| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস... খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে... কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়। আমার অদক্ষ কলমে... যদি পারো ভালোবেসো তাকে... ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে, যে অকারণে লিখেছিল মানব শ্রাবণের ধারা.... অঝোর শ্রাবণে।।
চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....
বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগের সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা তাই নিছক একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন।
বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। একজন বিদেশি ক্রেতা শুধু পণ্যের দাম ও মান বিবেচনা করেন না; পণ্য সময়মতো সরবরাহ করা যাবে কি না, বন্দরে কনটেইনার কত দিন আটকে থাকবে এবং পরিবহনব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য- এসব বিষয়ও তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বন্দরের অদক্ষতার কারণে রপ্তানিকারককে অর্ডার হারাতে হলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় পুরো অর্থনীতিকে।
আমাদের বন্দরের প্রধান সমস্যা কোথায়?
চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান, জাহাজের অপেক্ষাকাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম গড়ে আড়াই দিন, যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক কার্যক্রমে গড় সময় ২৪ ঘণ্টা। আমাদের বন্দরে প্রতি ঘণ্টায় ক্রেন দিয়ে গড়ে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় ৩৫টির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে, ২০০৭ সালে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বা ইকুইপমেন্ট অ্যাভেইলেবিলিটি প্রায় ৭০ শতাংশ- যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ৯৩ শতাংশের কথা বলা হচ্ছে।
এই ব্যবধান কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর অর্থ হলো সময়, অর্থ ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অপচয়।
তাহলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়া কেন?
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ বা জনস্বার্থের রক্ষক হয়ে যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং রাষ্ট্রের কার্যকর তদারকির ওপর।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোঃ
(১). মেয়াদঃ চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। পারস্পরিক সমঝোতা না হলে মেয়াদ বাড়ানো বাধ্যতামূলক নয়।
(২). অগ্রিম অর্থঃ চুক্তির শুরুতেই ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আপফ্রন্ট ফি দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩). বিনিয়োগঃ টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
(৪). রাজস্ব সুরক্ষাঃ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ন্যূনতম ভলিউম গ্যারান্টি, প্রতি টিইইউ অনুযায়ী রাজস্বের অংশ এবং বার্ষিক নির্ধারিত ফি প্রদানের ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে।
(৫). কর্মদক্ষতার বাধ্যবাধকতাঃ ট্রাকের অবস্থানকাল, ক্রেনের উৎপাদনশীলতা এবং অন্যান্য কার্যকরী সূচকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। টানা তিন মাস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৬). কর্মচারীদের সুরক্ষাঃ বন্দরের কর্মচারীদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ধারা রাখা হয়েছে।
(৭). তদারকি ও জবাবদিহিঃ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনাগত তদারকি অব্যাহত থাকবে। সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সাপ্তাহিক ও মাসিক পরিচালনাগত তথ্য এবং রাজস্বের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
এসব শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিই হবে চুক্তির সফলতা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
আমি মনে করি, সরকার ব্যবসা করার জন্য বন্দর পরিচালনা করে না। বন্দরের উদ্দেশ্য শুধু নিজস্ব আয় বাড়ানো নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। বন্দরের কার্যকারিতা বাড়লে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমতে পারে, রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হতে পারে এবং দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
অতএব, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির মূল্যায়ন শুধু সরকার কত টাকা পাবে কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠান কত লাভ করবে- এই সংকীর্ণ হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। দেখতে হবে, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কতটা লাভবান হচ্ছে। তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরিঃ
★চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, আর্থিক কাঠামো ও দায়বদ্ধতা যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা।
★বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ও কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা নিয়মিত যাচাই করা।
★বন্দরের কর্মচারীদের আইনগত অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করা।
★রাষ্ট্রের তদারকি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
★নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে চুক্তি অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
★চুক্তির মেয়াদ শেষে বা চুক্তি বাতিলের পরিস্থিতিতে বন্দরের কার্যক্রম যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা রাখা।
উপসংহারঃ
চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন কোনো দলীয় বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের প্রশ্ন।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া মানেই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন নয়; আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়েছে বলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তাও নেই।
প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ চুক্তি, কঠোর জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের কার্যকর তদারকি।
আমরা চাই, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দর হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হোক।
কারণ বন্দরের সাফল্য মানে শুধু বন্দরের সাফল্য নয়- এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্য।
(গত ৭ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় পোস্ট)
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২০
জুল ভার্ন বলেছেন: চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানেই কি জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া?
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ- এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু জাতীয় সম্পদ বলেই কি তার অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা মেনে নিতে হবে? দেশীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা দূর করার পরিবর্তে শুধু দেশীয় পরিচয়ের কারণে সেই ব্যবস্থাপনাকেই আঁকড়ে ধরে রাখার নাম কি আত্মনির্ভরশীলতা?
প্রথমেই একটি মৌলিক পার্থক্য বুঝতে হবে- বন্দরের মালিকানা এবং বন্দরের পরিচালনাগত দায়িত্ব এক বিষয় নয়। কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানেই বন্দরের মালিকানা বা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব তার হাতে তুলে দেওয়া নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো যায়।
আপনি বলেছেন, দুর্নীতি বন্ধ করে, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং যোগ্য জনবল নিয়োগের মাধ্যমে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই বন্দরের উন্নয়ন করা সম্ভব। অবশ্যই সম্ভব- কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উদ্যোগ এত দিন কার্যকরভাবে নেওয়া হয়নি কেন? যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের ব্যর্থতার দায় কি শুধু দেশীয় ব্যবস্থাপনার শ্রেষ্ঠত্বের তাত্ত্বিক বয়ান দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যায়?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় আড়াই দিন, যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক কার্যক্রমে প্রায় ২৪ ঘণ্টার কথা বলা হচ্ছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা প্রায় ৭০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের উৎস ও তুলনার ভিত্তি যাচাই করা জরুরি। তবে সমস্যাগুলো যদি বাস্তব হয়, তাহলে সেগুলোর সমাধানে দক্ষতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি কোথায়?
আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনলেই দক্ষ বন্দর গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন পেশাদার ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং কঠোর জবাবদিহি। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এসব ক্ষেত্রে উন্নতি আনা গেলে তা জাতীয় স্বার্থবিরোধী হবে কেন?
চুক্তির বিষয়ে আপনার উদ্বেগও উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ১৫ বছরের মেয়াদ দীর্ঘ; তাই চুক্তির আর্থিক শর্ত, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের অধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং চুক্তি শেষে পরিচালনাগত সক্ষমতা দেশীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত চুক্তির শর্ত বিশ্লেষণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দাবি করা- শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান বলে বিরোধিতা করা নয়।
প্রদত্ত চুক্তির সারাংশ অনুযায়ী, প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি, ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, রাজস্ব ভাগাভাগি, নির্ধারিত ফি, কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব শর্ত চূড়ান্ত চুক্তিতে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যাবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিশ্রুত বিনিয়োগকে বাস্তব বিনিয়োগ এবং কাগজে-কলমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে অর্জিত সাফল্য ধরে নেওয়া যাবে না।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার- বিদেশি প্রতিষ্ঠান মুনাফা করবে, এটাই তার ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই মুনাফার বিনিময়ে বাংলাদেশ যদি উন্নত সেবা, দ্রুত পণ্য পরিবহন, কম পরিচালনাগত বিলম্ব, নতুন বিনিয়োগ এবং অধিক প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে চুক্তিটি দেশের জন্য লাভজনক হতে পারে। বিপরীতে, রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে বা প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জিত না হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর বিধান থাকতে হবে।
জাতীয় স্বার্থ মানে বিদেশি দক্ষতা প্রত্যাখ্যান করা নয়; জাতীয় স্বার্থ মানে বিদেশি দক্ষতাকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগানো।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ করে তোলা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সক্ষমতা গড়ে ওঠার অপেক্ষায় দেশের রপ্তানিকারক, বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিকে অদক্ষতার মূল্য দিতে হবে কেন? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, প্রযুক্তি গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার পরিচালনাকারীর সহায়তা নেওয়াও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথ হতে পারে- যদি চুক্তিতে দেশীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, জ্ঞান হস্তান্তর ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকে।
আমার বক্তব্য পরিষ্কারঃ চট্টগ্রাম বন্দরের দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে বলেই সিদ্ধান্তটি সঠিক- এমন দাবি করছি না। আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পেয়েছে বলেই সিদ্ধান্তটি জাতীয় স্বার্থবিরোধী- এমন সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয়।
সিদ্ধান্তের বিচার হতে হবে তথ্য, চুক্তির শর্ত, বাস্তব ফলাফল এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ভিত্তিতে; বিদেশি-দেশীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
বন্দর বাংলাদেশের, মালিকানা বাংলাদেশের, জাতীয় স্বার্থও বাংলাদেশের। পরিচালনাকারী যে-ই হোক, তার কাছে জবাবদিহি চাইতে হবে বাংলাদেশকেই। আর যদি কেউ মনে করেন দেশীয় ব্যবস্থাপনাই আরও ভালো ফল দিতে পারত, তাহলে তাঁর দায়িত্ব শুধু আপত্তি তোলা নয়- কীভাবে, কত খরচে, কত সময়ে এবং কোন জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় সেই ফল অর্জন করা সম্ভব, তার বাস্তবসম্মত বিকল্পও তুলে ধরা।
আমরা যদি বিদেশ থেকে প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলজ্ঞান ও শিল্পব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারি, তাহলে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক দক্ষতা গ্রহণের প্রশ্নে আপত্তি কোথায়?
জাতীয় সম্পদকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার দেশীয় পরিচয় রক্ষা করা নয়; সেই সম্পদকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহার নিশ্চিত করাও দেশপ্রেম।
©somewhere in net ltd.
১|
১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৪৮
ডঃ এম এ আলী বলেছেন:
চট্টগ্রাম বন্দর কোনো বিদেশি কোম্পানির ব্যাবস্থাপনায় ন্যস্ত করে ব্যবসায়িক পরীক্ষাগার নয়; এটি বাংলাদেশের
জাতীয় সম্পদ। বন্দরের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে ব্যর্থ হয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের জন্য বিদেশি
কোম্পানির হাতে পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া কোনো দূরদর্শী সমাধান নয়; বরং দেশীয় ব্যবস্থাপনার
বিকাশ ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পথ সংকুচিত করার ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রশ্ন হলো, দুর্নীতি বন্ধ, জবাবদিহি নিশ্চিত, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং যোগ্য জনবল নিয়োগের মাধ্যমে
নিজেদের বন্দরকে নিজেরাই দক্ষভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার
দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের; সেই ব্যর্থতাকে বিদেশি কোম্পানির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার যুক্তি
হিসেবে ব্যবহার করা দায়িত্ব এড়ানোরই নামান্তর।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জাতীয়
গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনাগত দায়িত্ব দীর্ঘ মেয়াদে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। এতে দেশীয় জনবলের
দক্ষতা, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপরন্তু, বিদেশি কোম্পানির
মুনাফার স্বার্থ আর রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ যে এক, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
আমাদের প্রয়োজন বিদেশি নির্ভরতা নয়, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ দেশীয় ব্যবস্থাপনা। চট্টগ্রাম বন্দরের সংস্কার, প্রযুক্তির
আধুনিকায়ন ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে দেশীয় সক্ষমতা দিয়েই এর উন্নয়ন সম্ভব কি না, তা আগে
যাচাই করা উচিত। জাতীয় সম্পদ পরিচালনায় নিজেদের অক্ষমতা মেনে নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল
হওয়া কোনো গৌরবের বিষয় নয়; বরং নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
বন্দরকে আধুনিকায়ন করতে হবে, কিন্তু দেশীয় সক্ষমতাকে বিসর্জন দিয়ে নয়। জাতীয় সম্পদের প্রকৃত সাফল্য হলো
নিজেদের সম্পদ নিজেরাই দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে পরিচালনা করতে শেখা।