| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

অনেক দিন আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায় এমন একটি ভাবনা পড়েছিলাম—যুদ্ধ যখন দূরে থাকে, তখন তাকে নিয়ে আমরা উত্তেজিত হই, আলোচনা করি, পক্ষ-বিপক্ষ নিই। কিন্তু সেই যুদ্ধ যখন নিজের উঠোনে এসে দাঁড়ায়, তখন তার ভয়াবহতা আর কোনো বিমূর্ত বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে একেবারে ব্যক্তিগত বাস্তবতা।
কথাটি যে কত বড় নিষ্ঠুর সত্য, তা গত পরশু আমার এক প্রাক্তন সহকর্মীর সাথে কথা বলতে গিয়ে আবারও নতুন করে অনুধাবনে এলো।
হঠাৎ কথা হতেই জানালেন, গত সপ্তাহে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে টানা সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। রক্তের নানাবিধ জটিলতায় শরীর ও মনের ওপর দিয়ে যেন এক ঝড় বয়ে গেছে। সুস্থ হয়ে ফিরলেও সেই আতঙ্কের ছাপ এখনো তাঁর গলায় স্পষ্ট। খবরটি শুনে মনটা বেশ ভারী হয়ে গেল। কারণ, প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় যখন ডেঙ্গু আক্রান্ত কিংবা মৃত্যুর খবর পড়ি—সেটিকে কেমন যেন দূরের এক পরিসংখ্যান মনে হয়। অথচ যখন নিজের চেনা কোনো মানুষ সেই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে আসে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—ঝুঁকিটা আর দূর সীমান্তের কোনো খবর নয়, তা এখন আমাদের ড্রয়িংরুম আর শোবার ঘরে ঢুকে পড়েছে।
আজকের সংবাদপত্রের একটি খবরের দিকে চোখ মেলালেই পরিস্থিতির গুরুত্ব পরিষ্কার বোঝা যায়। দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। সরকারি (DGHS) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৯,২২০ জন এবং মারা গেছেন ১৪১ জন। আইইডিসিআর (IEDCR) সতর্ক করে জানিয়েছে, ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় আগামী সপ্তাহগুলোতে এই সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতেই আসছে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপের সময়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ মাসব্যাপী দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা অভিযান শুরু করছে। তবে সরকারের মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং নাগরিকের নিজস্ব সচেতনতা—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট নিরসন করা সত্যি কঠিন।
কারণ, এডিস মশার প্রজননের জন্য খুব বড় কোনো জলাশয় দরকার হয় না; ফুলের টবের নিচের পাত্র, ফুলদানি, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা ঘরের আশপাশে জমে থাকা সামান্য পানিই এদের বংশবৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট। আর পূর্ণবয়স্ক মশা দিনের বেলা আমাদের ঘরের আবছা আঁধারে—যেমন পর্দার পেছনে, টেবিল বা সোফার নিচে বা আসবাবের আড়ালে বিশ্রাম নেয়। ফলে কেবল রাস্তার ওষুধ ছিটানো কর্মীদের ওপর ভরসা না করে, ঘরের ভেতরের এই বিপজ্জনক উৎসগুলো আমাদের নিজেদেরই ধ্বংস করতে হবে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাশের পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় বছরজুড়ে স্থায়ী নজরদারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ও সক্রিয় জনসচেতনতার মাধ্যমে তারা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সেই সমন্বিত উদ্যোগগুলো থেকে আমাদেরও অনেক কিছু শেখার রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব বেশ উদ্বেগজনক।
এই অবস্থায় আমাদের চার স্তরের সচেতনতা প্রয়োজন:
১. নিজের ঘর (প্রজনন উৎস ধ্বংস): সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজ নিজ বাসাবাড়িতে পরিচালনা করুন ‘সাপ্তাহিক ১০ মিনিটের ডেঙ্গু চেক’। ফুলের টবের প্লেট, ফ্রিজ বা এসি-এর ড্রেন ট্রে, ছাদ ও বারান্দায় থাকা ছোট পাত্রের জমে থাকা পানি ফেলে দিন।
২. নিজের শরীর (সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি): দিনে বা রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন কিংবা মশা নিরোধক ক্রিম ব্যবহার করুন। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ডেঙ্গু পরীক্ষা ও ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা মেনে চলুন।
৩. নিজের প্রতিষ্ঠান (অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান): কাজের জায়গা, স্কুল-কলেজ বা নির্মাণাধীন ভবনে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে, সে ব্যাপারে তদারকি বাড়াতে হবে।
৪. নিজের সমাজ (সামাজিক প্রতিরোধ): পাড়া-মহল্লা, ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ও স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে সবাই মিলে নিজ নিজ এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নিন।
ডেঙ্গুর খবর পড়তে পড়তে আমরা যেন এটিকে আর শুধু একটি শুকনো সংখ্যা বা কাগজ-কলমের পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখি। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে একজন মানুষ, একটি পরিবার, আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা।
আজ নিজের ঘরের এক বালতি বা একটি টবের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা হয়তো খুব ছোট একটি কাজ। কিন্তু হাজারো মানুষ যদি নিজ নিজ জায়গায় এই ছোট কাজটুকু একসঙ্গে করি, তবে সেটিই হয়ে উঠতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রতিরোধ। আসুন, দর্শক হয়ে না থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব আজই নিজ কাঁধে তুলে নিই।
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনি একেবারে মূল জায়গাটিতে আলো ফেলেছেন। আমরা যতটাই সচেতন হই না কেন, রাস্তাঘাট, খানাখন্দ কিংবা প্রকাশ্য জলাশয়গুলো পরিষ্কার রাখতে নাগরিক ও সামাজিক সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যতক্ষণ না প্রতিটি নাগরিক এই শহর বা এই এলাকাটিকে নিজের ঘর মনে করে দায়িত্ব নেবেন, ততক্ষণ এই মরণফাঁদগুলো থেকে মুক্ত হওয়া সত্যিই কঠিন।
আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
২|
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০১
শায়মা বলেছেন: নিজ বাড়ি পরিষ্কার পরিছন্ন রাখার পরেও অন্যের বাড়ি, দোকান পাট রেস্তোরায় সাবধান থাকতে হবে। কারণ যতই বলি না কেনো কেউ কেউ বিশেষ করে রেস্তোরা, হসপিটালের ওয়েটিং এরিয়াতে মশার উৎপাৎ থাকে।
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৯
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনি একেবারে প্রাত্যহিক জীবনের এক বড় উদ্বেগের জায়গায় আলো ফেলেছেন। নিজের বাড়ি শতভাগ পরিষ্কার রাখার পরও যখন আমরা হাসপাতাল, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বাসের ওয়েটিং এরিয়ার মতো বাণিজ্যিক ও জনবহুল স্থানগুলোতে যাই, সেখানে মশার এই উৎপাত সত্যিই আমাদের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
এ জন্যই ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি প্রতিটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও জনপরিসরে নিয়মিত মশক নিধন এবং স্পট-চেকিং বাধ্যতামূলক করা খুব প্রয়োজন। আপনি একদম ঠিক বলেছেন—একটি জনস্বাস্থ্য সংকট দূর করতে হলে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত জায়গাতেই সমান সাবধানতা নিশ্চিত করতে হবে।
আপনার সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।
৩|
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬
সৈয়দ কুতুব বলেছেন: সচেতনতামুলক লেখা । ধন্যবাদ ।
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৩
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: ব্লগটি পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন এবং নিরাপদ থাকবেন!
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৪৯
জুল ভার্ন বলেছেন: চমৎকার লিখেছেন।
ডেংগু থেকে রক্ষা পেতে নিজ নিজ এলাকা পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। তবে আমাদের দেশে সব চাইতে বেশী প্রয়োজন সামাজিক এবং নাগরিক সচেতনতা। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া রাস্তাঘাট, খানাখন্দ, ছোট বড়ো জলাশয় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা অসম্ভব। এবং সেই অসম্ভবকে জয় করতে না পারলে ডেংগু থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।