নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

আমার বাংলার মানুষই, আমার পরিচয় দিবে একদিন। আমি শুধু, এই বাংলাটাকে একটা নতুন পরিচয় দিতে চাই।

পাগলা দাবাং

অন্তহীন কৃষ্ণদিন

পাগলা দাবাং › বিস্তারিত পোস্টঃ

আরাধ্য প্রনয়

০৯ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:২০


কামাল। ভীষণ সহজ-সরল আর বোকা-সোকা একটা ছেলে। প্রায় বছর দুয়েক হল ঢাকায় আছে। কিন্তু শহরটিকে ঠিক-ঠাক মত চিনে উঠতে পারেনি। তার ভরসা গুগোল ম্যাপ। কোথাউ যাবার আগে সে ম্যাপে দেখে রাস্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়, তারপরে ঘরের বাইরে পা ফেলে। অযোগ্যতা আর অনিহা এক নয়। রাস্তার নাম, বাসের নাম্বার, স্টপেজের নাম মনে রাখার ক্ষেত্রে তার একটা বিশাল মাত্রার অনিহা কাজ করে। তার মনে বদ্ধমূল হয়েছে, এই সব মনে রেখে মস্তিস্কের স্মৃতিকোষ গুলিকে কষ্ট দেয়া নিতান্তই বোকামির পরিচয়। হাতের কাছে যখন প্রযুক্তি রয়েছে তখন আর বৃথা কষ্ট কেন? পৃথিবীতে আরো অনেক অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেখানে এই অব্যবহৃত মস্তিস্ক কোষগুলিকে কাজে লাগানো যাবে।

মাস চারেক আগে একটি মেয়ের সাথে তার ফেইসবুকে পরিচয়। আগামী শুক্রবার প্রথম ডেটে যাচ্ছে। এর আগে সে কখনো ডেটে যায় নি। প্রচলিত ডেট বলতে যা বুঝায়, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে অভিসারিত হবে, সে রকম ডেটে ও কখনো যায়নি আগে। এর আগে যতবার কোন মেয়ের সাথে দেখা করেছে, তখন কেউ না কেউ সাথে ছিল। হয় মেয়ের বান্ধবী বা তার বুজুম বন্ধু। মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, তেমনি তার এই ধরনের ফেইসবুকিয় প্রনয়ের পরিনিতি ঐ ডেট পর্যন্তই। প্রতিবারই কিছু না কিছু গড়মিল হতেই হবে, না হলে যে তার সিঙ্গেল তকমাটা ঘুচে যাবে! মেয়ের তাকে পছন্দ হলে তার মেয়েকে পছন্দ হয় না আবার সে মেয়েকে পছন্দ করলে মেয়ে তাকে পছন্দ করে না। মানে ব্যাটে বলে ঠিক হয়ে উঠছেনা। এই মিস টাইমিংয়ে আসলে তাদের কোন হাতনেই। প্রোফাইল পিক দেখে প্রেম করাটা অনেকটা অনলাইনে পন্য কেনার মত। প্যারামিটার যাই হোক না কেন, দিনশেষে আপনাকে ঠকতেই হবে। তবে সময় সময় ব্যাতিক্রমও হয়। ব্যাতিক্রমরা সর্বদাই ব্যাতিক্রম। কখনো উদাহরন হয় না।

কেয়াবন কেয়া। বাদামী চুলের সেই মেয়েটি, যার ছবি দেখে কামালের দুচোখের ঘুম ঘুমপাড়ানীর দেশে নায়র গিয়েছিল, তার প্রোফাইল ছবিতে ডাগর ডাগর দুচোখ, গোলাপী ঠোঁট আর ঠোঁটের ফাঁকে সাদা দাঁতের ঝিলিক ছাড়া তেমন কিছুই ছিল না। যাই থাকুক না কেন, কামালের শান্ত চিত্তকে অশান্ত করতে ওটুকুই অনেক। কামাল কারনে অকারনে ওকে নক দিত। প্রথম প্রথম মেয়েটি এত পাত্তা দিত না। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে আর কতদিন। কামালের সহজ-সরল অকপট বাচন ভঙ্গীতে মেয়েটি একটু একটু করে দুর্বল হতে শুরু করল। যার চার মাসের ফসল তাদের আসছে ডেট।

কামাল একজন ছাপোষা বেসরকারী চাকুরে, যার অফিস শুরু হয় সকাল ৭ টায়, উত্তারার হাউজ বিল্ডিঙে বাসের জন্য লাইনে দাড়িয়ে। আর শেষ হয় রাত ৯ টায় একই স্থানে বাস থেকে নেমে। একটি ভালো মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি করে। মাসের শেষে টাকা কথা বলে। সময়ের দামে কেনা টাকা। ওর প্রতিটি সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। গড়পড়তা বৈচিত্র্যহীন জীবনে, একমাত্র বিচিত্রতা হচ্ছে সেই মেয়ে। ঐ মেয়েটির মনের গভীরে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, সেই রহস্য ভাণ্ডার উদ্ধারের দুঃসাহসিক অভিযাত্রী হচ্ছে কামাল। তবে আরো কোন অভিযাত্রিক আছে কিনা এ ব্যাপারে কামালের কোন ধারনা নেই। মুক্ত বাজার অর্থনীতির যুগে খালি মাঠে গোল দেয়ার আশা করাটা, একটা বিশাল লেভেল এর বোকাচোদামির পরিচয়। কামাল অনেক সহজ-সরল, বোকা-সোকা কিন্তু বোকাচোদা না।

কামাল রুয়েটে পুরকৌশলে পরেছে। ইঙ্গিনিয়ারিং পড়ার কারনে কমন সেন্স একটু কমে গেছে, কেবল এই যা। বাকী সব জিনিসপত্র ঠিকই আছে। দুটি চোখ, দুটি পা, দুটি হাত ব্লা ব্লা ব্লা। কে কি মনে করে সেটা বলতে পারব না, তবে এটুকু বলা যায় যে, এটি একটি লাভজনক বিদ্যা। মানে সবকিছু থেকেই সর্বাধিক লাভের একটা চিন্তা ভাবনা। এটি একটি বস্তুবাদী বিদ্যাও বটে। ইঙ্গিনিয়ারা তাদের এই পুথিগত, অভ্যাসগত এবং ধারনাগত বিদ্যা যখন মেয়েদের উপরেও প্রয়োগ করতে চায়, তখন শীত কালের বৃষ্টির মতই বিফল হয়। কামালের বাকীসব ফেইসবুকিয় প্রনয়গুলীর মাধ্যমে এ সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এবার মেয়ের কথায় আসি। কেয়া মেয়েটির কথায়। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিনান্সে চতুর্থ বর্ষে পড়ে। ভীষণ চটপটে, চপল, চঞ্চল আর চার্মিং একটা মেয়ে। অনেক ছেলেই তাকে এ পর্যন্ত প্রপোজ করেছে। দুই একজন ওয়েটিং লিস্টেও আছে। আর বাকিরা সবাই ব্যর্থ। তবে কামালের বিষয়টা আলাদা। সে গড়পড়তা ছেলেদের মত না। তার সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে যে, তার একটা ভালো চাকুরী আছে। না। চাকুরীর জন্য ভালবাসা না। ভালবাসার জন্য চাকুরী। চাকুরী মানে টাকা আয়ের একটা স্থিতিশীল উৎস আছে। বিশ্বজগতের সবাই স্থিতিশীলতা ভালোবাসে। তবে কেয়া কেন বাদ যাবে? চাকুরী বাদে চিন্তা করতে গেলে, কামাল নম্র, ভদ্র, নিরীহ একটা ছেলে। অন্তত ফেইসবুক আইডি থেকে যতটুকু বুঝা যায়, ততটুকু আর কি। এই হিসেবে কামালকে কেয়ার ভালই লাগে। কামাল রয়েছে ঐ ওয়েটিং লিস্টের প্রথম দিকটায়।

কামাল এবং কেয়া দুজনের পড়াশুনাতেই লাভ লোকসান জড়িয়ে আছে। কেয়ারটা সরাসরি আর্থিক। আর কামালেরটা পরোক্ষ ভাবে আর্থিক। তাই তাদের চিন্তা ধারায় অনেক মিল রয়েছে। ভেঙ্গে যদি বলি, কেয়া চিন্তা করে কানাকড়িতে পোলার ভালো না বেল্লিসিমো ভালো। আর কামাল চিন্তা করে আইসক্রিমটি এভাবে না তৈরি করে ঐ ভাবে তৈরি করলে খরচ আরো কম হত। এই আর কি! মোটাদাগে দুটিকে আর্থিক বলাই যায়।

পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আগামীকাল শুক্রবার সায়াহ্ন পূর্ব তারা দেখা করতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এটাই সিউর। ডেটিং স্থানটি ঠিক করেছে কেয়া। ধানমণ্ডির ওখানে। রাইফেলস স্কয়ার। শুক্রবারে দুজনেই ফ্রি। তাই দুজনেই কোন মতভেদ ছাড়াই একমত হয়েছে। কেয়ার বাসা ধানমণ্ডিতেই। তাই কামালই আগে যাবে। যাওয়ার পরে কেয়াকে ফোন দিবে। এমনটাই কথা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল। কামাল কেয়াকে বলেছে হালকা মেকআপ নিতে। চোখে গাড় করে কাজল দিতে। ঠোঁটে হালকা লিপজেল। আর কামাল যাবে ফ্রি স্টাইলে। মেয়েরা কি ছেলেদের সাজ-পোশাক নিয়ে খুব বেশী মাথা ঘামায় না নাকি! কামালের মাথার উপরদিয়ে গেল। কারন কেয়া তাকে তেমন বিশেষ কিছুই করতে বলেনি। কিন্তু গল্প-উপন্যাসে তো সে অন্য রকম পড়েছে। কি জানি কি! হাতের পাচ আঙ্গুলের মত সবাই হয়ত এক না।

আর কামাল যে ধরনের ছেলে তার সাথে এসব যায় না। সে খুব রাফ, আগোছালো জীবন-যাপন করে। ভালো লাগলে গোসল করে, আর না লাগলে না। জীবনেও বডি স্প্রে টাইপ কিছু ব্যবহার করে না। বিবর্ণ, ছেড়া ফাটা জিন্স, ভাঁজে মোচড়ানো জামা তার অভিধা। এটা তার ছাত্র জীবনের উত্তরাধিকার। ইদানিং কর্পোরেট লাইফের যাতাকলে হালকা-পাতলা পরিবর্তন এসেছে বটে। কিন্তু আভিধানিক পরিপাটি বলতে যা বুঝায় তার জন্য ওটুকু যথেষ্ট নয়। আর সে পুর প্রকৌশলী। সারাদিন মাঠে-ঘাটে সাইট ভিজিট করে বেড়ায়। তাই হয়ত পোশাক-আশাক নিয়ে কোম্পানিও তেমন কিছু বলে না। কিন্তু আজকের দিনটি বিশেষ। তাই সে প্রথা ভেঙ্গে গোসল, শেভ করল। আর আগেই ভালো জামাজোড়া নিয়ে রেখেছিল। তাই তৈরি করে রেখেছে বিকালে পড়বে বলে।

সে নিয়মিত জুম্মার নামাজ পড়ে না। গুনে গুনে তিন জুম্মা মিলিয়ে মিলিয়ে পড়ে। আজকে সেই তিন নাম্বার জুম্মা বার। তাই নামাজ মিস দিলে হবে না। অন্তরে মোহর লেগে যাবে। জাহান্নামে বিশেষ শাস্থি পেতে হবে। তাই আগে পরিত্রানের ব্যবস্থা করতে হবে। নামাজ দুপুরে। আর সে যাবে বিকালে। অনেক সময়। নামাজ সেরে একটু ভাতঘুমও দেয়া যাবে।

বিকেল। সূর্য দক্ষিন দিগন্ত হয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। উঁচু উঁচু ইমারতের তলে এটা বুঝার অবকাশ ঢাকায় খুব বেশী পাওয়া যায় না। কামাল ও পায়নি। সময় কথা বলছে। এমনটা হয় বলেই বিকেল হয়। সে ঘড়ি দেখে ধারনা করে নিয়েছে। সে বাসে বসেছে। বসার ঠিক পরেই কেয়াকে আপডেট জানিয়েছে যে, তুমি তৈরি হউ আমি আসছি।

সে ভাবছে। পরিচয়টা দিবে কিভাবে?

কামাল। আতাতুর্ক কামাল।

তার ফেইসবুক প্রোফাইল। না। বেশী ফিল্মি হয়ে যায়। নাকি কিছুই বলবে না! শুধু দেখে যাবে অপলক। আর শুনবে। কথা শুনবে। কেয়ার মিষ্টি কথা। যা মিষ্টি গলা ওর। না জানি জন্মের সময় কফোটা মধু ওর মুখে পড়েছিল? এত মিষ্টি গলা কারোর হতে পারে! মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে শুরু করে। কল্পনায় মজে যায় ও। মিস্তি-মধুর সৃষ্টি-সুখের কল্পনা। মিনিট ত্রিশেক পড়ে কল্পনাচ্ছেদ ঘটে কেয়ার ফোনে।

কি? কত দূর এলেন আপনি?

কেয়া ওকে আপনি করে বলে। ও অনেক বারই অনুরোধ করেছে তুমি বলতে। কিন্তু কাজ হয় নি। মেয়েরা মনে হয় বিশেষ বিশেষ অধিকার কেবল বিশেষ মানুষদেরই দেয়। সে মনে হয় এতোটা বিশেষ হয়ে উঠতে পারে নি এখনোও।

আমি কুরিল ফ্লাইওভারে ফ্লাই করছি। তুমি ধীরে ধীরে তৈরি হউ। আমার আরও ঘণ্টা দেড়েক লাগবে মনে হচ্ছে। রাস্তায় ট্রাফিক অনেক বেশী। কামাল মিষ্টি করে বুঝিয়ে বলে।

ওদিকে কেয়ার মনে কি রহস্য খেলা করছে, তা জানার কোন উপায় কামালের নেই। কামাল কিছু একটা ভেবে নেয় নিজ থেকে। তাই হয়তো হবে। তবে কামাল এটুকু বুঝতে পারে যে, কেয়ার মনে তার জন্য পরিমানে অল্প হলেও দুর্বলতা আছে। সেটাকে আরো বাড়িয়ে তোলার দায়িত্ব কামালের। কেয়ার নয়। কারন কেয়া যেচে কামালের কাসে আসে নি। কামালই গিয়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক। ভালোবাসায় আধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম কদম ছেলেরা ফেলে।

ঘণ্টা দেড়েক পর, বাস কন্টাক্টরের মামা ডাকে ঘুম ভাঙ্গে ওর। বাসে চাপলেই বাসের মৃদু কম্পনে ঘুম আসার অভ্যাসটি তার আবাল্য। ঘুম ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই ঝটপট জানালার কাঁচে দেখে চুল ঠিক করে নেয়। চট জলদি করে ধানমণ্ডি ২৭ এ নামে। নেমে কোন কিছু না ভেবেই প্রথমে একগুচ্ছ গোলাপ কিনে। তারপর একটা রিক্সা নেয় রাইফেলস স্কয়ারের উদ্দেশ্যে। রিক্সাতে চড়েই কেয়াকে ফোন করে ও।

কামাল বিশ মিনিটের মত দাড়িয়ে ছিল। তারপরেই কেয়া তার সাথে যোগ দেয়। কেয়াকে দেখে প্রথমে কামাল প্রতিক্রিয়াহীন ছিল মুহূর্তক্ষণ। একটা মেয়ে এতটা প্রিয়দর্শিনী হতে পারে! কিন্তু! কিন্তু! কিন্তু! এই তিন কিন্তুর গোলকধাঁধাময় চক্কর থেকে আজ অবধি কামাল বেড়ুতে পারে নি। কেয়ার গায়ের বর্ণ একটু ডার্ক। ছবিতে যতটা উজ্জ্বল মনে হয়েছিল, সামনা সামনি ততটা না। কেয়া কি কালো! কামাল প্রতিবারের মত এবারও কিন্তুর চক্করে পড়ে যায়। সে কিছুই বলতে পারছে না। একটা কিন্তুময় জড়তা কাজ করছে তার মনের চারপাশে।

অপরদিকে, কেয়ার প্রতিক্রিয়া অস্থির। কামালকে মনে হয় তার মনে ধরেছে। মুখে খই ফুটছে। এ কথা, সে কথা, আরো কত কথা যে মেয়ারা বলতে পারে। কোন কথাই কামালের মাথায় ডুকছে না। কামাল কি করবে বুজতে পারছে না। সে কি চলে যাবে! ছিঃ! একদম না এ কি করে হয়। এতে মেয়েটা চূড়ান্ত অপমানিত হবে। সে একজন ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকেরা মেয়েদের সম্মান করে। যে ভাবেই হোক, কেয়াকে তার মনে কথা কিছুতেই বুজতে দেয়া যাবে না। ঘণ্টা দুয়েকের জন্য হিপোক্রেট হলে, ধানমণ্ডি লেকের পানি দূষণ খুব বেশী একটা বাড়বে না। সে ঠিক করল সন্ধ্যা পর্যন্ত কেয়াকে সঙ্গ দিবে।

উপক্রমণিকার পরে, কামাল বলল, শুন কেয়া। আমি এদিকটায় নতুন। কিছুই চেনা জানা নেই। চল আমারা একটা ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।

কেয়া কামালকে হেলভেশিয়ার প্রস্তাব করল। কামাল বলল, ঠিক আছে। চল।

রেস্টুরেন্টা ভালোই। সেলফ সার্ভিস সিস্টেম। তারা একপাশে দুটি চেয়ারে মুখোমুখি বসল। কেয়া মেয়ে মানুষ। তাই মেয়ে মানুষের মতই গুটিসুটি দিয়ে বসল। কামাল টেবিলের উপরে হাতের কনুই রেখে দুহাতের কব্জি ভাজ করে, হাতের তালুর উল্টোপিঠে থুতনি রেখে বসল। তার চোখ ছিল অবুঝের মত কেয়ার দিকে তাক করা। ভাবটা এমন যেন, চোখের দৃষ্টিতে কেয়াকে বুঝছে সে। কেয়া একটা সুগার ফ্রি ঠাণ্ডা কফি আর কামাল একটা চিকেন কর্ণ স্যুপ অর্ডার করল। এই প্রথম দুজনের রুচি আলাদা হল। একজনের ঠাণ্ডা। আর একজনের গরম।

প্রথমবারের মতই, শুধু কেয়াই কথা বলে যাচ্ছে। কামাল সাথে সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে। হু, হা, দারুন, ঠিক আছে, ভালোই ইত্যাদি গতানুগতিক চায়িত শব্দ। কামালের খুব করে মনে চাইছিল দু-একটা সেলফি তুলতে। কিন্তু। কিন্তু। কিন্তু। তিন কিন্তুর গ্যাঁড়াকলে আবারও আটকে গেল সেলফি। মানব মনের সব ইচ্ছাকে পূর্ণতা দিতে হয় না। এই পূর্ণতা না দেয়াটা নিজেই একটা পূর্ণতা, একটা আর্ট। আর এভাবেই ধীরে ধীরে দিনের আলো হারিয়ে যেতে থাকল দুই মানব-মানবীর আমোঘ আদিম আকর্ষণে। কামালের এদিকে কোন খেয়ালই নেই। হঠাৎ কেয়ার কথায় খেয়াল হল।

ভাইয়া। সন্ধ্যা হয়ে এল। আমি বাসায় যাবতো। আর বেশী দেরি হলে আম্মু বকাবকি করবেন। আম্মুর বকাবকি শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।

ওহ! তাইতো। আমার খেয়াল নেই একদম। সরি।

সরি বলার কিছু নাই। ছেলেরা এমনই। চলেন আমার বাসা কাছেই। বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবেন। কেয়ার গলায় আদুরে অনুরোধ।

এভাবে খুব বেশী মেয়ে কামালকে কিছু অনুরোধ করেনি। কামাল রাজি হয়ে গেল। ঠিক আছে চল। তোমায় বাসায় নামিয়ে দিয়েই আমি যাব।

কেয়া খুশি হল মনে মনে। কামাল বুজতে পাড়ল। দুজনে একটি রিক্সা নিল। রিকশার হুড খোলা। বাতাসে দুজনের শরীরের ঘ্রান দুজনের নাকেই আসছে। দুজনেই চুপচাপ অনুভব করছে। কেউই কিছু বলছে না। সমস্ত পৃথিবীটা মনে হয় থেমে গিয়েছিল তাদের চলন্ত রিকশার চাকায়। আহ্নিক গতি বার্ষিক গতি দুটোই ভর করেছে সেখানে। আধঘণ্টা পড়েই কেয়ার বাসা চলে আসল। কেয়া কামালকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাল। এককাপ চা।

কামালের মনটা হঠাৎ করেই খালি খালি লাগতে লাগল। মুচকি হাসিতে শূন্যতা লুকাল। আবার দেখা হবে বলে বিদায় নিল। কেয়াও চলে গেল ঘরের ভিতরে, চোখের আড়ালে। মনের আড়ালেও চলে গেল কি! কামাল প্রতিক্রিয়াহীন।

লেকের ধারের রাস্তায় উদাসীন ভাবে হাটছে সে। মুহুতের জন্য ফ্ল্যাশব্যাকে গেল। ঐ দু ঘণ্টার বলা কোন কথাই তার মনে পড়ছে না। শুধু কেয়ার নিস্পাপ প্রিয়দর্শন মুখটি চোখের সামনে ভাসছে। গোলাপগুচ্ছটি যেখানে রেখেছিল সেখানেই আছে। আর দেয়া হল না। জন্ম নিল আর একটি আরাধ্য প্রনয়ের গল্প। দু হাত চলে গেল পিছনে, কোমরের কাছে। গোলাপ গুচ্ছটি হাতে নিল ও। লেকের জলে গোলাপ বিসর্জন দিল।

তারপরের গল্পটা গতানুগতিক। তাদের মধ্যে আর আগের মত কথা হয় না। দূরত্বের পরিমান কথা বলার ব্যাস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে বাড়ছে দূরত্ব। মনের দূরত্ব। সময়ের দূরত্ব। দুরত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আর বাকী সব কিছুই।

এভাবেই সময় প্রবাহিত হতে থাকে প্রতিনিয়ত সময়ের নিয়মে। কেয়া ধীরে ধীরে কামালের উপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শুধু পরিচয় এর সম্পর্কটুকুই অবশিষ্ট থাকে। একদিন কেয়া বলে, ভাইয়া, আপনি একটা নিরামিষ। পুড়াই নিরামিষ।

কামাল ভাবে বর্ণবাদীর চেয়ে নিরামিষ হওয়া অনেক ভালো। অনেক বেশী ভালো। এটা স্ব্যাস্থের জন্য অনেক উপকারী। আমি নিরামিষ হতে পারব কিন্তু বর্ণবাদী নই। কামালের মনে ঝড় শুরু হয়ে যায়। এই ঝড় কেয়ার ঝড় না। নিজের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করার ঝড়। আমি কি আসলেই এমন? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। বাস্তবতা যখন চোখের সামনে চলে আসে, তখন সবাইতা মেনে নিতে পারে না। কামালের এখন এই অবস্থা চলছে। সে তার আত্ম পরিচয় খুঁজছে। বর্ণবাদী কামাল। কেমন জানি অসহ্য লাগছে ওর।

এই দুর্যোগ পূর্ণ মুহূর্তে আচমকা নিউজ ফিডে একটি আপডেট আসল। কেয়াবন কেয়া ইন আ ওপেন রিলেশনশিপ। খুব করে ও বিপরীত লিঙ্গের মানবটিকে খুঁজল। তন্নতন্ন করে খুঁজল। কেয়ার টাইম লাইন, টাইমলাইনের প্রতিটি স্ট্যাটাস, স্ট্যাটাসের প্রতিটি কমেন্ট, সবগুলি মিউচুয়াল ফ্রেন্ড সবকিছুই। যেখানে যেখানে খোঁজা সম্ভব তার সবখানেই খুঁজল ও। দুই একজনকে সন্দেহ জনক বলে মনে হল ওর কাছে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কাউকে পেল না। কাউকেই না।

কামাল কষ্ট পায়নি মোটেও। অল্প অবাক হয়েছে এই যা। চোখের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে মাউস স্ক্রোল করল। কামাল এই বলে নিজেকে স্বান্তনা দিল যে, আমি বর্ণবাদী হতে পারি কিন্তু বর্ণচোরা নই। একটা মিথ্যা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলল সে।

সমসাময়িক সময়েই প্রাচী নামের একটি মেয়ে তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। খুব আগ্রহ করে নিউ ট্যাবে সে প্রতিভা প্রাচীর ফেইসবুক প্রোফাইলটি খুলল। খুবই আগ্রহ নিয়ে। যাই হোক, এবার আর নিজের কাছে নিজেকে প্রতারক মনে হবে না। বরাবরের মতই নতুন ভাবে শুরুর প্রস্তুতি শুরু করল সে। সে মনে প্রানে বিশ্বাস করে, প্রতিটা সময়ই নতুন। প্রতিটা অনুভূতই নতুন। আর নতুন প্রতিটা মেয়েই। নতুন প্রতিটা প্রেম।

বিঃদ্রঃ গল্পের চরিত্র ও কাহিনী দুটোই কাল্পনিক। কারোর সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নন। কামাল। ভীষণ সহজ-সরল আর বোকা-সোকা একটা ছেলে। প্রায় বছর দুয়েক হল ঢাকায় আছে। কিন্তু শহরটিকে ঠিক-ঠাক মত চিনে উঠতে পারেনি। তার ভরসা গুগোল ম্যাপ। কোথাউ যাবার আগে সে ম্যাপে দেখে রাস্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়, তারপরে ঘরের বাইরে পা ফেলে। অযোগ্যতা আর অনিহা এক নয়। রাস্তার নাম, বাসের নাম্বার, স্টপেজের নাম মনে রাখার ক্ষেত্রে তার একটা বিশাল মাত্রার অনিহা কাজ করে। তার মনে বদ্ধমূল হয়েছে, এই সব মনে রেখে মস্তিস্কের স্মৃতিকোষ গুলিকে কষ্ট দেয়া নিতান্তই বোকামির পরিচয়। হাতের কাছে যখন প্রযুক্তি রয়েছে তখন আর বৃথা কষ্ট কেন? পৃথিবীতে আরো অনেক অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেখানে এই অব্যবহৃত মস্তিস্ক কোষগুলিকে কাজে লাগানো যাবে।

মাস চারেক আগে একটি মেয়ের সাথে তার ফেইসবুকে পরিচয়। আগামী শুক্রবার প্রথম ডেটে যাচ্ছে। এর আগে সে কখনো ডেটে যায় নি। প্রচলিত ডেট বলতে যা বুঝায়, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে অভিসারিত হবে, সে রকম ডেটে ও কখনো যায়নি আগে। এর আগে যতবার কোন মেয়ের সাথে দেখা করেছে, তখন কেউ না কেউ সাথে ছিল। হয় মেয়ের বান্ধবী বা তার বুজুম বন্ধু। মোল্লার দৌড় যেমন মসজিদ পর্যন্ত, তেমনি তার এই ধরনের ফেইসবুকিয় প্রনয়ের পরিনিতি ঐ ডেট পর্যন্তই। প্রতিবারই কিছু না কিছু গড়মিল হতেই হবে, না হলে যে তার সিঙ্গেল তকমাটা ঘুচে যাবে! মেয়ের তাকে পছন্দ হলে তার মেয়েকে পছন্দ হয় না আবার সে মেয়েকে পছন্দ করলে মেয়ে তাকে পছন্দ করে না। মানে ব্যাটে বলে ঠিক হয়ে উঠছেনা। এই মিস টাইমিংয়ে আসলে তাদের কোন হাতনেই। প্রোফাইল পিক দেখে প্রেম করাটা অনেকটা অনলাইনে পন্য কেনার মত। প্যারামিটার যাই হোক না কেন, দিনশেষে আপনাকে ঠকতেই হবে। তবে সময় সময় ব্যাতিক্রমও হয়। ব্যাতিক্রমরা সর্বদাই ব্যাতিক্রম। কখনো উদাহরন হয় না।

কেয়াবন কেয়া। বাদামী চুলের সেই মেয়েটি, যার ছবি দেখে কামালের দুচোখের ঘুম ঘুমপাড়ানীর দেশে নায়র গিয়েছিল, তার প্রোফাইল ছবিতে ডাগর ডাগর দুচোখ, গোলাপী ঠোঁট আর ঠোঁটের ফাঁকে সাদা দাঁতের ঝিলিক ছাড়া তেমন কিছুই ছিল না। যাই থাকুক না কেন, কামালের শান্ত চিত্তকে অশান্ত করতে ওটুকুই অনেক। কামাল কারনে অকারনে ওকে নক দিত। প্রথম প্রথম মেয়েটি এত পাত্তা দিত না। কিন্তু পাত্তা না দিয়ে আর কতদিন। কামালের সহজ-সরল অকপট বাচন ভঙ্গীতে মেয়েটি একটু একটু করে দুর্বল হতে শুরু করল। যার চার মাসের ফসল তাদের আসছে ডেট।

কামাল একজন ছাপোষা বেসরকারী চাকুরে, যার অফিস শুরু হয় সকাল ৭ টায়, উত্তারার হাউজ বিল্ডিঙে বাসের জন্য লাইনে দাড়িয়ে। আর শেষ হয় রাত ৯ টায় একই স্থানে বাস থেকে নেমে। একটি ভালো মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি করে। মাসের শেষে টাকা কথা বলে। সময়ের দামে কেনা টাকা। ওর প্রতিটি সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। গড়পড়তা বৈচিত্র্যহীন জীবনে, একমাত্র বিচিত্রতা হচ্ছে সেই মেয়ে। ঐ মেয়েটির মনের গভীরে যে রহস্য লুকিয়ে আছে, সেই রহস্য ভাণ্ডার উদ্ধারের দুঃসাহসিক অভিযাত্রী হচ্ছে কামাল। তবে আরো কোন অভিযাত্রিক আছে কিনা এ ব্যাপারে কামালের কোন ধারনা নেই। মুক্ত বাজার অর্থনীতির যুগে খালি মাঠে গোল দেয়ার আশা করাটা, একটা বিশাল লেভেল এর বোকাচোদামির পরিচয়। কামাল অনেক সহজ-সরল, বোকা-সোকা কিন্তু বোকাচোদা না।

কামাল রুয়েটে পুরকৌশলে পরেছে। ইঙ্গিনিয়ারিং পড়ার কারনে কমন সেন্স একটু কমে গেছে, কেবল এই যা। বাকী সব জিনিসপত্র ঠিকই আছে। দুটি চোখ, দুটি পা, দুটি হাত ব্লা ব্লা ব্লা। কে কি মনে করে সেটা বলতে পারব না, তবে এটুকু বলা যায় যে, এটি একটি লাভজনক বিদ্যা। মানে সবকিছু থেকেই সর্বাধিক লাভের একটা চিন্তা ভাবনা। এটি একটি বস্তুবাদী বিদ্যাও বটে। ইঙ্গিনিয়ারা তাদের এই পুথিগত, অভ্যাসগত এবং ধারনাগত বিদ্যা যখন মেয়েদের উপরেও প্রয়োগ করতে চায়, তখন শীত কালের বৃষ্টির মতই বিফল হয়। কামালের বাকীসব ফেইসবুকিয় প্রনয়গুলীর মাধ্যমে এ সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এবার মেয়ের কথায় আসি। কেয়া মেয়েটির কথায়। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিনান্সে চতুর্থ বর্ষে পড়ে। ভীষণ চটপটে, চপল, চঞ্চল আর চার্মিং একটা মেয়ে। অনেক ছেলেই তাকে এ পর্যন্ত প্রপোজ করেছে। দুই একজন ওয়েটিং লিস্টেও আছে। আর বাকিরা সবাই ব্যর্থ। তবে কামালের বিষয়টা আলাদা। সে গড়পড়তা ছেলেদের মত না। তার সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে যে, তার একটা ভালো চাকুরী আছে। না। চাকুরীর জন্য ভালবাসা না। ভালবাসার জন্য চাকুরী। চাকুরী মানে টাকা আয়ের একটা স্থিতিশীল উৎস আছে। বিশ্বজগতের সবাই স্থিতিশীলতা ভালোবাসে। তবে কেয়া কেন বাদ যাবে? চাকুরী বাদে চিন্তা করতে গেলে, কামাল নম্র, ভদ্র, নিরীহ একটা ছেলে। অন্তত ফেইসবুক আইডি থেকে যতটুকু বুঝা যায়, ততটুকু আর কি। এই হিসেবে কামালকে কেয়ার ভালই লাগে। কামাল রয়েছে ঐ ওয়েটিং লিস্টের প্রথম দিকটায়।

কামাল এবং কেয়া দুজনের পড়াশুনাতেই লাভ লোকসান জড়িয়ে আছে। কেয়ারটা সরাসরি আর্থিক। আর কামালেরটা পরোক্ষ ভাবে আর্থিক। তাই তাদের চিন্তা ধারায় অনেক মিল রয়েছে। ভেঙ্গে যদি বলি, কেয়া চিন্তা করে কানাকড়িতে পোলার ভালো না বেল্লিসিমো ভালো। আর কামাল চিন্তা করে আইসক্রিমটি এভাবে না তৈরি করে ঐ ভাবে তৈরি করলে খরচ আরো কম হত। এই আর কি! মোটাদাগে দুটিকে আর্থিক বলাই যায়।

পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আগামীকাল শুক্রবার সায়াহ্ন পূর্ব তারা দেখা করতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এটাই সিউর। ডেটিং স্থানটি ঠিক করেছে কেয়া। ধানমণ্ডির ওখানে। রাইফেলস স্কয়ার। শুক্রবারে দুজনেই ফ্রি। তাই দুজনেই কোন মতভেদ ছাড়াই একমত হয়েছে। কেয়ার বাসা ধানমণ্ডিতেই। তাই কামালই আগে যাবে। যাওয়ার পরে কেয়াকে ফোন দিবে। এমনটাই কথা হয়েছে।

শুক্রবার সকাল। কামাল কেয়াকে বলেছে হালকা মেকআপ নিতে। চোখে গাড় করে কাজল দিতে। ঠোঁটে হালকা লিপজেল। আর কামাল যাবে ফ্রি স্টাইলে। মেয়েরা কি ছেলেদের সাজ-পোশাক নিয়ে খুব বেশী মাথা ঘামায় না নাকি! কামালের মাথার উপরদিয়ে গেল। কারন কেয়া তাকে তেমন বিশেষ কিছুই করতে বলেনি। কিন্তু গল্প-উপন্যাসে তো সে অন্য রকম পড়েছে। কি জানি কি! হাতের পাচ আঙ্গুলের মত সবাই হয়ত এক না।

আর কামাল যে ধরনের ছেলে তার সাথে এসব যায় না। সে খুব রাফ, আগোছালো জীবন-যাপন করে। ভালো লাগলে গোসল করে, আর না লাগলে না। জীবনেও বডি স্প্রে টাইপ কিছু ব্যবহার করে না। বিবর্ণ, ছেড়া ফাটা জিন্স, ভাঁজে মোচড়ানো জামা তার অভিধা। এটা তার ছাত্র জীবনের উত্তরাধিকার। ইদানিং কর্পোরেট লাইফের যাতাকলে হালকা-পাতলা পরিবর্তন এসেছে বটে। কিন্তু আভিধানিক পরিপাটি বলতে যা বুঝায় তার জন্য ওটুকু যথেষ্ট নয়। আর সে পুর প্রকৌশলী। সারাদিন মাঠে-ঘাটে সাইট ভিজিট করে বেড়ায়। তাই হয়ত পোশাক-আশাক নিয়ে কোম্পানিও তেমন কিছু বলে না। কিন্তু আজকের দিনটি বিশেষ। তাই সে প্রথা ভেঙ্গে গোসল, শেভ করল। আর আগেই ভালো জামাজোড়া নিয়ে রেখেছিল। তাই তৈরি করে রেখেছে বিকালে পড়বে বলে।

সে নিয়মিত জুম্মার নামাজ পড়ে না। গুনে গুনে তিন জুম্মা মিলিয়ে মিলিয়ে পড়ে। আজকে সেই তিন নাম্বার জুম্মা বার। তাই নামাজ মিস দিলে হবে না। অন্তরে মোহর লেগে যাবে। জাহান্নামে বিশেষ শাস্থি পেতে হবে। তাই আগে পরিত্রানের ব্যবস্থা করতে হবে। নামাজ দুপুরে। আর সে যাবে বিকালে। অনেক সময়। নামাজ সেরে একটু ভাতঘুমও দেয়া যাবে।

বিকেল। সূর্য দক্ষিন দিগন্ত হয়ে পশ্চিমে হেলে পড়েছে। উঁচু উঁচু ইমারতের তলে এটা বুঝার অবকাশ ঢাকায় খুব বেশী পাওয়া যায় না। কামাল ও পায়নি। সময় কথা বলছে। এমনটা হয় বলেই বিকেল হয়। সে ঘড়ি দেখে ধারনা করে নিয়েছে। সে বাসে বসেছে। বসার ঠিক পরেই কেয়াকে আপডেট জানিয়েছে যে, তুমি তৈরি হউ আমি আসছি।

সে ভাবছে। পরিচয়টা দিবে কিভাবে?

কামাল। আতাতুর্ক কামাল।

তার ফেইসবুক প্রোফাইল। না। বেশী ফিল্মি হয়ে যায়। নাকি কিছুই বলবে না! শুধু দেখে যাবে অপলক। আর শুনবে। কথা শুনবে। কেয়ার মিষ্টি কথা। যা মিষ্টি গলা ওর। না জানি জন্মের সময় কফোটা মধু ওর মুখে পড়েছিল? এত মিষ্টি গলা কারোর হতে পারে! মনে মনে নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে শুরু করে। কল্পনায় মজে যায় ও। মিস্তি-মধুর সৃষ্টি-সুখের কল্পনা। মিনিট ত্রিশেক পড়ে কল্পনাচ্ছেদ ঘটে কেয়ার ফোনে।

কি? কত দূর এলেন আপনি?

কেয়া ওকে আপনি করে বলে। ও অনেক বারই অনুরোধ করেছে তুমি বলতে। কিন্তু কাজ হয় নি। মেয়েরা মনে হয় বিশেষ বিশেষ অধিকার কেবল বিশেষ মানুষদেরই দেয়। সে মনে হয় এতোটা বিশেষ হয়ে উঠতে পারে নি এখনোও।

আমি কুরিল ফ্লাইওভারে ফ্লাই করছি। তুমি ধীরে ধীরে তৈরি হউ। আমার আরও ঘণ্টা দেড়েক লাগবে মনে হচ্ছে। রাস্তায় ট্রাফিক অনেক বেশী। কামাল মিষ্টি করে বুঝিয়ে বলে।

ওদিকে কেয়ার মনে কি রহস্য খেলা করছে, তা জানার কোন উপায় কামালের নেই। কামাল কিছু একটা ভেবে নেয় নিজ থেকে। তাই হয়তো হবে। তবে কামাল এটুকু বুঝতে পারে যে, কেয়ার মনে তার জন্য পরিমানে অল্প হলেও দুর্বলতা আছে। সেটাকে আরো বাড়িয়ে তোলার দায়িত্ব কামালের। কেয়ার নয়। কারন কেয়া যেচে কামালের কাসে আসে নি। কামালই গিয়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক। ভালোবাসায় আধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম কদম ছেলেরা ফেলে।

ঘণ্টা দেড়েক পর, বাস কন্টাক্টরের মামা ডাকে ঘুম ভাঙ্গে ওর। বাসে চাপলেই বাসের মৃদু কম্পনে ঘুম আসার অভ্যাসটি তার আবাল্য। ঘুম ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতেই ঝটপট জানালার কাঁচে দেখে চুল ঠিক করে নেয়। চট জলদি করে ধানমণ্ডি ২৭ এ নামে। নেমে কোন কিছু না ভেবেই প্রথমে একগুচ্ছ গোলাপ কিনে। তারপর একটা রিক্সা নেয় রাইফেলস স্কয়ারের উদ্দেশ্যে। রিক্সাতে চড়েই কেয়াকে ফোন করে ও।

কামাল বিশ মিনিটের মত দাড়িয়ে ছিল। তারপরেই কেয়া তার সাথে যোগ দেয়। কেয়াকে দেখে প্রথমে কামাল প্রতিক্রিয়াহীন ছিল মুহূর্তক্ষণ। একটা মেয়ে এতটা প্রিয়দর্শিনী হতে পারে! কিন্তু! কিন্তু! কিন্তু! এই তিন কিন্তুর গোলকধাঁধাময় চক্কর থেকে আজ অবধি কামাল বেড়ুতে পারে নি। কেয়ার গায়ের বর্ণ একটু ডার্ক। ছবিতে যতটা উজ্জ্বল মনে হয়েছিল, সামনা সামনি ততটা না। কেয়া কি কালো! কামাল প্রতিবারের মত এবারও কিন্তুর চক্করে পড়ে যায়। সে কিছুই বলতে পারছে না। একটা কিন্তুময় জড়তা কাজ করছে তার মনের চারপাশে।

অপরদিকে, কেয়ার প্রতিক্রিয়া অস্থির। কামালকে মনে হয় তার মনে ধরেছে। মুখে খই ফুটছে। এ কথা, সে কথা, আরো কত কথা যে মেয়ারা বলতে পারে। কোন কথাই কামালের মাথায় ডুকছে না। কামাল কি করবে বুজতে পারছে না। সে কি চলে যাবে! ছিঃ! একদম না এ কি করে হয়। এতে মেয়েটা চূড়ান্ত অপমানিত হবে। সে একজন ভদ্রলোক। আর ভদ্রলোকেরা মেয়েদের সম্মান করে। যে ভাবেই হোক, কেয়াকে তার মনে কথা কিছুতেই বুজতে দেয়া যাবে না। ঘণ্টা দুয়েকের জন্য হিপোক্রেট হলে, ধানমণ্ডি লেকের পানি দূষণ খুব বেশী একটা বাড়বে না। সে ঠিক করল সন্ধ্যা পর্যন্ত কেয়াকে সঙ্গ দিবে।

উপক্রমণিকার পরে, কামাল বলল, শুন কেয়া। আমি এদিকটায় নতুন। কিছুই চেনা জানা নেই। চল আমারা একটা ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।

কেয়া কামালকে হেলভেশিয়ার প্রস্তাব করল। কামাল বলল, ঠিক আছে। চল।

রেস্টুরেন্টা ভালোই। সেলফ সার্ভিস সিস্টেম। তারা একপাশে দুটি চেয়ারে মুখোমুখি বসল। কেয়া মেয়ে মানুষ। তাই মেয়ে মানুষের মতই গুটিসুটি দিয়ে বসল। কামাল টেবিলের উপরে হাতের কনুই রেখে দুহাতের কব্জি ভাজ করে, হাতের তালুর উল্টোপিঠে থুতনি রেখে বসল। তার চোখ ছিল অবুঝের মত কেয়ার দিকে তাক করা। ভাবটা এমন যেন, চোখের দৃষ্টিতে কেয়াকে বুঝছে সে। কেয়া একটা সুগার ফ্রি ঠাণ্ডা কফি আর কামাল একটা চিকেন কর্ণ স্যুপ অর্ডার করল। এই প্রথম দুজনের রুচি আলাদা হল। একজনের ঠাণ্ডা। আর একজনের গরম।

প্রথমবারের মতই, শুধু কেয়াই কথা বলে যাচ্ছে। কামাল সাথে সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে। হু, হা, দারুন, ঠিক আছে, ভালোই ইত্যাদি গতানুগতিক চায়িত শব্দ। কামালের খুব করে মনে চাইছিল দু-একটা সেলফি তুলতে। কিন্তু। কিন্তু। কিন্তু। তিন কিন্তুর গ্যাঁড়াকলে আবারও আটকে গেল সেলফি। মানব মনের সব ইচ্ছাকে পূর্ণতা দিতে হয় না। এই পূর্ণতা না দেয়াটা নিজেই একটা পূর্ণতা, একটা আর্ট। আর এভাবেই ধীরে ধীরে দিনের আলো হারিয়ে যেতে থাকল দুই মানব-মানবীর আমোঘ আদিম আকর্ষণে। কামালের এদিকে কোন খেয়ালই নেই। হঠাৎ কেয়ার কথায় খেয়াল হল।

ভাইয়া। সন্ধ্যা হয়ে এল। আমি বাসায় যাবতো। আর বেশী দেরি হলে আম্মু বকাবকি করবেন। আম্মুর বকাবকি শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।

ওহ! তাইতো। আমার খেয়াল নেই একদম। সরি।

সরি বলার কিছু নাই। ছেলেরা এমনই। চলেন আমার বাসা কাছেই। বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবেন। কেয়ার গলায় আদুরে অনুরোধ।

এভাবে খুব বেশী মেয়ে কামালকে কিছু অনুরোধ করেনি। কামাল রাজি হয়ে গেল। ঠিক আছে চল। তোমায় বাসায় নামিয়ে দিয়েই আমি যাব।

কেয়া খুশি হল মনে মনে। কামাল বুজতে পাড়ল। দুজনে একটি রিক্সা নিল। রিকশার হুড খোলা। বাতাসে দুজনের শরীরের ঘ্রান দুজনের নাকেই আসছে। দুজনেই চুপচাপ অনুভব করছে। কেউই কিছু বলছে না। সমস্ত পৃথিবীটা মনে হয় থেমে গিয়েছিল তাদের চলন্ত রিকশার চাকায়। আহ্নিক গতি বার্ষিক গতি দুটোই ভর করেছে সেখানে। আধঘণ্টা পড়েই কেয়ার বাসা চলে আসল। কেয়া কামালকে চায়ের আমন্ত্রণ জানাল। এককাপ চা।

কামালের মনটা হঠাৎ করেই খালি খালি লাগতে লাগল। মুচকি হাসিতে শূন্যতা লুকাল। আবার দেখা হবে বলে বিদায় নিল। কেয়াও চলে গেল ঘরের ভিতরে, চোখের আড়ালে। মনের আড়ালেও চলে গেল কি! কামাল প্রতিক্রিয়াহীন।

লেকের ধারের রাস্তায় উদাসীন ভাবে হাটছে সে। মুহুতের জন্য ফ্ল্যাশব্যাকে গেল। ঐ দু ঘণ্টার বলা কোন কথাই তার মনে পড়ছে না। শুধু কেয়ার নিস্পাপ প্রিয়দর্শন মুখটি চোখের সামনে ভাসছে। গোলাপগুচ্ছটি যেখানে রেখেছিল সেখানেই আছে। আর দেয়া হল না। জন্ম নিল আর একটি আরাধ্য প্রনয়ের গল্প। দু হাত চলে গেল পিছনে, কোমরের কাছে। গোলাপ গুচ্ছটি হাতে নিল ও। লেকের জলে গোলাপ বিসর্জন দিল।

তারপরের গল্পটা গতানুগতিক। তাদের মধ্যে আর আগের মত কথা হয় না। দূরত্বের পরিমান কথা বলার ব্যাস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে বাড়ছে দূরত্ব। মনের দূরত্ব। সময়ের দূরত্ব। দুরত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আর বাকী সব কিছুই।

এভাবেই সময় প্রবাহিত হতে থাকে প্রতিনিয়ত সময়ের নিয়মে। কেয়া ধীরে ধীরে কামালের উপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শুধু পরিচয় এর সম্পর্কটুকুই অবশিষ্ট থাকে। একদিন কেয়া বলে, ভাইয়া, আপনি একটা নিরামিষ। পুড়াই নিরামিষ।

কামাল ভাবে বর্ণবাদীর চেয়ে নিরামিষ হওয়া অনেক ভালো। অনেক বেশী ভালো। এটা স্ব্যাস্থের জন্য অনেক উপকারী। আমি নিরামিষ হতে পারব কিন্তু বর্ণবাদী নই। কামালের মনে ঝড় শুরু হয়ে যায়। এই ঝড় কেয়ার ঝড় না। নিজের স্বরূপ প্রত্যক্ষ করার ঝড়। আমি কি আসলেই এমন? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে। বাস্তবতা যখন চোখের সামনে চলে আসে, তখন সবাইতা মেনে নিতে পারে না। কামালের এখন এই অবস্থা চলছে। সে তার আত্ম পরিচয় খুঁজছে। বর্ণবাদী কামাল। কেমন জানি অসহ্য লাগছে ওর।

এই দুর্যোগ পূর্ণ মুহূর্তে আচমকা নিউজ ফিডে একটি আপডেট আসল। কেয়াবন কেয়া ইন আ ওপেন রিলেশনশিপ। খুব করে ও বিপরীত লিঙ্গের মানবটিকে খুঁজল। তন্নতন্ন করে খুঁজল। কেয়ার টাইম লাইন, টাইমলাইনের প্রতিটি স্ট্যাটাস, স্ট্যাটাসের প্রতিটি কমেন্ট, সবগুলি মিউচুয়াল ফ্রেন্ড সবকিছুই। যেখানে যেখানে খোঁজা সম্ভব তার সবখানেই খুঁজল ও। দুই একজনকে সন্দেহ জনক বলে মনে হল ওর কাছে। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কাউকে পেল না। কাউকেই না।

কামাল কষ্ট পায়নি মোটেও। অল্প অবাক হয়েছে এই যা। চোখের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে মাউস স্ক্রোল করল। কামাল এই বলে নিজেকে স্বান্তনা দিল যে, আমি বর্ণবাদী হতে পারি কিন্তু বর্ণচোরা নই। একটা মিথ্যা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলল সে।

সমসাময়িক সময়েই প্রাচী নামের একটি মেয়ে তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে। খুব আগ্রহ করে নিউ ট্যাবে সে প্রতিভা প্রাচীর ফেইসবুক প্রোফাইলটি খুলল। খুবই আগ্রহ নিয়ে। যাই হোক, এবার আর নিজের কাছে নিজেকে প্রতারক মনে হবে না। বরাবরের মতই নতুন ভাবে শুরুর প্রস্তুতি শুরু করল সে। সে মনে প্রানে বিশ্বাস করে, প্রতিটা সময়ই নতুন। প্রতিটা অনুভূতই নতুন। আর নতুন প্রতিটা মেয়েই। নতুন প্রতিটা প্রেম।

বিঃদ্রঃ গল্পের চরিত্র ও কাহিনী দুটোই কাল্পনিক। কারোর সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নন।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.