| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এগুলো এক ধরনের দীনতার স্বীকারোক্তি, যা টাকা দিয়ে ঢাকা যায় না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন নিউ ইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে নামলেন, তখন সেখানে জড়ো হওয়া কয়েকজন বাংলাদেশি আমেরিকান এই বাক্যটি ছুড়ে দিয়েছিলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার মনে পড়ল আরেকটি বাক্য, যা ২০২০ সালের মার্চে গোটা দেশে ভাইরাল হয়েছিল।
কোভিডের শুরুতে ইতালি থেকে ফেরা কিছু যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হচ্ছিল। তখন একজন চিৎকার করে বলেছিলেন, “I fuck your country system।”
দুটি বাক্যের কোনোটিই শুদ্ধ ইংরেজি নয়। কিন্তু ব্যাকরণ এখানে মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো, এই বাক্যগুলোর পেছনে যে মানসিকতা কাজ করে, সেটা কী?
চল্লিশ বছরের আমেরিকা, এক লাইনের ইংরেজি
নিউ ইয়র্কে এমন বাংলাদেশির সংখ্যা কম নয়, যারা চার-পাঁচ দশক ধরে আমেরিকায় আছেন। পাসপোর্ট আমেরিকার, সন্তানেরা সেখানেই জন্মেছে। তবু তাদের অনেকের ইংরেজি ওই এক লাইনেই আটকে আছে। কাজ চালানোর মতো বলতে পারেন, কিন্তু ভাষাটা কখনো নিজের হয়ে ওঠেনি।
প্রায় কুড়ি বছর আগে আমি এক বন্ধুর খালুর বাড়িতে কিছুদিন ছিলাম। ভদ্রলোক তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে ইয়েলো ক্যাব চালিয়েছেন। ততদিনে তার নিজের কয়েকটি ট্যাক্সি, আর জ্যাকসন হাইটসের আশেপাশে কয়েকটি বাড়ি। সেই সময়েই সেখানে একেকটি বাড়ির দাম মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
অথচ তিনি কথা বলতেন ঠিক এভাবেই: “Why you come here?” টাকা তাকে বাড়ি দিয়েছে, গাড়ি দিয়েছে। ভাষা দেয়নি, দেয়ার কথাও ছিল না। কারণ ভাষা কেনা যায় না, অর্জন করতে হয়।
টাকা আর রুচি এক জিনিস নয়
আমার এক বন্ধুর বাবা বহু বছর আগে ডিভি লটারি জিতে আমেরিকা গিয়েছিলেন। দেশে কৃষিকাজ করতেন, নিউ ইয়র্কে গিয়ে খাবারের ফুড কার্ট নিয়ে বসলেন। আজ তাদের পুরো পরিবার আমেরিকায়। ফুড কার্টের ব্যবসা খুবই লাভজনক।
ঢাকার ফুটপাতের হকার আর নিউ ইয়র্কের ফুড ভেন্ডরের মধ্যে তফাত কেবল নিয়মে। সেখানে নির্দিষ্ট জায়গায়, নির্দিষ্ট সময়ে, নিবন্ধিত ভেন্ডররাই বসতে পারেন। কিন্তু দুটোই আসলে স্ট্রিট ভেন্ডিং।
আমি জানি, কথাগুলো অনেকের গায়ে লাগবে। তাই পরিষ্কার করে বলি: ট্যাক্সি চালানো বা ফেরি করা সৎ পরিশ্রম, এতে লজ্জার কিছু নেই। আমার আপত্তি পেশা নিয়ে নয়। আপত্তি সেই মানুষটিকে নিয়ে, যিনি মনে করেন ডলারের জোরে তিনি দেশের মানুষের চেয়ে উঁচুতে উঠে গেছেন।
তবে নিজেদের দিকেও আঙুল তুলতে হয়। বাংলাদেশে আমাদের কজনের এমন বন্ধু আছেন, যিনি ফেরি করেন বা ফুটপাতে হকারি করেন? শ্রেণিবিভাজন আমাদের সমাজে যেমন আছে, প্রবাসে তা আরও প্রকট।
নিউ ইয়র্কে এই মানুষদের টাকা আছে, কিন্তু হোয়াইট কলার বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা খুবই কম। আমি নিজে কখনো আমার হোয়াইট কলার বন্ধুদের ব্লু কলার বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দেখিনি। দুই দল একই শহরে থাকে, একই ভাষায় কথা বলে, তবু দুটি আলাদা জগতে বাস করে।
তাই এরা নিজেদের জগৎ নিজেরাই গড়ে নেন। সভা-সমিতি, জেলাভিত্তিক সংগঠন, আর বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির প্রবাসী শাখা। আমার মনে হয়েছে, এর বড় কারণ আমেরিকান সমাজে তাদের সামাজিক পরিচিতি বা স্বীকৃতি কম। মূলধারায় যে সম্মান মেলে না, তা মেলে সমিতির পদে, দলের ব্যানারে, বিমানবন্দরের ভিড়ে। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু প্রবণতাটা চোখে পড়ার মতো।
এই অর্থে “Why you come here?” শুধু ঔদ্ধত্য নয়, এক ধরনের স্বীকৃতির খোঁজও। আর সেই খোঁজের দায় শুধু তাদের একার নয়, যে শ্রেণিবিভাজন তাদের আলাদা করে রেখেছে, তাতে আমাদেরও ভাগ আছে।
সুবিধামতো পরিচয়
এখানেই আসল কথা। আমাদের অনেকে আমেরিকায় গিয়ে সুবিধামতো বাংলাদেশি সাজেন, আবার দেশে ফিরে নিজেকে আমেরিকান দাবি করেন। পরিচয় তাদের কাছে পোশাকের মতো, প্রয়োজন বুঝে বদলে নেওয়া যায়। আবার তিনি তার আমেরিকান পাসপোর্ট এ বাংলাদেশ এর গ্রাতিস ভিসা করে নিয়ে আসেন যেন ১০০ ডলার দিতে না হয়। অদ্ভুত না?
ইতালিফেরত সেই ভদ্রলোককেই দেখুন। নিজের দেশের বিমানবন্দরে নেমে তিনি নিজেকে বাংলাদেশি ভাবেননি। “your country” বলে দেশটাকে তিনি ঠেলে দিলেন অন্যের দিকে, যেন তিনি বাইরের কেউ, এখানকার নিয়ম তার জন্য নয়।
জেএফকেতে যারা চিৎকার করলেন, তারাও একই কাজ করলেন উল্টো দিক থেকে। আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা দেশের রাজনীতির দলীয় লড়াই চালাচ্ছেন। অথচ সেই দেশের সমস্যা তাদের রোজকার জীবনে আর বহন করতে হয় না।
দুই ক্ষেত্রেই দেশটা তাদের কাছে দায়িত্ব নয়, প্রদর্শনের মঞ্চ।
দূর থেকে দেশপ্রেম
আমরা নানা পথে দেশ ছাড়ি। কেউ স্টুডেন্ট ভিসায়, কেউ ডিভি লটারিতে, কেউ দালালের হাতে জীবন বাজি রেখে সাগর বা জঙ্গল পেরিয়ে। দেশ ছাড়ার কারণগুলো বেশির ভাগ সময়ই বাস্তব: কাজ নেই, নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যৎ নেই। দেশ ছাড়াটা অপরাধ নয়।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। দেশ যত দূরে যায়, দেশপ্রেম তত জোরালো হয়। যিনি যেভাবেই বেরিয়ে থাকুন, বিদেশে গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। পতাকা হাতে সমাবেশ, ফেসবুক লাইভে স্লোগান, দলের হয়ে বিমানবন্দরে পাহারা।
রাজনীতিবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন এর নাম দিয়েছিলেন “দূরবর্তী জাতীয়তাবাদ”। এমন দেশপ্রেমে খরচ নেই, ঝুঁকিও নেই। আপনি যে রাজনীতির পক্ষে গলা ফাটাচ্ছেন, তার ফল ভোগ করতে হবে দেশে থাকা মানুষকে, আপনাকে নয়।
আরও তীক্ষ্ণ একটি বৈপরীত্যও আছে। কেউ কেউ বিদেশে আশ্রয় চেয়েছেন এই বলে যে বাংলাদেশে তাদের জীবন নিরাপদ নয়। কয়েক বছর পর সেই মানুষটিই প্রবাসে দেশপ্রেমের সবচেয়ে উঁচু গলা। সত্যিকারের নিপীড়নের শিকার মানুষ অবশ্যই আছেন, তাদের সুরক্ষা প্রাপ্য। কিন্তু যিনি দেশকে শুধু টিকিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তার মুখে দেশপ্রেমের ভাষণ মানায় না।
দেশপ্রেম মাপার পরীক্ষা তাহলে কী? স্লোগান নয়। দেশে টাকা পাঠানো হচ্ছে বৈধ পথে, নাকি হুন্ডিতে? সন্তান বাংলা বলতে পারে কি না? ছুটিতে দেশে এসে আপনি দেশের নিয়ম মানেন, নাকি “your country system” বলে উড়িয়ে দেন? এই প্রশ্নগুলো শুধু অন্যদের জন্য নয়। আমরা যারা কোনো না কোনো সময় দেশের বাইরে থেকেছি, প্রশ্নগুলো আমাদেরও নিজেদের করতে হবে।
যে নিয়ম অন্যের বেলায় মানতে হয়, নিজেদের ভেতরে তা ভাঙা স্বাভাবিক। ঠিক যেমন বিমানবন্দরে নেমে দেশের নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক মনে হয়েছিল ইতালিফেরত সেই ভদ্রলোকের কাছে।
শেষ কথা
এই লেখা সব প্রবাসীকে নিয়ে নয়। বহু প্রবাসী বাংলাদেশি নীরবে পরিশ্রম করেন, দেশে টাকা পাঠান, দুই দেশকেই সম্মান করেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই এ দেশের অর্থনীতি বহুবার টিকে থেকেছে।
লেখাটা তাদের নিয়ে, যারা বিদেশের পাসপোর্টকে শ্রেষ্ঠত্বের সনদ ভাবেন। যারা দুই দেশের সুবিধা নেন, কিন্তু কোনোটির দায় নেন না। আর যারা দেশের প্রতিনিধিকে বিদেশের মাটিতে অপমান করাকে রাজনীতি মনে করেন।
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৮
মুনতাসির বলেছেন: কোনোই অসুবিধা নাই ![]()
২|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৫
কামাল১৮ বলেছেন: পড়লাম।
৩|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৪৫
মহাজাগতিক চিন্তা বলেছেন:
লেখার প্রতিটি অনুচ্ছেদে আমাদের সমাজের এমন কিছু অসংগতি উঠে এসেছে, যেগুলো আমরা অনেকেই দেখি, উপলব্ধি করি, কিন্তু নানা কারণে সেগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে চাই না। বিশেষ করে প্রবাসী পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান, সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং দেশপ্রেমের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আপনার বিশ্লেষণটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
আমার কাছে লেখাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—আপনি বিষয়টিকে কেবল কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির অশোভন আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এর পেছনে থাকা শ্রেণিবৈষম্য, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং সুবিধামতো পরিচয় ব্যবহারের প্রবণতাকেও সামনে এনেছেন। এ কারণেই লেখাটি নিছক কারও আচরণের সমালোচনা না হয়ে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতা নিয়ে আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—প্রবাসে বসবাস করা, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করা কিংবা জীবিকার তাগিদে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর মধ্যে কোনো অপরাধ নেই। মানুষ উন্নত জীবন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভালো থাকার আশায় দেশান্তরি হয়। কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ ব্যবসায়ী হিসেবে, কেউ পেশাজীবী হিসেবে বিদেশে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। প্রত্যেকের সংগ্রাম ও বাস্তবতা আলাদা। তাই পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করে দেখা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ট্যাক্সিচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সৎ পরিশ্রমও একজন উচ্চপদস্থ পেশাজীবীর কাজের মতোই সম্মানের দাবিদার।
তবে সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন অর্থনৈতিক সাফল্যকে কেউ নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং সেই অবস্থান থেকে অন্য মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করেন। বিদেশে কয়েকটি বাড়ি, দামি গাড়ি, ব্যাংক ব্যালান্স কিংবা শক্তিশালী পাসপোর্ট অর্জন করা অবশ্যই ব্যক্তিগত সাফল্যের অংশ হতে পারে; কিন্তু এসব অর্জন কারও মানবিকতা, বিবেক, রুচি কিংবা নৈতিকতার স্বয়ংক্রিয় সনদ নয়। সম্পদ মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু সেই সম্পদের সঙ্গে বিনয়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের সম্পর্ক সব সময় তৈরি হয় না। আপনার লেখার এই দিকটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
‘Why you come here?’ কিংবা ‘I fuck your country system’-এর মতো বক্তব্যের মধ্যেও একটি গভীর মানসিক সংকট প্রকাশ পায়। এখানে ইংরেজি ভাষার শুদ্ধতা মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো বক্তব্যের ভেতরে থাকা অসম্মান, ঔদ্ধত্য এবং দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। কেউ রাজনৈতিকভাবে কোনো ব্যক্তির বিরোধিতা করতেই পারেন, সরকারের সমালোচনা করতে পারেন, এমনকি কোনো নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদও জানাতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিবাদ যখন যুক্তির পরিবর্তে গালাগাল, ব্যক্তিগত অপমান কিংবা অশালীন আচরণের আশ্রয় নেয়, তখন তার নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রতিবাদের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই স্বাধীনতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শালীনতা ও দায়িত্ববোধও জরুরি।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—কোনো রাজনৈতিক নেতা বা রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সমালোচনা করা মানেই দেশকে অপমান করা নয়। বরং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই অনেক সময় মানুষ ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন। তাই সমালোচনার ভাষা বিচার করার পাশাপাশি সমালোচনার বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট এবং প্রতিবাদের যৌক্তিকতাও বিবেচনা করা উচিত। ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষার নামে যেন যুক্তিসংগত রাজনৈতিক সমালোচনাকে দমন করা না হয়, আবার রাজনৈতিক বিরোধিতার অজুহাতে যেন অশোভন আচরণকেও বৈধতা দেওয়া না হয়। এই ভারসাম্যটিই একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি।
লেখায় শ্রেণিবৈষম্যের যে প্রসঙ্গটি এসেছে, সেটিও গভীরভাবে ভাবার মতো। আমাদের সমাজে পেশা ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। দেশে যাঁরা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে চান না, বিদেশে গিয়েও তাঁদের অনেকে একই মানসিকতা বহন করেন। অথচ একজন মানুষ কী কাজ করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কাজটি কতটা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বের সঙ্গে করেন। একজন শ্রমজীবী মানুষকে অবজ্ঞা করে আবার তাঁর অর্জিত অর্থ বা প্রবাসী পরিচয়কে সম্মানের চোখে দেখা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের একটি স্পষ্ট অসংগতি। এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে প্রকৃত অর্থে সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।
তবে শ্রেণিবৈষম্যের আলোচনায় প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামকেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অনেক প্রবাসী দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেন, পরিবার থেকে দূরে থাকেন, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবন কাটান এবং নিজেদের উপার্জনের বড় অংশ দেশে পাঠান। তাঁদের অনেকের জন্য বিদেশের জীবন কোনো বিলাসী স্বপ্ন নয়; বরং টিকে থাকা, পরিবারকে ভালো রাখা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা তৈরির নিরন্তর সংগ্রাম। তাঁদের সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে শুধু ঔদ্ধত্য বা হীনম্মন্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কেন একজন শ্রমজীবী প্রবাসীকে তাঁর কাজের জন্য যথাযথ সম্মান দিতে শিখিনি? কেন অর্থনৈতিক সাফল্যকে সামাজিক মর্যাদার প্রধান মাপকাঠি বানিয়েছি? কেন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছি? আপনার লেখাটি এই প্রশ্নগুলো সামনে আনার সুযোগ করে দিয়েছে।
‘সুবিধামতো পরিচয়’ প্রসঙ্গটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত, অন্য দেশের নাগরিক এবং বৈশ্বিক সমাজের একজন সদস্য হতে পারেন। একাধিক পরিচয় থাকা নিজে কোনো সমস্যা নয়। বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেই কেউ নিজের শিকড় ভুলে গেছেন, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। প্রকৃত সমস্যা হলো, যখন কেউ নিজের সুবিধা অনুযায়ী পরিচয়কে ব্যবহার করেন, কিন্তু সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ও নিয়মের প্রশ্ন এলে সেই পরিচয় থেকে সরে দাঁড়াতে চান। যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের আইন মানা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের জন্মভূমির প্রতি সম্মান দেখানো এবং তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাও মূল্যবান। পরিচয় শুধু সুবিধা গ্রহণের মাধ্যম নয়; পরিচয়ের সঙ্গে স্মৃতি, সম্পর্ক, দায়িত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত।
দেশপ্রেমের প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। বিদেশে বসে দেশের জন্য আবেগ প্রকাশ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পতাকা ব্যবহার করা কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নেওয়া—এসবের কোনোটিই নিজে থেকে ভুল নয়। প্রবাসীরা দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলবেন, মতামত দেবেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন—এটি তাঁদের অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে তখন, যখন দূর থেকে উচ্চকণ্ঠ দেশপ্রেমের সঙ্গে বাস্তব দায়িত্বের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশের সাধারণ মানুষকে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল ভোগ করতে হয়, বিদেশে নিরাপদে অবস্থানরত কারও ক্ষেত্রে সেই পরিণতি একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। এই বাস্তবতার কারণে প্রবাসী রাজনৈতিক সক্রিয়তার মধ্যে কখনো কখনো ঝুঁকিহীন আবেগপ্রকাশ ও দূরবর্তী জাতীয়তাবাদের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, প্রবাসীদের রাজনৈতিক মতামতকে কেবল তাঁরা দেশে থাকেন না বলে অগ্রাহ্য করা যায় না। বরং তাঁদের বক্তব্য কতটা যুক্তিনির্ভর, তথ্যসম্মত ও দায়িত্বশীল—সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের ভিত্তি।
আমার মতে, দেশপ্রেমের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল স্লোগানে নয়; বরং আচরণে, সততায়, আইন মানার মানসিকতায় এবং মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে। একজন মানুষ বিদেশে থেকেও দেশকে ভালোবাসতে পারেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন এবং দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। আবার দেশে থেকেও কেউ ব্যক্তিস্বার্থে দেশের ক্ষতি করতে পারেন। তাই দেশপ্রেমকে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে মাপা যায় না। বরং দেখতে হবে, একজন মানুষ তাঁর অবস্থান ও সামর্থ্য অনুযায়ী কতটা ন্যায়সংগত, দায়িত্বশীল এবং মানবিক আচরণ করছেন।
আরেকটি বিষয় আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে—দেশের প্রতি দায়িত্বের প্রশ্নটি শুধু প্রবাসীদের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা যারা দেশে বসবাস করি, তাঁরাও কি নিয়ম মেনে চলি? দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান কতটা দৃঢ় রাখতে পারি? ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আমরা নিজেরাই কি কখনো নীতি বিসর্জন দিই না? অন্যের দ্বিচারিতা চিহ্নিত করা সহজ, কিন্তু নিজের আচরণের অসংগতি স্বীকার করা কঠিন। আপনার লেখাটি তাই শুধু প্রবাসীদের দিকে আঙুল তোলার বিষয় নয়; বরং আমাদের প্রত্যেকের নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান হিসেবেও পড়া যায়।
সবশেষে বলব, আপনার লেখার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ রয়েছে, কিছু বক্তব্যের ব্যাখ্যা বা ভিন্নমতও থাকতে পারে; কিন্তু যে সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নগুলো আপনি উত্থাপন করেছেন, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কয়েকটি নেতিবাচক আচরণ যেন বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণীকরণের কারণ না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা দরকার। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যেমন সুবিধাবাদী ও অসংবেদনশীল আচরণের উদাহরণ থাকতে পারে, তেমনি অসংখ্য সৎ, পরিশ্রমী, মানবিক ও দেশপ্রেমিক মানুষও রয়েছেন, যাঁরা নীরবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অবদান ও মর্যাদাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়াও আমাদের কর্তব্য।
সব মিলিয়ে, লেখাটির মূল শিক্ষা আমার কাছে এটাই—পাসপোর্ট মানুষের নাগরিকত্ব নির্ধারণ করতে পারে, অর্থনৈতিক সাফল্য তার জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে, আর রাজনৈতিক পরিচয় তাকে কোনো বিশেষ মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে; কিন্তু এসবের কোনোটিই একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না। মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তার বিবেক, আচরণ, নৈতিকতা, অন্যের প্রতি সম্মান এবং নিজের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। দেশপ্রেমের নামে ঔদ্ধত্য নয়, প্রতিবাদের নামে অশালীনতা নয়, আর অর্থের জোরে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নয়—আমাদের প্রয়োজন যুক্তিবোধ, আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতা।
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮
মুনতাসির বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।
৪|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৭
ভুয়া মফিজ বলেছেন: স্মার্ট আওয়ামী লীগার আমি খুব কমই দেখেছি.............বাংলাদেশে, ব্লগে কিংবা ইংল্যান্ডে আমার এই ছোট্ট শহরে........সব জায়গাতেই একই অবস্থা। বলাই বাহুল্য, আমার কপাল খারাপ!!!! তবে একটা ব্যাপারে এদের মিল আছে। এরা ভুলভাল ইংরেজি বললেও সবার চেহারাতেই একটা কেমন জানি ''শেয়াল-ধূর্ততা'' জাতীয় ভাব আছে!!!!!
@মহাজাগতিক কবিভাই..........আজকাল আপনার মন্তব্য পড়া ছেড়ে দিয়েছি। আপনি এক কাজ করেন, এআই কি বলে দেখে সেটাকে সংক্ষিপ্ত আকারে নিজের ভাষায় প্রকাশ করেন। তাহলে আমিসহ অনেকেই আনন্দ পাবে। ![]()
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৬
মুনতাসির বলেছেন: উগ্রতা তাদের সবথেকে বড় ডিফেন্স। যুক্তি যাদের কাছে অজুহাত, তারা যেখানেই যাবেন, একই থাকবেন সেটা পিকাডেলি সার্কাস হোক আর ফিফথ এভিনিউ হোক।
৫|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪২
কলাবাগান১ বলেছেন: আমেরিকাতে হোয়াইটকালার ব্লু কালার যত জামাতি/রাজাকার দের দেখেছি, তাদের উগ্রতার কাছে........কারো তুলনা হয় না। অনলাইনে জামাতিদের মুখের ভাষা দেখুন.......যাকে পছন্দ হয় না তাকে কি 'শুদ্ধ' ইংরেজী উচ্চারনে আদর করে যে খোদ আমেরিকান দের ইংরেজী ফেল।
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫২
মুনতাসির বলেছেন: আচ্ছা। আন্দোলন করেন নাই?
৬|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩
খায়রুল আহসান বলেছেন: ভালো লিখেছেন। প্রতিবাদের ভাষাতেই প্রতিবাদকারীর একটা পরিচয় পাওয়া যায়, এ কথা সত্য। বেচারা হয়তো ভেবেছিলো, এতদিন বিদেশে থেকেও ইংরেজিতে কিছু একটা না বললে দেশবাসীর চোখে স্মার্ট হওয়া যাবে না।
পোস্টের সূচনা ও সমাপ্তির অনুচ্ছেদ দুটো হুবহু এক; হয়তো কথাগুলোর উপর গুরুত্ব আরোপ করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এমনটি করেছেন। অন্যথায়, ভুলে হয়ে থাকলে শেষেরটা বাদ দিয়ে দিতে পারেন।
@মহাজাগতিক চিন্তা, এ/আই প্রসূত মন্তব্য যখন পোস্টের চেয়ে বড় হয়ে যায়, তখন মন্তব্যের আকার দেখেই সেটা আর পড়ার কোন আগ্রহ থাকে না। সুতরাং, ভুয়া মফিজ এর পরামর্শটা আমলে নিতে পারেন।
৭|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০৩
মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ বলেছেন: মীরজাফর ইউনুসের ভাগ্য ভালো যে, যে মানুষটা জেএফকে তে তাকে মৌখিকভাবে হেনস্তা করেছে তার যায়গায় শা**য়া মা**য়া হাদী থাকলে কি হতো? আসল কথা হলো মীরজাফরদের জীবনের শেষ অধ্যায় এমনই, ব্যাতিক্রম ছাড়া।
শেষ বয়সে ইউনুস ৯০ এর সেই বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের মতো ভূমিকার রাখতো তবে বাংলাদেশের মানুষ তাকে আমৃত্যু শ্রদ্ধা করতো। কিন্তু না। সে বরং তার একান্তই নিজ স্বার্থ স্বিদ্ধির জন্য, ৫ ই আগষ্ট পরবর্তী সময়ে দ্বায়িত্ব পালনকালে, দেশের স্বার্থ বিকিয়ে এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছিলো যে কারনে মানুষ তাকে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাড়া করে বেড়াবে।
আমরা মীরজাফর আর খন্দকার মোশতাককে দেখিনি কিন্তু ২০২৪ এ মীরজাফর ইউনুসকে দেখেছি.....।
©somewhere in net ltd.
১|
১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২৭
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে।
......................................................................................
তার চেয়ে বড় কথা ১২০০ শিশু হত্যার বিচার চাইতে বাধা কোথায়?
চোরা না শুনে ধর্মর কথা , কিন্ত আইন একদিন এর বিচার করবেই
মানুষ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে , তখন আপনার এই যুক্তি বাহুল্যমাত্র ।