নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

নতুন নকিব

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দল-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না- বিদ্রোহী রন-ক্লান্ত। আমি সেই দিন হব শান্ত।

নতুন নকিব › বিস্তারিত পোস্টঃ

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক চেহারা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদায় নিহিত নয়। বরং তাঁর চরিত্র, আচার-আচরণ এবং নৈতিক গুণাবলির মধ্যেই প্রকৃত মহিমা লুকিয়ে আছে। এসব মহৎ গুণাবলির মধ্যে বিনয় বা তাওয়াযু‘ এমন এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার প্রিয় বান্দায় পরিণত করে এবং সৃষ্টিজগতের কাছে শ্রদ্ধাভাজন করে তোলে।

বিনয় অহংকারের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থিত একটি গুণ। এটি দুর্বলতার পরিচায়ক নয়; বরং আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে আল্লাহর সামনে নিজেকে নত করা এবং মানুষের সঙ্গে নম্র, সৌজন্যপূর্ণ ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করার নামই বিনয়। ইসলামী জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ—আল্লাহ একক, মহান ও পরাক্রমশালী; আর মানুষ তাঁর সৃষ্টি, দুর্বল ও নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা যে ব্যক্তির অন্তরে যত গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে তত বেশি বিনয়ী হয়ে ওঠে। বস্তুত বিনয় হলো তাওহীদের একটি ব্যবহারিক ফলাফল—আল্লাহর মহত্ত্বের স্বীকৃতি এবং নিজের ক্ষুদ্রত্বের অনুভূতির স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

ইসলাম মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তাকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। তাই কুরআনুল কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ জুড়ে বিনয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বর্তমান যুগে আত্মপ্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে জাহির করা এবং অহংকারের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিনয়ের এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক স্পষ্ট দলিল, সাহাবীদের জীবনী, প্রাজ্ঞ আলিমদের ব্যাখ্যা এবং বাস্তবিক প্রয়োগের আলোকে বিনয়ের তাৎপর্য বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

১. বিনয়ের সংজ্ঞা ও তাৎপর্য

আরবি ‘তাওয়াযু‘’ (تواضع) শব্দটি ‘ওয়াদ‘আ’ (وضع) ধাতুমূল থেকে গঠিত, যার অর্থ নিচু করা বা স্থাপন করা। পারিভাষিক অর্থে তাওয়াযু‘ হলো নিজের মর্যাদা, যোগ্যতা বা অবস্থানকে প্রকৃতপক্ষে জেনেও তা নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহ ও মানুষের সামনে নিজেকে নত রাখা। ইমাম গাযযালী (রহ.) তাঁর ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে বলেন, বিনয় হলো এমন একটি চারিত্রিক অবস্থা, যার ফলে ব্যক্তি নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে না করে এবং নিজের ভালো গুণগুলোকে নিজের কৃতিত্ব না ভেবে আল্লাহর অনুগ্রহ বলে স্বীকার করে।
তবে বিনয় ও দৈন্যতা বা হীনম্মন্যতার (ذلة) মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর ‘মাদারিজুস সালিকীন’ গ্রন্থে এই পার্থক্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত বিনয় আত্মমর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক নয়; বরং তা নিজের প্রকৃত অবস্থান অনুধাবন করে আল্লাহর সামনে বিনম্র হওয়া এবং মানুষের সাথে ন্যায্য, সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করা। পক্ষান্তরে দৈন্যতা হলো এমন হীনতা, যেখানে ব্যক্তি অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার করে, বাতিলকে প্রশ্রয় দেয় বা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে ভয় পায়। ইসলাম কখনোই মুমিনকে এই ধরনের হীনতা শেখায় না; বরং এমন বিনয় শেখায় যা আত্মমর্যাদাপূর্ণ, সাহসী এবং সত্যনিষ্ঠ।

এ কারণেই দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন, কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে তাঁরা কখনো দুর্বলতা প্রদর্শন করেননি। প্রকৃত বিনয় তাই কাপুরুষতা নয়; এটি এমন এক আত্মিক শক্তি, যা অহংকারকে জয় করে মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে।

২. কুরআনুল কারীমে বিনয়ের মর্যাদা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা একাধিক স্থানে বিনয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং অহংকারের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত আলোচনা করা হলো।

২.১ রহমানের বান্দাদের প্রথম পরিচয়ই বিনয়

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

অর্থ: আর রহমানের বান্দারা তারাই, যারা পৃথিবীতে বিনম্রভাবে চলাফেরা করে। আর যখন মূর্খরা তাদেরকে সম্বোধন করে, তখন তারা শান্তির কথা বলে। (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৬৩)

এই আয়াতে ‘হাওনান’ (هَوْنًا) শব্দটি বিনয়, নম্রতা ও শালীনতার অর্থ বহন করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে সর্বপ্রথম তাদের বিনয়ের কথাই উল্লেখ করেছেন—এটি প্রমাণ করে যে, বিনয় একজন মুমিনের পরিচয়ের কেন্দ্রীয় বিষয়। এছাড়া এই আয়াত থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: মূর্খ বা রূঢ় আচরণকারী মানুষের মুখোমুখি হলেও প্রকৃত মুমিন প্রতিশোধপরায়ণ হয় না, বরং শান্তি ও সংযমের ভাষায় জবাব দেয়। এটিই বিনয়ের সর্বোচ্চ পরীক্ষা।

২.২ অহংকারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা

وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ * وَاقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ ۚ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ

অর্থ: আর মানুষের প্রতি অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে উদ্ধতভাবে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক ও অহংকারীকে ভালোবাসেন না। আর তোমার চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নীচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ। (সূরা লুকমান, ৩১:১৮-১৯)

এই আয়াতে লুকমান হাকীম (আ.) তাঁর পুত্রকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র মানবজাতিকে শিক্ষা দিচ্ছেন। এখানে অহংকারের তিনটি বাহ্যিক লক্ষণের কথা বলা হয়েছে—মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, উদ্ধতভাবে চলা এবং উঁচু স্বরে চিৎকার করা—এবং এর বিপরীতে মধ্যপন্থা ও নম্র কণ্ঠস্বরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, বিনয় কেবল অন্তরের বিষয় নয়; এটি মানুষের কথাবার্তা, চলাফেরা ও শারীরিক ভাষায়ও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

২.৩ নেতৃত্বের জন্যও বিনয় অপরিহার্য

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ

অর্থ: আপনি আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি আপনার ডানা অবনত করে দিন। (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:২১৫; অনুরূপ নির্দেশ সূরা আল-হিজর, ১৫:৮৮)

এ নির্দেশ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া হয়েছে, যিনি সমগ্র মানবজাতির নেতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিনয় কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়; বরং নেতা, শিক্ষক, আলেম, দা‘ঈ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য অপরিহার্য একটি গুণ। যত বড় দায়িত্ব, তত বেশি বিনয়ের প্রয়োজন—কারণ ক্ষমতা মানুষকে সহজেই অহংকারের দিকে ধাবিত করে।

২.৪ পৃথিবীতে দাপটের সাথে বিচরণের নিষেধ

وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا

অর্থ: এবং পৃথিবীতে দাপটের সাথে বিচরণ করো না; তুমি তো কখনোই পৃথিবী বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায় পাহাড়সমও হতে পারবে না। (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৭)

এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এক অসাধারণ যুক্তি দিয়ে অহংকারের ভিত্তিহীনতা তুলে ধরেছেন—মানুষ যত শক্তিশালী বা প্রভাবশালীই হোক, বাস্তবে সে পৃথিবীর সামান্য একটি অংশও পরিবর্তন করতে অক্ষম, পাহাড়ের মতো উচ্চও হতে পারে না। তাহলে কীসের এত অহংকার? এই আয়াত মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান স্মরণ করিয়ে দেয়।

২.৫ আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না

إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا يُسِرُّونَ وَمَا يُعْلِنُونَ ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْتَكْبِرِينَ

অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ জানেন তারা যা গোপন করে এবং যা প্রকাশ করে; নিশ্চয় তিনি অহংকারীদের ভালোবাসেন না। (সূরা আন-নাহল, ১৬:২৩)

২.৬ অহংকারীদের পরিণতি: জাহান্নামে হীনতার সাথে প্রবেশ

إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ

অর্থ: যারা আমার ইবাদত করতে অহংকার করে, তারা অবশ্যই হীন-অপমানিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সূরা গাফির/আল-মু’মিন, ৪০:৬০)

এই আয়াত থেকে একটি চমৎকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়—যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অহংকারের মাধ্যমে নিজেকে বড় করতে চায়, আল্লাহ তা‘আলা তাকে পরকালে ঠিক বিপরীত অবস্থায়, অর্থাৎ হীন ও অপমানিত অবস্থায় উপস্থিত করবেন। বিনয় ও অহংকারের এই প্রতিদান আল্লাহর ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

২.৭ ইবলীস ও কারূনের কাহিনি: অহংকারের করুণ পরিণতি

কুরআনুল কারীমে অহংকারের ভয়াবহ পরিণতি বোঝাতে দুটি বিশেষ দৃষ্টান্ত এসেছে। প্রথমত, ইবলীসের কাহিনি—আল্লাহ তা‘আলা যখন ফেরেশতাদের আদমকে সিজদা করতে নির্দেশ দিলেন, তখন সকল ফেরেশতা সিজদা করলো, কিন্তু ইবলীস অহংকারবশত অস্বীকার করলো।

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ

অর্থ: আর যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো; তখন সকলে সিজদা করলো, একমাত্র ইবলীস ছাড়া। সে অস্বীকার করলো এবং অহংকার করলো, আর সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো। (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৪)

এই একটিমাত্র অহংকারের কারণে ইবলীস চিরকালের জন্য আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়—যদিও তার ইবাদত-বন্দেগির ইতিহাস ছিল দীর্ঘ। দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত হলো কারূনের কাহিনি (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৬-৮২), যে তার বিপুল সম্পদ নিয়ে সীমাহীন অহংকার করেছিল এবং নিজের সাফল্যকে একান্তই নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করেছিল। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তাকে ও তার ধন-ভাণ্ডারসহ ভূগর্ভে বিলীন করে দেন। এই দুটি কাহিনি স্পষ্ট করে দেয় যে, জ্ঞান, ইবাদত বা সম্পদ—যা-ই থাকুক, অহংকার তা সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে।

৩. হাদীসের আলোকে বিনয়ের গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতেও বিনয়ের গুরুত্ব বহুভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস তুলে ধরা হলো।

৩.১ বিনয়ে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়

مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ، وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا، وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ

অর্থ: দান সম্পদ কমায় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৮৮)

৩.২ অহংকারীর জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

অর্থ: যার অন্তরে অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯১)
এই হাদীস শুনে এক সাহাবী প্রশ্ন করেছিলেন, মানুষ তো স্বভাবতই সুন্দর পোশাক ও জুতা পছন্দ করে—তবে কি এটাও অহংকার? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। কিবর (নিন্দিত অহংকার) হলো সত্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা। এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা বা উপযুক্ত পোশাক পরিধান করা অহংকার নয়; বরং অহংকার হলো একটি হৃদয়ঘটিত রোগ, যার লক্ষণ হলো সত্য প্রত্যাখ্যান ও মানুষকে অবজ্ঞা করা।

৩.৩ আল্লাহর নির্দেশ: পরস্পরের প্রতি বিনয়ী হও

إِنَّ اللَّهَ أَوْحَى إِلَيَّ أَنْ تَوَاضَعُوا حَتَّى لَا يَبْغِيَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ وَلَا يَفْخَرَ أَحَدٌ عَلَى أَحَدٍ

অর্থ: আল্লাহ আমার কাছে ওহী পাঠিয়েছেন যে, তোমরা বিনয় অবলম্বন করো; যাতে কেউ কারও ওপর অহংকার না করে এবং কেউ কারও প্রতি জুলুম না করে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৬৫)

৩.৪ জান্নাতী ও জাহান্নামীদের পরিচয়

أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ؟ كُلُّ ضَعِيفٍ مُتَضَعِّفٍ ۚ ... أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَهْلِ النَّارِ؟ كُلُّ عُتُلٍّ جَوَّاظٍ مُسْتَكْبِرٍ

অর্থ: আমি কি তোমাদেরকে জান্নাতবাসীদের সংবাদ দেব না? তারা হলো প্রত্যেক দুর্বল, বিনয়ী, হীন মনে করা ব্যক্তি... আমি কি তোমাদেরকে জাহান্নামবাসীদের সংবাদ দেব না? তারা হলো প্রত্যেক রূঢ়, দাম্ভিক ও অহংকারী ব্যক্তি। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৯১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৫৩)

এই হাদীসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে জান্নাত ও জাহান্নামের অধিবাসীদের বৈশিষ্ট্য সরাসরি বিনয় ও অহংকারের নিরিখে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুনিয়ার দৃষ্টিতে যাদেরকে ‘দুর্বল’ বা ‘তুচ্ছ’ ভাবা হয়, প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরের বিনয়ই তাদেরকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে তোলে। অন্যদিকে রূঢ়, দাম্ভিক ও ক্ষমতাদর্পী ব্যক্তিরা, দুনিয়াতে যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের অহংকারই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৩.৫ রাসূলুল্লাহর (সা.) আত্মপরিচয়ে বিনয়

لَا تُطْغُونِي كَمَا أَطْغَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا: عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ

অর্থ: তোমরা আমার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না, যেমন খ্রিস্টানরা মারইয়াম-পুত্রের (ঈসা আ.) ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছিল। আমি তো তাঁর (আল্লাহর) বান্দা মাত্র। তাই তোমরা বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৪৪৫)

বিশ্বনবী হয়েও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রশংসা বা মর্যাদা আরোপ করাকে নিরুৎসাহিত করেছেন এবং নিজেকে সর্বদা ‘আল্লাহর বান্দা’ হিসেবে পরিচয় দিতে বলেছেন। এটি বিনয়ের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত—নবুওয়াতের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেও নিজেকে আল্লাহর একজন বান্দা হিসেবেই উপস্থাপন করা।

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে বিনয়ের বাস্তব দৃষ্টান্ত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিনয়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, নবীকুলের সর্দার, অথচ তাঁর দৈনন্দিন জীবন ছিল অত্যন্ত সরল ও বিনয়পূর্ণ। তাঁর জীবনের কিছু নির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলো:

তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করতেন এবং নিজের পোশাক নিজেই সেলাই করতেন—কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির জন্য এটি অস্বাভাবিক হলেও তাঁর কাছে এটি ছিল স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ।

তিনি ঘরের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন এবং কখনো নিজের প্রয়োজনে ভৃত্যের অপেক্ষা করতেন না, বরং নিজের কাজ নিজেই করতেন।

তিনি দাস-দাসীদের দাওয়াতও সানন্দে গ্রহণ করতেন এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের—তারা যত সাধারণ মর্যাদার হোক—নিয়মিত দেখতে যেতেন।

তিনি রাস্তায় শিশুদের সালাম দিতেন এবং তাদের সাথে হাস্যরসপূর্ণ আচরণ করতেন, যা তাঁর সরলতা ও বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ।
তিনি মজলিসে কোনো বিশেষ আসন গ্রহণ করতেন না, বরং যেখানে জায়গা পেতেন সেখানেই বসে যেতেন, যাতে অচেনা কেউ তাঁকে সহজে চিনতে না পেরে ভুলবশত অন্য কাউকে নেতা মনে করে বসতো।

মক্কা বিজয়ের দিন, যা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয়, তিনি বিজয়ীর দাপট নিয়ে প্রবেশ করেননি; বরং মাথা অবনত করে বিনয় ও কৃতজ্ঞতার সাথে মক্কায় প্রবেশ করেছিলেন—ইতিহাসের অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত, যেখানে চূড়ান্ত বিজয়ও অহংকারের কারণ হয়নি।

এই দৃষ্টান্তগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, ক্ষমতা ও মর্যাদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনো অহংকারী করতে পারেনি; বরং যত মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তত তাঁর বিনয় গভীর হয়েছে। এটিই একজন প্রকৃত মুমিন নেতার আদর্শ চরিত্র।

৫. সাহাবায়ে কেরামের জীবনে বিনয়ের দৃষ্টান্ত

সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম ছিলেন বিনয়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিপুল ক্ষমতা ও মর্যাদা অর্জনের পরও তাঁরা নিজেদেরকে আল্লাহর ক্ষুদ্র বান্দা মনে করতেন।

৫.১ হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু

খিলাফতের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও তিনি প্রতিবেশীদের ভেড়ার দুধ দোহন করে দিতেন। খলিফা হওয়ার পর যখন এক বালিকা তাঁর কাছে এসে বলল, এখন তো আপনি খলিফা, ভেড়ার দুধ দোহাতে পারবেন না—তখন তিনি বললেন, আমি আশা করি খিলাফত আমার এই কাজে কোনো পরিবর্তন আনবে না। খিলাফত লাভের ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তোমরা আমাকে তোমাদের সর্বোত্তম মনে করে দায়িত্ব দিয়েছ, কিন্তু আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। আমি যদি ভুল করি, তোমরা আমাকে সংশোধন করবে।

৫.২ হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু

বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের খলিফা হয়েও তিনি নিজে বাজার পরিদর্শন করতেন, নিজের কাঁধে পানির মশক বহন করতেন এবং পাটের বস্তা কাঁধে করে দরিদ্রদের ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতেন। বিখ্যাত জেরুজালেম বিজয়ের সময় তিনি সাধারণ, তালিযুক্ত পোশাক পরে প্রবেশ করেছিলেন, যা দেখে বিদেশি দূতরাও বিস্মিত হয়েছিলেন—কারণ তাদের ধারণা ছিল বিজয়ী সম্রাট রাজকীয় পোশাকে আসবেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, নিজের হিসাব নেওয়ার আগেই যদি আমি নিজের হিসাব নিয়ে নিই, তবে কিয়ামতের দিন তা আমার জন্য সহজ হবে।

৫.৩ উয়াইস আল-কারনী রাদিয়াল্লাহু আনহু

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমরকে জানিয়েছিলেন যে, ইয়েমেন থেকে উয়াইস আল-কারনী নামক একজন অতি সাধারণ, অপরিচিত ব্যক্তি আসবে, যার দোয়ায় আল্লাহ সাড়া দেন। কিন্তু সাহীহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদীস থেকে জানা যায়, উয়াইস নিজে কখনো তাঁর এই মর্যাদার কথা প্রকাশ করেননি এবং মানুষের মাঝে পরিচিতি পাওয়া এড়িয়ে চলতেন। হযরত উমর স্বয়ং তাঁকে খুঁজে বের করে তাঁর দোয়া প্রার্থনা করেছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রকৃত মর্যাদাবান ব্যক্তিরা প্রায়ই নিজেদের গোপন রাখেন এবং প্রচারবিমুখ থাকেন—এটিই বিনয়ের সর্বোচ্চ রূপ।

৫.৪ হযরত সালমান আল-ফারিসী ও আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা

পারস্যের সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত হয়েও সালমান ফারিসী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে কখনো বিশেষ মনে করতেন না; তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন ‘সালমান, আল্লাহর এক দুর্বল বান্দা’ বলে। অন্যদিকে চতুর্থ খলিফা আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর নিকটাত্মীয় ও অত্যন্ত জ্ঞানী সাহাবী, খিলাফতকালেও তালিযুক্ত পোশাক পরিধান করতেন এবং নিজের হাতে বাজার থেকে জিনিসপত্র বহন করে আনতেন। তাঁদের জীবনাদর্শ আজও মুসলিম সমাজের জন্য অনুকরণীয়।

৬. প্রাজ্ঞ আলিমদের দৃষ্টিতে বিনয়ের সীমারেখা

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) ‘মাদারিজুস সালিকীন’ গ্রন্থে বিনয়কে তিন স্তরে ভাগ করেছেন। প্রথম স্তর হলো আল্লাহর প্রতি বিনয়—তাঁর হুকুম মেনে নেওয়া এবং কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা ছাড়াই তাঁর বিধান পালন করা। দ্বিতীয় স্তর হলো সত্যের প্রতি বিনয়—নিজের মতের ভুল প্রমাণিত হলে তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং জ্ঞানে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। তৃতীয় স্তর হলো সৃষ্টির প্রতি বিনয়—মানুষের সাথে সদাচরণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে সমান সম্মান প্রদর্শন।

ইমাম গাযযালী (রহ.) তাঁর ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থের ‘কিতাবু কাসরিশ শাহওয়াতাইন’ ও ‘যাম্মুল কিবরি ওয়াল উজব’ অধ্যায়ে অহংকারের উৎসগুলো বিশ্লেষণ করেছেন—যেমন বংশমর্যাদা, রূপ-সৌন্দর্য, শক্তি, সম্পদ, জ্ঞান এবং অনুসারীর সংখ্যা। তাঁর মতে, এই প্রতিটি বিষয়ই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে, কারণ মানুষ ভুলে যায় যে এসবই আল্লাহর দান, নিজের কোনো কৃতিত্ব নয়। যে ব্যক্তি এই সত্য উপলব্ধি করে, সে কখনোই অহংকারী হতে পারে না।

তবে আলিমগণ এ বিষয়েও সতর্ক করেছেন যে, বিনয় যেন দ্বীনের বিষয়ে দুর্বলতা বা সত্য গোপন করার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, কোনো আলেম যদি ভুল ধারণা প্রচারিত হতে দেখে বিনয়ের অজুহাতে সত্য প্রকাশ না করেন, তাহলে তা প্রকৃত বিনয় নয়, বরং দায়িত্ব থেকে পলায়ন। প্রকৃত বিনয় হলো নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদা নিয়ে নমনীয় থাকা, কিন্তু আল্লাহর দ্বীন ও সত্যের ব্যাপারে দৃঢ় থাকা।

৭. বর্তমান যুগে বিনয়ের প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মপ্রচার, বড়ত্বের প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে জাহির করার প্রবণতা এবং অহংকার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিনিয়ত নিজের সাফল্য, সম্পদ ও জীবনযাত্রা প্রদর্শনের এই সংস্কৃতি মানুষের অন্তরে গোপন অহংকারের বীজ বপন করছে, যা অনেক সময় নিজের অজান্তেই ঘটে থাকে। অথচ ইসলাম শেখায়—প্রকৃত সম্মান মানুষের প্রশংসায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে।

কর্মক্ষেত্রে, পরিবারে এবং সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে বিনয়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। একজন বিনয়ী নেতা কর্মীদের আস্থা অর্জন করেন, একজন বিনয়ী শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হৃদয় জয় করেন, একজন বিনয়ী অভিভাবক সন্তানদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে ওঠেন। বিপরীতে, জ্ঞান, পদ বা সম্পদের অহংকার সম্পর্ক নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তির নিজের ক্ষতির কারণ হয়। যে ব্যক্তি নিজের কৃতিত্ব নিয়ে অহংকার করে, সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে পারে; পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করে দেন।

৮. বিনয়ের সুফল ও অহংকারের কুফল

বিনয়ের সুফল ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান। বিনয়ী ব্যক্তি সহজেই মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা অর্জন করেন। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়, দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং সমাজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। একজন বিনয়ী নেতা জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেন, একজন বিনয়ী আলেম মানুষের আস্থা অর্জন করেন এবং একজন বিনয়ী ব্যবসায়ী সততা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

অন্যদিকে অহংকার মানুষের ইহকাল ও পরকাল—উভয় জীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। কুরআনে বর্ণিত ইবলীস, কারূন ও ফিরআউনের কাহিনি এই সত্যের সাক্ষ্য দেয়—তাদের প্রত্যেকের কাছে ছিল অসাধারণ কিছু—ইবলীসের ছিল দীর্ঘ ইবাদতের ইতিহাস, কারূনের ছিল অতুলনীয় সম্পদ, ফিরআউনের ছিল বিশাল রাজত্ব। কিন্তু অহংকার তাদের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। অহংকারী ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করে, অন্যকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে। তাই একজন মুমিনের উচিত অহংকার থেকে দূরে থাকা এবং সবসময় নিজের ভুল সংশোধনের মানসিকতা রাখা।

৯. বিনয় অর্জনের বাস্তবিক উপায়

বিনয় একটি অর্জনযোগ্য গুণ, যা চর্চা ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব। নিচে কিছু কার্যকর উপায় উল্লেখ করা হলো:
আল্লাহর মহত্ত্ব ও নিজের ক্ষুদ্রত্ব, দুর্বলতা এবং মৃত্যুর অনিবার্যতা নিয়মিত স্মরণ করা—মানুষ মাটি থেকে সৃষ্ট এবং একদিন মাটিতেই ফিরে যাবে, এই বাস্তবতা অহংকারের মূলে আঘাত করে।

নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থসহ অধ্যয়ন করা, বিশেষত অহংকারের পরিণতি সম্পর্কিত আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ অনুসরণ করা এবং তাঁর বিনয়পূর্ণ জীবনযাপনের ছোট ছোট দৃষ্টান্তগুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করা।

গরীব, দুর্বল ও অসহায় মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা, তাদের সমস্যা জানা এবং তাদের সেবা করা—এতে অন্তরে কৃতজ্ঞতা ও বিনয় দুটোই বৃদ্ধি পায়।

নিয়মিত আত্মসমালোচনা (মুহাসাবা) করা—দিনের শেষে নিজের আচরণ, কথাবার্তা ও সিদ্ধান্তগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং ভুল স্বীকার করার মানসিকতা রাখা।

অহংকারের সাধারণ কারণগুলো—বংশমর্যাদা, রূপ-সৌন্দর্য, সম্পদ, পদ-পদবি ও অনুসারীর সংখ্যা—সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং এসবকে আল্লাহর সাময়িক পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা, নিজের স্থায়ী কৃতিত্ব নয়।

আন্তরিক ও বিশ্বাসী মানুষের কাছ থেকে নিজের সম্পর্কে সৎ মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা, প্রশংসায় ভেসে না যাওয়া এবং সমালোচনা শোনার মানসিকতা তৈরি করা।

আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করা, যাতে তিনি অন্তরকে অহংকার থেকে মুক্ত রাখেন এবং প্রকৃত বিনয়ী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
মনে রাখতে হবে, মানুষকে ছোট করলে কেউ বড় হয় না; বরং মানুষকে সম্মান করলে নিজের সম্মানই বৃদ্ধি পায়। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে: যে যত বড়, সে তত বেশি বিনয়ী হওয়া উচিত। কারণ বিনয় মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয় এবং জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়।

উপসংহার

বিনয় মুমিনের জীবনের অন্যতম মহৎ ও অপরিহার্য গুণ। এটি ঈমানের পরিপূর্ণতা, আখলাকের সৌন্দর্য এবং জান্নাতের চাবিকাঠি। কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক স্পষ্ট দলিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস্তব জীবনচরিত এবং সাহাবায়ে কেরাম ও প্রাজ্ঞ আলিমদের অনুসৃত পথ থেকে আমরা এই সত্য উপলব্ধি করি যে, প্রকৃত মর্যাদা অহংকারে নয়, বিনয়েই নিহিত।

আমরা যদি কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করে বিনয়কে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিতে পারি, তবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শান্তি, সম্প্রীতি ও বরকত নেমে আসবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে প্রকৃত বিনয়ী বান্দা হওয়ার তাওফীক দান করুন এবং অহংকারের প্রতিটি রূপ থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স

1. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৩
2. কুরআনুল কারীম, সূরা লুকমান, আয়াত: ১৮-১৯
3. কুরআনুল কারীম, সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ২১৫
4. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৮৮
5. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৭
6. কুরআনুল কারীম, সূরা আন-নাহল, আয়াত: ২৩
7. কুরআনুল কারীম, সূরা গাফির (আল-মু’মিন), আয়াত: ৬০
8. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৩৪
9. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭৬-৮২
10. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াছ্ছিলাহ ওয়াল আদাব, হাদীস: ২৫৮৮
11. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস: ৯১
12. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জান্নাহ ওয়া ছিফাতি নাঈমিহা ওয়া আহলিহা, হাদীস: ২৮৬৫
13. সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৯১৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৮৫৩ (আহলুল জান্নাহ ওয়ান নার সম্পর্কিত হাদীস)
14. সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৪৪৫ (রাসূলুল্লাহর আত্মপরিচয়ে বিনয় সম্পর্কিত হাদীস)
15. সহীহ মুসলিম, উয়াইস আল-কারনী সম্পর্কিত বর্ণনা, কিতাবু ফাযাইলিছ ছাহাবা
16. ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়াহ, মাদারিজুস সালিকীন
17. ইমাম আবু হামিদ আল-গাযযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন (কিতাবু কাসরিশ শাহওয়াতাইন; বাবু যাম্মিল কিবরি ওয়াল উজব)
18. তাফসীরে ইবনে কাসীর
19. তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন
20. সীরাতুন নববী (বিভিন্ন প্রামাণ্য সূত্র) — খুলাফায়ে রাশিদীনের জীবনী গ্রন্থসমূহ

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: অনেক দিন পর আপনার লেখা পেলাম । কেমন আছেন ? শুক্রবারের মতো দিনে এমন লেখা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ । আশা করি আগের মতো আবার বিভিন্ন ধর্মীয় জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয় আমাদের সাথে শেয়ার করবেন ।

২| ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২০

স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অহংকারের মাধ্যমে নিজেকে বড় করতে চায়,
আল্লাহ তা‘আলা তাকে পরকালে ঠিক বিপরীত অবস্থায়, অর্থাৎ হীন ও অপমানিত
অবস্থায় উপস্থিত করবেন। বিনয় ও অহংকারের
এই প্রতিদান আল্লাহর ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

......................................................................................................................................
পৃথিবীতে দাপটের সাথে আমেরিকা বিচরণ করছে আর আরব বিশ্বকে নাকানি চুবানী দিচ্ছে !
আরেক ইহুদী নেতা যাকে মনে চাচ্ছে তাকে মেরে ফেলছে !
তাহলে ঐসবের বিচার পরকালে হবে , কয়জন একথা বিশ্বাস করে মার খাবে আর চুপ করে থাকবে ?

৩| ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২

মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:



বিনয় নিয়ে এত বিস্তৃত ও দলিলভিত্তিক আলোচনা সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে বিনয়কে হীনম্মন্যতা বা দুর্বলতা থেকে আলাদা করে দেখানোর বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সত্যিকারের বিনয় মানুষকে ছোট করে না; বরং অহংকার থেকে মুক্ত করে তার মর্যাদাকেই আরও গভীর করে।

আমার মনে হয়, এই লেখার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা হলো—জ্ঞান, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা মর্যাদা যত বাড়বে, বিনয়ের প্রয়োজনও তত বাড়বে। কারণ মানুষের বড় হওয়ার প্রকৃত পরীক্ষা তার অর্জনে নয়, অর্জনের পর সে অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তাতে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনের উদাহরণগুলোও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মহত্ত্ব কখনো আত্মপ্রচারে নয়, বরং সত্যের সামনে নত হওয়া এবং মানুষের প্রতি সম্মান দেখানোর মধ্যেই প্রকাশ পায়। বর্তমান আত্মপ্রচারনির্ভর সময়ে তাই ‘বিনয়’ নিয়ে এমন আলোচনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।

চমৎকার ও চিন্তাজাগানিয়া লেখা। লেখককে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

৪| ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪১

সুলাইমান হোসেন বলেছেন: অনেক সময় অসুন্দর ছেড়া জামা পড়লেও অহংকার আসতে পাড়ে,অহংকার মূলত নফসের রোগ এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং যুদ্ধ অপরিহার্য।অহংকার দূর করার প্রাথমিক চিকিৎসা হলো,অহংকারের কারনসমূহ থেকে পলায়ন করা।যেমন জ্ঞানের কারনে অথবা শিক্ষাদানের কারনে অন্তরে অহংকার অনুভূত হলে জ্ঞান বিতরন এবং শিক্ষাদান থেকে সাময়িক ছুটি নেওয়া,অথবা পলায়ন করা।রাজত্বের কারনে মনে অহংকার অনুভুত হলে রাজাগীরি এবং বাদশাহী,এবং ক্ষমতা ছেড়ে পলায়ন করা।এছাড়া অহংকারের কৌশলগত,কর্মগত জ্ঞনগত আো অনেক চিকিৎসা আছে,যা নফস সম্পর্কে জ্ঞানী এবং বিচক্ষন ব্যাক্তি চিকিৎসা করতে পারে।ইমাম আবু হামেদ গাজ্জালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি অহংকার এবং প্রতিকার নিয়ে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন।যা পাঠ করলে নফসের সুক্ষ্ম চক্রান্তসমূহ ধরা পড়বে

ইলমে মুয়ামালায় আধ্যাতিক পথের সালিকদের জন্য অহংকার দূর করা সবচেয়ে জটিল এবং কঠিন হিসেবে ধরা হয়।শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,সালিকদের দিল থেকে সবশেষে যা বের করা হয় সেটা হলো অহংকার।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.