নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

www.oputanvir.com

অপু তানভীর

আমার চোখে ঠোঁটে মুখে তুমি লেগে আছো

অপু তানভীর › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভালবাসার গল্প সমূহঃ সব গল্পের নায়ক আমি নিজেই ;)

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:১৯



বাইক ভ্রমন

গেট খোলার আওয়াজ শুনেই ঐশী নিচে তাকালো । বেশ রাত হয়ে গেছে । এতো রাতে আবার কে বাইরে যাচ্ছে! বাড়ির গেট দশটার সময়ই বন্ধ হয়ে যায় । তারপর বিশেষ দরকার ছাড়া কারো বাইরে যাওয়া নিষেধ ।
গেটের কাছে একটা ৪০ পাওয়ার বাল্ব জ্বলছে । একজন বাইক বের করছে । ছাদের উপর থেকে দেখে চেনার উপায় নেই । কেবল মাথাটাই দেখা যাচ্ছে মানুষটার । তবে ঐশী খুব ভাল করেই চেনে । ওদের বাড়িওয়ালার ছেলে অপু । ফরিদপুর মেডিক্যালে পড়ে । কদিন পরেই ডাক্তার হয়ে যাবে । এলাকার সব পিতা মাতার কাছে আদর্শ ছেলে হিসাবে পরিচিত । ঐশীর মা বাবাও ওকে কতবার যে বলেছে অপুর মত হতে কিন্তু চাইলেই কি আর হওয়া যায় !
এলাকার সব ছেলেরা এই ছেলেটাকে অসম্ভব অপছন্দ করে । তার কারনেই বাবা মায়েদের কাছ থেকে তাদের কথা শুনতে হয় । অবশ্য অপুকে অপছন্দ করার পেছনে আরেকটা কারনও আছে । এলাকার প্রায় সব মেয়ে অপুকে পছন্দ করে । পথে ঘাটে দেখা হলেই ভাইয়া ভাইয়া বলতে বলতে দৌড়ে আসে । ঐশীর এই ন্যাকামো দেখে এতো বিরক্ত লাগে । ধরে ধরে থাপড়াতে ইচ্ছে করে । একটা ছেলে মেডিক্যালে পড়ে বলেই তার পেছনে এমন ঘুরঘুর করতে হবে ? কেন আর কোন কাজ নেই ?
ঐশী অপুকে গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে দেখলো । সেদিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । তারপর আবার চোখ সরিয়ে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালো । আজকে ঐশীর মনটা বিশেষ রকমের খারাপ । মন খারাপের কারনটা সে যতবারই মন থেকে দুর করার চেষ্টা করছে ততবারই সেটা মনের উপর ঝেঁকে বসছে । কিছুতেই অন্য কোন কাজে মন বসাতে পারছে না । কতবার মনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এসব চিন্তা মাথার ভেতরে আনার কোন মানে নেই । এসব কিছুই ওর জীবনে হবে না । কোন দরকার নেই । জীবন কখনও রোমান্টিক গল্পের মত হয় না তেমন ঘটনা বাস্তবে ঘটে না কিন্তু সেটা মন বুঝতে চাইছে না । অবশ্য কতইবা বড় হবে ও । এই বয়সে মেয়েদের মন এমন একটু করবেই কিন্তু ঐশী এটা মানতে নারাজ ! তার কেবল মনে হচ্ছে কেন হবে এমন ! এমনটা হবে না !
ঐশীর ফোনটা বেজে উঠলো । নাম্বারটা দেখেই চমকে উঠলো !
বুকের ভেতরে কেমন যেন ধরফর শুরু হয়ে গেল মুহুর্তেই ! এই ছেলে ওকে কেন ফোন দিয়েছে !
কি কারনে ?
ওর সাথে কি এমন কথা যেন ফোন দিতে হবে ?
ফোন ধরবে না ধরবে না করেও ফোনটা ধরলো ও ।
ওপাশ থেকে কিছু সময় নিরবতার পরপরই শোনা গেল
-মনের দুঃখে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিবে নাকি ?
-কেন ? ঝাঁপ দিবো কেন ? আর আমার মন খারাপ আপনাকে কে বলল ?
-বলতে হবে কেন ? আমি জানি ! জানো না ডাক্তারেরা অনেক কিছু বুঝতে পারে ?
-আপনি মনের ডাক্তার না, হাড়ের ডাক্তার আর এখনও ডাক্তার হন নিও । তাহলে কিভাবে জানেন ?
-কিভাবে জানি সেটা জরূরী না । জানি এটা জরূরী । এখন নিচে নেমে এসো । আমি আমি গেট খোলা রেখেছি । ডান দিকে আমি অপেক্ষা করছি !
কথাটা শুনেই ঐশীর বুকের ভেতরে একটা অন্য রকম অনুভূতি হতে লাগলো ! এসব কি হচ্ছে ওর সাথে ! এমন তো হবার কথা না । মোটেই হবার কথা না ! এটা নিশ্চয়ই কোন স্বপ্ন ! এখনই ওর স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে ! ঐশী বলল
-আমি আসবো কেন ? আসবো না ! আপনার ঐ নীরা বান্ধবীকে আসতে বলেন !
ওপাশ থেকে খুব জোরে হাসির শব্দ শোনা গেল ! এতোই জোরে যে হাসির শব্দটা ফোনের ভেতর থেকেই নয় বাইরে থেকেই শোনা গেল । অপু কিছু সময় পরে হাসি থামিয়ে বলল
-আসো ! আমি অপেক্ষা করছি !
এই বলে সে ফোন কেটে ছিল । ঐশীর খুব মেজাজ গরম হল । মনে মনে বলল, কি ভাবে এই ছেলে নিজেকে ! সে বলবে আর ঐশী চলে যাবে ? মোটেই যাবে না । এখানেই বসে থাকবে ! অন্য মেয়েকে নিয়ে বাইকে চড়ার সময় তার মনে ছিল না । এখন আবার ঢং দেখাতে এসেছে !
আজকে কলেজ থেকে রিক্সায় করে ফেরার পথে নিউমার্কেটে থেমেছিলো একটা কাজে । সেখান থেকে বাসায় ফেরার জন্য রিচায় উঠতে যাবে তখনই চোখ গেল অপুর দিকে । সে বাইকে করে অন্য দিকে যাচ্ছিলো । দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল সাথে সাথেই । কারন বাইকের পেছনে নীরা নামের একটা মেয়ে বসে ছিলো । মেয়েটাকে সে আগে থেকেই চেনে । অপুর সাথেই মেডিক্যালে পড়ে । মাঝে মাঝে এই বাসাতেও এসেছে ।
বাসায় আসার পর থেকে কেবল অনুভব করলো যে ওর মনটা কেমন অস্থির হয়ে গেছে । কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। ও নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না । এতো দিন ধরে নিজের মনের সাথে দুদ্ধ করে যে যে সত্য সে লুকিয়ে রেখেছে সেটা যেন ভেঙ্গে চুড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে । আর এখন অপুর এই ফোন পেয়ে সেই শেষ বাঁধা টুকুও পেরিয়ে গেল সত্যটা ।
সিড়ি দিয়ে নামার সময় একবার মনে হল বাসায় ঢুকে একটু হাত মুখে পানি দিয়ে আসে । সেই সাথে পরনের পোশাকটাও বদলে আসে । একটা কালো রংয়ের লিং টিশার্ট পরে আছে ও । সেই সাথে সাদা রংয়ের একটা লেগিংস । দিনের বেলা হলে এই জিনিস পরে বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তা করাও যেত না । কিন্তু রাতের বেলা বলে সাহস করলো ও । আর বাসায় গেলে হয়তো আর বের নাও হতে পারে । যদি কোন রকম আওয়াজ শুনে কারো ঘুম ভেঙ্গে যাবে তাহলে সব মাটি !
তিন মিনিটের মাথায় ঐশী গেট দিয়ে বের হয়ে এল । পুরো এলাকাটা একেবারে নিশ্চুপ হয়ে আছে । ডান দিকে একটু হাটতেই দেখতে পেল অপুকে । বাইকের উপর বসে আছে । ওকে আসতে দেখেই বাইখ স্টার্ট দিল । তারপর বলল
-উঠো !
-কোথায় যাবেন এই রাতের বেলা ?
-সেটা গেলেই দেখতে পাবা । উঠতে বলছি ওঠো
ঐশী বুঝতে পারছে এই ছেলে গলাতে এতো জোর কিভাবে পাচ্ছে । যেন সে জানেই সে বলবে ঐশী তাই করবে। ঐশী নিজের উপরেই বিরক্ত হল । এমন কেন হচ্ছে ? দুপুরের ঐ দৃশ্য দেখেই ও ঠিক করেছিলো এই বদ ছেলের কথা ও আর ভাববেই না । কিছুতেই ভাববে না । কিন্তু পারে নি । কিছুতেই কিছু হয় নি । আর এখন সে এই ছেলের সাথে বাইকে উঠতেছে ।
অপু একটু হেসে বলল
-শক্ত করে চেপে ধরবে কিন্তু ! আমি কিন্তু দ্রুত চালাবো খুব !


পরিশিষ্টঃ
আধা ঘন্টা পরে । বাইক ছুটে চলছে ঢাকা ফরিদপুর মহাসড়ক দিয়ে । ঐশী শক্ত করে অপুকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে । মাঝেমাঝেই ও নিজের বাবার মোটর সাইকেলে ওঠে কিন্তু এই গতির কাছে সেই গতি কিছুই না । ঐশী সামনের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না । তবে ওর কেন জানি ভয় করছে না । বরং মনের ভেতরে অদ্ভুদ একটা আনন্দ অনুভূতি হচ্ছে ! বারবার মনে হচ্ছে এই দৃশ্য যেন কোন দিন শেষ না হয় !



আনন্দময় রাত
রাতের আকাশটা নুশরাতের কাছে সব সময় অন্য রকম মনে হয় । নিশ্চুপ আকাশের দিকে সে তাকিয়ে আছে ঘন্টার পর ঘন্টা । কি যেন দেখে ! বাসার আশে পাশের আন্টিরা মাঝে মাঝেই নুশরাতের এই চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকাটা নিয়ে কানাঘুষা করে । নুশরাতকে নাকি জ্বীনে ধরেছে । তাই সে সব সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে । তার সেই জ্বীনের খোজ করে !

নুশরাতকে সত্যিই জ্বীনে ধরেছে । তবে এই জ্বীন কোন অশরীরি নয় বরং জলজ্যান্ত মানুষ । আর সেই জ্বীন আকাশে কিংবা গাছের মাথায় থাকে না । সেই জ্বীনটা থাকে ওদের নিজেদের বাসাতেই । ওর সামনে দিয়ে হেটে কলেজে যায়, বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ায় অন্য মেয়েদের নিয়ে । মাঝে মাঝে ওকে ধকম দেয় ছাদে লাফালাফি করার জন্য ।

প্রথম যেদিন নুশরাতের সাথে অপুর কথা হয় সেদিন অপুর কাছে বিশাল এক ধকম খেয়েছিল । এতো জোরে বকা সে আর কোন দিন খায় নি । এমন নি ওর বাবা মাও কোন দিন ওকে এভাবে বকে নি । তেমন কিছুই করে নি সে । কেবল ছাদের উপর একটু নাচছিলো । ওদের এই বাসাটা এলাকার ভেতরে সব থেকে উচু । তাই ছাদের উপর কি করলো সেটা অন্য ছাদ থেকে দেখা যায় না । নুশরাত তাই মাঝে মাঝেই ছাদ উঠে আপন মনে নাঁচছিলো । কানে হেড ফোন লাগিয়ে মনের সুখে এই কাজটা সে মাঝে মাঝেই করে ।

ঠিক সেই সময়েই একটা জোরে ধমক দিল কেউ । নুশরাতের নাঁচ বন্ধ হয়ে গেল । তাকিয়ে দেখলো তাকিয়ে দেখলো অপু ওর সামনে দাড়িয়ে ওর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে । তারপর পর রাগত স্বরে বলল

-এই ভর দুপুর বেলা লাফাচ্ছো কেন ?

নুশরাত প্রথমে কি বলবে ঠিক বুঝতে পারলো না । কোন মতে বলল

-কেন ?

-কেন আবার কি কথা ! এভাবে বাদরের মত লাফাতে ইচ্ছে করে মাঠে গিয়ে লাফাও । তুমি যে এভাবে লাফাচ্ছো নিচে কি পরিমান শব্দ হচ্ছে জানো ? মানুষ জন থাকে না ? মাথায় এতো টুকু জ্ঞান নেই ? ভাত খাও না ? ঘাস খাও ....

নুশরাতের চোখে পানি চলে এল । এতো কঠিন করে কেন কথা বলে ? ওর সাথে কঠিন করে কথা বললে ওর মোটেই ভাল লাগে না । নুশরাত তারপর বেশ কিছুদিন ছাদে আসে নি । কিন্তু তারপরেও অপুর বকাবকি কমে নি। যেখানে সেখানে দেখা হলেও বকাবকি শুরু । মায়ের কাছে বলেও কোন লাভ হয় নি । ওর মা বরং অপুর সঙ্গ দিয়েছে ।

নুশরাত এই ব্যাপারটা খুব ভাল করে খেয়াল করে দেখেছে । একটু ভাল ছাত্র হলেই জগতের সবাই তার সাথে একমত হয় । অপু গতবছর মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে । তারপর থেকে সবার কাছে সে একেবারে ভদ্র আর আদর্শ ছেলে হয়ে গেছে । এলাকার বাবা তার কাছে এসে পরামর্শ নিয়ে যায় কিভাবে তার ছেলে মেয়ে কে পড়ালে মেডিক্যালে চান্স পাবে, ভাল কিছু করতে পারবে । আর এই বদ ছেলে এমন ভাব করে মতামত দেয় যেন সে নিজে কত বড় পন্ডিত হয়ে গেছে ! নুশরাতের খুব মেজাজ গরম হয় । বিশেষ করে ওর পড়াশুনার ব্যাপারে অপু যখন নাক গলায় । ইচ্ছে করে নাক ভেঙ্গে দিতে ।

একদিন ঠিক ঠিক অপুর নাক ভেঙ্গে দিবে ! তখন সে তাকে ডাকবে নাক ভাঙ্গা অপু ! একটু সত্যি সত্যিই এই কাজটা করবে ।

অপুর চেহাটাতে নাক নেই এই কল্পনা করতেই নুশরাত ফিক করে হেসে দিল । তারপর আবারও তাকালো আকাশের দিকে ।

ঐতো একটা তারা খসে পড়লো । নুশরাত সেদিকে তাকিয়ে কিছু সময় চোখ বন্ধ করে রইলো । খসে পড়া তারা দেখে কিছু চাইলে নাকি সেটা পূরন হয়ে যায় । সেও মনে মনে চাইলো কিছু !

পরক্ষনেই পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পেল । আওয়াজটা শুনেই ও একেবারে জমে গেল !

এখন এখানে কেন সে ?

অপুর কালকে ফাইনাল পরীক্ষা ! সে পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকার কথা ! এখানে কেন এসেছে ?

নুশরাতের অস্বস্তির কারণ আছে আরেকটা ! বার বার মনে হচ্ছে ওকে এই অবস্থায় দেখলে অপু কিছু নিশ্চয়ই আঁচ করে ফেলবে । কি লজ্জার ব্যাপার হবে তখন !

আজকে নুশরাত করে হাতে মেহেদী দিয়েছে । অপু মেহেদী খুব পছন্দ করে । সেই সাথে বর্তমানে নুশরাতের পরনে রয়েছে কালো রংয়ের টিশার্ট আর সাদা লেগিংস । রাত বলেই এতো কিছু চিন্তা করে নি । অপুর ফেসবুকে ও খুব ভাল করেই ফলো করে । ও কি পছন্দ করে না করে সেটা খুব ভাল করে জানে । অপু কি কিছু বুঝে ফেলবে ? তাহলে সত্যিই লজ্জার ব্যাপার হবে খুব !

অপু আস্তে আস্তে এগিয়ে এল ওর দিকে । তারপর ওর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল

-এই সবে বিশ্বাস করো তুমি ?

-কোন সবে ?

-এই যে খসে পড়া তারার কাছে কিছু চাওয়া ?

-করি !

-তোমার মাথায় দেখি আসলেই গোবর ভরা !

নুশরাতের হঠাৎ রাগ উঠে গেল । রাগ করেই নুশরাত বলল

-অপু ভাই সব সময় অপমান করে কথা বলবেন না তো । আপনি ব্রিলিয়ান্ট বলে সবাইকে ছোট করে দেখবেন কেন ? হ্যা আমার মাথায় গোবর ভরা ! হ্যাপি !

এই বলেই নুশরাত উঠে পড়লো । আর থাকবে না এখানে । ছাদে এসেছিলো যখন তখন ওর মনটা খুব ভাল ছিল। কিন্তু এখন যেটা খারাপের দিকে যাচ্ছে ।

নুশরাত যখন পাশ দিয়ে চলে যেতে চাইলো তখনই ওকে অবাক করে দিয়ে অপু ওর হাত ধরলো । নুশরাতের পুরো শরীর যেন সাথে সাথে কেঁপে উঠলো । কিছু সময় একেবারে ফ্রিজ হয়ে গেল । বারবার মনে হল কি হল এটা !

কেন হল !

অপু বলল, কই দেখি তোমার হাত ! মেহেদী দিয়েছো দেখি !

-হাত ছাড়েন !

-ছাড়িয়ে নাও !

নুশরাত চুপ করে দাড়িয়ে রইলো । কি করবে বুঝতে পারছে না । সামনের মানুষটা ওর হাত ধরে দাড়িয়ে আছে। ওপর মনের ভেতরে তীব্র একটা আনন্দবোধ হচ্ছে ! কিন্তু সেটা সে কিভাবে প্রকাশ করবে বুঝতে পারছে না।

একটা সময় নুশরাত একটা টান অনুভব করলো ওর হাতে । ওকে পাশে বসিয়ে দিল । তবে হাত এখনও ছাড়ে নি । নুশরাতের কেবল মনে হচ্ছে এই মানুষটা যেন ওর হাত না ছাড়ে । কোন ভাবেই না ।

হঠাৎ অপু বলল, আমার মনটা অস্থির হয়ে আছে ।

-কেন ?

-তোমার জন্য !

-আমি কি করেছি ?

-গত কাল আমি তোমার কলেজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম । তখন তোমাকে দেখলাম একটা ছেলের সাথে বসে হাসছো আর গল্প করছো !

-তো ?

নুশরাত তাকিয়ে দেখলো অপুর চেহারাটায় কেমন যেন একটা অস্বস্তি ফুটে উঠেছে । কিছু যেন বলতে চেয়েও পারছে না । এই প্রথম নুশরাত এমন একটা ভাব ফুটে উঠতে দেখলো অপুর চেহারাতে । নুশরাত বলল, আমি অন্য ছেলের সাথে কথা বললেন আপনার অস্বস্থির কেন লাগবে ?

-জানি না !

কিছু সময় কেউ কোন কথা বলল না । নুশরাতের হাত তখনও অপুর হাতে ধরা ! হঠাৎ অপু বলল

-এই যে তোমার হাতের এই মেহেদী, আমি জানি এটা আমার জন্য দেওয়া !

-ইস বলেছে !

-আমি জানি । তারপর তুমি যেদিন থেকে জেনেছো আমি মেয়েদের কোন ধরনের পোশাকে পছন্দ করি তারপর থেকে সেগুলো ছাড়া আর কিছুই পর নি । যেগুলো পছন্দ করি সেগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছো ।

নুশরাত নিচের দিকে তাকিয়ে ফেলল । ওর বুকের ভেতরে কেমন ঢিপঢিপ করছে । এই ছেলে সব কিছু বুঝে যায় কেন ?

অপু বলল, আর আজকে ঐ দৃশ্য দেখে আমার ভাল লাগে নি !

নুশরাত মৃদু স্বরে বলল, এতো কিছু বুঝে গেছেন তাহলে অস্থির কেন হচ্ছেন ?

-জানি না । সত্যি জানিনা । এই অনুভূতির দিক দিয়ে আমি খুব হিংসুক । আমার প্রিয় মানুষকে অন্য অন মানুষের সাথে মিশতে দেখলেই আমার অস্থির লাগে !
-কিন্তু এটা কি ঠিক ?
-না ঠিক না । তবুও লাগে । কি করবো ?

নুশরাত হঠাৎ করে হেসে ফেলল । তারপর বলল
-এই বাচ্চামী বাদ দিন । কাল পরীক্ষা না আপনার মন দিয়ে পড়ুন গিয়ে ! আর .....।
-আর ?
-আর যেটা নিয়ে অস্থির হচ্ছেন সেটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কোন কারন নেই । যা আপনার তা আপনারই থাকবে ..... কেউ নিতে পারবে না!
-সত্যি ?
-হ্যা সত্যি ?
-প্রমান দাও ?
-ইস ! আপনি দেখি বদ আছেন !

এই বলেই নুশরাত চট করে লাফিয়ে উঠলো । তারপর হাত ছাড়িয়ে নিলো । তারপর এক দৌড়ে চলে এল সিড়ি ঘরের দরজার কাছে । অপুর তখনও বসে আছে । নুশরাত বলল

-কোন প্রমান পাবেন না । বুঝছেন । মুখের কথা বিশ্বাস করতে হবে !



আর কিছু না বলে নুশরাত দৌড়ে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলো । ওর মনে এখন তীব্র একটা আনন্দ হচ্ছে । হঠাৎ করে আজকে এমন ঘটনা ঘটে যাবে ও ভাবতেও পারে নি । ওর বুকের ভেতরটা তীব্রভাবে লাফালাফি করছে । এখন বাথরুমে গিয়ে কিছু ঠান্ডা পানির ঝর্ণার নিচে কিছু সময় না বসলে কিছুতেই শান্ত হবে এসব কিছু ! আজকে আনন্দের রাত !



থেমে যাওয়া গল্প

মিতুকে আমি কোন দিন ভালবাসি নি । কিন্তু মিতু আমাকে ঠিকই ভালবেসেছিলো । বলা যায় মনপ্রান উজাড় করে ভালবেসেছিলো । প্রথম জীবনের ভালবাসা যাকে বলে । কোন চিন্তা ভাবনা না করেই প্রেমে পরা !

ঠিক কোন জিনিসটা দেখে সে আমার প্রেমে পড়েছিলো আমি আজও তা বুঝতে পারি নি । একদিনের কথা আমার পরিস্কার মনে আছে । সেদিন কলেজ ছুটির সময় হঠাৎ করেই বৃষ্টি এসে হাজির । আমি ভাগ্যগুণে একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম । কিছুদুর যেতেই লক্ষ্য করলাম মিতু একটা একটা গাছের নিচে দাড়িয়ে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে । ঐ গাছে আরও কয়েকজন পুরুষ মানুষ দাড়িয়ে রয়েছে । ব্যাপারটা মিতুর জন্য বেশ বিব্রতকর ছিল আবার গাছের তলা থেকে ঠিক বের হতে সাহসও হচ্ছিলো না । আমি রিক্সা থাকিয়ে ওকে তুলে নিলাম রিক্সাতে ।

প্রথমে রিক্সাতে উঠতে চাচ্ছিলো না কিন্তু পরে ভেবে দেখলো যে এই বৃষ্টির ভেতরে এতো গুলো অপরিচিত পুরুষ মানুষের সাথে থাকাটা মোটেই নিরাপদ নয় । এর থেকে আমার সাথে রিক্সাতে ওঠাই বরং ভাল ।

রিক্সাতে উঠে দেখলাম মিতু একটু একটু কাঁপছিলো শীতে । অনেক খানিই ভিজে গেছে সে । আমি পকেট থেকে রুমাল বের করে দিলাম । বেশ খানিকটা পথ তখনও বাকি । আর তীব্র বৃষ্টির কারনে রিক্সা খুব দ্রুত চলছিলোও না ।

যখন ওকে ওর বাসার সামনে নামিয়ে দিলাম তখন বৃষ্টি ধরে এসেছে । নামার সময়ে ও কেবল মৃদু স্বরে বলল ধন্যবাদ । তারপর নেমে গেল ।

বলা চলে তারপর থেকেই ওর সাথে আমার কথা বলা শুরু হয় । এর আগে ক্লাসে দেখা হলেও ঠিক কথা হত না। দুর থেকেই কেবল চিনতাম ওকে ।

মিতুকে আমি গম্ভীর আর কম কথা বলা মেয়ে হিসাবেই চিনতাম । কিন্তু একটা সময় আবিস্কার কালম যে মেয়েটা প্রচুর কথা বলে । অন্য মানুষের সামনে কথা বলতে লজ্জা বোধ করতো কারন তাদের সাথে কথা বলে ও মজা পেত না । আমি ছিলাম ওর কমফোর্ট জোন । একবার মেয়েরা যদি নিজেদের কোমফোর্ট জোনের ভেতরে ঢুকে পড়ে তাহলে তাদের আর থামানো মুস্কিল ।

এর ভেতরে ওকে সাবিহার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম । সাবিহা তখন অন্য কলেজে পড়ে । সাবিহার সাথেও মিতুর বেশ ভাব হয়ে গেল । মাঝে মাঝেই আমরা তিনজন এদিক ওদিক চলে যেতাম । আমি তখনও বুঝতে পারি নি যে মিতু আমাকে ভালবাসে । একদিন সাবিহা আমাকে বলল কথাটা । আমি শুনে আকাশ থেকে পড়লাম!

সাবিহা বলল

-তুমি কি বুঝতে পারো যে মিতু তোমাকে পছন্দ করে ?

আমি অবাক হয়ে বললাম

-মানে ? পছন্দ বলতে ? ফ্রেন্ড হিসাবে পছন্দ নাকি তোমার আমার পছন্দর মত পছন্দ !

সাবিহা বলল

-তোমার আমার পছন্দের মত পছন্দ !

আমি বললাম

-নাহ ! এতো দিন ধরে ওকে চিনি ! আমি তো কিছু বুঝলাম না !

-তুমি বুঝবাও না কোন দিন ! একটা মেয়ে একটা ছেলের দিকে কোন ভাবে তাকায় সেই দৃষ্টিতে কি বলে এটা একটা মেয়ে খুব ভাল করে বোঝে !

কথা সত্য । আমরা যেন অন্য ছেলের দৃষ্টি বুঝতে পারি তারা মেয়েদের দিকে কিভাবে তাকায় মেয়েরাও মেয়েদের এই চাহনী ঠিকই বুঝে ! আমি বললাম

-তো ? আমাকে কি করতে বল ?

-কিছুই না । দেখো মিতু ভাল মেয়ে । আমার কোন সমস্যা নেই তাতে কিন্তু ও তোমাকে পছন্দ করে এটা বুঝতে পেরে আামার ওকে সহ্য হচ্ছে না । ও তোমার আশে পাশে থাকলে ভাললাগে না !

এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক । আমি সাবিহার স্থানে হলে হয়তো আমারও ভাল লাগতো না । আমি সাবিহাকে বললাম

-আচ্ছা আমি ওর সাথে কথা বলে ব্যাপারটা এখানেই মিটিয়ে ফেলবো !

পরদিন মিতুকে কথাটা বলতেই ও চোখ সরিয়ে নিল অন্য দিকে । যেন ওর একটা অপরাধ ধরা পড়ে গেছে । আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না । কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম অন্য দিকে । মিতুই বলল

-দেখো এটা একদমই আমার নিজের ব্যাপার ! তোমার এই ব্যাপারে চিন্তিত হতে হবে না । সাবিহাকে বল যে ওকে চিন্তা করতে হবে না । আমি কোন দিন তোমাদের দুজনের মাঝে আসবো না ।

-আমি জানি ।

মিতু বলল

-আমি জানি সাবিহা যেদিন থেকে বুঝতে পেরেছে সেদিক থেকে ও আমাকে ঠিক পছন্দ করছে না । কিন্তু কি করবো না, আমি তোমার প্রতি অনুভূতিটা নিয়ন্ত্রন করতে পারছি না । কিছুতেই পারছি না । তোমার থেকে দুরে যাবো সে শক্তিও আমার নেই ।

কি অদ্ভুদ এক পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম আমি । এভাবেই কয়েকদিন চলে গেল । আমি মিতুর সাথে আগের মত মিশতে গেলেই বারবার কেবল ঐ কথা মন হয় । সাবিহার চেহারা ভেসে ওঠে । একটা সময় আমাদের মাঝে দুরুত্ব তৈরি হয়ে গেল । আমি জানি এটা ওকে কষ্ট দিত কিন্তু মনে হল যে এটাই সব থেকে ভাল উপায় । বেশি বেশি মিশলেই বরং আমার প্রতি ওর আকর্ষন আরও বেড়ে যাবে ।

কলেজ শেষ করে আমরা যখন ইউনিভার্সিটি কোচিংয়ের জন্য ঢাকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি মিতু তখন আমাদের এলাকা ছেড়ে পাড়ি দিল ওর মামার কাছে সিলেটে । যাওয়ার আগে শেষ বারের মত আমার সাথে দেখা করতে চাইলো ।

সেদিন রাতে ওর বাস ছিল । সন্ধ্যা বেলা আমি হাজির হলাম ওর বাসার পাশের বাগানটাতে । বেশ কিছুটা সময় কেবল বসে রইলো । কেউ কোন কথা বললাম না । হঠাৎ মিতু আমাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো । সে কান্নার যে তীব্রতা ছিল সেটা আমাকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিল । কেউ আমার জন্য এমন ভাবে কাঁদছে এটা ভাবতেই মনটা সিক্ত হয়ে উঠলো ।

চলে আসার কেবল ও ঠোঁটে মৃদুর ভাবে একটা চুমু খেল । আর বলল, ভাল থেকো আমার ভালবাসা । তোমাকে কোনদিন ভুলবো না ।

সেই দিনই আমাদের শেষ দেখা । আর কোন দিন ওর সাথে আমার দেখা হয় নি । মিতুর ভালবাসার গল্প সেখানেই থেমে গেছে ।




কত কথা ছিল বলার

চারিদিকের এতো আওয়াজ এতো আওয়াজ আর এতো মানুষ তার পরেও সুদ্বীপ্তার মনে হচ্ছে ও যেন একদম একা । আজ সুদ্ধীপ্তার বিয়ে । বিয়ের সব আয়োজন একেবারে সমাপ্ত । সব কিছু তৈরি । ওর কানে এই তথ্যও এসেছে যে বরযাত্রী বাসা থেকে রওয়ানা দিয়েছে । খুব জলদিই এখানে চলে আসবে । সবার মুখ হাসি হাসি কিন্তু ওর নিজের মনে শান্তি নেই । মনের মাঝে বারবার কেবল সেই চেহারাটা ভেসে উঠছে । শেষ বারের মত তাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে !

অপুর সাথে ওর পরিচয়টা অনেক দিনের । একই সাথে কলেজ যাওয়া একই সাথে প্রাইভেট । ইন্টার পাশ করেও ওদের যোগাযোগ ছিল । কত কথা বলতো ওরা । কত ধরনের কথা । একবার কথা শুরু হলে যেন আর কথা শেষই হত না । চলতেই থাকতো ওদের ।

একটা সময় সুদ্বীপ্তা অনুভব করতে পারলো যে অপুর জন্য তার একটা অনুভূতি কাজ করা শুরু করেছে । এই অনুভূতির কোন তূলনা নেই । সে যে অপুর প্রেমে পরেছে সেটা বুঝতে আরও একটু সময় লাগলো । কিন্তু অপুর দিক থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে খানিকটা হতাশ হয়ে পড়লো । বারবার মনে হত ছেলেটাকে কি কখনই এসব বুঝবে না ? ওর জন্য এতো এতো ভাবনা এতো নির্ঘুম রাত কাটানো এসব কি কোন দিন অপু বুঝতে পারবে না ?

অপু বুঝতে পারে নি । তার মনে কেবল কাজ করতো কোন মেয়েটা তার দিকে কেমন চোখে তাকালো কে তার লেখা পড়ে কি বলল এই সব ! কতদিন অপুকে অনুরোধ করে বলেছে সে ওকে নিয়ে একটা গল্প লিখতে কিন্তু অপু কোন দিন ওকে নিয়ে গল্প লিখে নি । ওর একটাই বক্তব্য হচ্ছে বন্ধুদের নিয়ে গল্প লেখা যাবে না । গল্প লিখতে হবে কেবল ক্রাশদের নিয়ে ।

বর চলে এসেছে !

পুরো ঘরের ভেতরে একটা হইহই পড়ে গেল । সবাই দেখতে দেখতে ঘর ছেড়ে বাইরে চলে গেল । এতো সময় সুদ্বীপ্তা তো মনের ভেতরে একা ছিল এখন বাইরের একা হয়ে গেল একেবারে । খুব কান্না আসতে লাগলো ওর । বারবার ইচ্ছে করলো চিৎকার করে কাঁদি । একবার মনে হল যে হয়তো ভুলই করলো বিয়েতে রাজি হয়ে । আর কটা দিন অপেক্ষা করলে কি কোন লাভ হত ?

অপুর কাছ থেকে নিকেজে গুটিয়ে নিয়েছিলো সে । আস্তে আস্তে একেবারেই দেখা সাক্ষাত কমিয়ে দিল । তারপর একদম বন্ধ হয়ে গেল । প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হত তবে সেটা সয়ে হয়ে এল । কথায় আছে চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল । একটা সময় সেই কষ্ট গুলো কম মনে হতে লাগলো । যদিও আজকে বেশ কষ্ট হচ্ছে । বারবার অপুকে দেখতে ইচ্ছে করছে ওর !

ওর মনের কথার পূরনের জন্যই হয়তো দরজাটা খুলে অপু ঘরে প্রবেশ করলো । অপুকে দেখে সুদ্বীপ্তার বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করে করে উঠলো সাথে সাথে ।

-তুমি !

-এভাবে একা একা বিয়ে করে ফেলছো ? একবার বললেও না ?

-কি লাভ হত !

অপু কোন জবাব না দিয়ে আস্তে করে এসে সবলো ওর পাশে । তারপর পর সুদ্বীপ্তাকে অবাক করে দিয়ে ওর হাত ধরে বলল

-তোমাকে খুব মিস করেছি এই কদিনে !

সুদ্বীপ্তা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলো । অপু বলল

-আমি আসলে কোন দিন তোমার প্রয়োজনটা ঠিক মত বুঝতেই পারি নি । তুমি ছিলে হৃদয়ের কাছে এই জন্যই হয়তো দেখতে পারি নি । তুমি হারিয়ে যাওয়ার পরে আসলে বুঝতে পেরেছি ।

সুদ্বীপ্তা কি বলবে বুঝতে পারলো না । কেবল ওর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো । কোন মতে টিস্যু দিয়ে চোখের পানিটা মুছে তাকালো অপুর দিকে । তারপর বলল, অনেক দেরী হয়ে গেছে ।

-হুম জানি !

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তখনই হুড়মুড় করে কতগুলো মেয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো । তারপর এক প্রকার জোর করেই সুদ্বীপ্তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল বাইরে । অপু কেবল কেবল সেদিকে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় । বুকের ভেতরে কি অদ্ভুদ কষ্ট হতে শুরু করলো মেয়েটার জন্য ! কত কথা বলার ছিল কিন্তু কিছুই বলা হল না । কেবল তাকিয়ে দেখলো নিজের প্রিয় মানুষটা কিভাবে অন্যের হয়ে গেল !





দীর্ঘশ্বাস

-আই লাভ ইউ ! আই লাভ ইউ সো সো মাচ !

আমি মেসেজ টার দিকে আরও বেশ কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলাম । আমি এও জানি একটু পরেই হ্যাপির আরেকটা মেসেজ এসে হাজির হবে । সে লিখবে, সরি ভাইয়া ! আসলে কি হয়েছে জানেন আপনার নাম আর আমার বয়ফ্রেন্ডের নাম একদম একই । ওকে আই লাভ ইউ পাঠাতে গিয়ে আপনার কাছে চলে গেছে । কিছু মনে নিয়েন না প্লিজ !

এই ঘটনা আজকে নিয়ে সাত বার হচ্ছে । প্রতিবার মেয়েটা আমাকে আই লাভ ইউ বলে তারপর কিছু সময় পরে বলে সে ভুল করে বলে ফেলেছে । সে আসলে তার বয়ফ্রেন্ডকে বলতে চেয়েছিলো ।

আমি আজকেও অপেক্ষা করতে থাকি কখন হ্যাপি আজকে বলবে যে সে সরি ! সে ভুল করে বলে ফেলেছে ।

কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও দেখলাম এই মেয়ে আজকে সরি বলল না । আমি খানিকটা চিন্তিত বোধ করলাম । তারপর নিজের নক দিলাম । ওকে এখনও অনলাইনেই দেখা যাচ্ছে ।

-কি হল ?

সাথে সাথেই উত্তর এল ।

-কি হবে ?

-আজকে সরি বললে না যে ?

-কোন ব্যাপারে ?

-এই যে আজকেও তোমার বয়ফ্রেন্ড কে মেসেজ পাঠাতে গিয়ে আমাকে পাঠিয়ে ফেলেছো !

-নাহ । আজকে ভুল জায়গাতে মেসেজ পাঠাই নি । একেবারে সঠিক স্থানে গিয়েছে মেসেজ !

আমি খানিকটা অবাক না হয়ে পারলাম না । আজকে দেখি এই মেয়ের খুব সাহসী হয়ে উঠেছে । আমি বললাম

-তা তোমার ঐ বয়ফ্রে্ড জানলে রাগ করবে না ?

-করুক ! আমি কারো রাগের ধার ধারি না ।

-তাহলে তো সমস্যা !

-কি সমস্যা ?

-যে মেয়ে কারো রাগের ধার ধারে না তার সাথে তো প্রেম করা যাবে না ! দেখা গেল আমি রাগ করলাম আর তুমি সেই রাগের ধার ধারলে না । তখন ?

-এ মা আমি তাই বলেছি নাকি ?

-তাই তো বলছো ! শোনো এই সব আমার সাথে হবে না !

-এই শুনেন !

আমি আর মেসেজের জবাব দিলাম না । একবার মনে হল মেয়েটাে ব্লক করে রাখি কিন্তু সেটা করলাম না । ব্লক করলে মেয়েটা হয়তো আরও বেশি কষ্ট পাবে । তবে কয়েকদিন মেয়েটা যে আমাকে জ্বালাবে সেটা বুঝতে পারছিলাম । তবে আমার ধারনা এবার ভুল প্রমানিত হল । পরের দিনই আমি হ্যাপির ইন এ রিলেশনশীপ স্টাটাস দেখতে পেলাম । সত্যি সত্যিই অপু নামের একটা ছেলের সাথে ওর সম্পর্ক । আমি সত্যিই সত্যি খানিকটা লজ্জা পেলাম । মেয়েটার কথা শুনে যদি রাজি হয়ে যেতাম তাহলে নিশ্চয়ই হাসির পাত্র হয়ে যেতাম । আমাকে নিয়ে ওরা নিশ্চয়ই হাসাহাসি করতো !

যাক বেঁচে গেছি এ যাত্রায় !

তারপর আর হ্যাপির কথা আমার মনে ছিল না । একবার খেয়াল করে দেখি যে হ্যাপির আইডিটা গায়েব হয়ে গেছে । হয়তো ডিজেবল হয়ে গেছে নয়তো ও আমাকে ব্লক করে দিয়েছে ।

তারপর অনেক দিন পরে এক বই মেলাতে ঘুরতে ঘুরতে হ্যাপির সাথে আবার দেখা হয়ে গেল । সেই পিচ্চির হ্যাপি আর নেই তখন । আমার উপর চোখ পড়তেই দেখি এগিয়ে এল । অনেক কথা হল । আমি এখন কি করি আর সে কি করে, জীবন কেমন চলছে এই সব । কথার ফাঁকে এক ফাঁকে হ্যাপি আমাকে সত্যিই সত্যিই জানালো যে সে দিনের সেই প্রোপজটা সে আমাকে সত্যি সত্যিই করেছিলো । তার অপু নামের কোন বয়ফ্রেন্ড ছিল না । আমিই ছিলাম ওর জীবনের প্রথম প্রেম । আমার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যত হয়ে সে তীব্র লজ্জা পেয়ে যায় । তারপর সেটা কাটানোর জন্যই একটা ফেইক আইডি খুলে এই কাজটা করেছিলো ।

আমি এই কথা শুনে কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না । শেষে ও নিজেই হেসে পরিবেশটা হালকা করে দিল । তবে আমার কেন জানি মনে হল ওর বুকের ভেতর থেকে একটা সুক্ষ দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল । জীবনের প্রথম ভালবাসায় ব্যর্থ হওয়ার দীর্ঘশ্বাস !






ফিরে দেখা তাকে

আমি জানতাম নওশাবা আবারও আমাকে আনব্লক করবে । আজ হোক, কাল সেটা সে করবেই । পছন্দের মানুষকে সহজেই ফেসবুকে ব্লক করা যায় কিন্তু বেশি সময় সেই ব্লক ধরে রাখা যায় না । তাই মোটামুটি নিশ্চিৎ ছিলাম যে নওশাবা আবারও আমাকে আনব্লক করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে !

ঘটনা খুব বড় কিছু না । আমি ফেসবুকে মাঝে মাঝে পরিচিত সবার নাম ব্যবহার করে গল্প লিখি । কখনও বা তাদেরকে সেটা জানাই আবার জানাই না । এমনিই কেবল নাম ব্যবহার করি । নওশাবার নামটাও এই রকম একটা গল্পে ব্যবহার করেছিলাম । আমারও গল্পে নায়কের নামের ক্ষেত্রে সাধারনত আমি নিজের নামই ব্যবহার করে থাকি । এরপর থেকেই যত সমস্যা শুরু হয় । নওশাবা সেই গল্প পড়ে নিজেকে গল্পের নায়িকা আর আমাকে নায়ক ভাবতে শুরু করে দিলো । মেয়েদের মনে কখন যে কি আসে সেটা আসে সেটা বোঝা বড় দায় । তারপর কয়েক দিন সে আমাকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে শুরু করলো যে সে আমাকে পছন্দ করে । আমি যেন তার দিকে নজর দেই । আমি দেখেও না দেখার ভান করলাম । আমি চাচ্ছিলাম যে ও নিজে মুখ ফুটে আমাকে বলে ।

তারপরই নওশাবা একদিন কথাটা জিজ্ঞেস করলো । তবে খানিকটা ঘুরিয়ে । একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে সে আমাকে মেসেজ পাঠালো । সেখানে জানতে চাইলো যে আমি ওকে পছন্দ করি কি না !

আমি সরাসরি উত্তর দিলাম । ওকে বললাম যে যাদের আমি পছন্দ করি না তাদের সাথে আমি কথা বলি না কিংবা মেলামেশা করি না । তার মানে হচ্ছে তাকে আমি অবশ্যই পছন্দ করি । কিন্তু তার মানে এই নয় না আমি তার সাথে প্রেম করতে চাই ।

এই উত্তরটা আমি ইচ্ছে করেই এভাবে দিলাম । আমার কথা হচ্ছে তুমি যদি আমাকে পছন্দ কর তাহলে সরাসরি আমাকে বল যে আমি তোমাকে ভালবাসি । তুমি বাসো ? ঘুরিয়ে বলার কি দরকার !

তাই আমিও ঘুরিয়ে উত্তর দিলাম ।

তারপরেই নওশাবা আমাকে ব্লক করে দিল । এবং ব্লক করে দেওয়ার আগে আমাকে জানালো যে তার বয়ফ্রেন্ড নাকি আমার সাথে কথা বলা পছন্দ করে না । আমি মেসেজ দেখে হাসতে হাসতে শেষ । আমি খুব ভাল করেই জানি ওর কোন প্রেমিক ছিল না । কেবল একটা অযুহাত দরকার ছিল বলে সে এটা ব্যবহার করেছে ।

কিন্তু আমার ধারনা ভুল প্রমানিত হল । নওশাবা আর আমাকে আনব্লক করলো না । আমি ভেবেছিলাম সপ্তাহ যেতে না যেতেই সে আমাকে ঠকই আনব্লক করে দিবে । কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও নওশাবা আর আমাকে আনব্লক করলো না । আমিও ওর কথা ভুলে গেলাম একদম । হয়তো আর কোন দিন নওশাবাকে মনেও পড়তো না ।

কিন্তু আবারও নওশাবা আমার জীবনে ফিরে এল । তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে । বউকে নিয়ে ঘর সংসারে ব্যস্ত। সকালে অফিস যাই বিকেলে বাসায় আসি । ছুটির দিন গুলোতে বউকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই । এই ভাবে জীবন চলে যাচ্ছিলো । এমন এক শান্তিময় সন্ধ্যায় নওশাবার খবোর আবারও আমার দরজাতে এসে হাজির । নওশাবার একটা ছোট ভাই ছিল আমি জানতাম । সে আমার দরজাতে কড়া নাড়লো !

ওকে প্রথম দেখাতে চিনতে আমার খানিকটা কষ্ট হল কারন আমাদের কোন দিন সরাসরি দেখা হয় নি । আমি কেবল ওকে নওশাবার সাথে ছবিতে দেখেছিলাম । ও এসে যা জানালো তার সারমর্ম হল নওশাবার একটা মাইনর অপারেশন হবে । খুব সিরিয়াস কিছু না । কিন্তু ওর ধারনা হয়েছে ও হয়তো মারা যাবে. মারা যাওয়ার আগে আমার সাথে সে দেখা করতে চায় ।

বউকে কিছু না বলেই হাসপাতালে রওয়ানা দিলাম । মাঝে কতগুলো বছর কেটে গেছে । নওশাবার চেহারার বিশেষ পরিবর্তন হয় নি । আগে যেমন সুন্দর ছিল এখনও তেমনই সুন্দরই আছে । আমি যখনই কেবিনের ভেতরে দেখলাম আস্তে আস্তে সবাই কেবিন ছেড়ে বের হয়ে গেল । আমি ওর পাশে বসলাম । নওশাবা আমার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে । ওর চেহারায় একটা বিষণ্ণতা ছায়া পরিস্কার দেখা যাচ্ছে ।

আমাকে না পাওয়ার বিষণ্ণতা ?

আসার পথে ওর ভাইয়ের কাছে এই কথা জানতে পেরেছি যে নওশাবা আর বিয়ে করে নি । বাসা থেকে বেশ কয়েকবার চাপ দেওয়া হয়েছিলো তবে সে রাজি হয় নি ।

আমি বসতেই নওশাবা বলল

-আপনি একদম বদলান নি ?

আমি হাসলাম । তারপর বললাম

-তুমিও আগের মতই আছো দেখছি । আগের থেকে আরও সুন্দরী হয়েছো ?

আমার কথা শুনে নওশাবা হাসলো । তারপর হঠাৎ বলল

-আমার হাত টা একটু ধরবেন ? প্লিজ !

আমি খানিকটা ইতস্তত করে ওর হাত ধরলাম । নওশাবা আবারও কিছু সময় তাকিয়ে রইলো আমার দিকে । তারপর বলল

-আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারতো । তাই না ?

-হয়তো !

-যদি মরে যাই তাহলে আমার উপর রাগ রাখবেন না ।

-রাগ কেন ?

-ঐ যে আপনাকে ব্লক করে দিয়েছিলাম । তবে আপনাকে নিয়মিত ফলো করতাম ফেইক আইডি দিয়ে । খুব কষ্ট হত কেন জানি ! বারবার আপনার কথা বলতে ইচ্ছে করতো !

-বলতে ! আমি কি মানা করেছিলাম ?

নওশাবা উত্তর না দিয়ে আরও কিছু সময় চুপ করে থাকলো । ওর ভাই এসেআমাকে জানালো যে নাওশাবাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে । ডাক্তােরা সবাই অপেক্ষা করছে । আমি উঠে পড়লাম । তারপর কি মনে হল নওশাবার কপালে মৃদু ভাবে একটা চুমু খেলাম । ওকে বললাম

-অতীত নিয়ে পড়ে থেকে কোন লাভ নেই বুঝেছো ! অপারেশন শেষ করে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে । তারপর নতুন জীবন শুরু করবে ! ঠিক আছে ?

ও হাসলো একটু । তবে কথার জবাব দিলো না ।

আর আমাদের কথা হল না । আমার সামনেই ওকে ওটির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল ।

আমি বাইরে বের হয়ে এলাম । রিক্সা করে যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন হঠাৎ আমার মনটা উদাস হয়ে গেল । সত্যিই কি জীবনটা অন্য রকম হতে পারতো ? কি জানি !





স্বপ্নময় রাত তারপর স্বপ্নভঙ্গ

এমন একটা রাত যে ওর জীবনে সত্যিই আসবে সেটা শামা কোন দিন ভাবতে পারে নি । এখনও ঠিক মনে হচ্ছে সব কিছু যেন স্বপ্নের মত ঘটে যাচ্ছে । একদম নাটক সিনেমাতে যেমন হয়ে থাকে সেই ভাবেই আজকের ঘটনা গুলো একের পর এক ঘটেই যাচ্ছে । শামার কাছে মনে হচ্ছে ও একটা স্বপ্নের মাঝেই রয়েছে ।

অপু আহমেদ নামের মানুষটা এখন ঠিক ওর সামনেই বসে আছে । এই জঙ্গলের মাঝে । কেবল ওরা দুজন রয়েছে । সামনে কিছু শুকনো কাঠ জড় করে আগুন জ্বালানো হয়েছে । শামার কাছে কেবলই এসব স্বপ্ন মনে হচ্ছে ।

স্বপ্নটা শুরু হয় যখন অপু আহমেদ ওদের নিউজ এজেন্সীতে ওর সিনিয়র হিসাবে জয়েন করে । বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তাকে শামা চিনে খুব ভাল ভাবেই । সত্যিই বলতে কি অপু আহমেদের জন্যই তার এই পেশাতে আসা । তাকে আইডল মনে করেই এই পেশাতে ঢুকেছে । তারপর যখন সেই মানুষটা স্বয়ং তার বস হিসাবে জয়েন করলো শামা যেন স্বপ্নে ভাসছিলো ।

তবে শামা তার সামনে যেতে কিছুতেই সাহস করতো না । সামনে গেলেই কেমন যেন হাট পা অবশ হয়ে আসতো ঠিক মত কথা বলতে পারতো না । আবার সব সময় তার সামনে ঘোরাঘুরি করতে ইচ্ছে করতো । ইচ্ছে করতো তার আশে পাশে থাকতে তবে অপু আহমেদ সব সময়ই গম্ভীর হয়ে কাজ করতো । সবার কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট দুরুত্ব বজায় রেখেই চলতো । এটা শামা খানিকটা পীড়া দিলেও সে খুশি ছিল । পচন্দের মানুষটাকে সব সময় সামনে দেখতে পাওয়ার ভেতরে একটা আলাদা আনন্দ থাকে । শামা ঠিক সেই আনন্দটাই উপভোগ করছিলো ।

-এখন কেমন লাগছে ? দেখি পা খানা ?

শামা নিজের আপন মনের ভাবনাতেই ছিল, অপুর কথা শুনে তন্ময় ভাঙ্গলো । তাকিয়ে দেখে অপু ওর পায়ের ক্ষতটা পরীক্ষা করছে । একটু আগে সে জঙ্গলের ভেতরে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো । ওদের খাবার শেষ হয়ে গিয়েছে । সেটা আনতেই গিয়েছিলো । শামার পুরো শরীরটা কেঁপে উঠলো । একটা তীব্র লজ্জা লজ্জা ভাব কাজ করতে ওর শরীর জুড়ে । অবশ্য সেই সাথে একটা ভাল লাগাও ছড়িয়ে পড়েছে সেই অনুভূতিতে ।

অপু বলল

-একটু জ্বলতে পারে । বুঝতে তবে ক্ষতটা পরীক্ষা করা দরকার !

-ভাইয়া আপনি বড় হয়ে আমার পায়ে হাত দিচ্ছেন । আমার খুব লজ্জা লাগছে !

-লজ্জা !

অপু কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলো শামার দিকে । ঠিক যেন বুঝতে পারছে না মেয়েটা আসলে কি বলতে চাইছে । তারপর বলল

-শুনো বিপদের সময় এসব ভেবে লাভ নেই । ওকে ?

-হুম !

ক্ষতটা পরীক্ষা করে রুমাল দিয়ে বেঁধে দিল । তারপর আবার বসে পড়লো ওর পাশে । বসতে বসতে বলল

-রাতে কিছু খাবার জুটবে না । না খেয়েই থাকতে হবে বুঝেছো ? ওরা আসতে আসতে আরও দেরি হবে ! আমাদের এখানেই অপেক্ষা করতে হবে !

তারপর শামার দিকে তাকিয়ে বলল

-তোমাকে এই বিপদের ভেতরে নিয়ে আসার জন্য সরি !

শামা বলল

-আপনি কি আনেন নি আমি ইচ্ছে করে এনেছি ! রিমেম্বার ?

সত্যিই তাই । শামাকে এখানে জোর করে পাঠানো হয় নি । শামা ইচ্ছে করেই এসেছে ।

পৎবন নগর এলাকাটা বেশ বিপদ জনক এলাকা হিসাবেই পরিচিত । এখানে মাঝে মাঝেই বড় রকমের ঝামেলা শুরু হয় । একটা বিশেষ এসাইনমেন্ট নিয়ে অপু আহমেদ এখানে আসতে চাচ্ছিলো ছদ্যবেশ নিয়ে । কিন্তু একা একা আসার চেয়ে কাউকে সাথে নিয়ে আসার কথা ভাবছিলো । কিন্তু অফিসে কেউ ই ইচ্ছে করে অপুর সাথী হতে চায় নি । এই বিপদের মাঝে এই কাজটা কেউ করতে সাহস পায় নি । কিন্তু শামা শোনার পরপরই রাজি হয়ে গেল । সে যাবে । অপু প্রথমে রাজি না হলেও এজেন্সীর মালিক যখন বলল তখন রাজি হয়ে গেল ।

তারপরই পৎবন নগরে এসে হাজির । চোলাচালান, আর চাঁদাবাজির বেশ কিছ খবর সংগ্রহ করে ফিরেই যাবে এমন সময় এখানে একটা দাঙ্গা লেগে যায় দুই গ্রুপের মাঝে । সেখানেই শামা পায়ে আঘাত পায় । হোটেলে ফিরে ফেলে হয়তো সন্দেহের কারনে ধরা পরতে পারে তাই আর ফেরৎ যায় নি । পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নেয় । তারপর সেখান দিয়েই এলাকার বাইরে চলে আসে । তবে জঙ্গলটা এতো ঘন যে পথ হারিয়ে ফেলে । আরও রাতের বেলা বলে কিছু করতে পারছিলো না । শেষে ঠিক করলো এখানেই অপেক্ষা করবে সাহায্য আশা পর্যন্ত !

শামা হঠাৎ বলল

-একটা কথা বলি আপনাকে ?

-হুম বল ?

-আপনি এখনও কেন সিঙ্গেল ?

-মানে ?

-মানে এই যে এতো সফল একজন সাংবাদিক আপনি, তারপরেও আপনি এখনও বিয়ে করেন নি ? কেন ?

শামার মনে হল অপু খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করলো প্রশ্ন শুনে । শামা সাথে সাথেই বলল, আপনি যদি রাগ করেন তাহলে বলতে হবে না । আমি কেবল কৌতুহল থেকে জানতে চাইলাম ! আই এম সরি !

অপু এবার তাকালো শামার দিকে বেশ কিছু সময় । তারপর হঠাৎ বলল, তুমি কেন এই বিপদজনক জায়গাতে আসতে রাজি হলে বলতো ?

শামা বলল

-কোন কারন নেই । মনে হল একটা থ্রিল হবে । আসলে এই পেশাটাই তো চ্যালেঞ্জিং পেশা, তাই না ?

অপু একটু হাসলো । তারপর বলল

-তুমি জানো জীবনে প্রচুর মানুষের ইন্টারভিউয়ের আমি নিয়েছি জীবনে । কে মিথ্যা বলছে সেটা সহজেই টের পেয়ে যাই ।

শামা অন্য দিকে তাকালো কিছুটা সময় । কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না । আসলে ও যে অপু আহমেদকে পছন্দ করে এটা অফিসের অনেকেই জানে । এটা যে অপু আহমেদের চোখও এড়ায় নি সেটা শামা জানে । কিন্তু কি বলবে সেটা ও ঠিক বুঝতে পারলো না । অপু বলল

-তুমি যেটা চাও সেটা কোন দিন সম্ভব না শামা ?

শামা সাথে সাথেই বলল

-কেন ?

-এই কেনরও কোন উত্তর নেই ।

-না বলতেই হবে ! আমি শুনবো না । আমি জানতে চাই । আমি কি অযোগ্য ?

-ব্যাপারটা মোটেই যোগ্য অযোগ্য নয় । অন্য কিছু !

-আমাকে বলেন ? আমি শুনতে চাই

-এমন ছেলেমানুষী কেন করছো ?

-আমি জানি না । আমি কেবল জানতে চাই !

আরও কিছু বলতে যাবে তখনই পাশ থেকে আওয়াজ হল । দুজনেই সতর্ক হয়ে উঠলো । অপুর হাতে ওর লাইসেন্স করা পিস্তলটা চলে এসেছে । কোন বিপদ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত । কিছু মানুষ যেন এগিয়ে আসছে ওদের দিকে । শামা কিছুটা ভয়ে ভয়ে তাকালো অপুর দিকে ।

-মিস্টার অপু আহমেদ !

অন্ধকার থেকে আওয়াজ শোনা গেল ! অপু একটু শঙ্কিত কন্ঠে বলল

-ইয়েস !

-আপনার সাথে যে আছে সে কি মিস সুমাইয়া শামা ?

-হ্যা !

-আমাদেরকে আপনার বস আমিরুল আহমেদ পাঠিয়েছে । আপনি কি দয়াকরে আপনার পিস্তলটা নামাবেন ?

কিছুটা শিথিল হয়ে এল অপুর পেশী । সে পিস্তল নামিয়ে এল । অন্ধকার থেকে পুলিশের পোশাক পরা বেশ কিছু মানুষ বেরিয়ে এল ।

ঢাকাতে আবার পৌছাতে পৌছাতে পরদিন দুপুর হয়ে গেল । শামাকে আগে স্থানীয় হাসতাপালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরে ঢাকার একটা প্রাইভেট মেডিক্যালে ভর্তি করা হল । পায়ের ক্ষত ঠিক হতে আরও দুই দিন লাগলো । তারপর আরও কয়েকদিন বিশ্রাম নিল । যখন সপ্তাহ খানেক পরে শামা আবার অফিস জয়েন করলো ও কেবল ব্যাকুল ছিল অপু আহমেদের সাথে দেখা করার জন্য । হাসপাতালে ওকে দেখতে এসেছিলো অনেকেই কিন্তু অপু আহমেদ আসে নি । একটু অভিমান জন্মেছিলো বটে তবে মেনে নিয়েছে । এসাইনমেন্টের দুইদিন অপুর সাথে পুরোটা সময় কাটিয়েছে সে ।

কিন্তু অফিসে এসে সব থেকে বড় ধাক্কাটা খেল সে । অপু আহমেদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে । কোথায় গেছে বলে যায় নি । কেবল চলে গেছে । শামার জীবন থেকেও অপু আহমেদ সেদিন থেকে গায়েব হয়ে গেল ।




কি সেটা!

নীতু যে আমার ইউনিভার্সিটিতে পড়তো আমি ভাল করেই জানতাম । এমন কি ও কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে সেটাও আমি খুব ভাল করে জানি। কিন্তু গত দুই বছরে একটা বারের জন্যও আমি কোন দিন ওর ডিপার্টমেন্টের সামনে যায় নি । এমন সব স্থান আমি এড়িয়ে চলেছি সেখানে ওর সাথে আমার দেখা হতে পারে । তবুও যে ওর সাথে আমার দেখা হয় নি তা নয় । আমার সাথে ওর মাঝে মাঝে দেখা হয়ে যেত । আমি যতদ্রুত সম্ভব সেই স্থান ত্যাগ করতাম । ওর সাথে চোখাচোখি হোক এটা চাইতাম না । ভয় হত সেই দৃষ্টিতে আমি কি দেখবো !

একটা সময়ে এই চোখেই আমি আমার জন্য ভালবাসা দেখেছিলাম । অথবা আমি আরও ভাল করে বললে আমার মনে হত যেন সেই চোখে আমার জন্য ভালবাসা ছিল । কিন্তু সেটা ছিল আমার ভুল ধারনা । নীতু হয়তো আমাকে ভালবাসেই নি । আমি ওকে ভালবেসেছি বলেই হয়তো আমার চোখে ব্যাপারটা এমন মনে হয়েছে । হয়তো আমারই বুঝতে ভুল ছিল । তাই কষ্ট গুলোও আমারই থাকুক । সেগুলো আর আমি বাড়াতে চাই না । চাই ঐ চোখের সামনে আর পড়তে ।

কিন্তু কপালে যদি লেখা থাকে তাহলে সেটা কোন ভাবেই বদলানো যায় না । মিতুর সাথে আমার আবার দেখা হয়ে গেল । আর এমন ভাবেই দেখা হয়ে গেল যে আমার কোন উপায় ছিল না যে আমি সেটা বদলাবো ।

সেমিস্টার ব্রেকের পর কদিন ক্লাস বন্ধ । টিউশনী থেকে ছুটি নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম । বাবা জরুরী ভিত্তিতে বাসায় যেতে বলল । কেন বলল ঠিক জানি না । এমন কি বলল যে সে আমার জন্য বাসে টিকিটও বুক করে রাখবে । বাসে ব্যাগ রেখে আমি বাইরে কিছু সময় ঘোরাঘুরি করে যখন আবার বাসে উঠলাম তখনই আমার বুকটা ধক করে উঠলো ।নীতু যাচ্ছে আমার সাথে । তাও আবার আমার পাশের সীটে বসে ।

আমি কিছুটা সময় কেবল মুর্তির মত করে দাড়িয়ে রইলাম পথে মাঝে । কতদিন পরে ওকে এতো কাছ থেকে দেখছি কে জানে ! সাদা রংয়ের একটা কামিজ পরেছে সেই সাথে সাথে লেগিংস পরে আছে ! সেই সাথে লাল রংয়ের একটা ওড়না গায়ে জড়ানো । আমার দিকে চোখ পড়তেই একটু হাসলো মৃদ্যু ভাবে । যেন আমাকে ও এখানে আশাই করছিলো । আমাকে দেখে মোটেই অবাক হয় নি ।

সত্যই কি অবাক হয় নি ?

আমি খানিকটা মন্থর গতিতে এসে ওর পাশে এসে বসলাম । আমি তীব্র অস্বস্থি বোধ করতে থাকি । একটা সময় আমি ওর এই চোখের দিকে তাকানোর জন্য কত কিছুই না করতাম । কত চোখাচোখি হত আমাদের । নিরবে কত মুচকি হাসি । সেদিন কবেরার কথা !

গাড়ি চলতে শুরু করেছে অনেকটা সময় । পুরোটা সময় আমি নীতুর দিকে একবারও তাকায় নি । ও একদম আমার গা ঘেষেই বসে আছে । ওর শরীর থেকে মিষ্টি সুগন্ধ আসছে । আমি সেটা টের পাচ্ছি খুব ভাল করে । খুব ইচ্ছে করছে ওর সাথে কথা বলার জন্য । একটা প্রশ্ন আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এখনও কিন্তু করতে পারি না । নিজেকে কেন জানি এতো ছোট করতে ইচ্ছে করে না ।

হঠাৎ নীতু বলল

-কথা কি আর বলবেই না ঠিক করেছো ?

আমি কোন মতে তাকিয়ে বললাম

-কই না তো !

-এতো সময় আমরা পাশাপাশি বসে আছি আর তুমি একটা কথাও বল নি ।

-তুমিও বল নি । আমি আবার ভুল বুঝি তো । আগে থেকে কথা বললে তুমি আবার কি মনে কর তাই ?

-আমি কিছু মনে করবো.....।

নীতু কিছু বলতে গিয়ে বলল না । চুপ করে গেল । আমি কিছু সময় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম নীতু যেন একটু একটু কাঁদছে যেন !

মানে কি রে এসবের ?

এই মেয়ে গুলো এমন কেন ?

এতো রহস্য কেন করে ?

নিজেই ইশারা দিয়ে কাছে টানবে আবার নিজেরা দুরে ঠেলবে আবার নিজেরাই ফ্যাঁচফ্যাচ করে কাঁদবে !

নতুন কলেজে উঠেছে নীতুকে আমার চোখে পরে সবার আগে । প্রথম বয়সের ভাল লাগা যেটাকে বলে । সারাটা দিন কেবল চোখের সামনে নীতুকেই দেখতে পাই । কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম আমি যেন ক্লাসের ফাঁকে ওর দিকে তাকাই, কলেজ ছুটির পরে ওর পিছু নেওয়া এসব কেবল এক দিক থেকেই নয়, ওদিক থেকেও ছিল । ওর সাথে চোখাচোখী হয়ে গেলেই ও হাসতো । সেই হাসির ভেতরে কি যে রহস্য লুকিয়ে থাকতো ! কি যে আনন্দ হত ! যখন ওর পিছু নিতাম ফেরার পথে, মাঝে মাঝেই ওর হাত থেকে এটা ওটা খসে পড়তো । নীতু সে সব তোলার চেষ্টা করতো না । ওভাবে ফেলে চলে যেত । আমি কাছে গিয়ে দেখতাম কোন দিন চকলেট পড়ে আছে কোন দিন না একটা ফুল ! আমার জন্যই যে ও সব রেখে দিতো বুঝতে কষ্ট হত না ।

কিন্তু আমরা কেউ এগিয়ে যেতাম না । কেউ একে অন্যের সাথে কথা বলতাম না । কিসের জানি একটা ভয় কাজ করতো । এভাবে দিন কেটে লাগলো । কিন্তু একটা সময়ে মনে হল এই ভাবে আর কয়দিন । ঐদিক থেকে সব কিছু ঠিক আছেই । এখন ভালবাসি বলার সময় এসেছে ।

কলেজের শেষ দিন আমি ওকে বলেও দিলাম । আমি আগের দিন রাতের বেলা ঘুমাতেই পারি নি উত্তেজনার কারনে । কিন্তু ধাক্কাটা খেলাম সেদিনই । নীতু আমাকে কেবল বলল, আমিএখন এসব রিলেশনে জড়াতে চাই না । সামনে পরীক্ষা, পড়াশুনা করতে চাই !

সেদিন ঐ খানে কত সময় আমি দাড়িয়ে ছিলাম আমি নিজে জানি না । তবে সেই ধাক্কা থেকে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছে । এখনও যে আমি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছি তাও না !

আর এখান এই মেয়ে আমার পাশে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদছে !

এসবের মানে কি কে জানে ?

-আই এম সরি !

হঠাৎ নীতু কথাটা বলল । আমি বললাম

-সরি কেন ?

-ঐদিন তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য । আসলে আমি সেদিন ঠিক বুঝতে পারি নি অথবা বলতে পারো আমি হয়তো প্রস্তুত ছিলাম না । আর...

-আর ?

কথাটা বলার আগে একটু দম নিল । তারপর আবার বলল

-আর ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আবারও ফিরে আসবে । কিন্তু তুমি যে এভাবে রাগ করে আমার মুখ দেখাই বন্ধ করে দিবে কোন দিন ভাবি নি । তোমাকে হারানোর পরে আমি তোমার গুরুত্ব বুঝতে পারি । আমি কি হারিয়েছি সেটা বুঝতে পারি !

আমি কি বলবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । নীতু তখনও কেঁদেই চলেছে । আমি পকেট থেকে টিস্যুর বের করে ওর হাতে দিলাম । হঠাৎ কেন জানি মনটা শিক্ত হয়ে শুরু করেছে । নীতুর উপর যে রাগ ছিল সেটা রক্ষ্য করলাম কমতে শুরু করেছে ।

নীতু বলল

-আমি অনেক দিন তোমার ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থেকেছি কিন্তু কোন দিন তোমার দেখা পাই নি । যে কয়বার তোমাকে দেখতে পেয়েছি কেবল দেখেছি তুমি আমার থেকে দুরে চলে গিয়েছো !

আমি চুপ করে রইলাম কেবল । কি বলবো ঠিক খুজে পেলাম না । কথা সত্য আমি সব সময়েই ওকে এড়িয়ে চলেছি । নীতু আবার বলল

-একবার আমাকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া কি যেত না ?

-জানি না !

-এখনও রাগ করেই থাকবা ?

আমি চুপ করে থাকলাম । নীতু এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-রাগ করেই থাকবা তাই না ?

হঠাৎ নীতুর কন্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে গেল । আমি খানিকটা অবাক হয়ে গেলাম । নীতু বলল

-তোমার কি মনে হয় আমি এর শোধ তুলবা না মনে করছো ?

-মানে কি ?

-মানে কি ! বাসায় গেলে বুঝতে পারবে ? তোমার কি মনে হয় হঠাৎ করে তোমাকে কেন বাসায় যেতে বলা হল ? আমি আমি হঠাৎ করেই তোমার পাশের সিটে এসে বসলাম ! তোমার মনে হয় না আমার বাবা আমাকে একা একা এতো দুর আসার অনুমূতি দিল কিভাবে ?

আমি বিস্ময় নিয়ে তাকালাম কেবল নীতুর দিকে । এই মেয়ে কি বলছে ? কি ব্যাপার ?

নীতু আমাকে ভড়কে যেতে দেখে ফিক করে হেসে ফেলল কেবল । তারপর বলল

-কেবল একটা কথা বলি, তোমার বাবা আমার এই টিকিট বুক করে দিয়েছে । বুঝলে ! বাকিটা বাসায় গিয়ে টের পাবে !

পুরো রাস্তা নীতু এই ব্যাপারে আর কোন কথাই বলল না । নিজের মোবাইল বের করে গান শুনতে লাগলো । একটা সময়ে ওর এয়ারফোনের একটা আমার কানে নিজে হাতেই ঢুকিয়ে দিল । তারপর নিজের পছন্দমত গান শুনাতে লাগলো আমাকে । একটা সময় গান শুনতে শুনতে আমার শরীরের হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো খুব স্বাভাবিক ভাবেই । আমি টেনশনে বাঁচলাম না । এই মেয়ে দেখি সত্যি রহস্য করতে খুব পছন্দ করে ।

না জানি বাবার সাথে কি পরামর্শ করেছে ! আমি অপেক্ষা করতে থাকি । বাস এগিয়ে চলতে থাকে বাসার দিকে । তবে অনেক দিন পরে আজকে মনের ভেতরে কেন জানি একটা শান্তি শান্তি অনুভূতি কাজ করছিলো । নীতুর প্রতি সকল রাগ আমার তখন চলে গেলে । সামনে হয়তো আরো ভাল কিছু অপেক্ষা করছে !

কিন্তু কি সেটা !




ডাক্তার বউ

-খেতে পারবে তো ?
আমি টিভি দেখছিলাম । মৌসুমীর কথাটা আবার কানে যেতে আবার ওর দিকে ফিরে তাকালাম । ও হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একেবারে প্রস্তুত । আমি একটু হাসলাম । তারপর বললাম

-খেতে পারবো না কেন ?

-না মানে ঠান্ডা খাবার খেতে হবে তো !

-তো ! তুমি এমন কর যে আমি যেন এসব কোন দিন করি নি ।

মৌসুমী একটু মাথা নিচু করে বলল

-তুমি আবার কি মনে কর !

-আমি কি মনে করবো বলতো ? তুমি কাজে যাচ্ছো, এটা তোার ডিউটি ! আমাকে রান্না করে খাওয়ানো তোমার এক মাত্র কাজ নয় ! তুমি নিশ্চিন্তে যাও !

দরজা কাছে গিয়েও আবার আরেকবার ফিরে তাকালো । আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আবার হাসলাম । এই মেয়েটার মনে এসব কি যে চলে আমি কিছু বুঝি না । আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম । মৌসুমী এবার আমার হাসিতে খানিকসটা আস্বত্ত হল মনে হল । একটু হাসলো । তারপর দরজা খুলে বের হয়ে গেল ।

আমি আবার টিভির দিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু কেন জানি পারলাম না । বারবার ঘুরে ফিরে আবার মৌসুমীর কথাটা ফিরে ফিরে আসতে লাগলো । মেয়েটা কি কোন দিন নিজের ভেতরে ফেরৎ আসবে না? সারা জীবন এমন একটা হীন্যমন্যতা নিয়ে কাটাবে ?

মৌসুমী সাথে আমার বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস হয়েছে । আমি বলবো না মৌসুমী দেখতে খুব সুন্দরী ছিল । আমি নিজেও তো আর রাজপুত্র নই । আমার হিসাবে সে ঠিক আছে । তবে বলতে কোন দ্বিধা নেই যে কেবল চেহারাটা বাদ দিয়ে মৌসুমী আমার থেকে সব কিছুতেই মৌসুমী এগিয়ে । পেশাতে সে একজন ডাক্তার । তাও আবার বিসিএস পাশ করা । অন্য দিকে আমি একটা ব্যাংকে চাকরি করি কেবল । আমাকে ওর বিয়ে করার কোন কথা না তবুও আমাদের বিয়ে হয়েছিলো ।

এর কারনটা ও আমাকে বলেছিলো বিয়ের রাতে । বাংলাদেশের বেশির ভাগ মেয়েই নিজের চেহারা সম্পর্কে খুব সচেতন । আর যে সব মেয়েদের চেহারা সুন্দর নয় সেটা নিয়ে তারা খুব বেশি চিন্তিত থাকে, মনমরা হয়ে থাকে । আর যদি কোন কারনে যদি এই সম্পকৃতি ঘটনা থেকে কোন ধাক্কা খায় তাহলে সেই ক্ষতটা সারা জীবন যে থেকেই যায় ।

মৌসুমী যেখন মেডিক্যালে ভর্তি হয় তখন একটা ছেলের সাথে ফোনে কথা বলতো । তারপর সেখান থেকে প্রেম । আগে তখন এতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় এতো সহজে কেউ কাউকে দেখা সুযোগ ছিল না । তাই না দেখেই তাদের প্রেম চলতে লাগলো । তারপর একদিন দেখা হল তাদের । এবং ছেলেটা মৌসুমীকে পছন্দ করলো না । ব্রেক আপ করলো । সেই আঘাতটা মৌসুমীর মনে লেগেছিল খুব । সেটা ওর মনবলকে অনেকটাই নিচে নামিয়ে দিয়েছে । পড়াশুনায় ভাল হলেও ও নিজের চেহারা নিয়ে একটা ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকে । সেটা এখনও যায় নি । সে ভেবেই নিয়েছে তাকে হয়তো কেউ আর ভালবাসবে না !

আমার হঠাৎ কেন যেন মনে হল আজকে মৌসুমীকে লাইনে আনার একটা চেষ্টা করা যায় । যেমন ভাবা তেমন কাজ ! আমি বেশ কিছু সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়ে নিই । ওর পছন্দের খাবার গুলো রান্না করতে বেশ সময় লেগে গেল । অবশ্য সেটা সমস্যা না । ওর ডিউটি সকাল ছয়টা পর্যন্ত । আমি এর আগে গিয়ে পৌছাবো ।

যখন ওর হাসপাতালে পৌছালাম তখন রাত একটা বাজে । আমাকে হাসপাতালের স্টাফরা আগে থেকেই চিনে । তাই ওর অফিস পর্যন্ত যেতে আমার কোন অসুবিধা হল না । ক্যাবিনে গিয়ে দেখি ও ক্যাবিনে নেই । রাউন্ডে গেছে । ওর এক কো ডাক্তার বসে রাতের খাবার খাচ্ছে । আমাকে আসতে দেখে হাসলো । তারপর বলল

-বাহ ! মৌসুমীর জন্য খাবার নিয়ে এসেছেন !

আমি হাসলাম । তবে কিছু বললাম না । সে আবারও

-ভাইয়া, আপনি জানেন মৌসুমীর যখন নাইট ডিউটি থাকে তখন রাতে ও কিছুই খায় না ।

-কেন ?

-আমি খাওয়ানোর চেষ্টা করেছি বেশ কয়েকবার কিন্তু কাজ হয় নি ।

আমি অবাক হয়ে বললাম

-কেন ? খায় না কেন ?

ডাক্তার মেয়েটি হাসলো । তারপর বলল

-ও নাকি আপনাকে ছাড়া খেতেই পারে না । আপানকে কি পরিমান ভালবাসে সেটা আমি ওর চোখে দেখেছি । জাস্ট অবাক হয়ে গেছি !

আমি কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । এর মানে হচ্ছে ওর যতদিন রাতে ডিউটি ছিল ততদিন কিছু না খেয়েই থেকেছে !

আমি কিছু বলতে যাবো তখনই মৌসুমী কেবিনে ঢুকলো । আর আমাকে দেখেই চমকে উঠলো । আমাকে এখানে আশা করে নি । ডাক্তার মেয়েটির তখন খাওয়া শেষ হয়ে গেছে । সে মৌসুমীর দিকে তাকিয়ে বলল, এবার কিছু খাবে আশা করি !

মৌসুমী ওকে কিছু বলে চুপ করার চেষ্টা করলো তবে মেয়েটি থামলো না । আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলল

-ভাইয়া জোর করে খাওয়াবেন । না খেতে চাইলেও । দেখছেন কেমন চিকন হয়ে যাচ্ছে ! বেশি চিকন হলে আদর করে মজা পাবেন না কিন্তু !

মৌসুমীর মুখ লাল হয়ে উঠলো । মেয়েটাকে ধমক দিয়ে বলল

-যা রাউন্ড দিয়ে আয় !

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-তুমি !

আমি কিছু না বলে টিফিক ক্যারিয়ার খুলতে শুরু করলাম । তারপর নিজের হাতে যত্ন করেই ওকে খাইয়ে দিলাম । ওকে যখন খাইয়ে দিচ্ছিলাম তখন ওর চোখে কেমন পানি টপমল করছিলো । আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না যে মৌসুমীর ভেতরে ভেতরে কি পরিমান আনন্দ হচ্ছে ।

খাওয়া শেষ করে আমি যখন যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন মৌসুমী হঠাৎ বলল

-আজকে না গেলে হয় না ?

-থাকবো ?

-যদি সমস্যা না হয় !

-আচ্ছা থাকি । সমস্যা হবে না !

আমরা বারান্দায় বসলাম । বাইরে জ্যোঁৎসা জ্বলছে । মৌসুমী হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলো । তারপর বলল

-আমাকে এভাবে ভালবাসবে তো সারা জীবন ?

আমি কেবল ওকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম । মৌসুমী আবার বলল

-আমি কোন দিন ভাবি নি আমাকে সত্যি সত্যি কেউ ভালবাসবে ! এই জন্য তোমাকে হারানোর ভয় খুব আমার !

আমি ওকে মুখের সামনে এনে বললাম

-এই তাকাও আমার দিকে ! আমার চোখের দিকে ! ভালবাসি তোমাকে ?

-হু !

-এই চোখ দেখে মনে হচ্ছে চলে যাবো ?

-উহু !

আমি হাসলাম । তারপর ওর হাত দুটো আর শক্ত করে ধরে বসে রইলাম । এই হাসপাতালও আমার কাছে যেন স্বর্গ মনে হতে লাগলো । এতো মায়াময় বউ যদি পাশে থাকে তাহলে যে কোন স্থানই এমন স্বর্গ মনে হবে !




ভুল

জীবনের এই পর্যায়ে এসে সানিয়া জীবনের কাছ থেকে আর কিছু চায় না । একটা সময় খুব করে কিছু একটার জন্য স্বপ্ন দেখেছিলো । নিজের মনের ভেতরে বুনেছিলো নতুন একটা স্বপ্ন । কিন্তু চোখের সামনে সেই স্বপ্নটা ভেঙ্গে যেতে দেখে আর কিছুই চাইতে সাহস হয় নি । কারন স্বপ্ন ভাঙ্গার কষ্ট আর দ্বিতীয়বার পেতে চায় না ।

কিন্তু সজিবের সাথে যখন আবার দেখা হয়ে গেল তখন সাথে সাথেই আবার পুরানো ক্ষতটা জেগে উঠলো । চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পরতে শুরু করলো আবার !

-আরে সানিয়া না ?

মুখটা খুব স্বাভাবিক করে একটু তাকালো একটু সজিবের দিকে । একটু হাসির ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলো । ওকে বুঝতে দিতে চায় না কোন ভাবেই । সজিব আবারও বলে উঠলো

-আরে তাই তো ! সানিয়াই তো ! এখানে !

সজিব যেন চিৎকার করে উঠলো । সানিয়া সজিবের চিৎকার শুনে একটু অবাক না হয়ে পারলো না । সাজিব এতো স্বাভাবিক আচরন করছে কিভাবে ? ওর কি কিছুই মনে পড়ছে না ? নাকি মনে করতে চায় না । একটু মনকে শক্ত করে এগিয়ে গেল সজিবের দিকে ।

পারবতিপুর স্টেশনের ওয়েটিং রুমে এসে সজিবের সাথে এভাবে দেখা হবে যাবে সানিয়া ভাবতে পারে নি । মনের ভেতরে এই দেখা হয়ে যাওয়ার ভয়টা ছিল ওর অনেক দিন থেকেই । সেই মইণ স্যারের কোচিং সেন্টার যেদিন ছেড়েছিলো তারপর থেকে সারাটা সময় কেবল এই ভয় ছিল যদি সত্যিই কোন দিন দেখা হয়ে যায় তখন কিভাবে চোখে চোখ রেখে কথা বলবে সজিবের সাথে ! আর দেখা কি না হয়ে গেল এই রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে !

সজিবকে ও চিনতো সেই কলেজ জীবন থেকে । যদিও ওরা ভিন্ন কলেজে পড়তো তবে একই স্যারের কাছে কোচিং করতো । একই সাথে একই ব্যাচে । অপুর বন্ধু ছিল । সেই হিসাবে সজিবের সাথে কথা হত । কথা বার্তায় দারুন চটপটে ছিল । অল্প সময়েই সবার সাথেই সজিবের খুব ভাব হয়ে গেল ।

তারপরই সানিয়া প্রথম চিঠিটা পেল ওর বইয়ের মধ্যে । কে যেন চিঠিটা ওর ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে । কখন দিয়েছে সানিয়া বলতে পারবে না । রাতের বেলা পরতে গিয়ে চিঠিটা আবিস্কার করে । প্রথমে খুব রাগ হলেও কৌতুহল থেকে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে । এতো চমৎকার করে কথা গুলো লেখা ছিল যে সানিয়ার মনে আর সেই বিরক্তিটা আর থাকে নি । সারাটা রাত কেবল চিঠির কথা গুলোর কথা ভেবে কাটিয়ে দিলো সেদিন রাতে । পর কয়েক দিন খুব মনযোগ দিয়ে খোজার চেষ্টা করলো কে চিঠিটা রেখে যায় সেটা খোজার জন্য । কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারলো না । কাউকে ঠিক লজ্জার কারনে বলতেও পারলো না । এমন কি ওর বন্ধু অপুকেও বলতে পারলো না ।

এভাবে পুরো ফার্স্ট ইয়ারটা কেটে গেল । এর মাঝে বেশ কয়েকটা চিঠি এসে হাজির হয়েছে । তবে একদিন সানিয়া ঠিক ঠিক জেনে গেল । আসলে নিজের চোখে সজিবকে দেখে ফেললো ওর বইয়ের ভেতরে খাম রাখতে । খুব ইচ্ছে করছিলো তখনই হাতে নাতে ধরতে । কিন্তু ধরলো না । তবে ওর মনে একটা অন্য রকম আনন্দ কাজ করছিলো । তারপরও চিঠি আসছিলোই । সানিয়ার এবার মজাই লাগছিলো । কারন সাজিব ভেবেছিলো যে সানিয়া হয়তো জানে না কিন্তু সানিয়া সবই দেখছিলো আর মুচকি মুচকি হাসছিলো ।

এই ব্যাপারটা প্রথম আলাপ করে অপুর সাথে । অপু খানিকটা অবাক হয়ে যায় । সানিয়া হাসতে হাসতে বলে, তোর ঐ বন্ধুকে একদিন হাতে নাতে ধরবো বুঝলি । তুই কিন্তু কিছু বলবি না খবরদার ! আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লেখার মজা বুঝাবো !

তারপর একদিন চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায় । ঠিক তার পরের সপ্তাহেই সানিয়া সজিবের সাথে অন্য একটা মেয়েকে আবিস্কার । সজিবের সাথে কথা বলতেই ও সজিবের কলেজে হাজির হয় । সেখান থেকেই মেয়েটার খোজ পায় । মেয়েটা নাকি সজিবের প্রেমিকা । ওদের কিছু দিন ধরে প্রেম চলছে ।

সানিয়ার পুরো দুনিয়াই যেন নড়ে উঠেছিলো । চিঠি গুলো তাহলে কি সত্যিই মিথ্যা ছিল ? এতো আবেগ দিয়ে লেখা চিঠি গুলো !

সব মিথ্যা ! মানুষ মানুষের অনুভূতির সাথে এভাবে প্রতারনা কিভাবে করতে পারে ! চিঠি গুলো পড়তে পড়তে সানিয়ে কবে যে সজিবের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো ও বলতেও পারবে না । তাই ধাক্কাটা সামলাতে ওর একটু কষ্ট হয়েছিলো ।

তারপর আর কোটিংএ যায় নি । ও সবার সাথেই যোগাযোগ বন্ধ করে করেছিলো এমন কি অপুর সাথেও । সজিবের বন্ধু বলেই হয়তো অপুকেও আর তখন সহ্য হত না । তারপর এতো গুলো বছর কেটে গেছে । ইউনিভার্সিটি পার করে জবে ঢুকেছে ও । নতুন করে আর প্রেমে পড়ে নি । বাসা থেকে সানিয়ার বিয়ে দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে কিন্তু ওকে রাজি করাতে পারছে না কিছুই । ইচ্ছে করে চাকরি নিয়ে চলে এসেছে এই গ্রামে । স্বেচ্ছায় নির্বাসনে !

সজিব ওর সাথে খুবই স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলে চলেছে । বিয়ে করেছে সম্প্রতি । এখানে এসেছিলো একটা কাজে । এখন ফেরৎ যাচ্ছে । সানিয়ে এখানে থাকে জেনে অবাক হল । এই অজ পাড়াগায়ে একা একা কেন থাকে সেটাও জানতে চাইলো । সানিয়া এড়িয়ে গেল সে কথা । ও ঠিক করলো যে আগের প্রসঙ্গ তুলবে না । তুলে কি লাভ এখন আর !

তারপর এল অপুর প্রসঙ্গ ! সজিব বলল

-ও কোথায় আছে বলতে পারো ? তুমি যে কোচিং ছেড়ে দিলে ও আর আসতো না । ইন্টারের পর কোথায় যে গেল আর খোজই পেলাম না ।

সানিয়া একটু জানতো । পরীক্ষার পর একবার এসেছিলো ওর সাথে দেখা করতে । ওকে বলেছিলো যে ও জার্মানি চলে যাচ্ছে । অপুর বড় মামা থাকে সেখানে । সেখানেই পড়াশুনা করবে ! সানিয়ে বেশি আগ্রহ দেখায় নি । তখনও অপুকে কেবল সজিবের বন্ধুই মনে হত ওর । তারপর অবশ্য সানিয়ার মনে হয়েছিলো যে ও অপুর সাথে খানিকটা কঠিন ব্যবহারই করেছিলো । ওর তো দোষ ছিল না কোন !

সজিব বলল, এতো চাপা ছেলে আমি নিজে কোন দিন দেখি নি । আর এতো সংশয় মনে ! তোমাকে কোন দিন সাহস করে বলতে পারে নি মনের কথা । তারপর আমার কথা মত তোমাকে চিঠি লিখলো আর আবার কাধে দায়িত্ব পড়লো সেটা তোমার বইয়ের ভেতরে রেখে আসার !

সানিয়ার মনে হল ও যেন ভুল শুনলো । কান গরম হয়ে গেল সাথে সাথে । বুকের স্পন্দনটা সাথে সাথে বেড়ে গেল বহু গুণে ! সানিয়া বলল

-কি বললে তুমি ?

সজিব এবার অবাক হয়ে বলল

-কেন, তুমি জানো না ? ও চিঠিতে ওর নাম লিখে নি কিংবা বলে নি কিছু তোমাকে পরে ?

সানিয়ার চোখ দিয়ে তখন পানি পরতে শুরু করেছে । সে কোন মতে বলল

-ঐদিন তোমাকে আমি চিঠি রাখতে দেখে ফেলেছিলাম । ভেবেছিলাম তুমিই লিখছো ঐ চিঠি গুলো ! আমিও তোমাকে পছন্দ করতে শুরু করি । এ কথা অপুকে আমি বলেছি !

কিছুটা সময় দুজনের কেউ কোন কথা বলল না । সজিব বলল, ছোট বেলা থেকে অপু অনেক চাপা আর অভিমানী । তুমি আমাকে ভুলে পছন্দ করেছো এটার জন্যই হয়তো তোমাকে আর কিছু বলে নি ! একা একাই কষ্ট পেয়ে গেছে । বেটা ছাগলটা যদি সাহস করে একটু তোমাকে বলতো ....

সানিয়া কি বলবে কিছুই খুজে পেল না । বারবার কেবল সেই অপুর চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করতে লাগলো !

আরও কিছু সময় পার হয়ে গেল । সজিবের ট্রেনর হুইসেল দিয়ে দিয়েছে । সজিব সানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল

-আমি আসি । যদি অপুর খোজ পাই তোমার কথা বলবো । কেমন !

সানিয়া উঠলো না। বসেই রইলো । এতোটা দিন ও একটা ভুল ধারনা নিয়ে কাটিয়ে এসেছে । কিন্তু আর না । এভাবে জীবন নষ্ট করার আর মানে হয় না । সানিয়াও উঠে দাড়ালো সাথে সাথে । ট্রেনটা এখনও ছেড়ে যায় নি । একটু একটু নড়তে শুরু করেছে । সানিয়ার মনে হল আর এক মুহুর্ত নির্বাসন নয় । আজ থেকেই ও অপুর খোজ শুরু করবে । খুজে বের করে প্রথমে একটা কষে চড় মারবে । তারপর অন্য চিন্তা ।

সানিয়া খানিকটা দৌড়াতে থাকে । এই ট্রেনটাতে ওকে উঠতেই হবে !

মন্তব্য ৬ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (৬) মন্তব্য লিখুন

১| ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ সকাল ৭:৫৮

রাজীব নুর বলেছেন: অনেক বড় গল্প।
আমি আপনার সব লেখার নায়ক আপনাকে মনে করেই পড়ি।

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৩৯

অপু তানভীর বলেছেন: গল্প বড় না । ছোট ছোট গল্প । মোট ১০টা ।

২| ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৩:০৪

খাঁজা বাবা বলেছেন: সময়ের কাজটা সময়ে করতে হয়।
বলে ফেললে ই পারতেন।

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৩:১০

অপু তানভীর বলেছেন: বলে ফেলাই উচিৎ সব সময় । কিন্তু সব সময় উচিৎ কাজটা করা যায় না বিভিন্ন কারনে !

৩| ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১:০৩

রাকিবুল ইয়াসিন বলেছেন: প্রিয়-তে রাখলাম :)

১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:০৯

অপু তানভীর বলেছেন: পড়ে ফেলুন সব

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.