নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

কোচিং ব্যবসা, বদলে যাওয়া শৈশব এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বানিজ্যিকীকরণ

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৭

কোচিং যে আজকাল একটা দারুণ লাভজনক ব্যবসা—তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সম্প্রতি নিজের জীবন দিয়ে এর রূপান্তরটা চোখের সামনে দেখতে পেলাম।

স্মৃতির পাতা একটু পেছনে উল্টালে মনে পড়ে, আমি যখন নবম-দশম শ্রেণীতে পড়তাম, তখন বন্ধু মামুনের সাথে ‘ম্যাবস’ (মঞ্জু একাডেমি ফর বেসিক কেয়ার) নামের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুল শেষ করে বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলতো ক্লাস। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল আর ঢাকা ইউনিভার্সিটির বেশ কজন তরুণ শিক্ষার্থী ক্লাস করাতেন। সাধারণ ক্লাসরুমের মতোই ২০-৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী একসাথে বসে ক্লাস করতাম। প্রতি সপ্তাহে টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, মাস শেষে মান্থলি পরীক্ষা—অর্থাৎ পড়াশোনার একটা সুন্দর শৃঙ্খলা আর চাপ ছিল সেখানে। আর ফাইনাল পরীক্ষার আগে সব বিষয়ের ওপর দেওয়া হতো গোছানো সাজেশন।

বহু বছর পর, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে আবার একটি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার সুযোগ হলো। তবে এবার কোনো শিক্ষার্থী হিসেবে নয়—এক শিক্ষার্থীর বাবা হিসেবে!

গত শুক্রবার সাভারের ‘উদ্ভাস-উন্মেষ’ কোচিং সেন্টারের তরফ থেকে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ‘গণিত অলিম্পিয়াড’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। আমার ছোট মেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলাম পরীক্ষা দেওয়ানোর জন্য। মেয়ে যখন ভেতরের ক্লাসরুমে পরীক্ষা দিচ্ছিল, আমি বাইরে বসে চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম আর মনে মনে ওদের ‘বিজনেস মডেল’টা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

উদ্ভাস-উন্মেষের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপস রয়েছে, যেটির মাধ্যমেই আমার মেয়ের রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে। অ্যাপে গিয়ে দেখলাম, সেখানে পঞ্চম শ্রেণী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত সব ধরণের কোচিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে! পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষার দুই মাসের জন্য ওদের টিউশন ফি ৫,০০০ টাকা।

সেদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দফায় দফায় পরীক্ষা চলল। আমার মেয়ের ব্যাচেই প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। পুরো দিনে যদি গড়ে ১,০০০ শিক্ষার্থীও এই অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে থাকে, আর সেখান থেকে যদি মাত্র ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীও ওদের বৃত্তি কোচিংয়ে ভর্তি হয়—তবে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১০০ জন। অর্থাৎ শুধু সাভার ব্রাঞ্চ থেকেই আয়: ৫,০০০ × ১০০ = ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা!

আর এটা তো শুধু সাভারের একটি ব্রাঞ্চের দুই মাসের একটা কোর্সের হিসেব। পুরো দেশে নাকি ওদের এমন আরও ১১৭টি ব্রাঞ্চ রয়েছে! একবার ভাবুন, কত বিশাল এই ব্যবসার পরিধি!

বাংলাদেশে কেবল উদ্ভাস-উন্মেষই নয়, এমন আরও অসংখ্য কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। কিছুদিন আগে আমার এক সহকর্মীর মুখে শুনলাম, ওঁর ছোট ভাই পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও ‘রোড টু ডক্টর’ নামের একটি মেডিকেল ভর্তি কোচিং পরিচালনা করেন। সারা দেশেই তাদের শাখা বিস্তৃত। তিনি নাকি এত ব্যস্ত থাকেন যে শুক্র-শনিবার প্লেনে করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এক ব্রাঞ্চ থেকে আরেক ব্রাঞ্চে যাতায়াত করেন!

আমরা যখন ছোট ছিলাম, কোচিং ছিল পিছিয়ে পড়া পড়ালেখা একটু গুছিয়ে নেওয়ার একটা মাধ্যম। আর আজ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুর্বলতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে কোচিং হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসংগঠিত ও বাণিজ্যিক এক ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে এখন ভালোভাবেই বাণিজ্যিকীকরণের দিকে হেঁটে চলেছে, সাভারের সেই অলিম্পিয়াডের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তা আরেকবার স্পষ্ট অনুধাবন করলাম।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +২/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:২৯

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: উদ্ভাস-উন্মেষ হলো বুয়েটের সোহাগ ভাইদের প্রতিষ্ঠান । আমার যখন কোচিং ছিলো সেইম রোডে তাদের নতুন শাখা খুলেছিলো। আমাদের সাথে পেরে উঠে নাই । পরে করোনার সময় পারিবারিক সমস্যার কারণে রানিং কোচিং ছেড়ে দেই । এখন সেই এলাকার ৮০ ভাগ স্টুডেন্ট এই কোচিংয়ে পড়ে । বিশেষ করে ৮/৯/১০ শ্রেনীর । সোহাগ ভাই রকমারি ডট.কম এরও মালিক । এরা ডানপন্থী বই ছাড়া আর কোনো বই রাখে না । এখন মাঝে মাঝে ভাবি চাকুরি করে লস । যেটুকু মেধা ছিলো এডটেকে টাইম দিলে এতদিনে আরো ভালো কিছু করা যেত । এডটেক কিন্তু এখন কোটি টাকার বাজার । পাশপাশি প্রকাশনী এবং বই বের করতে পারলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো ।সোহাগ ভাইকে অনেক সময় সকল উদ্যোক্তা হিসাবে সমাজে পরিচিত করা হয় । বুয়েট থেকে পাশ করে কোচিং বিজনেস আর অনলাইন বই বাজার খুলে তিনি সফল উদ্যোক্তা হয়ে গেছেন । তার দরকার ছিলো টেক সাইড লিড দেয়া ।

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৫

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: আপনার বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক, খোলামেলা এবং অত্যন্ত গভীর বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ!

আপনার মন্তব্যটিতে এডটেক (EdTech) ইন্ডাস্ট্রি, প্রকাশনা ব্যবসা এবং দেশের তরুণ মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। আপনার নিজের কোচিং চালানোর অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে রানিং ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ার গল্পটি যেমন বাস্তবতার এক ভিন্ন দিক উন্মোচন করে, তেমনই এডটেক ও বইয়ের বাজারকে যুক্ত করে কোটি টাকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার যে হিসাবটি দেখিয়েছেন—তা সত্যিই বর্তমান বাজার ব্যবস্থার একদম ভেতরের চিত্র।

তবে আপনার মন্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনুচিন্তার জায়গাটি হলো—বুয়েটের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার বা প্রযুক্তিবিদদের মূল কাজ কী হওয়া উচিত ছিল। তারা যখন বিশ্বমানের টেকনোলজি, রিসার্চ বা উদ্ভাবনী টেক-ইন্ডাস্ট্রিকে নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে কেবল কোচিং বাণিজ্য কিংবা প্রথাগত বইয়ের ই-কমার্সে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন, তখন ব্যক্তিক বা বাণিজ্যিক সফলতা হয়তো আসে, কিন্তু জাতীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জায়গাটি এক ধরনের শূন্যতায় থেকে যায়।

একজন সফল 'উদ্যোক্তা' হওয়ার পাশাপাশি মেধার সঠিক ও দূরদর্শী ব্যবহার দেশ গঠনে কতটা প্রয়োজন—আপনার মন্তব্যটি সেই ভাবনার দরজাই খুলে দেয়।

এমন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে পোস্টের মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আবারও অশেষ ধন্যবাদ। শুভকামনা সবসময় !

২| ২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮

রাজীব নুর বলেছেন: আমার সময় এত কোচিং সেন্টার ছিলো না।
তাছাড়া সব সাবজেক্ট স্যারদের কাছে পড়তে হতো না।

২১ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু বলেছেন: সত্যিই, একটা সময় ছিল যখন স্কুলের ক্লাসরুমের পড়া আর নিজের গৃহপাঠই (Self-study) ছিল পড়াশোনার মূল ভিত্তি। সব বিষয়ের জন্য প্রাইভেট পড়ার কথা তখন কেউ ভাবতেও পারত না—কেবল কঠিন দু-একটি বিষয়ে প্রয়োজন হলে শিক্ষকের সহায়তা নেওয়া হতো। পড়াশোনার মাঝে একটা স্বকীয়তা ও নিজস্ব চেষ্টার আনন্দ ছিল।

কিন্তু আজ সময় বদলে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্লাসরুমের শিথিলতা আর অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার বাজারে প্রতিটি বিষয়ের জন্যই শিক্ষার্থীদের ছুটতে হচ্ছে কোনো না কোনো কোচিং সেন্টার বা গৃহশিক্ষকের কাছে। এতে শিশুদের শৈশব যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনই শিক্ষা হয়ে উঠছে ভীষণ খরচসাপেক্ষ ও বানিজ্যিক।

আপনার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আমাদের শৈশব আর আজকের প্রজন্মের শৈশবের সেই অমূল্য তফাৎটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

এমন সুন্দর ও নস্টালজিক অনুভূতি শেয়ার করার জন্য অশেষ ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন, সাথে থাকবেন সবসময়!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.