| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রাথমিক শিক্ষার বিভাজন—একটি শিশুর ভবিষ্যৎ কি জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়?
(প্লে-গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি)
"একটি শিশুর হাতে প্রথম যে বইটি তুলে দেওয়া হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় তার ভবিষ্যতের ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তি যদি সবার জন্য এক রকম না হয়, তাহলে কি আমরা সত্যিই সমান সুযোগের সমাজ গড়ে তুলতে পারব?"
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য সকল শিশুকে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে একটি শিশুর শিক্ষা অনেকাংশেই নির্ভর করে সে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে, তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য কত, এবং তার আশেপাশে কী ধরনের শিক্ষা-পরিবেশ রয়েছে।
আজকের বাংলাদেশে একই বয়সী দুই শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরু একেবারেই ভিন্ন হতে পারে। একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, আরেকজন বেসরকারি বা বিদেশি কারিকুলামের স্কুলে। একই দেশের নাগরিক হলেও তাদের শেখার পদ্ধতি, ভাষা, বই, মূল্যায়ন, এমনকি ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও ভিন্ন।
প্রশ্ন হলো—এই বৈচিত্র্য কি একটি শক্তি, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি বিভক্ত শিক্ষা-ব্যবস্থা তৈরি করছে?
প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে একটি শিশু সাধারণত নিম্নলিখিত ধারাগুলোর যেকোনো একটিতে শিক্ষাজীবন শুরু করে
১। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
২। সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত (এমপিওভুক্ত) বা স্বায়ত্তশাসিত বিদ্যালয়
৩। বেসরকারি বিদ্যালয়
৪। ইংরেজি ভার্সন
৫। ইংরেজি মিডিয়াম
৬। মাদ্রাসা (ইবতেদায়ি)
৭। হাফেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
৮। বিদেশি কারিকুলামভিত্তিক স্কুল
প্রতিটি ধারার নিজস্ব লক্ষ্য, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি রয়েছে। ফলে শুরু থেকেই শিশুদের শেখার অভিজ্ঞতা একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়।
প্রধান সমস্যাগুলো কোথায়?
১. এক দেশের মধ্যে বহু শিক্ষা-ধারা
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা একটি একক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধারার কারণে শিশুদের শেখার মান, ভাষাগত দক্ষতা, মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়।
একজন সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং একজন উন্নত বেসরকারি বা বিদেশি কারিকুলামের শিক্ষার্থীর মধ্যে শেখার সুযোগ ও পরিবেশ প্রায়ই সমান থাকে না।
২. শিক্ষার মানে বৈষম্য
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনেক উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আবার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বড় শ্রেণিকক্ষ, এবং শেখানোর পদ্ধতির দুর্বলতা শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করে।
অন্যদিকে, অনেক বেসরকারি ও বিদেশি কারিকুলামের স্কুলে
১। ছোট ক্লাস
২। তুলনামূলক বেশি শিক্ষক
৩। প্রযুক্তির ব্যবহার
৪। ইংরেজি চর্চা
৫। কার্যভিত্তিক শিক্ষা
এসব কারণে শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ধরনের সুবিধা পায়।
৩. ভাষাগত বৈষম্য
বাংলাদেশের অনেক শিশু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছেও সাবলীলভাবে বাংলা বা ইংরেজি পড়ে বুঝতে পারা দূরে থাক রিডিং পড়তে পারেনা।
অন্যদিকে, কিছু প্রতিষ্ঠানে একই বয়সের শিক্ষার্থীরা বই পড়ে বিশ্লেষণ করতে পারে, ইংরেজিতে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারে,
উপস্থাপনা দিতে পারে।
এই পার্থক্য পরবর্তী শিক্ষাজীবনে বড় প্রভাব ফেলে।
৪. মুখস্থনির্ভর শিক্ষা
অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াই প্রধান লক্ষ্য।
ফলে
১। প্রশ্ন করা নিরুৎসাহিত হয়,
২। বিশ্লেষণী চিন্তার সুযোগ কমে,
৪। বাস্তব সমস্যার সমাধান শেখানো হয় না,
৫। সৃজনশীলতার পরিবর্তে মুখস্থ বিদ্যার উপর নির্ভরতা তৈরি হয়।
৬। কোচিং-নির্ভর সংস্কৃতি (প্রাথমিক স্কুলেও স্কুলের পড়ে কোচিং করাতে হয়, আফসোস)
বিদ্যালয়ের পাঠ অনেক ক্ষেত্রে কোচিং ছাড়া সম্পূর্ণ হচ্ছে না—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরেই আলোচিত।
এতে দুটি সমস্যা তৈরি হয়—
আর্থিকভাবে সক্ষম পরিবার অতিরিক্ত সুবিধা পায়।
অসচ্ছল পরিবারের শিশুরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে।
৬. শিক্ষক এবং তার জবাবদিহিতা
শিক্ষকই একটি শিশুর প্রথম পথপ্রদর্শক। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং জবাবদিহির মান সব প্রতিষ্ঠানে সমান নয়।
যেখানে দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কার্যকর তদারকি থাকে, সেখানে শিক্ষার মানও সাধারণত ভালো হয়।
৭. পাঠ্যবই বনাম বাস্তব জীবন
অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মধ্যে ফাঁক থেকে যায়।
বর্তমান বিশ্বে প্রয়োজন
১। সমস্যা পর্যবেক্ষণ ও সমাধান
২। যোগাযোগ দক্ষতা,
৩। প্রযুক্তি শিক্ষা ও ব্যবহার
৪। দলগতভাবে কাজ সম্পন্ন,
৫। যুক্তিনির্ভর চিন্তা।
৬। সামাজিক সচেতনতা তৈরি
কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে এসব দক্ষতা সব প্রতিষ্ঠানে সমান গুরুত্ব পায় না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের উপর।
কিন্তু যখন একটি শিশু জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা-ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে
১। তারা কি একই জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ নিয়ে বড় হবে?
২। তারা কি একই মানের মৌলিক দক্ষতা অর্জন করবে?
৩। শিক্ষা কি সুযোগের সমতা তৈরি করছে, নাকি বৈষম্য আরও বাড়াচ্ছে?
উপসংহার
প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর জীবনের আতুরঘর। এখানেই তার ভাষা, চিন্তা, চরিত্র, শেখার অভ্যাস এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হয়।
যদি এই ভিত্তি সবার জন্য সমান শক্তিশালী না হয়, তাহলে উচ্চশিক্ষায় গিয়ে সেই বৈষম্য আরও বড় হয়ে ওঠে।
তাই বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে যেকোনো সংস্কারের আলোচনা শুরু হওয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়—গড়ে ওঠে শিশুর প্রথম শ্রেণিকক্ষে।
যদি শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য হয় নিজের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন এবং দশের উন্নয়ন তবে শুরুতেই এতো বৈষম্য কেন? 
©somewhere in net ltd.