপিয়ান ধাঁচের ঝুলবারান্দা।

আজকাল মনে হচ্ছে সংস্কার করা হয়েছে, সে জন্য আরও ভালো লাগছিল। জাদুঘরে রাজবাড়ির নিজস্ব সম্পদের মাঝে বেশকিছু সিন্দুক দেখতে পেলাম,
ব্যবহার করা ছোটখাট জিনিস বাকি টা সাজানো হয়েছে মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের প্রাপ্ত কালো পাঁথরের মূর্তি নিয়ে।
এই ভবনের সামনের স্তম্ভ অলংকরন, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে। রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালির ব্যবহার এর মোহনিয়তা বাড়িয়েছে।
এই প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিশাল এক মাঠ,মাঠের ওপাশে চোখের প্রশান্তি হয়ে দেখা দেয় শিব ও দোল মন্দির।

নীচের তলার কক্ষ গুলোর ব্যবহার অনুযায়ী এর যে অবস্থান বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো আমার কাছে- যেহেতু রাজবাড়ি লিখিত ইতিহাসে দেখা যায় হেমন্তকুমারি দেবী উনার শাশুড়ি মহারানী শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে নির্মাণ করেছিলেন এর ভবন, সেই ভবনে জলসা ঘরের মাহাত্ম্য টা বুঝতে পারলাম না। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রবেশ মুখের ডানপাশে নাচ ঘর এবং বামের পুরোটা জুড়ে টর্চার সেল, সেখানে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরানো কারাগার অন্ধকূপ, বিশাল পানির চৌবাচ্চা যেখানে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হত এবং সর্বশেষে ফাঁসি মঞ্চ।
এরপর এগিয়ে গেলে বর্তমানে বাগান রয়েছে এবং বাগান ধরে এগিয়ে গেলে বসত ভিটার দেখা পাওয়া গেলো। রাজবাড়ির নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আশেপাশে অনেকগুলো দিঘী বা জলাশয় কাটা হয়েছিলো যেগুলো শিব সরোবর, গোপালচৌকি ও গোবিন্দ সরোবর এমন চমৎকার নামে নামকরণ করা হয়। একদম মাঝে আছে শ্যাম সাগর নামে বিশাল দিঘী। বসত ভিটার প্রাসাদ এর চারপাশে বেশ কয়েকটা দৃষ্টি নন্দন মন্দিরে ঘুরলাম। এদের মধ্যে অন্যতম দোচালা পদ্ধতিতে নির্মিত বড় আহ্নিক মন্দির, যেটা পশ্চিম দিকে কুঁড়েঘর আকৃতির। এই মন্দির আবহমান বাংলার ঐতিহ্যে নকশায় তৈরি, এবং একদম বসত ভিটা ছুঁয়ে, মনে হল রাজবাড়ির অন্দর মহলের রমণীদের এখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো। বসত ভিটা থেকে লম্বা মেঠোপথের মত করে একটা পথ গিয়ে থেমেছে রানির স্নানের ঘাট, চারপাশে চমৎকার করে দেয়াল তুলে এটাকে ব্যক্তিগত সুইমিং পুলের আদলে বানানো হয়েছে।
শোনা যায় - যেহেতু মহারানী হেমন্ত কুমারী গোবিন্দ ভক্ত ছিলেন রাধার মত উনিও অস্ট সখী নিয়ে চলতেন, স্নানে যেতেন সখিদের নিয়ে। আহ্নিক মন্দিরে স্নান শেষে সরাসরি যেতেন। রাধারানীর ডাকে শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন, অস্টসখী নিয়ে রাধারানী কৃষ্ণ কে মোহিত করতে নৃত্য করেছিলেন। সেই দৃশ্যকে পোড়া মটির ফলকে তুলে এনে সাজিয়েছেন আহ্নিক মন্দিরের দেয়ালে। রাজপরিবারের অন্দর মহল থেকে রাধা গোবিন্দ মন্দিরে আসবার একটা ছোট্ট পথ রয়েছে সেখানে রয়েছে বিশাল এক তুলসী মঞ্চ।
ঐ দরজা দিয়ে মহারানী হেমন্ত কুমারী প্রতিদিন এসে সান্ধ্য প্রদীপ জ্বালাতেন। এর পাশের লক্ষ্মী মন্দির ও এবং সেবায়িতদের থাকবার ভবনগুলো প্রায় বিলিন অবস্থায় আছে। 
পাঁচ আনী জমিদার বাড়ির ভেতরে রয়েছে ৪০০ বছরের পুরানো গোবিন্দ মন্দির রাধাকৃষ্ণ বা রাধা গোবিন্দ মন্দির যে কৃষ্ণ সেই নাকি গোবিন্দ। এই মন্দিরে পোড়া মাটির অসংখ্য কাজ যা কি-না কান্তজীর মন্দিরের সদৃশ্য রয়েছে।
এই পোড়া মটির ফলক বা ইটের মাধ্যমে পৌরানিক সব গল্পগাথা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীরা। দেয়ালে দেয়ালে রয়ে গেছে চিত্রের মাঝে রামায়ন মহাভারত কাহিনী মুঘল আমলের নিদর্শন যা, এসব ফলক বানারসের শল্পী ও কারিগর দিয়ে নির্মিত। বসত ভিটার চারপাশে প্রচুর গাছগাছালি সহ ফুলের বাগান, অন্দর মহল মিলিয়ে বিশাল এই রাজবাড়ী প্রাঙ্গণ।
এই রাজবাড়িতে ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত বড় শিব মন্দির বা ভূবনেশ্বর মন্দির।শিব মন্দির বিশাল শিবলিঙ্গ রয়েছে কষ্টিপাথরে নির্মিত বলা হয় উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় সেটি, তবে সেটার কোন ঐতিহাসিক দলিল নেই। ভূমি থেকে বেশ উচুতে নির্মান করা হয়। টানাবারান্দা ঘেরা রয়েছে এর চারিপাশে মাঝে গর্ভগৃহ। এটাকে পঞ্চরত্ন মন্দির ও বলা হয় চারদিকে চারটি ছোট চূরা মাঝে পাচঁ নাম্বারটি বৃহৎ চূরা নিয়ে গঠিত বলে। সেখান থেকেই দেখা যাবে রথ মন্দির যা এক গম্ভূজ বিশিস্ট, যা আমরা দূর থেকে রাজবাড়ি প্রবেশের সময় শুরুতেই দেখেছি। পাশের দোল মন্দির অবশ্য চারতলা।
মোটামুটি ছয় একর করে ছয়টি দিঘী ও ছযটি মন্দির নিয়ে এই পাঁচআনি জমিদার বাড়ি। এটি ছাড়াও, আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে- একআনি, তিন আনি ও সাড়ে তিন আনির দুই তরফের বসত ভিটা ও চার আনির ভবন এসবের অধিকাংশই যদিও ভগ্নপ্রায়।
তবে এই রাজবাড়ি থেকে ১৫/বিশ মিনিটের পথ পেরুলেই পাবেন হাওয়া খানা। আপনারা যারা রাজস্থানের জলমহাল দেখেছেন তারা জানেন সেটা ছিলো অবকাশ যাপনের কেন্দ্র তেমনি চারআনি জমিদার তৈরি করেছিলেন অবকাশ যাপনের জন্য হাওয়াখানা।
সেখানে অবসরে হাতি রথ নিয়ে বেড়াতে আসতেন এই রাজবাড়ির সদস্যরা। চতুর্দিকের জলাশয় বেষ্টিত চমৎকার এই হাওয়াখানা নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ অবসর যাপন কেন্দ্র বলা যায়।এর প্রথমতলা পানির নীচে, চারপাশে জলাশয় থাকায় সেখানে নৌকা ভ্রমণ ও আনন্দদায়ক ছিলো বুঝা যায়।

মন্দিরের সেবায়ত এর কাছে গল্প শুনলাম, প্রজাবৎসল উদার মহারানী হেমন্ত কুমারী উনার ব্যক্তিত্ব কর্মগুণ ও দানশীলতার জন্য ইতিহাসে আজও ভাস্বর হয়ে আছেন। রাজশাহীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেও উঠে আসে তার নাম, রাজশাহীতে ঢোপকল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পানিজনিত কলেরা মহামারির হাত থেকে এখানকার মানুষকে পরিত্রাণ দিতে তার অবদান আজও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করা হয়।
প্রায় একঘণ্টা ব্যাপি আমার এই ভ্রমণে রাজশাহীর এই শরত সময়ের উজ্জ্বল মেঘমুক্ত নীল আকাশ আর চকচকে রোদ আপনাদের মত সারাক্ষণ আমার সাথে ছিলো। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে। ও হ্যাঁ ফেরার সময় আপনার ভ্রমণ গাইড কে তার প্রাপ্য মজুরী এবং মন্দিরের দানবাক্সে দান করতে ভুলবেন না যেন।
নোটঃ প্রথম ছবিটা উইকি থেকে নেয়া, বাকি সব আমার ক্যামেরার। বেশির ভাগ ভিডিও ধারণ করেছি বিধায় দারুণ সব ছবি দিতে পারলাম না। এই ভ্রমণের সময় কাল গোঁট বছরের সেপ্টেম্বার মাস, এরপর দিন সময় মাস কিভাবে কেটেছে বলতে পারবো না। একটু ফ্রি হবার পর পোষ্ট দেবার আগ্রহ, ব্লগারদের পোষ্ট পড়ার ও মিথস্ক্রিয়ার আগ্রহ আমাকে আবার ব্লগে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে।
আশা করছি সকল ব্লগার ভালো আছেন!
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৩
মনিরা সুলতানা বলেছেন: যখন সবাই মিষ্টি খাবার জন্য রেডি থাকবে ![]()
আশা করছি ভালো আছেন।
২|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৭
মরুভূমির জলদস্যু বলেছেন:
- বেশ কয়েক মাস আগে গিয়েছিলাম বিবি-বাচ্চাদের নিয়ে সারাদিনের ট্রিপে ঘুরে দেখে এসেছি এইসব।
- চমৎকার পোস্ট হয়েছে। পোস্টে + রইলো।
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬
মনিরা সুলতানা বলেছেন: ধন্যবাদ দস্যু ভাই !
হ্যাঁ আপনার এই অভ্যাসটা দারুণ পরিবার সহ ঘুরতে যাওয়া। নিশ্চয়ই আপনার পরিবারের সবাই সহযোগিতা ও করেন আপনার সাথে থেকে।
অনেক ধন্যবাদ !
৩|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০২
মিরোরডডল বলেছেন:
কেমন আছো মণিপু?
বাংলাদেশে আমি যতগুলো পুরনো জমিদার বাড়ি ভিজিট করেছি, আমার অভিজ্ঞতা বলে এগুলো প্রপারলি মেইনটেইন্ড না,
স্মেলি আর ময়লা। এটার কি অবস্থা?
ফাঁসির মঞ্চের ছবি দাওনি আপু।
ছাদে যাওনি? এরকম পুরনো বাড়ির ছাদগুলো ভালো লাগে।
কিছু ভিডিও ক্লিপ দিতে।
অনেকদিন পর তোমাকে দেখে ভালো লাগলো মণিপু।
৪|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:৩০
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
প্রায় বছরখানেক পরে নতুন পোস্ট নিয়ে আসলেন । নতুন কোন পোস্ট দিয়েছেন কিনা জানার জন্য কতবার যে
আপনার ব্লগ বাড়িতে ডু মেরেছি তার কোন ইয়ত্তা নেই । মনে করেছিলাম মনিরাপু একেবারেই আমাদের কাছ
হতে হারিয়ে গেল কিনা । যাহোক আশ্বস্থ হলাম সাথে আনন্দিতও। আশা করি এখন থেকে আপনাকে নিয়মিত
দেখতে পাব ।
এবার আসি পোস্টের কথায় । ছবি গুলি খুব সুন্দর হয়েছে সাথে বিবরণগুলিও । অনেক নতুন অজানা তথ্য
উঠে এসেছে পোস্টটিতে ।
এই সামু ব্লগে অনেকেই তাঁদের চোখ দিয়ে দেখা দেশের অনেক পুরাতন রাজবাড়ী/জমিদার বাড়ীর ছবি দিয়ে
পোস্ট দিয়ে থাকেন ,দেখে ভাল লাগে । সেখানে শুধু ভাল লাগার কথাগুলিই বলে যাই আমি সহ অনেকেই ।
এবার আপনাকে পেয়ে আরো কিছু অনুভবের কথা বলে যাওয়ার জন্য আপনার পোস্টটিকেই উপযুক্ত বলে
ভেবেছি । আমার নীজের যৎসামান্য জানা অভিজ্ঞতা সাথে আপনার বিবরণীগুলিই আমার এই বিশ্লেষনী
মন্তব্যের প্রেক্ষাপট।
প্রথমেই আসি আপনার পোস্টের কথায় । শিরোনামটি সুন্দর দিয়েছেন । জেনএক্স ক্রনিকেলস এমন এক বর্ণনা
বা ধারাবিবরণীকে বুঝিয়েছেন যেখানে Generation X-এর মানুষদের জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্নভঙ্গ, সামাজিক পরিবর্তন
এবং সময়ের রূপান্তরের গল্প তুলে ধরেছেন। এটি সাধারণত Generation X মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মের
অভিজ্ঞতা যারা এনালগ পৃথিবী থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের মধ্যবর্তী সেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের বাস্তবতা,
হতাশা, স্বাধীনচেতা মনোভাব ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে।
সম্ভবত এ প্রেক্ষিতেই পতন হয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদের সাথে এর মিল রেখে “জেনএক্স ক্রনিকেলস”-কে একটি
ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের সাথে এ পোস্টে থাকা আপনার বলা কথাগুলির মিল পাওয়া যায় ।অতীতের গৌরব
বনাম বর্তমানের নীরবতা, যেমন একসময় রাজপ্রাসাদ ছিল ক্ষমতা ও জৌলুসের প্রতীক, তেমনি Gen X ছিল
পরিবর্তনের আশায় ভরপুর এক প্রজন্ম। কিন্তু সময়ের সাথে সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান হয়েছে।
দেয়ালে লেগে থাকা স্মৃতি, ভাঙা প্রাসাদের দেয়ালে ইতিহাসের চিহ্ন থাকে; ঠিক তেমনই এই প্রজন্মের জীবনে
পুরোনো মূল্যবোধ, গান, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার ছাপ রয়ে গেছে। পরিবর্তনের সাক্ষী রাজপ্রাসাদ রাজত্বের
উত্থান-পতন দেখেছে; Gen X দেখেছে মুক্তি যুদ্ধ, দেখেছে গণভবনের পতন,অর্থনৈতিক বদল,এক যুগান্তরের
রূপান্তর।সৌন্দর্য ও বিষাদের সহাবস্থান ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদ যেমন একই সাথে সুন্দর ও বিষণ্ণ, তেমনি
জেনএক্স ক্রনিকেলস nostalgia ও বাস্তবতার মিশ্র অনুভূতি বহন করে।সংক্ষেপে সুন্দর করে সচিত্র বুঝিয়ে
দিয়েছেন জেনএক্স ক্রনিকেলস এ সময়ের হাতে ক্ষয়প্রাপ্ত কিন্তু স্মৃতিতে জীবন্ত এক প্রজন্মের গল্প যেমন
পুঠিয়ার মত পতিত রাজপ্রাসাদ, যা ভেঙে গেলেও ইতিহাস হারায় না।
এখন অতীত রাজবাড়ী প্রসঙ্গে আমার ছোট ছোট কিছু অনুভবের কথা সংক্ষেপে বলে যাব এখানে ।
প্রথমেই পুঠিয়া রাজ পরিবারটির কথাই বলি , যেটি ষোড়শ শতাব্দীতে বসবাসকারী ভট্সাচার্য নামে এক
পবিত্র ব্যক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।পুঠিয়া রাজপরিবারের সম্পত্তি ছিল ব্রিটিশ বাংলার দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারি
এবং সবচেয়ে ধনী।
আপনার মত অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি থেকে দেখলে পুঠিয়া রাজবাড়ী তিন স্তরের ইতিহাস বহন করে বলে মনে করি।
রাজনৈতিক ইতিহাস হিসাবে এটা মোগল , জমিদারি, ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ইত্যাদি। এটি একই
স্থানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা ইতিহাস ধারন করে ।স্থাপত্য ইতিহাস হিসাবে এটা দেশীয় ও
পাশ্চাত্য রীতির মিলন সাথে উপনিবেশিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। তৃতীয়ত; ধর্ম-সংস্কৃতি ইতিহাস হিসাবে এটি
রাজবাড়ি + মন্দির + লোকজ শিল্প তথা ততকালীন গ্রামীণ ধর্মীয় সমাজব্যবস্থার একটি সুন্দর কেন্দ্র ছিল
এককালে ।
এই রাজবাড়িটি এ জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে এটি বাংলার অন্যতম সুন্দর জমিদার প্রাসাদ, ইন্দো-ইউরোপীয়
স্থাপত্যের বিরল উদাহরণ, টেরাকোটা শিল্পের ভাণ্ডার, জমিদারি সমাজব্যবস্থার জীবন্ত দলিল, পর্যটন ও
প্রত্নতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাইতো এখনো লক্ষ লক্ষ দেশী বিদেশী পর্যটক সেখানে যায় পর্যবেক্ষনের জন্য ।
পুঠিয়ার রাজবাড়ীকে শুধু একটি প্রাসাদ বা জমিদারের বাসস্থান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থ ধরা যায় না।
ইতিহাস-মনস্ক বা প্রতীকী(symbolic) দৃষ্টিতে দেখলে পুঠিয়া রাজবাড়ী আসলে ক্ষমতা, ধর্ম ও সংস্কৃতির
একত্রিত প্রকাশ, একটি সামাজিক দর্শনের স্থাপত্যরূপ।
ক্ষমতার প্রতীক হিসাবে বলা যায় জমিদারি যুগে ক্ষমতা শুধু প্রশাসনিক ছিল না দেখানোও ছিল ক্ষমতার অংশ।
পুঠিয়া রাজবাড়ীর ছিল বিশাল প্রবেশদ্বার,উঁচু স্তম্ভ,প্রশস্ত প্রাঙ্গণ,কেন্দ্রীয় অবস্থান, এগুলো জনগণকে একটি বার্তা
দিত যেএখানেই শাসনের কেন্দ্র।রাজবাড়ি ছিল কর আদায়ের স্থান,বিচার সভা,প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র অর্থাৎ
স্থাপত্য নিজেই ছিল রাজনৈতিক ভাষা।প্রতীকী অর্থে রাজবাড়ি ছিল রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ যথা Micro-State ।
রাজবাড়ীর প্রাসাদগুলির শ্রেণিবিন্যাস থেকে দেখা রাজবাড়ির অন্দরমহল ও বাহিরমহলের বিভাজন সমাজের
শ্রেণিবিন্যাস বোঝায় যথা বাইরে থাকবে প্রজা ও প্রশাসন আর ভিতরে থাকবে রাজা আর রাজপরিবার,
সর্বভিতরে নারীদের অন্দর যেন স্থাপত্যের মধ্যেই সামাজিক ক্ষমতার স্তর নির্মিত।
ধর্মের প্রতীক হিসাবে পুঠিয়ার বিশেষত্ব হলো রাজবাড়ি একা নয়; তার চারপাশে মন্দিরসমূহ এটি কাকতালীয়
নয় এট ছিল রাজশক্তি ও ধর্মশক্তির ঐক্য।জমিদাররা নিজেদের শুধু প্রশাসক নয়, ধর্মরক্ষক বা ধর্মপালা
হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতেন।রাজবাড়ির পাশে মন্দির নির্মাণের মাধ্যমে বলা হতো শাসন শুধু শক্তির দ্বারা নয়,
ঈশ্বরের অনুমোদনে পরিচালিত।অর্থাৎ রাজা হলেন পার্থিব প্রতিনিধি, মন্দির ও দেবতা হল আধ্যাত্মিক বৈধতা
এর প্রতীকী অর্থ হল ধর্ম রাজশক্তিকে নৈতিক বৈধতা দেয়।
ছবি দৃশ্য আর বাস্তব পর্যবেক্ষনে মনে হয় মহাজাগতিক কেন্দ্রের ধারণার সাথে মিল রেখে প্রাসাদটি যেন নির্মিত।
বিশ্লেষণি মতে দেখা যায় রাজবাড়ি(কেন্দ্র)+মন্দির(পবিত্র অক্ষ) যা প্রতিকী অর্থে একটি Sacred Landscape
তৈরি করে।এটি যেন ভারতীয় পুরাণের -মেরু পর্বত- ধারণার সামাজিক প্রতিফলন যেখানে কেন্দ্র মানেই শৃঙ্খলা।
সংস্কৃতির প্রতীক হিসাবে এটি ছিল শিল্প ও পরিচয়ের কেন্দ্র,পুঠিয়া রাজবাড়িতে হতো সংগীত আসর,পূজা উৎসব,
নাট্য আয়োজন, সাহিত্য চর্চা, জমিদাররা সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফলে রাজবাড়ি হয়ে ওঠেছিল গ্রামীণ
সংস্কৃতির হৃদয়।
টেরাকোটা শিল্পের ভাষায় মন্দিরের দেয়ালে দেখা যায় রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্য,কৃষিজীবন আর লোকসংস্কৃতি
এগুলো শুধু অলংকার নয় সমাজের স্মৃতি সংরক্ষণ। আপনার পোস্টে টেরাকোটার ছবিগুলি দেখে এর প্রতিকি ও
বাহ্যিক অর্থ অনুধাবনে মনে হল দেয়াল যেন ইতিহাসের বই।
পুঠিয়া রাজবাড়িকে প্রতীকীভাবে দেখা যায় ক্ষমতা, ধর্ম ও সংস্কৃতি উতসব ও শিল্প সামাজিক পরিচয়ে। তিনটি
মিলেই তৈরি হয়েছিল সেখানে একটি পূর্ণ সমাজব্যবস্থা।দার্শনিক দৃষ্টিতে পুঠিয়া রাজবাড়ী আসলে একটি প্রশ্ন
তোলে ক্ষমতা কি শুধু রাজনৈতিক? নাকি ধর্ম ও সংস্কৃতি ছাড়া ক্ষমতা অসম্পূর্ণ?জমিদারি সমাজের উত্তর ছিল
ক্ষমতা টিকে থাকে যখন তা বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত হয়।
বাংলার অন্যান্য রাজবাড়ি বনাম পুঠিয়া রাজবাড়ীর প্রতীকী পার্থক্য তুলনার জন্য আমি কয়েকটি ঐতিহাসিক
রাজবাড়িকে আলোচনায় আনতে পারি পারি যথা নাটোর রাজবাড়ী,আহসান মঞ্জিল,দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী(উত্তরা
গণভবন)আর এই পুঠিয়া রাজবাড়ি। উইকিপিডিয়া হতে ধার করে নীচে তাদের চিত্র দেখানো হয়েছে ।
নাটোর রাজবাড়ির ঝবি
আহসান মঞ্জিল এর ছবি
দিঘাবাড়িয়া রাজপ্রাসাদ ( উত্তরা গণভবন) এর ছবি
প্রশাসনিক বনাম আধ্যাত্মিক/ধর্মীয় ক্ষমতার প্রতিক হিসাবে নাটোর রাজবাড়ীটি দেখায় বৃহত জমিদারী প্রশাসনের
কেন্দ্র, আহসান মঞ্জিল দেখায় নগর অভিজাত ও ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক প্রভাব,দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী দেখায়
আধুনিকায়িত রাজীকীয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পক্ষান্তরে পুঠিয়া রাজবাড়ী ছিল ধর্মীয় বৈধতাসহ সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিক।
অন্যান্য রাজবাড়ি ক্ষমতার বাহ্যিক জাঁকজমক দেখায়, কিন্তু পুঠিয়ায় ক্ষমতা মন্দিরসমূহের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে।
সেখানে শাসন ছিল ধর্ম + সমাজ। ধর্মীয় প্রতীকে পুঠিয়ার ছিল অনন্যতা, বাংলার অধিকাংশ রাজবাড়িতে মন্দির ছিল,
কিন্তু পুঠিয়ার মতো সম্পূর্ণ মন্দির-নগরী খুব বিরল।তুলনা করলে দেখায় নাটোরে ছিল রাজকেন্দ্র প্রধান, ধর্ম গৌণ
আহসান মঞ্জিলে ধর্মীয় প্রতীক প্রায় অনুপস্থিত (নগর সংস্কৃতি প্রধান)দিঘাপতিয়াতে ইউরোপীয় প্রাসাদধর্মী আধুনিকতা
পক্ষান্তরে পুঠিয়া রাজবাড়ি+বহু মন্দির তথা Sacred Landscape। পুঠিয়ায় রাজবাড়ি একা নয় এটি একটি ধর্মীয়
মহাবিশ্বের কেন্দ্র।
শহর বনাম গ্রামীণ সভ্যতা নিরিখে দেখা যায় আহসান মঞ্জিলে শহুরে নবাবি সংস্কৃতি, দিঘাপতিয়ায় পাশ্চাত্য
প্রভাবিত অভিজাত জীবন, নাটোরে প্রশাসনিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র, লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র।পুঠিয়ার শিল্পে
দেখা যায় কৃষিজীবন,পুরাণকাহিনি,লোকধর্ম,অন্যদিকে ঢাকার রাজপ্রাসাদগুলো বেশি ইউরোপীয় জীবনধারা
প্রতিফলিত করে।
স্থাপত্যের প্রতীকী ভাষায় অন্যান্য রাজবাড়ি তে ছিল ইউরোপীয় আধিপত্যের অনুকরণ,আধুনিকতার প্রদর্শন,
উপনিবেশিক ক্ষমতার নিকটতা পক্ষান্তরে পুঠিয়া রাজ বাড়ী ইউরোপীয় কাঠামো + দেশীয় ধর্মীয় পরিবেশ,স্থানীয়
পরিচয় রক্ষার প্রচেষ্টা এটিকে তাই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের সূক্ষ্ম রূপও বলা যায়।
স্থানিক প্রতীকে পুঠিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল এই যে আহসান মঞ্জিল নদীমুখী(বাণিজ্য ও বিশ্বসংযোগ),
দিঘাপতিয়া হল একটি পরিকল্পিত রাজকীয় উদ্যান,নাটোর মুলত প্রশাসনিক রাজধানী আর পুঠিয়া একটি
মন্দিরবেষ্টিত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র অর্থাৎ পুঠিয়ার বিন্যাস ধর্মীয় মহাজাগতিক ধারণার মতো।
গভীর ঐতিহাসিক উপলব্ধিতে বলা যায় আহসান মঞ্জিল বলে আমরা আধুনিক ,দিঘাপতিয়া বলে আমরা রাজকীয়,
নাটোর বলে আমরা প্রশাসক, পুঠিয়া বলে আমরা সমাজ ও ধর্মের রক্ষক।এই কারণেই পুঠিয়া রাজবাড়ী বাংলার
ইতিহাসে শুধু স্থাপত্য নয়, একটি সমন্বিত সভ্যতার প্রতীক।
রাজবাড়িগুলির বর্তমান পতন শুধু কিছু প্রাসাদের ধ্বংস বা জমিদারদের ক্ষমতা হারানোর ইতিহাস নয়; এটি
আসলে সমাজ, ক্ষমতা, নৈতিকতা ও সময়ের পরিবর্তনের গভীর শিক্ষা বহন করে। বাংলার রাজবাড়িগুলো
যেমন পুঠিয়া রাজবাড়ী, নাটোর রাজবাড়ী, আহসান মঞ্জিল কিংবা দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী (উত্তরা গণভবন)
তাদের উত্থান ও পতনের মধ্যেই ইতিহাস একটি গভীর মানবিক সত্য প্রকাশ করেছে।
পুঠিয়ার মত রাজপ্রাসাদগুলি বলে ক্ষমতার অস্থায়িত্ব এটাই ইতিহাসের প্রথম শিক্ষা,রাজবাড়িগুলো একসময় ছিল আইন,অর্থনীতি,বিচার,সামাজিক মর্যাদার কেন্দ্র। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই সেই ক্ষমতা বিলীন হয়ে যায়।
আমাদের জন্য শিক্ষা হল কোনো ক্ষমতাই স্থায়ী নয়।
যে প্রাসাদে হাজার মানুষ মাথা নত করত, আজ সেখানে বিদ্যালয়, যাদুঘর , সরকারি অফিস,অথবা নিঃশব্দ
ধ্বংসাবশেষ।ইতিহাস যেন বলছে ক্ষমতা সময়ের কাছে ধার করা একটি অবস্থান মাত্র।
সামাজিক ন্যায়বোধের পরিবর্তনটাও ঘটেছে এদের পতনের সাথে ,জমিদারি ব্যবস্থা টিকে ছিল একটি শ্রেণিভিত্তিক
সমাজে অল্পসংখ্যক শাসক সাথে , বিপুল প্রজা, সময়ের সাথে মানুষের ন্যায়বোধ বদলেছে।১৯৫০ সালে জমিদারি
প্রথা বিলুপ্ত হয় কারণ সমাজ নতুন প্রশ্ন তোলে ক্ষমতা কি জন্মসূত্রে হবে?নাকি জনগণের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ? শিক্ষাটা
হল সমাজ যখন ন্যায়বোধ বদলায়, তখন প্রতিষ্ঠানও বদলায়।জমিদার প্রথা উচ্ছেদে বাংলার প্রায় ভুলে যাওয়া
এক মহান জননেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ভুমিকা ছিল মনে রাখার মত । এই সুযোগে এই দেশ
বরেন্য মহান নেতার প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলী ।
রাজবাড়ীগুলিতে ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে আভিজাত্য প্রদর্শনী,রাজবাড়ির জীবন ছিল আভিজাত্যপূর্ণ,
বিশাল কর্মচারী বাহিনী.উৎসব ও জাঁকজমক,স্থাপত্য রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল ব্যয় তাই জমিদারি আয় বন্ধ হওয়ার
পর এই কাঠামো টিকে থাকতে পারেনি।আমাদের কাছে শিক্ষাটা হল অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য
দীর্ঘস্থায়ী হয় না।অর্থনীতি বদলালে ক্ষমতার রূপও বদলায়।
রাজবাড়িগুলির পতন ছিল কেন্দ্র থেকে জনগণের দিকে ক্ষমতার স্থানান্তর,রাজবাড়ি ছিল কেন্দ্রীয় ক্ষমতা”র প্রতীক।
পতনের পর প্রশাসন রাষ্ট্রের হাতে যায়,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে,জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ে। আমাদের জন্য শিক্ষা
ইতিহাসের প্রবণতা হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।রাজা থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র হতে জনগণ।
ধর্আমীয় /ধ্যাত্মিক শিক্ষাটা হল অহংকারের সীমা থাকা প্রয়োজন,প্রায় সব রাজবাড়ির একটি সাধারণ দৃশ্য;ভাঙা
বারান্দা,নীরব অন্দরমহল,শূন্য সিংহাসন ,এগুলো যেন মানবসভ্যতার একটি নীরব উপদেশ।মানুষের নির্মাণ
মহান হতে পারে, কিন্তু সময় তার চেয়েও মহান।অনেক দার্শনিক ইতিহাসবিদ বলেন, রাজবাড়িগুলো হলো
Stone Lessons পাথরের মধ্যে লেখা শিক্ষা।
তবে রাজবাড়ির পতন মানে সংস্কৃতির রূপান্তর বা বিলুপ্তি নয়,রাজবাড়ি হারিয়েছে ক্ষমতা, কিন্তু উৎসব রয়ে গেছে,
শিল্প রয়ে গেছে,লোকস্মৃতি রয়ে গেছে অর্থাৎ সভ্যতা ধ্বংস হয় না রূপ বদলায়। মোট কথা প্রতিষ্ঠান মরে, সংস্কৃতি
বেঁচে থাকে।
রাজবাড়ির পতনের ইতিহাস আমাদেরকে ৫টি বড় শিক্ষা দেয় , ক্ষমতা অস্থায়ী সময় সবকিছুকে বদলায়,
পরিবর্তনশীল সমাজ নতুন মুল্যবোধ তৈরী করে , অর্থ সম্পদ ছাড়া ক্ষমতা টিকেনা, ক্ষমতার গনতন্ত্রীকরণ
জনগন ইতিহাসের চূড়ান্ত শক্তি, অহংকার স্থায়ী নয় সময়ে হয় পরিবর্তন।
রাজবাড়িগুলো আজ যেন ইতিহাসের ভাষায় আমাদের প্রশ্ন করে তোমরা কি ক্ষমতাকে স্থায়ী ভাবছ,নাকি
এটিকে দায়িত্ব হিসেবে দেখছ? এই প্রশ্নই রাজবাড়ি দেখার প্রকৃত ঐতিহাসিক শিক্ষা।
রাজবাড়ি ও সভ্যতার উত্থান-পতন এই বিষয়টি কেবল ইতিহাস নয়; কুরআনের দৃষ্টিতে এটি মানবসভ্যতার
একটি পুনরাবৃত্ত নৈতিক শিক্ষা। এই উপলব্দিতে রয়েছে তিনটি স্তর যথা কুরআনের শিক্ষা, ইতিহাসের বাস্তব
উদাহরণ আর মানবসমাজের চিরন্তন নিয়ম।কুরআনে বারবার বলা হয়েছে সভ্যতার ধ্বংস আকস্মিক নয়,
এটি নৈতিক ও সামাজিক কারণের ফল।
কুরআন একটি ধারাবাহিক নিয়ম (সুন্নাতুল্লাহ) তুলে ধরে বলে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করলে সভ্যতা উন্নত হয়,
আর অন্যায় ও অহংকার বাড়লে পতন ঘটে। কুরআনে উল্লেখিত বহু জাতি এই শিক্ষার উদাহরণ যথা আদ
জাতি,সামুদ জাতি,ফিরআউনের মিসর। তারা শক্তিশালী ছিল, স্থাপত্যে উন্নত ছিল, কিন্তু নৈতিক অবক্ষয়ের
কারণে বিলুপ্ত হয়।কুরআনের কেন্দ্রীয় বার্তা হল শক্তি নয় ন্যায়ই সভ্যতার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।
ক্ষুদ্র সভ্যতার প্রতিরূপ, একটি রাজবাড়িকে ছোট একটি সভ্যতার প্রতিক হিসেবে দেখা যায়।রাজবাড়ির মধ্যে ছিল শাসনব্যবস্থা,অর্থনীতি,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,সংস্কৃতি ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস যেমন পুঠিয়া রাজবাড়ী বা নাটোর রাজবাড়ী
এগুলো শুধু বাড়ি নয়, একটি সামাজিক বিশ্ব।তাদের উত্থান ছিল ভূমি ও সম্পদে, ধর্মীয় বৈধতা, সাংস্কৃতিক
পৃষ্ঠপোষকতায় আর পতন আসে অর্থনৈতিক পরিবর্তনে, সামাজিক ন্যায়বোধের পরিবর্তনে, জনগণের ক্ষমতায়নে ,
এগুলি কুরআনে বর্ণিত ঐতিহাসিক ধাঁচের সাথে আশ্চর্য মিল দেখায়,এটি শুধু বাংলায় নয় বিশ্বসভ্যতার সাধারণ নিয়ম।
মানবসমাজের জন্য শিক্ষা হল ক্ষমতা একটি আমানত (Trust), মালিকানা নয়,কুরআন শাসনকে “আমানত” বলে।
যখন ক্ষমতা দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, পতন শুরু হয়।স্থাপত্য টিকে, ক্ষমতা টেকে না, আজও প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে,
কিন্তু শাসক নেই।
এটি কুরআনের একটি বাস্তব প্রতিফলন। মানুষ চলে যায়, নিদর্শন রয়ে যায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
ইতিহাস আমাদেরকে সতর্ক করে, শাস্তি দেয় না, ধ্বংসাবশেষ ভয় দেখানোর জন্য নয় ভাবানোর জন্য।
রাজবাড়ি যেন নীরবে বলে আমাদের মতো ভুল পুনরাবৃত্তি কোরো না।
আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে কুরআনের দৃষ্টিতে ইতিহাস একটি আদালতের মতো। সময় বিচারক,সমাজ সাক্ষী,
সভ্যতা অভিযুক্ত যেখানে প্রশ্ন একটাই ক্ষমতা কি মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়েছিল?
রাজবাড়ি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতা আমাদের শেখায় সভ্যতা ধ্বংস হয় অস্ত্রের কারণে নয়,বরং নৈতিক ভারসাম্য
হারানোর কারণে। এ কারণেই কুরআন ইতিহাসকে গল্প হিসেবে নয়, আয়না হিসেবে উপস্থাপন করে ।
কেন সমৃদ্ধি অনেক সময় মানুষ বা সভ্যতাকে ধীরে ধীরে পতনের দিকে নিয়ে যায়?এই বিষয়টি কুরআন,
ইতিহাস ও মানবমন তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে পরিষ্কার বুঝা যায়।কুরআনে সমৃদ্ধিকে শুধু পুরস্কার
বলা হয়নি; বরং পরীক্ষা বলা হয়েছে।
কারণ সমৃদ্ধি মানুষের ভেতরের আসল চরিত্র প্রকাশ করে। কুরআনে বহু শক্তিশালী জাতির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে:
আদ জাতি,সামুদ জাতি,ফিরআউনের মিসর তারা ধ্বংস হয়েছিল দারিদ্র্যের কারণে নয় বরং প্রাচুর্যের পর অহংকারের
কারণে। মানুষ কষ্টে আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু প্রাচুর্যে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবতে শুরু করে।সমৃদ্ধি ধীরে ধীরে
মানুষের চিন্তাকে বদলে দেয়। এটি হঠাৎ পতন ঘটায় না বরং নিন্মে তুলে দেয়া ধাপে ধাপে:-
ধাপ ১: নিরাপত্তার অনুভূতি মানুষ ভাবেএখন আমি নিরাপদ,ফলে সতর্কতা কমে যায়।
ধাপ ২: কৃতজ্ঞতা না হয়ে হয় অধিকারবোধ প্রথমে মানুষ বলে আমি পেয়েছি পরে বলে এটা আমার প্রাপ্য।
কৃতজ্ঞতা বদলে যায় entitlement-এ।
ধাপ ৩: আত্মনির্ভরতার ভ্রম; মানুষ মনে করে আমার সাফল্য শুধু আমার যোগ্যতায়।এখানেই আধ্যাত্মিক
বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়।
ধাপ ৪: সহমর্মিতা হ্রাস; কষ্ট না থাকলে অন্যের কষ্ট বোঝা কঠিন হয়ে যায়।সমাজে তখন দেখা দেয় বৈষম্য,
সামাজিক দূরত্ব,অবিচার।
ইতিহাসের নিয়ম হল বিলাসিতা সভ্যতাকে দুর্বল করে। ইতিহাসবিদরা একটি পুনরাবৃত্ত ধারা লক্ষ্য করেছেন ।
প্রথম পর্যায়ে আসে সংগ্রাম যা ঐক্য ও নৈতিকতা শক্তিশালী করে । ২য় পর্যায়ে আসে সমৃদ্ধি যা উন্নয়ন ও
স্থিতিশীলতা আনে। ৩য় পর্যায়ে আসে বিলাসিতা যা শৃঙ্খলাকে করে শিথিল,৪র্থ পর্যায়ে আসে আত্মতুষ্ঠি
এতে দায়িত্ববোধ কমে ।শেষ স্তরে আসে পতন ঠিক তখনউ নতুন শক্তির উত্থান ঘটে ।বাংলার বহু রাজবাড়ির
ইতিহাসেও একই চিত্র দেখা যায় যেমন পুঠিয়া রাজবাড়ী বা নাটোর রাজবাড়ী।
অনেক সমৃদ্ধি বিপজ্জনক হতে পারে? কারণ সমৃদ্ধি তিনটি বিভ্রম তৈরি করে: স্থায়িত্বের বিভ্রম;মানুষ ভাবে
বর্তমান অবস্থা চিরস্থায়ী। নিয়ন্ত্রণের বিভ্রম;মানুষ ভাবে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে। শ্রেষ্ঠত্বের বিভ্রম; মানুষ ভাবে
সে অন্যদের চেয়ে উত্তম।এই তিনটি মিলেই অহংকার জন্মায়।
দারিদ্র্য মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। সমৃদ্ধি অনেক সময় প্রশ্নহীন জীবন তৈরি করে।ফলে আত্মসমালোচনা
কমে বিনয় হারায়,উদ্দেশ্য ভুলে যায়, কুরআনিক ভাষায় এটিকে বলা হয় হৃদয়ের কঠোরতা।
সভ্যতার চূড়ান্ত paradox তথা সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে সাফল্য একটি সভ্যতাকে শক্তিশালী করে,
অতিরিক্ত হলে সেটিই পতনের কারণ হয়। অর্থাৎ সম্পদ প্রয়োজনীয় কিন্তু আত্মভোলা সম্পদ ধ্বংসাত্মক
সংক্ষেপ পতনের মনস্তাত্ত্বিক সূত্র হল; সমৃদ্ধি হতে আত্মতুষ্টি সেখান হতে অহংকার, অহংকার হতে অবিচার,
অবিচার থেকে সামাজিক দুর্বলতা আর সেখান হতেই শুরু হয় পতন।
ইতিহাস ও কুরআনের যৌথ শিক্ষা যেন এই কথাটিই বলে সমৃদ্ধি মানুষকে ধ্বংস করে না; সমৃদ্ধির প্রতি মানুষের
ভুল মনোভাব তাকে ধ্বংস করে।এই পবিত্র রমজান মাসে মুল্যবান ছবি ও কথা সমৃদ্ধ আপনার এই পোস্টটির
কল্যানে উথ্থান ও পতনের বিষয়ে হদয়ে জেগে উঠা ছোট ছোট কিছু অনুভবের আলোকে লেখা এই মন্তব্যটি
বেশ বড় হয়ে গেছে । একবার ভাবছিলাম মন্তব্যের কথাগুলি উঠিয়ে নিয়ে আমার ব্লগে একটি পৃথক পোস্ট দেই।
তারপরে আবার মনে হল এর উযুক্ত স্থান হল আপনার মন্তব্যের তলে ।
তাই এখানেই কথাগুলি বলে গেলাম ।
এত সুন্দর সুন্দর অনুভব উদ্রেককারী আপনার এই পোস্টটি প্রিয়তে গেল ।
শুভেচ্ছা রইল
৫|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:৪৫
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
অট: আপনার মন্তব্যের তলে হবে আপনার পোস্টের তলে মন্তব্যের ঘরে ।
৬|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১০:২৬
রাজীব নুর বলেছেন: অনেকদিন পর সুন্দর একটা পোষ্ট দিয়েছেন।
ধন্যবাদ।
আপনার আশ্রম নিয়ে অনেকদিন কিছু লিখেন না!!!
৭|
২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১০
অপু তানভীর বলেছেন: আরে ভুল করে এদিকে চলে এসেছেন নাকি? আমি তো ভাবলাম নির্বাচিত হওয়ার পরে এখন আর টাইমই পাইবেন না।
যাক সামুর কথা ভোলেন নাই !
আমার কথা আবার ভুলে যাইবেন না যেন! ![]()
©somewhere in net ltd.
১|
২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৭
ডার্ক ম্যান বলেছেন: আপা, মিষ্টি কবে খাওয়াবেন