| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আরাফাত৫২৯
দূর থেকে দূরে, আরো বহুদূর......... চলে যেতে হয়, কত স্মৃতির ছায়ায়, এই রোদ্দুরের নীচে, নীল সবুজের খেলাঘরে জীবন মেতে থাকে কত নিয়মের প্রতীক্ষায়...
১/
বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ মহামতি গ্রাহাম উনার অফিসের বিশাল জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সময়টা প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যার রক্তিম আভা দূর আকাশে দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো আকাশটাতে দাউ দাউ করে সোনালি রঙের আগুন জ্বলছে। দিনের এই সময়টাতে কেন যেন মনটা একটু বিষন্ন হয়ে যায় কোন কারণ ছাড়াই।
নিঃশব্দে কখন যে মহামতি গ্রাহামের পিছনে উনার সহকারী মেয়ে দ্রিণা এসে দাঁড়িয়েছে তা তিনি একেবারেই খেয়াল করেননি। পিছন থেকে দ্রিণা আলতো করে নিজের হাত মহামতি গ্রাহামের কাঁধে রেখে বলল, “এত গভীরভাবে কি ভাবছেন মহামতি গ্রাহাম?”
মহামতি গ্রাহাম কিছুটা চমকে উঠলেন। একটু থেমে বললেন, “হ্যাঁ, তেমন কিছু না ভাবছিলাম না দ্রিণা। তবে একটু দুশ্চিন্তা করছিলাম বৈ কি!”
দ্রিণা বলল, “আপনি কি নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের মহাজাগতিক প্রাণীদের কথা ভাবছিলেন।”
মহামতি গ্রাহাম একটু হেসে বললেন, “সেটাই কি একটু স্বাভাবিক না?” তারপরে একটু থেমে তিনি বললেন, “আমার কেন যেন মনে হচ্ছে নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের মহাজাগতিক প্রাণীরা আমাদেরকে তাদের প্রযুক্তি দিবে না।”
“আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে মহামতি গ্রাহাম?” দ্রিণা খুব নীচু স্বরে বলল, “নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের মহাজাগতিক প্রাণীরা তো বলেছে যে মিল্কিওয়ের* প্রতিটি সৌরমন্ডলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা যে কোন একটি সভ্যতাকে ওরা ওদের প্রযুক্তি দিয়ে এক ধাপ উপরে উঠিয়ে দিবে। আমাদের সৌরমন্ডলে তো আমরাই একমাত্র টাইপ-১* সভ্যতা। সুতরাং, আমরাই হব আমাদের সৌরমন্ডলের প্রথম টাইপ-২* সভ্যতা।”
মহামতি গ্রাহাম মাথা নীচু করে বললেন, “তুমি একটু ভুল বললে দ্রিণা। নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীরা আসলে বলছে যে ওরা প্রতিটি সৌরমন্ডলে থাকা সর্বোচ্চ সভ্যতাটিকে ওই সৌরমন্ডলে থাকা অন্য সব সভ্যতার চেয়ে এক ধাপ উপরে নিয়ে যাবে।” একটু থেমে মহামতি গ্রাহাম বললেন, “আমার আর তোমার কথাটি শব্দগত দিক দিয়ে খুব কাছাকাছি হলেও এর অর্থে কিন্তু বিস্তর ফারাক আছে।”
দ্রিণা হেসে বলল, “আমি তো আপনার মত বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ নই মহামতি গ্রাহাম। তাই আমার চিন্তা-ভাবনা আপনার মত প্রসারিত নয়। তবে আমার মনে হচ্ছে আমরাই আমাদের সৌরমন্ডলের প্রথম টাইপ-২ সভ্যতা হব।”
“সেটা হলে তো বিজ্ঞান একাডেমির প্রধাণ হিসাবে আমি সবচেয়ে গর্বিত হব।”
“সেটাই হবে, আপনি দেখে নিয়েন মহামতি গ্রাহাম।” দ্রিণা একটু কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “আপনি বিশ্রাম করুন মহামতি গ্রাহাম।” তারপরে সে আরো বলল, “ভুলে যাবেন না আগামীকাল নিনাশগ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা আমাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ফলাফল জানাবে। পৃথিবীবাসী অধীর আগ্রহে এই ফলাফল শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি জানি, আগামীকাল পৃথিবীবাসীর জন্য এক গৌরবময় দিন হতে যাচ্ছে।”
“তোমার মনের আশা পূর্ণ হোক দ্রিণা।” মহামতি গ্রাহাম বললেন, “এবার আমাকে একটু একা থাকতে দাও।”
দ্রিণা চলে যাবার পর নির্জন কক্ষে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে মহামতি গ্রাহাম মানব সভ্যতার ইতিহাস ভাবতে থাকলেন। সেই গুহামানবের যুগ থেকে আগুন জ্বালানো শেখা। সেখান থেকে শুরু করে এই তেত্রিশশো শতাব্দিতে এসে মানবজাতি এখন টাইপ-১ সভ্যতাতে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে মানুষ এখন পৃথিবীর সব শক্তি ব্যবহার করতে পারে। অথচ প্রযুক্তির এই বিশাল পথ পাড়ি দিতে মানবজাতিকে কত সহস্র যুদ্ধ-বিগ্রহ, হিংসা আর হানাহানির ভিতর দিয়ে যেতে হয়ছে সেটা বলার মত নয়। গত এক সহস্রাব্দ মানবজাতি শুধু মারামারি আর হানাহানি করে গিয়েছে শুধু পৃথিবীর সব শক্তির উৎসগুলো নিজেদের আয়ত্বে আনার জন্য। সেই হানাহানিতে পৃথিবীর কত শত জনপথ একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে। শুধুমাত্র যারা শক্তিধর ছিল তারাই টিকে গিয়েছে পৃথিবীতে। তারাই পৃথিবীর সব শক্তির উৎসগুলোকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানের টাইপ-১ সভ্যতা গড়ে তুলেছে।
সহস্র বছর আগে দার্শনিক কার্দাসিয়েভ* সভ্যতার এই স্তরগুলো তৈরি করেছিলেন। মানবজাতি টাইপ-২ সভ্যতায় উন্নীত হলে সূর্য থেকে প্রাপ্ত সাম্ভব্য সব শক্তি ব্যবহার করতে পারবে। সেক্ষত্রে সূর্যের চারিদিকে ডাইসন* গোলক বসাতে হবে যেনো সূর্যের সব শক্তি কাজে লাগানো যায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেটা মানবজাতির পক্ষে বর্তমানে অসম্ভব। তাছাড়া কোনভাবে যদি ডাইসন গোলক বানানোও যায় সেটা পুরো সৌরমন্ডলকে অন্ধকার করে দিবে। ডাইসন গোলক ছাড়াও কিভাবে একটা নক্ষত্রের সবটুকু শক্তি নিজেদের আয়ত্ত্বে নেয়া যায় সেটা মানবজাতির বর্তমান প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। টাইপ-২ সভ্যতায় পরিণত হতে মানুষের হয়ত আরো লক্ষ বা কোটি বছর লেগে যেতে পারে। কিন্তু নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীরা যদি মানবজাতিকে সেই প্রযুক্তি দেয় তাহলে মানুষ এক লহমায় সভ্যতার একটি বিশাল ধাপ অতিক্রম করে ফেলবে।
কয়েক বছর আগে যখন নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীরা বিজ্ঞান একাডেমির সাথে যোগাযোগ করেছিল তখন তারা বলেছিল যে এভাবে কোন প্রজাতিকে সভ্যতার একটি স্তর একলাফে পার করে দেয়া যায় না। সেজন্য, পুরো একটা প্রজন্মকে ধাপে ধাপে জিনেটিক্যালি পরিবর্তন করেই সভ্যতা গ্রহণের উপযুক্ত করেই সভ্যতা হস্তান্তর করতে হয়। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির যেসব সভ্যতা নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীদের দেয়া প্রযুক্তি পাবে তাদের সকলকেই আগে সভ্যতার একটি ধাপ অতিক্রমের উপযুক্ত করেই প্রযুক্তি দেয়া হবে।
নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীরা টাইপ-৭ স্তরের সভ্যতা। সভ্যতার এই স্তরের অধিবাসীরা পুরো মহাবিশ্ব ও অন্যান্য ডায়মেনশনের মহাবিশ্বগুলো ইচ্ছামত পরিবর্তন করতে পারে। তারা একই সাথে শক্তি, একই সাথে বাস্তব। তারা চাইলেই এক মহাবিশ্ব ছেড়ে নিজের ইচ্ছেমত আরেক মহাবিশ্ব মূহূর্তেই বানিয়ে নিতে পারে। সেই মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র তারা নিজেরাই ঠিক করে নিতে পারে। তারা চাইলেই অস্তিত্বে থাকতে পারে, চাইলেই বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাদের অস্তিত্ব, আকার, আয়তন বা চেতনা মানবজাতির পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব।
এসব ভাবতে ভাবতেই বিজ্ঞান একাডেমীর মহামতি গ্রাহাম নিজের অফিস কক্ষের ইজিচেয়ারে ঘুমিয়ে পড়লেন।
২/
বিজ্ঞান একাডেমীর মূল সভাকক্ষে এখন তুমুল উত্তেজনা বিরাজ করছে। সভাকক্ষের বিশাল টেবিলের চারপাশে পৃথিবীসেরা বিজ্ঞানীরা বসে আছেন। মূল আসনটিতে বসে আছেন মহামতি গ্রাহাম। উনার চুল খুব অবিন্যস্ত, চোখের নীচে কালি। বোঝা যাচ্ছে যে কোন কারণে উনি ভিতরে ভিতরে খুব বিধ্বস্ত।
কিছুক্ষণের মধ্যই বিজ্ঞান একাডেমীর সাথে নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীদের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। নিনাশ গ্রহানুপুঞ্জের অধিবাসীরা মানবজাতিকে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে। পুরো পৃথিবী অধীর আগ্রহে এই সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করছে।
পদার্থবিজ্ঞানী ক্ত্রিকি বলল, “টাইপ-২ সভ্যতায় উন্নীত হলে আমরা আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের অন্যান্য সৌরমন্ডলগুলোতে ভ্রমণ করতে পারব। তখন ট্রাকিনার অনেক সুবিধা হবে অন্য সৌরমন্ডলের গ্রহগুলো টেরাফরমিং করে মানুষ বসাবসের উপযোগী করে তোলা।
ট্রাকিনা পরিবেশবিজ্ঞানী। মাঝ বয়েসী মেয়ে। সে তার ছোট করে ছাটা চুলগুলো বিন্যস্ত করতে করতে বললা, “টাইপ-২ সিভিলাইজেশন হলে যেকোন গ্রহের কক্ষপথ পরিবর্তন করা প্রযুক্তি আমাদের হাতে থাকবে। আর কক্ষপথ পরিবর্তন করলে সেই গ্রহের অবহাওয়া এমনিতেই আমূল পরিবর্তন হবে। তখন মানুষের উপযোগী করে গ্রহগুলো টেরাফরমিং করা কোন ব্যাপারই না। সেক্ষত্রে অবশ্য গ্রহগুলোর কক্ষপথ পরিবর্তন করতে মহাকাশ বিজ্ঞানী এয়ির সাহায্য লাগবে।”
মহাকাশ বিজ্ঞানী এয়ি ছেলে নাকি মেয়ে সেটা বোঝা খুব দুস্কর। সে বলল, “টাইপ-২ সভ্যতায় এসব করা কোন ব্যাপারই না। বস্তুকে শক্তিতে পরিবর্তন করার নীতি ব্যবহার করে আমরা খুব সহজেই একটা পুরো গ্রহকে শক্তিতে পরিণত করে ফেলতে পারব। তারপর সেই শক্তিকে একটা ছোট ক্যাপসুলের ভিতরে ভরে আমরা অন্য কোথাও গিয়ে আবার গ্রহটাকে বের করে আনতে পারব। তখন একটা গ্রহের কক্ষপথ পরিবর্তন করা খুব মামুলি একটা ব্যাপার হবে।”
সমাজবিজ্ঞানী রিকো বলল, “এতো দেখি আলাদিনের চেরাগের মত অবস্থা। একটা চেরাগের ভিতর একটা আস্ত দৈত্য থাকার রুপকথার মত অবস্থা।”
রিকোর কথায় সবাই হেসে উঠল। পদার্থবিজ্ঞানী ক্ত্রিকি বলল, “মহামতি গ্রাহাম, তোমাকে এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন? তুমি কি কোন কারণে খুব চিন্তিত?”
মহামতি গ্রাহামের উত্তরের অপেক্ষা না করেই গণিতবিদ বেঞ্জামিন বলে উঠল, “মহামতি গ্রাহাম হয়ত ভাবছেন যে নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা টাইপ-২ প্রযুক্তি মানুষদের না দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে দিবে। ওরা নিউরাল কম্পিউটারের মাঝে সিমুলেশন করে সূর্য বানিয়ে সেই সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে নিউরাল কম্পিউটার চালাবে।” খুব উচ্চ মানের এক রসিকতা হয়েছে ভেবে গণিতবিদ বেঞ্জামিন ‘হো হো’ করে নিজেই হেসে উঠল।
মহামতি গ্রাহাম নীচু কন্ঠে বললেন, “তোমাদের উচ্ছাসগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। তোমরা পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানী, মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। পুরো পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের নেতৃত্ব দাও তোমরাই। কিন্তু, মানবজাতির একটা বিশাল প্রযুক্তিগত পথ পাড়ি না দিয়ে সভ্যতার একটা বিশাল স্তর পার করে ফেলাটা কি ঠিক হবে?”
সভাকক্ষের অনেকেই একসাথে কথা বলে উঠল। মহামতি গ্রাহাম হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। মহামতি গ্রাহাম বললেন, “দেখো আমরা এখনো টাইপ-২ সভ্যতার প্রযুক্তি হাতে পাইনি। পাবো, নাকি পাবো না, সেটাও এখনো জানি না। নিজেদের তৈরি না করে এত বড় একটা প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য কতটুকু কল্যাণকর হবে সেটাও আমরা জানি না। তবে আমার মনে হয়, মানবজাতি যদি নিজেই এই প্রযুক্তিটুকু অর্জন করে নিত তাহলে সেটা বেশি ভালো হত।”
সভাকক্ষে সবাই একসাথে কথা বলে উঠল। মহামতি গ্রাহাম হাত তুলে সবাইকে বললেন, “আমি জানি আমার কথাটা তোমাদের কাছে ভালো লাগছে না। কিন্তু আমি আমার মতামত দিলাম। তবে নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা আমাদের টাইপ-২ সভ্যতার প্রযুক্তি দলে আমরা অবশ্যই সেটা গ্রহণ করব।” মহামতি গ্রাহাম একটু থেমে বললেন, “আমাদের হাতে আর সময় নেই। আর অল্প কিছুক্ষণ পরেই নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা আমাদের সাথে যোগাযোগ করে ওদের সিদ্ধান্ত জানাবে। আগামীকাল হয়ত মানবজাতির জন্য এক নতুন অধ্যায় হবে। কিন্তু সেটা কি রকম হবে সেটা আমাদের কারো জানা নেই।”
মহামতি গ্রাহাম তাঁর হাত উপরে তোলা মাত্রই সভাকক্ষের বিশাল দরজাটি নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। সেই সভাকক্ষে কিছুক্ষণের ভিতর নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীর যোগাযোগ করে মানবজাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি জানাবে।
৩/
বিজ্ঞান একাডেমির সভাকক্ষের ঠিক মাঝামাঝি একটা জায়গায় একটা পোর্টাল আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। এই পোর্টালের মাধ্যমেই নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা বিজ্ঞান একাডেমির সাথে যোগাযোগ করে। এই পোর্টালটি স্পেস টাইমের এক বিশাল ব্যবধান ঘুঁচিয়ে দিয়ে পৃথিবীবাসীর সাথে যোগাযোগ তৈরি করছে। এই পোর্টালের চারিদিকের চেয়ারগুলোতে পৃথিবীসেরা বিজ্ঞানীরা নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীদের সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করছে।
পোর্টালের ঠিক মাঝখানে সাদা একটা বিন্দু বড় হচ্ছে। বিন্দুটিকে ঠিক সাদা না বলে এক শূণ্যতা বলা যেতে পারে। সেই শূণ্যতায় যেন এক অসীম বিস্তৃতি। সেই বিস্তৃতি থেকে একটি কন্ঠে ভেসে আসল, “স্বাগতম হে মানব সম্প্রদায়!”
বিজ্ঞান একাডেমির সবাই বলে উঠল, “স্বাগতম হে নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসী। পৃথিবীবাসীর পক্ষ থেকেও আপনাদেরকে স্বাগতম।”
সেই বিস্তৃতি বলে উঠল, “আমরা জানি পৃথিবীবাসী আজকে অধীর আগ্রহে আমাদের সিদ্ধান্ত জানার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমরা কি আমাদের সিদ্ধান্ত শোনার জন্য প্রস্তুত?”
মহামান্য গ্রাহাম বলে উঠল, “হ্যাঁ নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসী, আমরা প্রস্তুত।”
“আমরা খুবই প্রীত হলাম।” সেই অসীম বিস্তৃতি থেকে ভেসে এলো, “আমাদের সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত জানানোর আগে আমরা সেই গ্রহের বাসিন্দাদের কোন প্রশ্ন থাকলে সেটা করার অনুমতি দেই। তোমরা আমাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রশ্ন করো। মনে রেখো, প্রশ্ন করার মাধ্যমেই সভ্যতা এগিয়ে যায়। যারা প্রশ্ন করেনা, তারা কখনো কোন সভ্যতা তৈরি করতে পারেনি। তোমাদের প্রশ্নের ধরনই বলে দিবে তোমরা কতটুকু সভ্য।”
পদার্থবিজ্ঞানী ক্ত্রিকি বলল, “সভ্যতার সপ্তম স্তরে তোমাদের প্রযুক্তিগুলো কেমন?”
“সভ্যতার প্রাথমিক স্তরে প্রযুক্তির দরকার হয়। সভ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে কোন প্রযুক্তি লাগে না। আমরা চাইলেই আমাদের রিয়েলিটি পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে করে নতুন আমাদের যা দরকার সেটা করে নিতে পারি। আমাদের শক্তির দরকার হয় না। আমরা একই সাথে বস্তু ও শক্তি। তাই আমাদের অস্তিত্বের দরকার হয় না। কারণ, আমরাই সবকিছুর অস্তিত্ব। বেঁচে থাকা আমাদের কাছে কোন অর্থ বহন করে না, ঠিক তেমনি বেঁচে না থাকাটাও আমাদের কাছে কোন অর্থ বহন করে না। আমরা চির শ্বাশ্বত।” কন্ঠস্বরটি একটু থেমে বলল, “সভ্যতার প্রথম বা দ্বিতীয় স্তরে থেকে তোমরা এসব বুঝতে পারবে না। এমনকি সভ্যতার ষষ্ঠ স্তরে থাকলেও তোমরা এটা ঠিকমত বুঝতে পারতে না।”
ট্রাকিনা অবাক হয়ে বলল, “তাহলে কি সময়েরও কোন অর্থ তোমাদের কাছে নেই।”
“আমাদের কাছে সময়ের কোন অর্থ নেই। আমরা চাইলেই সময়ের সামনে বা পেছনে চলে যেতে পারি, ফিরে আসতে পারি। আমরা চির শ্বাশ্বত।”
মহাকাশ বিজ্ঞানি এয়ি বলল, “তাহলে তো তোমাদের অবস্থানেরও দরকার হয় না। সেক্ষেত্রে তোমরা নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জে কেন থাকো?”
“আমরা কখনো বলি নি যে আমরা নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জে বসবাস করি। আমরা নিনাশ গ্রহাণুপুঞ্জ থেকে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সব সভ্যতার সাথে যোগাযোগ করি। আমরা তোমাদের মহাবিশ্বেও থাকি, আবার অন্য মহাবিশ্বেও বিচরণ করি। দরকার হলে আমরা নিজেরাই নিজেদের মত মহাবিশ্ব তৈরি করে নেই।”
সমাজবিজ্ঞানী রিকো বলল, “আচ্ছা তাহলে তোমাদের সমাজব্যবস্থা ঠিক কেমন?”
“আমাদের কোন সমাজব্যবস্থা নেই। আমরা একই সাথে একক, আবার দলবদ্ধ। আমরা একই সাথে অস্তিত্ব, আবার একই সাথে সীমাহীন শূণ্যতা। এটা তোমরা বুঝতে পারবে না।”
মহামতি গ্রাহাম বললেন, “হে মহান স্বত্বা, তাহলে কি তোমরা কখনো ধ্বংস হবে না?”
“আমরা ধ্বংসের মাধ্যমেই সৃষ্টি হই। আমরা একই সাথে ধ্বংস আর একই সাথে সৃষ্টি। অসীম থেকে অসীম বিয়োগ দিলে সেটা তখনও অসীম থাকে। সসীম থেকে কিছু বিয়োগ দিলেই সেটা ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়। তোমার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ মহামতি গ্রাহাম।”
মহামতি গ্রাহাম বললেন, “হে মহান স্বত্বা, তোমরা কি এখন আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবে?”
“অবশ্যই মহামতি গ্রাহাম।” পোর্টালের সেই অসীম বিস্তৃতি থেকে ভেসে এল, “আমরা তোমাদের বলেছিলাম যে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রতিটি সৌরমন্ডলে থাকে সর্বোচ্চ সভ্যতাটিকে আমরা সেই সৌরমন্ডলে থাকা অন্য সব সভ্যতার চেয়ে চেয়ে এ ধাপ উপরে নিয়ে যাবো।” পোর্টাল থেকে ভেসে আসা স্বরটি একটু থেমে বলল, “আমরা চাই, প্রতিটি সৌরমন্ডলে থাকা সর্বোচ্চ সভ্যতাটি যেন সেই সৌরমন্ডলে থাকা অন্য সব প্রজাতির সভ্যতার পাশে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। কোন দুষ্ট প্রকৃতির সভ্যতা যেন তাদের বিনাশ না করে।”
বিজ্ঞান একাডেমির সভাকক্ষে পিনপতন নিরবতা। মহামতি গ্রাহাম মাথা নীচু করে বসে আছেন। বিজ্ঞানীরা শূণ্য দৃষ্টিতে পোর্টালের দিকে তাকিয়ে আছে। পোর্টাল থেকে ভেসে আসছে, “তোমাদের সৌরমন্ডলের পৃথিবী নামক গ্রহে মানব সম্প্রদায় সর্বোচ্চ সভ্যতা নয়। তোমরা টাইপ-২ সভ্যতার জন্য তৈরি নও।”
বিজ্ঞান একাডেমির সভাকক্ষে সবাই নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। পদার্থবিজ্ঞানী ক্ত্রিকি বলল, “পৃথিবীতে মানব সম্প্রদায় ছাড়া আর কোন সভ্যতা নেই। তাহলে তোমরা কাদের টাইপ-২ প্রযুক্তি দিচ্ছো?”
“তোমরা সভ্যতা কথাটি খুব আক্ষরিক অর্থেই নিয়েছো। সভ্যতা মানেই প্রযুক্তিগত উন্নয়ণ নয়। তোমাদের চারপাশেই রয়েছে তোমাদের চেয়ে অনেক সভ্য একটি প্রজাতি। সংখ্যায় তারা তোমাদের চেয়েও অনেক বেশি। তোমাদের একজনের বিপরীতে তাদের রয়েছে কয়েক মিলিয়ন সদস্য। তারা সংখ্যাগত দিক দিয়েও তোমাদের গ্রহে সবচেয়ে বেশি। তারা সুদক্ষ, তারা শিষ্ট, তারা আত্ম-বিধ্বংসী নয়। তোমরা তাদের পিপিলীকা বল।”
সমাজবিজ্ঞানী রিকো বলল, “তাই বলে পিপিলীকা? পিপিলীকা টাইপ-২ প্রযুক্তি দিয়ে কি করবে? ওরা কি এর কিছু বুঝবে?”
“হে মানব, টাইপ-২ প্রযুক্তি দিয়ে তাহলে তুমি কি করবে? তুমি কি নিজে টাইপ-২ প্রযুক্তি তৈরি করতে পারবে? পৃথিবী শুধু তোমার একার নয়। এই পৃথিবীতে শুধু তুমি একাই থাকো না। এই পৃথিবী ততটুকুই তোমার ঠিক যতটুকু একটি পিপীলিকার।”
মহামতি গ্রাহাম মাথা নীচু করে বসে আছেন, যেন তিনি আগে থেকে ব্যাপারটি জানতেন। অসীম বিস্তৃতি থেকে ভেসে আসা সেই কন্ঠে শোনা গেল, “হে মানব প্রজাতি, তোমরা জটিল, সৃজনশীল, কিন্তু তোমরা কুচক্রি ও তোমাদের সভ্যতা আত্মবিধ্বংসী। হাজার বছরেও তোমরা ঐক্য গড়তে পারোনি। পিপীলিকারা কখনো একে অপরকে কারণ ছাড়া হত্যা করেনি। তারা নিখুঁত সংগঠনে বাঁচে, নিজেদের চেয়ে উপনিবেশের মঙ্গলকে বড় মনে করে। তারাই তোমাদের সৌরমন্ডলের সবচেয়ে বড় প্রকৃত সভ্যতা।” সে কন্ঠ কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, “তোমাদের সভ্যতা কেমন কুচক্রি তার একটা উদাহরণ দেই। তোমাদের মহামতি গ্রাহাম ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে তোমরা সৌরমন্ডলের সবচেয়ে বড় সভ্যতা নও। সে আন্দাজ থেকেই তিনি তোমাদের গ্রহের সব প্রান্তে আবহাওয়া পরিশোধক নামে বড় বড় যে যন্ত্রগুলো বসিয়েছিলেন, সেগুলো আসলে ধীরে ধীরে পিপিলীকা নিধনের বায়ু ছড়াতো। তিনি চেয়েছিলেন পিপিলীকা সম্প্রদায় পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মানব সম্প্রদায় হবে টাইপ-২ সভ্যতার একমাত্র দাবীদার। পিপিলীকারা কখনোই তোমাদের এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চায়নি। তারা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের হয়েই কাজ করেছে। আমরা পিপিলীকা সম্প্রদায়কে রক্ষা করেছি। আমরা তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা তোমাদের কুচক্রি চাল জানার পরেও তাদের কাজ বন্ধ করেনি। মহামতি গ্রাহামের বায়ু পরিশোধক যন্ত্রগুলো আসলে কাজ করেনি।”
মহামতি গ্রাহাম আরো মাথা নীচু করে বসে আছেন। তার বিশাল রাজকীয় চেয়ারের মাঝে তাকে কেমন যেন অসহায় দেখাতে থাকে।
মহাকাশ বিজ্ঞানী এয়ি হতবুদ্ধি হয়ে বলল, “কিন্তু, তারা তো ছোট, সীমাবদ্ধ জীব।”
“আকার কোনো বিষয় নয়। আমরা তাদের জন্য তৈরি করব ন্যানো-ডাইসন নেটওয়ার্ক, যা সূর্যের শক্তি সংগ্রহ করবে তাদের স্কেলে। তারা তোমাদের চেয়ে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবে, কারণ তাদের অহংকার নেই। একদিন, তারা তোমাদের শিক্ষক হবে।”
পোর্টালের আলোকবিন্দু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। শেষ বাক্যটি যেন সমগ্র সভাকক্ষের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হল, “মনে রেখো হে মানব সম্প্রদায়, তোমরাই এই গ্রহের সবচেয়ে অসভ্য, সেটা কখনো ভুলে যেও না।”
আলো নিভে গেল। সভাকক্ষে শুধু শোনা যাচ্ছে ভারী নিঃশ্বাস। বাইরে, বিজ্ঞান একাডেমির জানালার কাছে, এক লম্বা সারি পিপীলিকা অবিরাম অগ্রসর হচ্ছে। তারাও হয়ত জেনে গেছে, তাদের ইতিহাস এখনই পাল্টে গেছে।
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২৩
আরাফাত৫২৯ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ
২|
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ১১:৩৭
রাজীব নুর বলেছেন: ভালো।
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪
আরাফাত৫২৯ বলেছেন: ধন্যবাদ
৩|
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩
হুমায়রা হারুন বলেছেন: খুব ভাল লাগলো।
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪
আরাফাত৫২৯ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ
৪|
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৪১
কথামৃত বলেছেন: নিনাশ আসলে একটি গ্রহাণুপুঞ্জ। এখানে কোনো বিশাল গ্রহ নেই; হাজার হাজার ছোট-বড় পাথর খালি চোখে দেখা মহাকাশে ভাসছে।
পৃথিবীর তুলনায় এখানে মাধ্যাকর্ষণ খুবই কম। এক লাফে আপনি অনেক উঁচুতে চলে যাবেন। পানি গোসলের সময় গ্লোবের আকারে ভেসে বেড়াবে।
গ্রহাণুপুঞ্জের অধিবাসীরা সাধারণত তিনটি কারণে বিখ্যাত: খনিজ উত্তোলন, কারিগরি দক্ষতা এবং বাণিজ্য।
©somewhere in net ltd.
১|
২৭ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৬:০৪
নকল কাক বলেছেন: খুব ভাল হয়েছে