| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
নতুন নকিব
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।
রক্তের গ্রুপ বৃত্তান্ত; জীবন রক্ষার স্বার্থেই জেনে রাখা দরকার রক্তের গ্রুপ
ছবি সংগৃহীত।
বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। দুই পরিবার আনন্দে ব্যস্ত। বর ও কনে দুজনেই সুস্থ, শিক্ষিত, স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কেউ কল্পনাও করছে না, তাদের শরীরের ভেতর নীরবে লুকিয়ে আছে একটি ভয়াবহ সত্য। দুজনেই থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার। এই বর কনে যুগল থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত হবে। জন্মের পর থেকেই তার জীবন হবে হাসপাতালনির্ভর। প্রতি মাসে রক্ত নিতে হবে। আয়রন জমে যাবে শরীরে। ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে হৃদযন্ত্র, লিভার ও অন্যান্য অঙ্গ। একটি শিশুর শৈশব, কৈশোর ও স্বপ্ন সবকিছু রক্তের ব্যাগের সাথে বাঁধা পড়ে যাবে।
এই করুণ বাস্তবতা বাংলাদেশে প্রতিদিন ঘটছে। কারণ একটাই, বিবাহের আগে বর ও কনের রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার শনাক্ত করা হয় না। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় থ্যালাসেমিয়া একটি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য জেনেটিক রোগ, যদি প্রিম্যারিটাল স্ক্রিনিং এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ারের হার আনুমানিক ১০.৯ থেকে ১৩.৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ নীরব বাহক হিসেবে সমাজে বসবাস করছেন। শুধুমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষা, হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস, একটি শিশুকে আজীবনের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করতে পারে। এটি কোনো সাধারণ পরীক্ষা নয়, এটি একটি জীবন বাঁচানোর সিদ্ধান্ত।
থ্যালাসেমিয়ার মতো জেনেটিক রোগ ছাড়াও রক্ত সম্পর্কিত আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের রক্তের গ্রুপ জানা। বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, জটিল অস্ত্রোপচার, প্রসবকালীন জটিলতা, ক্যানসার চিকিৎসা এবং বিভিন্ন গুরুতর রোগে হাজার হাজার মানুষ রক্তের অভাবে জীবন হারান বা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান। অনেক সময় রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, তার বা পরিবারের কেউই তার রক্তের গ্রুপ জানে না। এতে সঠিক রক্ত সংগ্রহে দেরি হয়, আর এই দেরিই অনেক ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করে।
রক্তের গ্রুপ কী? রক্তের গ্রুপ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ধারিত হয় লাল রক্তকণিকার পৃষ্ঠে উপস্থিত অ্যান্টিজেন নামক বিশেষ প্রোটিন বা কার্বোহাইড্রেট অণুর ভিত্তিতে। এই অ্যান্টিজেনগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে জানিয়ে দেয় কোন রক্ত নিজের এবং কোনটি বাইরের। ভুল রক্ত শরীরে প্রবেশ করলে ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সেটিকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে রক্তের গ্রুপ চিহ্নিত করার জন্য মূলত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুটি প্রধান সিস্টেম ব্যবহৃত হয়। একটি হলো ABO সিস্টেম, অন্যটি Rh সিস্টেম।
ABO রক্তের গ্রুপ সিস্টেম
১৯০০ সালে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টাইনার প্রথম লক্ষ্য করেন যে, কিছু মানুষের রক্ত একে অপরের সাথে মেশালে জমাট বাঁধে। গবেষণার মাধ্যমে তিনি A, B এবং C নামের তিনটি গ্রুপ চিহ্নিত করেন। পরবর্তীতে C গ্রুপকে O নামে পরিচিত করা হয়, যা জার্মান শব্দ Ohne থেকে এসেছে, যার অর্থ নেই বা অনুপস্থিত। ১৯০২ সালে তার সহকর্মীরা AB গ্রুপ আবিষ্কার করেন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ল্যান্ডস্টাইনার ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।
ABO সিস্টেমে চারটি গ্রুপ রয়েছে।
গ্রুপ A, যেখানে লাল রক্তকণিকায় A অ্যান্টিজেন থাকে এবং রক্তরসে anti-B অ্যান্টিবডি থাকে।
গ্রুপ B, যেখানে B অ্যান্টিজেন থাকে এবং anti-A অ্যান্টিবডি থাকে।
গ্রুপ AB, যেখানে A ও B উভয় অ্যান্টিজেন থাকে কিন্তু কোনো অ্যান্টিবডি থাকে না।
গ্রুপ O, যেখানে কোনো অ্যান্টিজেন থাকে না কিন্তু anti-A ও anti-B উভয় অ্যান্টিবডি থাকে।
Rh সিস্টেম
১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ল্যান্ডস্টাইনার ও অ্যালেক্স ওয়াইনার Rh সিস্টেম আবিষ্কার করেন। এখানে মূল ভূমিকা পালন করে RhD অ্যান্টিজেন। এই অ্যান্টিজেন থাকলে রক্তকে Rh পজিটিভ বলা হয়, না থাকলে Rh নেগেটিভ বলা হয়।
ABO এবং Rh সিস্টেম মিলিয়ে মোট আটটি প্রধান রক্তের গ্রুপ গঠিত হয়।
A+, A-, B+, B-, O+, O-, AB+ এবং AB-।
রক্তদান ও গ্রহণে সামঞ্জস্যতার গুরুত্ব
ভুল গ্রুপের রক্ত দিলে শরীরের অ্যান্টিবডি লাল রক্তকণিকা ধ্বংস করতে শুরু করে, যাকে হেমোলাইসিস বলা হয়। এর ফল হতে পারে কিডনি বিকল, শক এবং মৃত্যু। এ কারণেই রক্ত সঞ্চালনের আগে ক্রস ম্যাচিং করা বাধ্যতামূলক।
O নেগেটিভ রক্তকে সার্বজনীন দাতা বলা হয়, কারণ এতে কোনো A, B বা Rh অ্যান্টিজেন নেই। জরুরি অবস্থায় এটি যেকোনো রোগীকে দেওয়া যায়।
AB পজিটিভকে সার্বজনীন গ্রহীতা বলা হয়, কারণ এতে কোনো অ্যান্টিবডি নেই।
ABO ও Rh ছাড়াও অন্যান্য রক্ত গ্রুপ সিস্টেম
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ৪০টিরও বেশি রক্ত গ্রুপ সিস্টেম আবিষ্কার করেছেন, যেখানে ৬০০টিরও বেশি অ্যান্টিজেন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে Kell, Duffy, Kidd, MNS এবং Lewis উল্লেখযোগ্য। এগুলো সাধারণ রক্তদানে কম গুরুত্বপূর্ণ হলেও বারবার রক্ত গ্রহণকারী রোগী, গর্ভাবস্থার জটিলতা এবং অটোইমিউন রোগে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। Kell সিস্টেম নবজাতকের হেমোলাইটিক রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। Duffy অ্যান্টিজেন ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে আংশিক সুরক্ষা দেয়।
বাংলাদেশে রক্তের গ্রুপের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় B+ গ্রুপ, প্রায় ৩১ থেকে ৩৪ শতাংশ। এরপর O+ প্রায় ২৯ থেকে ৩৩ শতাংশ। A+ প্রায় ২১ থেকে ২৬ শতাংশ এবং AB+ প্রায় ৯ শতাংশ। Rh নেগেটিভ গ্রুপ অত্যন্ত বিরল, মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ থেকে ৭ শতাংশ। এই বিরলতার কারণে নেগেটিভ গ্রুপের রক্তের সংকট সবসময় লেগেই থাকে।
গর্ভাবস্থা, Rh অসামঞ্জস্যতা এবং চিকিৎসা
Rh নেগেটিভ মা যদি Rh পজিটিভ সন্তান ধারণ করেন, প্রথম সন্তান সাধারণত নিরাপদ থাকে। কিন্তু প্রসবের সময় মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পরবর্তী গর্ভধারণে এই অ্যান্টিবডি শিশুর রক্ত ধ্বংস করতে পারে, যাকে হেমোলাইটিক ডিজিজ অব দ্য নিউবর্ন বলা হয়। আধুনিক চিকিৎসায় Anti-D ইনজেকশন দিয়ে এই ঝুঁকি প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে শর্ত একটাই, মায়ের রক্তের গ্রুপ আগে থেকেই জানা থাকতে হবে।
করণীয়
নিজের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখুন। নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করুন। বিশেষ করে যারা Rh নেগেটিভ গ্রুপের, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। বিবাহের আগে অবশ্যই বর ও কনের থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং করান। সরকার, এনজিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এই বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
আজই নিজের ও পরিবারের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখুন। সচেতন হোন। অন্যকে সচেতন করুন। রক্ত দিন। জীবন বাঁচান। এক ফোঁটা রক্ত হয়তো আপনার কাছে তুচ্ছ, কিন্তু কারও কাছে সেটাই হতে পারে পুরো একটি জীবন।
রেফারেন্স
১. World Health Organization (WHO). Blood Safety and Availability Guidelines
২. National Thalassemia Survey, Bangladesh
৩. Landsteiner K. Nobel Prize Lecture, 1930
৪. British Society for Haematology. Blood Group Systems
৫. Transfusion Medicine Textbook, Elsevier
৬. International Society of Blood Transfusion (ISBT) Database
১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:১৯
নতুন নকিব বলেছেন:
সুচিন্তিত মন্তব্যটির জন্য আন্তরিক অভিনন্দন। বাস্তবতা হলো, প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করলেও থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার স্ক্রিনিং করা সম্ভব। বিয়ের আগে কোন কারণে সম্ভব না হলে অন্ততপক্ষে বিয়ের পরও দুজনের রক্ত পরীক্ষা করা যায়। যদি দুজনই ক্যারিয়ার হন, তাহলে ভবিষ্যৎ সন্তানের ঝুঁকি প্রায় ২৫% এর থেকেই যায়।
সুতরাং, এই সমস্যার সমাধান হলো সচেতনতা ও মেডিকেল পরামর্শ, শুধু “বিয়ে হলে সব ঠিক হয়ে যাবে” ভাবলে হবে না। স্বাস্থ্যগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবেগ দিয়ে নয়, পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত।
আবারও ধন্যবাদ।
২|
১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১৯
রাজীব নুর বলেছেন: রক্তের গ্রুপ জানা অবশ্যই জরুরী। এবং নিয়মিত রক্ত দান করে দেওয়া উচিৎ।
১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬
নতুন নকিব বলেছেন:
খুব সুন্দর কথা বলেছেন। ধন্যবাদ। আপনার কল্যান কামনা করছি।
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:২৯
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: বিবাহের আগে বর ও কনের রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার শনাক্ত করা হয় না।
.............................................................................................................................
বিষয়টা না হয় পারিবারিক বিবাহর ক্ষেত্রে করার সুযোগ আছে
কিন্ত যখন প্রেমের টানে পাগল হয়ে মিয়া বিবি পালায়ে বিয়ে করে
সে সময় এই সুযোগ থাকে কি ?
বাস্তবতা হলো আমরা বিশেষ প্রজাতি, আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
আর যদি ও কিছু সমস্যা থাকে তার সমাধান হলো
বিয়ে হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে ।