| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রিয়াজ দ্বীন নূর
ভাসিয়ে দিয়েছি তরী;আকুল হয়ে দিশার খোঁজে পাথার দিয়েছি পাড়ি।
শহরটা নিচে। অনেক নিচে। রিকশার টুংটাং, বাসের হর্ন, কারো হাসির শব্দ, কারো ঝগড়ার শব্দ — সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত শহর। কিন্তু রিয়াজের কাছে এই সব শব্দ এখন অনেক দূরের। যেন কোনো এক পাহাড়ের চূড়া থেকে সে সমতলের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সমতলের মানুষগুলো অনেক ছোট, অনেক অস্পষ্ট, তাদের জীবন অনেক আলাদা — এমন একটা জীবন যেখানে রিয়াজের কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
জানালার কাচে তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে।
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এই মুখটা কি তার? এই চোখের নিচের কালো দাগ, এই শুকনো ঠোঁট, এই অগোছালো দাড়ি — এটা কি সেই রিয়াজ যে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কলার ঠিক করতে করতে হাসত? যে ভাবত, জীবন একটা সুন্দর জায়গা? যে স্বপ্ন দেখত — একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট, একটা রান্নাঘর যেখানে রোজ সন্ধ্যায় রান্নার গন্ধ উঠবে, একটা বিছানা যেখানে দুটো মানুষের উষ্ণতা থাকবে?
কাচের ভেতরের মুখটা কোনো উত্তর দেয় না।
শহরে আজ বৃষ্টি নেই।
অনেকদিন হলো বৃষ্টি নেই।
ছয় মাস।
ছয় মাস কত ছোট একটা সময়। একটা ঋতুও পরিবর্তন হয় না সেই সময়ে। বীজ বুনলে গাছ হয়ে ওঠে না। শিশু হাঁটতে শেখে না। কিন্তু ছয় মাসে একটা মানুষ ভেঙে পড়তে পারে — এটা রিয়াজ এখন জানে। ছয় মাসে একটা মানুষের ভেতরের সব রঙ মুছে যেতে পারে, সব শব্দ হারিয়ে যেতে পারে, সব স্বপ্ন ঝরে পড়তে পারে — এটা রিয়াজ এখন বোঝে।
ছয় মাস আগে এই শহরে বৃষ্টি ছিল।
রিয়াজের মনে আছে। বিয়ের আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। সারারাত। টিনের চালে না, রাস্তার পিচে না — সে বৃষ্টি পড়েছিল রিয়াজের বুকের ভেতর। আনন্দের বৃষ্টি। প্রতীক্ষার বৃষ্টি। এত বছর একা থাকার পর কেউ একজন আসছে — এই ভাবনার বৃষ্টি।
সেই বৃষ্টি আর আসেনি।
বিয়ের দিনটার কথা মনে পড়ে।
লাল বেনারসি। সোনার চুড়ির শব্দ। আতরের গন্ধ। মেহেদির রং। রিয়াজ যখন প্রথমবার তার মুখ দেখেছিল — সেই লাল শাড়িতে, চোখে কাজল, ঠোঁটে একটুখানি লাজুক হাসি — তখন মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে আসার সার্থকতা আছে। মনে হয়েছিল, এত বছর ধরে সে যে একাকীত্বের ভেতর দিয়ে হেঁটেছে, যে শীতের রাতগুলো সে একা কাটিয়েছে চাদর মুড়ি দিয়ে, যে বর্ষার বিকেলগুলো সে জানালার ধারে বসে অর্থহীনভাবে পার করেছে — সেই সব একাকীত্বের শেষ হলো।
এবার সে আর একা নেই।
এবার সে আর একা নেই — এই ভাবনাটা কত মিষ্টি ছিল।
কত মিষ্টি।
সেই মিষ্টির স্বাদ এখন জিভে থাকে। কিন্তু থাকে বিষের মতো। মিষ্টি যখন বিষ হয়ে যায়, তখন মুখ থেকে সেটা ফেলে দেওয়া যায় না। গলায় আটকে থাকে। সারাক্ষণ।
বিয়ের পরের প্রথম সকালটার কথা রিয়াজ ভুলতে পারে না।
ঘুম থেকে উঠে সে দেখেছিল, পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে। এই দৃশ্যটা — এত সাধারণ, এত তুচ্ছ, কিন্তু রিয়াজের কাছে তখন এটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ দৃশ্য। পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। বুকটা ওঠানামা করছে। চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে পড়েছে। রিয়াজ অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে ছিল। উঠতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, উঠলেই বুঝি এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে, এই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে।
সে রান্নাঘরে গিয়ে চা বানিয়েছিল।
দুটো কাপে।
দুটো কাপে চা ঢালতে ঢালতে সে হাসছিল। নিজেই নিজের হাসির কারণ বুঝতে পারছিল না। শুধু জানছিল, ভেতরে কোথাও একটা উষ্ণতা আছে। একটা আলো আছে। একটা কারণ আছে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে চা বানানোর।
দুটো কাপে চা।
এখন সে একটা কাপে চা বানায়। একটা কাপ। আর সেই একটা কাপ বেশিরভাগ সময় ঠান্ডা হয়ে যায়, কারণ রিয়াজ চা বানিয়ে রেখে দেয়, খেতে পারে না। বসে থাকে। কোথায় বসে থাকে সে নিজেও জানে না। চিন্তা করে কিনা তাও জানে না। শুধু সময় যায়। ঠান্ডা চা পড়ে থাকে। রিয়াজ বসে থাকে।
দুটো কাপ ছিল।
এখন একটা।
একটা কাপও কি থাকবে? নাকি সেটাও একদিন ফেলে দেবে সে? কারণ একটা কাপ মানেই তো মনে করিয়ে দেয় — একসময় দুটো ছিল।
যেদিন সে চলে গিয়েছিল।
রিয়াজ সেই দিনটার কথা মনে করতে চায় না। কিন্তু মনে না করতে চাইলেই সেটা আরো তীব্রভাবে আসে। স্মৃতি এমনই নিষ্ঠুর — যাকে তুমি তাড়াতে চাও, সে ফিরে আসে। যাকে তুমি ভুলতে চাও, সে আরো গভীরে গেঁথে যায়।
সেদিন অফিস থেকে ফিরেছিল রিয়াজ।
দরজায় চাবি দিতে দিতে মাথায় ছিল, আজ বাইরে থেকে বিরিয়ানি আনা যাক। ও রান্না করতে ভালোবাসে না, রিয়াজ জানে। কিন্তু বিরিয়ানি পেলে খুশি হয়। দরজা খুলল। ঘর অন্ধকার। ডাকল — কোনো সাড়া নেই।
প্রথমে ভাবল, বাজারে গেছে। পরে ভাবল, বান্ধবীর বাসায় গেছে। তারপর দেখল, আলমারি খোলা। কিছু কাপড় নেই। প্রসাধনী নেই। সোনার চুড়িগুলো নেই।
শুধু সেই লাল বেনারসিটা আছে।
হ্যাঙারে ঝুলছে।
রিয়াজ অনেকক্ষণ সেই লাল বেনারসির দিকে তাকিয়ে ছিল। বেনারসিটা নিঃশব্দে ঝুলছিল। বাতাস নেই, তাই নড়ছিলও না। শুধু ঝুলছিল। যেন সে নিজেও জানে না কী হয়েছে। যেন সেও অপেক্ষায় আছে।
তারপর ফোন করেছিল। একবার। দুবার। দশবার। পঁচিশবার।
ফোন বন্ধ।
তারপর একটা মেসেজ এসেছিল। মাত্র দুটো লাইন। পড়তে পড়তে রিয়াজের মনে হয়েছিল, তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে দেওয়াল ধরেছিল। দেওয়ালটা ঠান্ডা ছিল। অনেক ঠান্ডা।
সেই রাতে সে মেঝেতে বসেছিল। কখন বসেছিল জানে না। কতক্ষণ বসেছিল জানে না। শুধু জানে, যখন উঠল, তখন ভোর হয়ে গেছে।
পাখি ডাকছে।
পাখি কেন ডাকছে? পৃথিবীটা কেন স্বাভাবিক আছে? কেন রাস্তায় রিকশা চলছে? কেন দোকান খুলছে? কেন মানুষ হাঁটছে? রিয়াজের পৃথিবী ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বাইরের পৃথিবী কেন থামেনি?
কেন থামল না?
এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি।
পৃথিবী থামে না। কারো জন্য। কখনো।
সেদিনও বৃষ্টি হয়নি। আকাশ ছিল পরিষ্কার, নির্লজ্জভাবে নীল। রোদ উঠেছিল। যেন কিছুই হয়নি। যেন রিয়াজের ভেতরের সব জল শুকিয়ে গেছে বলে আকাশও সিদ্ধান্ত নিয়েছে — আজ থেকে এই শহরে আর বৃষ্টি নেই।
তারপর থেকে প্রতিটা দিন একটা যুদ্ধ।
সকালে ঘুম ভাঙে। না, ঘুম ভাঙে না — ঘুম আসে না, তাই একসময় চোখ খোলে। রাতটা পার হয়। সেটুকুই। রিয়াজ বিছানায় শুয়ে থাকে, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। মাথায় কোনো চিন্তা নেই স্পষ্ট করে, কিন্তু একটা ভার আছে। একটা অদৃশ্য পাথর আছে বুকের ওপর, যেটা সরানো যাচ্ছে না।
উঠতে হবে।
উঠতে হবে কেন? অফিস আছে। ঠিক আছে। উঠতে হবে। কিন্তু উঠব কীভাবে? পা দুটো মাটিতে রাখলে মাটি ঠান্ডা। শরীর ভারী। কেমন যেন মনে হয়, পুরো শরীরটা পাথর হয়ে গেছে রাতের মধ্যে। নড়ানো কঠিন।
তারপরও ওঠে।
ওঠে, কারণ না উঠলে কেউ প্রশ্ন করবে। না উঠলে জীবন থামবে না, কিন্তু মানুষ জানবে। আর রিয়াজ চায় না কেউ জানুক। সে চায় না কেউ জিজ্ঞেস করুক — কী হয়েছে? ভালো আছ? কারণ সে জানে না উত্তরে কী বলবে।
"না" বললে তারা জড়িয়ে ধরবে, সহানুভূতি দেখাবে। আর সেই সহানুভূতি রিয়াজের একদমই সহ্য হয় না। সহানুভূতি একটা পর্দার মতো — মানুষ সহানুভূতি দিয়ে নিজেকে আড়াল করে, নিরাপদ রাখে। তোমার কষ্ট দেখে, কিছুটা কষ্ট পায়, তারপর বাড়ি ফিরে নিজের জীবনে ডুবে যায়।
রিয়াজ বাথরুমে যায়। আয়নায় তাকায়।
আয়নার মানুষটা কে?
সে চেনে না। চেনা মানুষ ছিল একটা — হাসিখুশি, একটু বেখেয়ালি, স্বপ্নবাজ রিয়াজ। সে আর নেই। এই মানুষটা অন্য। এর চোখের নিচে কালো গর্ত। এর দৃষ্টি শূন্য। এর মুখে কোনো ভাষা নেই।
রিয়াজ দাঁত মাজে। মুখ ধোয়। প্যান্ট-শার্ট পরে।
যন্ত্রের মতো।
বাইরে রোদ। প্রতিদিন রোদ। এই শহরে যেন বৃষ্টির কথা কেউ মনে রাখেনি। আকাশ শুকনো। রাস্তা শুকনো। রিয়াজের চোখও শুকনো। কাঁদতে পারে না। কান্না আসে না। ভেতরে কান্নার জলও হয়তো শুকিয়ে গেছে।
বৃষ্টিহীন শহরে শুকনো মানুষ হাঁটে।
খাওয়ার কথা।
রিয়াজ ভুলে যায় খেতে। প্রথম প্রথম ভুলে যেত, তারপর মনে পড়লে খেত। এখন মনে পড়লেও খেতে পারে না। খাবার সামনে রাখলে পেট বলে — না। গলা বলে — না। সব বলে না। শুধু মাথাটা বলে — খা, না হলে মরে যাবি। কিন্তু বাকি শরীর মাথার কথা শোনে না।
দুপুরে অফিসে সবাই ক্যান্টিনে যায়। রিয়াজও যায়। প্লেটে ভাত তোলে। মাছ নেয়। বসে। তাকায়। খাওয়ার চেষ্টা করে। দুটো গ্রাস খায়। তারপর আর পারে না।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করে, "খাচ্ছ না কেন?"
রিয়াজ বলে, "পেট ভরা।"
মিথ্যা কথা।
পেট ভরা না। পেট ফাঁকা। কিন্তু ফাঁকাটা খাবারের না। এই ফাঁকা অন্য ধরনের। এই ফাঁকা ভাত-মাছ দিয়ে ভরার না। এই ফাঁকা পুরোনো পৃথিবীর। সেই পৃথিবী যেখানে রিয়াজের একটা জায়গা ছিল, একটা মানুষ ছিল, একটা কারণ ছিল।
সেই কারণটা চলে গেছে।
মাঝেমাঝে রিয়াজ ভাবে — মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে? শরীর কি একসময় নিজেই বুঝতে পারে যে তাকে আর খাওয়ানো হবে না, তাই সে নিজেই খাওয়া ছেড়ে দেয়? নাকি শরীর লড়াই করে? কিন্তু কীসের জন্য লড়াই করে যখন মানুষটাই লড়তে চায় না?
অফিস।
রিয়াজ অফিসে বসে থাকে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে কী আছে সে দেখে না। চোখ স্ক্রিনে, কিন্তু দৃষ্টি কোথায়? কোথাও না। দৃষ্টি ভেসে যায়। শূন্যে। দেওয়ালে।
বস ডাকে। রিয়াজ সাড়া দেয়।
মিটিং হয়। রিয়াজ বসে থাকে।
কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়। যন্ত্রের মতো। সঠিক উত্তর। কারণ শরীর জানে, বহু বছরের অভ্যাস থেকে জানে। মাথাটা নেই, কিন্তু শরীর চলে।
একটা অটোপাইলট আছে মানুষের। দুঃখের সময় সেই অটোপাইলট চালু হয়ে যায়। শরীর চলতে থাকে। দিন পার হয়। মানুষ ভাবে — ও ঠিক আছে। ভালো আছে।
কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে একটা মানুষ বসে আছে অন্ধকারে।
একা।
অফিসের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সাদা আকাশ। রোদের আকাশ। মেঘ নেই। বৃষ্টির চিহ্ন নেই। রিয়াজ তাকিয়ে থাকে। একসময় মেঘ দেখলে মন ভালো হতো। মেঘলা দিনে কোথাও বেরোতে ইচ্ছে করত। এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু মনে হয় — এই আকাশের নিচে আমি কেন আছি?
এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
বাসায় ফেরা।
প্রতিদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রিয়াজ একটু থমকায়। একটু দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ বাসায় ফিরতে হবে। সেই ঘরে। যেখানে আলমারিটা আছে, যেটা এখনো খুলতে পারে না ঠিকমতো। যেখানে সেই লাল বেনারসিটা আছে — রিয়াজ সরায়নি। ফেলে দিতে পারেনি। রেখে দিয়েছে।
কেন রেখেছে, জানে না।
হয়তো এটাই তার শাস্তি। নিজেকে দেওয়া শাস্তি।
লিফটে ওঠে। ছয় তলা। দরজায় চাবি দেয়।
ঘর অন্ধকার।
সবসময় অন্ধকার।
একসময় ঘরে আলো ছিল। দরজা খুললেই ভেতর থেকে আলো আসত, শব্দ আসত — টিভির শব্দ, বা রান্নাঘর থেকে কোনো শব্দ, বা "এলে?" বলে একটা কণ্ঠস্বর।
সেই কণ্ঠস্বরটার জন্য রিয়াজ কখনো কখনো দরজায় কান পেতে থাকে।
শোনার চেষ্টা করে।
কিছু শোনা যায় না।
শুধু নীরবতা।
ঘরের নীরবতা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস। এই নীরবতা চাপা দেয়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রিয়াজ আলো জ্বালায়। আলো জ্বালালে শুধু দেখা যায় — ঘরটা কতটা ফাঁকা।
বাইরে রাস্তায় তখনো মানুষ। তখনো শব্দ। কিন্তু ঘরের ভেতরে একটা আলাদা পৃথিবী। একটা বৃষ্টিহীন, শব্দহীন, উষ্ণতাহীন পৃথিবী।
রিয়াজের পৃথিবী।
রাত।
রাতই সবচেয়ে কঠিন।
দিনে অন্তত একটা অটোপাইলট চলে। দিনে অন্তত মানুষের ভিড় আছে, শব্দ আছে, ব্যস্ততার একটা ভান করা যায়। কিন্তু রাতে? রাতে সব নিরিবিলি হয়ে যায়। শহর ঘুমিয়ে পড়ে। আর রিয়াজ শুয়ে থাকে একটা বিশাল বিছানায়।
বিছানাটা বড়। দুজনের জন্য।
এখন একজনের জন্য।
অর্ধেক বিছানা ফাঁকা।
রিয়াজ সেই ফাঁকা অর্ধেকের দিকে তাকিয়ে থাকে। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে আসে। বিছানার সাদা চাদরে পড়ে। চাদরে ভাঁজ আছে। কিন্তু কারো শরীরের উষ্ণতা নেই। কারো নিঃশ্বাসের শব্দ নেই।
মাঝরাতে কখনো কখনো একটা হাত এগিয়ে যায় ফাঁকা দিকে।
পুরনো অভ্যাস।
কিন্তু হাতে কিছু লাগে না। ঠান্ডা চাদর। ঠান্ডা, নিরুত্তাপ।
রিয়াজ হাত ফিরিয়ে আনে।
ছাদে মাঝেমাঝে যায়। রাত তিনটায়। চারটায়। আকাশের দিকে তাকায়। তারা দেখে। মেঘ নেই, বলে তারা স্পষ্ট। কিন্তু রিয়াজ তারা দেখে না আসলে। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকার একটা কারণ আছে — ছাদে দাঁড়ালে মনে হয় একটু বাতাস লাগছে। মনে হয় এই পৃথিবীটা এত ছোট না। মনে হয়, এখানে এলে হয়তো একটু শ্বাস নেওয়া যায়।
কিন্তু বাতাসও শুকনো।
এই শহরে বৃষ্টি নেই, তাই বাতাসেও কোনো ভেজা নেই। সব শুকনো। পাতা শুকনো। রাস্তা শুকনো। মানুষ শুকনো।
রিয়াজ শুকনো।
স্বপ্নের কথা।
মানুষ রাতে স্বপ্ন দেখে। ঘুমের মধ্যে। কিন্তু রিয়াজের ঘুম নেই, তাই স্বপ্নও নেই। আর জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা চলে গেছে।
একটা সময় ছিল, রিয়াজ স্বপ্ন দেখত। অনেক স্বপ্ন। একটা বাড়ির স্বপ্ন — ছোট্ট, কিন্তু নিজের। একটা বাগানের স্বপ্ন — হয়তো দুটো গাছ, হয়তো একটু ফুল। সন্ধ্যায় ছাদে বসে চায়ের স্বপ্ন। শীতের রাতে লেপ মুড়ি দিয়ে গল্প করার স্বপ্ন।
শিশুর স্বপ্ন।
হ্যাঁ, সেই স্বপ্নটাও ছিল। একটা ছোট্ট শিশু। যার চোখ হবে মায়ের মতো, নাক হবে বাবার মতো। যে হাঁটতে শিখবে ধরে ধরে। যে প্রথমবার "বাবা" বলবে।
সেই স্বপ্নগুলো কোথায় গেল?
স্বপ্নের কোনো কবর হয় না। স্বপ্ন মরে না। স্বপ্ন শুধু মানুষের ভেতর থেকে বের হয়ে যায়, বাষ্পের মতো, অদৃশ্য হয়ে যায়। মাটিতে পড়ে না। গলে যায় না। শুধু উবে যায়। কিন্তু যাওয়ার সময় একটা ক্ষত রেখে যায়। সেই ক্ষতটা থাকে।
থাকতেই থাকে।
রিয়াজ এখন স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। কারণ স্বপ্ন দেখলে ভালো লাগে। আর ভালো লাগলে মনে হয় — এরপর কষ্ট আসবে। ভালোর পরেই কষ্ট আসে। সবসময়।
তাই ভালো না লাগাই ভালো।
তাই স্বপ্ন না দেখাই ভালো।
এই শহরে বৃষ্টি নেই। এই শহরে স্বপ্নও নেই।
একদিন মা ফোন করেছিল।
"কেমন আছিস?"
রিয়াজ বলেছিল, "ভালো।"
মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা। কিন্তু সত্যি বলার ভাষা নেই। সত্যি বললে মা কাঁদবে। মা কাঁদলে রিয়াজ সামলাতে পারবে না। আর মা কি সত্যিই বুঝবে? বুঝবে কীভাবে — এই শূন্যতা, এই ভার, এই প্রতিটা মুহূর্তের যুদ্ধ?
"ভালো আছি, মা।"
মা বলেছিল, "খাচ্ছিস তো ঠিকমতো?"
"হ্যাঁ।"
"রাতে ঘুমাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ।"
তিনটা মিথ্যা। পরপর তিনটা।
ফোন রাখার পর রিয়াজ অনেকক্ষণ বসে ছিল। মায়ের কণ্ঠটা মাথায় ঘুরছিল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠ। ভালোবাসার কণ্ঠ।
মায়ের গলায় একটা কষ্ট ছিল। লুকানো, কিন্তু রিয়াজ টের পেয়েছিল। মা জানে কিছু একটা হয়েছে। মা সব জানে। মায়েরা সব জানে। কিন্তু সে জিজ্ঞেস করেনি। কারণ সে হয়তো জানে — ছেলে বলবে না। আর জোর করলে ছেলে আরো দূরে সরে যাবে।
তাই মা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল — খাচ্ছিস? ঘুমাচ্ছিস?
এই দুটো প্রশ্নের ভেতর দিয়ে সে আসলে বলেছিল — বেঁচে আছিস তো? আছিস তো?
রিয়াজ সেই রাতে একটু কেঁদেছিল।
মায়ের কথা মনে করে। মায়ের সেই গলার কথা মনে করে।
খুব অল্প কান্না। চোখ ভিজেছিল, গাল ভিজেছিল। তারপর শুকিয়ে গেছিল। এই শহরে সব শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি।
বন্ধু আছে কয়েকজন।
তারা জানে কিছুটা। পুরোটা জানে না। রিয়াজ বলেনি পুরোটা। বললে তারা পরামর্শ দেবে। "সময় লাগে।" "এগিয়ে যা।" "নতুন কাউকে খোঁজ।" "আল্লাহর ওপর ছেড়ে দে।"
সব পরামর্শ। সব সঠিক। সব অর্থহীন।
কারণ পরামর্শ দিয়ে ব্যথা কমে না। ব্যথার একমাত্র ওষুধ সময়। কিন্তু সময়ের কাছে যাওয়ার জন্য যে শক্তি লাগে, সেই শক্তি রিয়াজের নেই।
একদিন একজন বন্ধু এসেছিল। বসেছিল পাশে। কিছু বলেনি। শুধু বসেছিল।
সেটাই ভালো লেগেছিল। সবচেয়ে বেশি।
কথা না বলা। শুধু থাকা।
কিন্তু মানুষ সবসময় থাকতে পারে না। তার নিজের জীবন আছে, কাজ আছে, সংসার আছে। সে চলে গেছে। রিয়াজ আবার একা।
বন্ধু চলে যাওয়ার পর রিয়াজ দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ শুনেছিল। তারপর শব্দ থেমে গেছিল।
নীরবতা।
আবার নীরবতা।
শহরের মধ্যে একটা মানুষ হাঁটছে।
রিয়াজ।
সে হাঁটছে। ফুটপাত ধরে। কোথায় যাচ্ছে? কোথাও না। শুধু হাঁটছে। কারণ ঘরে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে, আর ঘরে না থাকলে কোথায় যাবে জানে না।
মানুষ আসছে-যাচ্ছে। সবার কোথাও না কোথাও যাওয়ার আছে।
সবার কারণ আছে।
রিয়াজের নেই।
একটা চায়ের দোকানে বসে। গরম ধোঁয়া ওঠে। রিয়াজ হাত দিয়ে ধরে কাপটা। উষ্ণতা লাগে হাতে। মানুষের হাতের উষ্ণতা না। চায়ের কাপের উষ্ণতা। কিন্তু তবুও উষ্ণতা।
পৃথিবীতে এটুকুই আছে এখন।
একটা চায়ের কাপের উষ্ণতা।
রিয়াজ বসে থাকে। দোকানের সামনে দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। একজন মেয়ে হাসছে ফোনে। একজন বুড়ো মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছে। দুটো বাচ্চা দৌড়াচ্ছে। একটা কুকুর শুয়ে আছে ছায়ায়।
পৃথিবী চলছে।
রিয়াজ দেখছে।
আকাশের দিকে তাকায়। নীল। পরিষ্কার। একটুও মেঘ নেই।
এই শহরে বৃষ্টি নেই।
সে কি আর কখনো ভালো হবে?
এই প্রশ্নটা রিয়াজ নিজেকে করে। প্রতিদিন। কখনো কখনো রাত তিনটায়, ঘুম না আসায় ছাদে উঠে। কখনো অফিসের বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। কখনো রাস্তার মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে।
ভালো হবে কি?
হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে মানুষ কষ্ট পেয়েছে। হাজার বছর ধরে মানুষ ভেঙে পড়েছে। প্রেম হয়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে, মানুষ হারিয়ে গেছে — এই গল্প নতুন না। এই কষ্ট নতুন না। হাজার বছর আগেও কেউ এভাবে বিছানার ফাঁকা অর্ধেকের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। কেউ এভাবে একটা কাপে চা বানিয়েছে।
কিন্তু সেই জানাটা এখন কোনো সান্ত্বনা দেয় না।
কারণ অন্যদের কষ্ট জেনে নিজের কষ্ট কমে না।
কষ্ট সবসময় একক।
কষ্ট সবসময় শুধু তোমার।
হাজার বছরের ইতিহাসে কারো কষ্ট কাউকে বাঁচায়নি।
এক রাতে রিয়াজ ছাদে গিয়েছিল।
সেদিন রাত অনেক ভারী ছিল। ভেতরটা আরো ভারী। শুয়ে থাকতে পারছিল না। উঠে পড়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে।
ছাদে দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়েছিল।
অনেক নিচে। রাস্তা। আলো। গাড়ি।
অনেক নিচে।
সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাস ছিল। শুকনো বাতাস।
তারপর মোবাইল বেজেছিল।
মা।
রাত তিনটায় মা ফোন করেছিল।
রিয়াজ ধরেছিল।
মা বলেছিল, "ঘুম হচ্ছে না। তোর কথা মনে পড়ছিল। কেমন আছিস?"
রিয়াজ বলতে পারেনি কিছু।
মা বলেছিল, "কথা বল আমার সাথে।"
রিয়াজ তখনো কিছু বলেনি।
মা বলেছিল, "বাবা।"
শুধু এই একটা শব্দ।
রিয়াজ ছাদ থেকে নেমে এসেছিল।
পরদিন সকালে।
রিয়াজ উঠেছিল। বাথরুমে গিয়েছিল। মুখ ধুয়েছিল।
আয়নায় তাকিয়েছিল।
সেই একই মুখ। চোখের নিচে কালো দাগ। শুকনো ঠোঁট। অগোছালো দাড়ি।
কিন্তু আজ কেন যেন একটু অন্যরকম লাগল।
কী অন্যরকম? জানে না। কিছু বদলায়নি। ব্যথা আছে। শূন্যতা আছে। ভার আছে। কিন্তু আজ — আজ শুধু একটু মনে হলো, এই মুখটা চেনা। এই মানুষটা কে — জানে না পুরোপুরি। কিন্তু সে এখানে আছে।
এখনো আছে।
রিয়াজ রান্নাঘরে গেল।
চা বানাল।
একটা কাপে।
চা নিয়ে জানালার ধারে দাঁড়াল। বাইরে তাকাল। সকালের আলো। রাস্তায় মানুষ। একটা কাক ডাকছে।
আকাশের দিকে তাকাল।
সাদা। পরিষ্কার।
কোথাও দূরে, দিগন্তের কাছে, একটুখানি — সামান্য — মেঘ।
ছোট্ট একটা মেঘ।
বৃষ্টি হবে কিনা জানে না।
হয়তো হবে না।
হয়তো সেই মেঘ উড়ে যাবে। মিলিয়ে যাবে।
কিন্তু মেঘটা আছে।
আজ আছে।
রিয়াজ চায়ে চুমুক দিল।
গরম।শহরটা নিচে। অনেক নিচে। রিকশার টুংটাং, বাসের হর্ন, কারো হাসির শব্দ, কারো ঝগড়ার শব্দ — সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত শহর। কিন্তু রিয়াজের কাছে এই সব শব্দ এখন অনেক দূরের। যেন কোনো এক পাহাড়ের চূড়া থেকে সে সমতলের দিকে তাকিয়ে আছে, আর সমতলের মানুষগুলো অনেক ছোট, অনেক অস্পষ্ট, তাদের জীবন অনেক আলাদা — এমন একটা জীবন যেখানে রিয়াজের কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
জানালার কাচে তার নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে।
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। এই মুখটা কি তার? এই চোখের নিচের কালো দাগ, এই শুকনো ঠোঁট, এই অগোছালো দাড়ি — এটা কি সেই রিয়াজ যে একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কলার ঠিক করতে করতে হাসত? যে ভাবত, জীবন একটা সুন্দর জায়গা? যে স্বপ্ন দেখত — একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট, একটা রান্নাঘর যেখানে রোজ সন্ধ্যায় রান্নার গন্ধ উঠবে, একটা বিছানা যেখানে দুটো মানুষের উষ্ণতা থাকবে?
কাচের ভেতরের মুখটা কোনো উত্তর দেয় না।
শহরে আজ বৃষ্টি নেই।
অনেকদিন হলো বৃষ্টি নেই।
ছয় মাস।
ছয় মাস কত ছোট একটা সময়। একটা ঋতুও পরিবর্তন হয় না সেই সময়ে। বীজ বুনলে গাছ হয়ে ওঠে না। শিশু হাঁটতে শেখে না। কিন্তু ছয় মাসে একটা মানুষ ভেঙে পড়তে পারে — এটা রিয়াজ এখন জানে। ছয় মাসে একটা মানুষের ভেতরের সব রঙ মুছে যেতে পারে, সব শব্দ হারিয়ে যেতে পারে, সব স্বপ্ন ঝরে পড়তে পারে — এটা রিয়াজ এখন বোঝে।
ছয় মাস আগে এই শহরে বৃষ্টি ছিল।
রিয়াজের মনে আছে। বিয়ের আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। সারারাত। টিনের চালে না, রাস্তার পিচে না — সে বৃষ্টি পড়েছিল রিয়াজের বুকের ভেতর। আনন্দের বৃষ্টি। প্রতীক্ষার বৃষ্টি। এত বছর একা থাকার পর কেউ একজন আসছে — এই ভাবনার বৃষ্টি।
সেই বৃষ্টি আর আসেনি।
বিয়ের দিনটার কথা মনে পড়ে।
লাল বেনারসি। সোনার চুড়ির শব্দ। আতরের গন্ধ। মেহেদির রং। রিয়াজ যখন প্রথমবার তার মুখ দেখেছিল — সেই লাল শাড়িতে, চোখে কাজল, ঠোঁটে একটুখানি লাজুক হাসি — তখন মনে হয়েছিল, এই পৃথিবীতে আসার সার্থকতা আছে। মনে হয়েছিল, এত বছর ধরে সে যে একাকীত্বের ভেতর দিয়ে হেঁটেছে, যে শীতের রাতগুলো সে একা কাটিয়েছে চাদর মুড়ি দিয়ে, যে বর্ষার বিকেলগুলো সে জানালার ধারে বসে অর্থহীনভাবে পার করেছে — সেই সব একাকীত্বের শেষ হলো।
এবার সে আর একা নেই।
এবার সে আর একা নেই — এই ভাবনাটা কত মিষ্টি ছিল।
কত মিষ্টি।
সেই মিষ্টির স্বাদ এখন জিভে থাকে। কিন্তু থাকে বিষের মতো। মিষ্টি যখন বিষ হয়ে যায়, তখন মুখ থেকে সেটা ফেলে দেওয়া যায় না। গলায় আটকে থাকে। সারাক্ষণ।
বিয়ের পরের প্রথম সকালটার কথা রিয়াজ ভুলতে পারে না।
ঘুম থেকে উঠে সে দেখেছিল, পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে। এই দৃশ্যটা — এত সাধারণ, এত তুচ্ছ, কিন্তু রিয়াজের কাছে তখন এটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে অসাধারণ দৃশ্য। পাশে কেউ একজন শুয়ে আছে। শ্বাস নিচ্ছে। বুকটা ওঠানামা করছে। চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে পড়েছে। রিয়াজ অনেকক্ষণ শুধু তাকিয়ে ছিল। উঠতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, উঠলেই বুঝি এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে, এই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে।
সে রান্নাঘরে গিয়ে চা বানিয়েছিল।
দুটো কাপে।
দুটো কাপে চা ঢালতে ঢালতে সে হাসছিল। নিজেই নিজের হাসির কারণ বুঝতে পারছিল না। শুধু জানছিল, ভেতরে কোথাও একটা উষ্ণতা আছে। একটা আলো আছে। একটা কারণ আছে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে চা বানানোর।
দুটো কাপে চা।
এখন সে একটা কাপে চা বানায়। একটা কাপ। আর সেই একটা কাপ বেশিরভাগ সময় ঠান্ডা হয়ে যায়, কারণ রিয়াজ চা বানিয়ে রেখে দেয়, খেতে পারে না। বসে থাকে। কোথায় বসে থাকে সে নিজেও জানে না। চিন্তা করে কিনা তাও জানে না। শুধু সময় যায়। ঠান্ডা চা পড়ে থাকে। রিয়াজ বসে থাকে।
দুটো কাপ ছিল।
এখন একটা।
একটা কাপও কি থাকবে? নাকি সেটাও একদিন ফেলে দেবে সে? কারণ একটা কাপ মানেই তো মনে করিয়ে দেয় — একসময় দুটো ছিল।
যেদিন সে চলে গিয়েছিল।
রিয়াজ সেই দিনটার কথা মনে করতে চায় না। কিন্তু মনে না করতে চাইলেই সেটা আরো তীব্রভাবে আসে। স্মৃতি এমনই নিষ্ঠুর — যাকে তুমি তাড়াতে চাও, সে ফিরে আসে। যাকে তুমি ভুলতে চাও, সে আরো গভীরে গেঁথে যায়।
সেদিন অফিস থেকে ফিরেছিল রিয়াজ।
দরজায় চাবি দিতে দিতে মাথায় ছিল, আজ বাইরে থেকে বিরিয়ানি আনা যাক। ও রান্না করতে ভালোবাসে না, রিয়াজ জানে। কিন্তু বিরিয়ানি পেলে খুশি হয়। দরজা খুলল। ঘর অন্ধকার। ডাকল — কোনো সাড়া নেই।
প্রথমে ভাবল, বাজারে গেছে। পরে ভাবল, বান্ধবীর বাসায় গেছে। তারপর দেখল, আলমারি খোলা। কিছু কাপড় নেই। প্রসাধনী নেই। সোনার চুড়িগুলো নেই।
শুধু সেই লাল বেনারসিটা আছে।
হ্যাঙারে ঝুলছে।
রিয়াজ অনেকক্ষণ সেই লাল বেনারসির দিকে তাকিয়ে ছিল। বেনারসিটা নিঃশব্দে ঝুলছিল। বাতাস নেই, তাই নড়ছিলও না। শুধু ঝুলছিল। যেন সে নিজেও জানে না কী হয়েছে। যেন সেও অপেক্ষায় আছে।
তারপর ফোন করেছিল। একবার। দুবার। দশবার। পঁচিশবার।
ফোন বন্ধ।
তারপর একটা মেসেজ এসেছিল। মাত্র দুটো লাইন। পড়তে পড়তে রিয়াজের মনে হয়েছিল, তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে দেওয়াল ধরেছিল। দেওয়ালটা ঠান্ডা ছিল। অনেক ঠান্ডা।
সেই রাতে সে মেঝেতে বসেছিল। কখন বসেছিল জানে না। কতক্ষণ বসেছিল জানে না। শুধু জানে, যখন উঠল, তখন ভোর হয়ে গেছে।
পাখি ডাকছে।
পাখি কেন ডাকছে? পৃথিবীটা কেন স্বাভাবিক আছে? কেন রাস্তায় রিকশা চলছে? কেন দোকান খুলছে? কেন মানুষ হাঁটছে? রিয়াজের পৃথিবী ভেঙে পড়েছে, কিন্তু বাইরের পৃথিবী কেন থামেনি?
কেন থামল না?
এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়নি।
পৃথিবী থামে না। কারো জন্য। কখনো।
সেদিনও বৃষ্টি হয়নি। আকাশ ছিল পরিষ্কার, নির্লজ্জভাবে নীল। রোদ উঠেছিল। যেন কিছুই হয়নি। যেন রিয়াজের ভেতরের সব জল শুকিয়ে গেছে বলে আকাশও সিদ্ধান্ত নিয়েছে — আজ থেকে এই শহরে আর বৃষ্টি নেই।
তারপর থেকে প্রতিটা দিন একটা যুদ্ধ।
সকালে ঘুম ভাঙে। না, ঘুম ভাঙে না — ঘুম আসে না, তাই একসময় চোখ খোলে। রাতটা পার হয়। সেটুকুই। রিয়াজ বিছানায় শুয়ে থাকে, চোখ বন্ধ, কিন্তু ঘুম নেই। মাথায় কোনো চিন্তা নেই স্পষ্ট করে, কিন্তু একটা ভার আছে। একটা অদৃশ্য পাথর আছে বুকের ওপর, যেটা সরানো যাচ্ছে না।
উঠতে হবে।
উঠতে হবে কেন? অফিস আছে। ঠিক আছে। উঠতে হবে। কিন্তু উঠব কীভাবে? পা দুটো মাটিতে রাখলে মাটি ঠান্ডা। শরীর ভারী। কেমন যেন মনে হয়, পুরো শরীরটা পাথর হয়ে গেছে রাতের মধ্যে। নড়ানো কঠিন।
তারপরও ওঠে।
ওঠে, কারণ না উঠলে কেউ প্রশ্ন করবে। না উঠলে জীবন থামবে না, কিন্তু মানুষ জানবে। আর রিয়াজ চায় না কেউ জানুক। সে চায় না কেউ জিজ্ঞেস করুক — কী হয়েছে? ভালো আছ? কারণ সে জানে না উত্তরে কী বলবে।
"না" বললে তারা জড়িয়ে ধরবে, সহানুভূতি দেখাবে। আর সেই সহানুভূতি রিয়াজের একদমই সহ্য হয় না। সহানুভূতি একটা পর্দার মতো — মানুষ সহানুভূতি দিয়ে নিজেকে আড়াল করে, নিরাপদ রাখে। তোমার কষ্ট দেখে, কিছুটা কষ্ট পায়, তারপর বাড়ি ফিরে নিজের জীবনে ডুবে যায়।
রিয়াজ বাথরুমে যায়। আয়নায় তাকায়।
আয়নার মানুষটা কে?
সে চেনে না। চেনা মানুষ ছিল একটা — হাসিখুশি, একটু বেখেয়ালি, স্বপ্নবাজ রিয়াজ। সে আর নেই। এই মানুষটা অন্য। এর চোখের নিচে কালো গর্ত। এর দৃষ্টি শূন্য। এর মুখে কোনো ভাষা নেই।
রিয়াজ দাঁত মাজে। মুখ ধোয়। প্যান্ট-শার্ট পরে।
যন্ত্রের মতো।
বাইরে রোদ। প্রতিদিন রোদ। এই শহরে যেন বৃষ্টির কথা কেউ মনে রাখেনি। আকাশ শুকনো। রাস্তা শুকনো। রিয়াজের চোখও শুকনো। কাঁদতে পারে না। কান্না আসে না। ভেতরে কান্নার জলও হয়তো শুকিয়ে গেছে।
বৃষ্টিহীন শহরে শুকনো মানুষ হাঁটে।
খাওয়ার কথা।
রিয়াজ ভুলে যায় খেতে। প্রথম প্রথম ভুলে যেত, তারপর মনে পড়লে খেত। এখন মনে পড়লেও খেতে পারে না। খাবার সামনে রাখলে পেট বলে — না। গলা বলে — না। সব বলে না। শুধু মাথাটা বলে — খা, না হলে মরে যাবি। কিন্তু বাকি শরীর মাথার কথা শোনে না।
দুপুরে অফিসে সবাই ক্যান্টিনে যায়। রিয়াজও যায়। প্লেটে ভাত তোলে। মাছ নেয়। বসে। তাকায়। খাওয়ার চেষ্টা করে। দুটো গ্রাস খায়। তারপর আর পারে না।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করে, "খাচ্ছ না কেন?"
রিয়াজ বলে, "পেট ভরা।"
মিথ্যা কথা।
পেট ভরা না। পেট ফাঁকা। কিন্তু ফাঁকাটা খাবারের না। এই ফাঁকা অন্য ধরনের। এই ফাঁকা ভাত-মাছ দিয়ে ভরার না। এই ফাঁকা পুরোনো পৃথিবীর। সেই পৃথিবী যেখানে রিয়াজের একটা জায়গা ছিল, একটা মানুষ ছিল, একটা কারণ ছিল।
সেই কারণটা চলে গেছে।
মাঝেমাঝে রিয়াজ ভাবে — মানুষ না খেয়ে কতদিন বাঁচে? শরীর কি একসময় নিজেই বুঝতে পারে যে তাকে আর খাওয়ানো হবে না, তাই সে নিজেই খাওয়া ছেড়ে দেয়? নাকি শরীর লড়াই করে? কিন্তু কীসের জন্য লড়াই করে যখন মানুষটাই লড়তে চায় না?
অফিস।
রিয়াজ অফিসে বসে থাকে। কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিনে কী আছে সে দেখে না। চোখ স্ক্রিনে, কিন্তু দৃষ্টি কোথায়? কোথাও না। দৃষ্টি ভেসে যায়। শূন্যে। দেওয়ালে।
বস ডাকে। রিয়াজ সাড়া দেয়।
মিটিং হয়। রিয়াজ বসে থাকে।
কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয়। যন্ত্রের মতো। সঠিক উত্তর। কারণ শরীর জানে, বহু বছরের অভ্যাস থেকে জানে। মাথাটা নেই, কিন্তু শরীর চলে।
একটা অটোপাইলট আছে মানুষের। দুঃখের সময় সেই অটোপাইলট চালু হয়ে যায়। শরীর চলতে থাকে। দিন পার হয়। মানুষ ভাবে — ও ঠিক আছে। ভালো আছে।
কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে একটা মানুষ বসে আছে অন্ধকারে।
একা।
অফিসের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সাদা আকাশ। রোদের আকাশ। মেঘ নেই। বৃষ্টির চিহ্ন নেই। রিয়াজ তাকিয়ে থাকে। একসময় মেঘ দেখলে মন ভালো হতো। মেঘলা দিনে কোথাও বেরোতে ইচ্ছে করত। এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু মনে হয় — এই আকাশের নিচে আমি কেন আছি?
এই প্রশ্নের উত্তর নেই।
বাসায় ফেরা।
প্রতিদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রিয়াজ একটু থমকায়। একটু দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ বাসায় ফিরতে হবে। সেই ঘরে। যেখানে আলমারিটা আছে, যেটা এখনো খুলতে পারে না ঠিকমতো। যেখানে সেই লাল বেনারসিটা আছে — রিয়াজ সরায়নি। ফেলে দিতে পারেনি। রেখে দিয়েছে।
কেন রেখেছে, জানে না।
হয়তো এটাই তার শাস্তি। নিজেকে দেওয়া শাস্তি।
লিফটে ওঠে। ছয় তলা। দরজায় চাবি দেয়।
ঘর অন্ধকার।
সবসময় অন্ধকার।
একসময় ঘরে আলো ছিল। দরজা খুললেই ভেতর থেকে আলো আসত, শব্দ আসত — টিভির শব্দ, বা রান্নাঘর থেকে কোনো শব্দ, বা "এলে?" বলে একটা কণ্ঠস্বর।
সেই কণ্ঠস্বরটার জন্য রিয়াজ কখনো কখনো দরজায় কান পেতে থাকে।
শোনার চেষ্টা করে।
কিছু শোনা যায় না।
শুধু নীরবতা।
ঘরের নীরবতা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী জিনিস। এই নীরবতা চাপা দেয়। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রিয়াজ আলো জ্বালায়। আলো জ্বালালে শুধু দেখা যায় — ঘরটা কতটা ফাঁকা।
বাইরে রাস্তায় তখনো মানুষ। তখনো শব্দ। কিন্তু ঘরের ভেতরে একটা আলাদা পৃথিবী। একটা বৃষ্টিহীন, শব্দহীন, উষ্ণতাহীন পৃথিবী।
রিয়াজের পৃথিবী।
রাত।
রাতই সবচেয়ে কঠিন।
দিনে অন্তত একটা অটোপাইলট চলে। দিনে অন্তত মানুষের ভিড় আছে, শব্দ আছে, ব্যস্ততার একটা ভান করা যায়। কিন্তু রাতে? রাতে সব নিরিবিলি হয়ে যায়। শহর ঘুমিয়ে পড়ে। আর রিয়াজ শুয়ে থাকে একটা বিশাল বিছানায়।
বিছানাটা বড়। দুজনের জন্য।
এখন একজনের জন্য।
অর্ধেক বিছানা ফাঁকা।
রিয়াজ সেই ফাঁকা অর্ধেকের দিকে তাকিয়ে থাকে। চাঁদের আলো জানালা দিয়ে আসে। বিছানার সাদা চাদরে পড়ে। চাদরে ভাঁজ আছে। কিন্তু কারো শরীরের উষ্ণতা নেই। কারো নিঃশ্বাসের শব্দ নেই।
মাঝরাতে কখনো কখনো একটা হাত এগিয়ে যায় ফাঁকা দিকে।
পুরনো অভ্যাস।
কিন্তু হাতে কিছু লাগে না। ঠান্ডা চাদর। ঠান্ডা, নিরুত্তাপ।
রিয়াজ হাত ফিরিয়ে আনে।
ছাদে মাঝেমাঝে যায়। রাত তিনটায়। চারটায়। আকাশের দিকে তাকায়। তারা দেখে। মেঘ নেই, বলে তারা স্পষ্ট। কিন্তু রিয়াজ তারা দেখে না আসলে। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁড়িয়ে থাকার একটা কারণ আছে — ছাদে দাঁড়ালে মনে হয় একটু বাতাস লাগছে। মনে হয় এই পৃথিবীটা এত ছোট না। মনে হয়, এখানে এলে হয়তো একটু শ্বাস নেওয়া যায়।
কিন্তু বাতাসও শুকনো।
এই শহরে বৃষ্টি নেই, তাই বাতাসেও কোনো ভেজা নেই। সব শুকনো। পাতা শুকনো। রাস্তা শুকনো। মানুষ শুকনো।
রিয়াজ শুকনো।
স্বপ্নের কথা।
মানুষ রাতে স্বপ্ন দেখে। ঘুমের মধ্যে। কিন্তু রিয়াজের ঘুম নেই, তাই স্বপ্নও নেই। আর জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা চলে গেছে।
একটা সময় ছিল, রিয়াজ স্বপ্ন দেখত। অনেক স্বপ্ন। একটা বাড়ির স্বপ্ন — ছোট্ট, কিন্তু নিজের। একটা বাগানের স্বপ্ন — হয়তো দুটো গাছ, হয়তো একটু ফুল। সন্ধ্যায় ছাদে বসে চায়ের স্বপ্ন। শীতের রাতে লেপ মুড়ি দিয়ে গল্প করার স্বপ্ন।
শিশুর স্বপ্ন।
হ্যাঁ, সেই স্বপ্নটাও ছিল। একটা ছোট্ট শিশু। যার চোখ হবে মায়ের মতো, নাক হবে বাবার মতো। যে হাঁটতে শিখবে ধরে ধরে। যে প্রথমবার "বাবা" বলবে।
সেই স্বপ্নগুলো কোথায় গেল?
স্বপ্নের কোনো কবর হয় না। স্বপ্ন মরে না। স্বপ্ন শুধু মানুষের ভেতর থেকে বের হয়ে যায়, বাষ্পের মতো, অদৃশ্য হয়ে যায়। মাটিতে পড়ে না। গলে যায় না। শুধু উবে যায়। কিন্তু যাওয়ার সময় একটা ক্ষত রেখে যায়। সেই ক্ষতটা থাকে।
থাকতেই থাকে।
রিয়াজ এখন স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। কারণ স্বপ্ন দেখলে ভালো লাগে। আর ভালো লাগলে মনে হয় — এরপর কষ্ট আসবে। ভালোর পরেই কষ্ট আসে। সবসময়।
তাই ভালো না লাগাই ভালো।
তাই স্বপ্ন না দেখাই ভালো।
এই শহরে বৃষ্টি নেই। এই শহরে স্বপ্নও নেই।
একদিন মা ফোন করেছিল।
"কেমন আছিস?"
রিয়াজ বলেছিল, "ভালো।"
মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা। কিন্তু সত্যি বলার ভাষা নেই। সত্যি বললে মা কাঁদবে। মা কাঁদলে রিয়াজ সামলাতে পারবে না। আর মা কি সত্যিই বুঝবে? বুঝবে কীভাবে — এই শূন্যতা, এই ভার, এই প্রতিটা মুহূর্তের যুদ্ধ?
"ভালো আছি, মা।"
মা বলেছিল, "খাচ্ছিস তো ঠিকমতো?"
"হ্যাঁ।"
"রাতে ঘুমাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ।"
তিনটা মিথ্যা। পরপর তিনটা।
ফোন রাখার পর রিয়াজ অনেকক্ষণ বসে ছিল। মায়ের কণ্ঠটা মাথায় ঘুরছিল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠ। ভালোবাসার কণ্ঠ।
মায়ের গলায় একটা কষ্ট ছিল। লুকানো, কিন্তু রিয়াজ টের পেয়েছিল। মা জানে কিছু একটা হয়েছে। মা সব জানে। মায়েরা সব জানে। কিন্তু সে জিজ্ঞেস করেনি। কারণ সে হয়তো জানে — ছেলে বলবে না। আর জোর করলে ছেলে আরো দূরে সরে যাবে।
তাই মা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল — খাচ্ছিস? ঘুমাচ্ছিস?
এই দুটো প্রশ্নের ভেতর দিয়ে সে আসলে বলেছিল — বেঁচে আছিস তো? আছিস তো?
রিয়াজ সেই রাতে একটু কেঁদেছিল।
মায়ের কথা মনে করে। মায়ের সেই গলার কথা মনে করে।
খুব অল্প কান্না। চোখ ভিজেছিল, গাল ভিজেছিল। তারপর শুকিয়ে গেছিল। এই শহরে সব শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি।
বন্ধু আছে কয়েকজন।
তারা জানে কিছুটা। পুরোটা জানে না। রিয়াজ বলেনি পুরোটা। বললে তারা পরামর্শ দেবে। "সময় লাগে।" "এগিয়ে যা।" "নতুন কাউকে খোঁজ।" "আল্লাহর ওপর ছেড়ে দে।"
সব পরামর্শ। সব সঠিক। সব অর্থহীন।
কারণ পরামর্শ দিয়ে ব্যথা কমে না। ব্যথার একমাত্র ওষুধ সময়। কিন্তু সময়ের কাছে যাওয়ার জন্য যে শক্তি লাগে, সেই শক্তি রিয়াজের নেই।
একদিন একজন বন্ধু এসেছিল। বসেছিল পাশে। কিছু বলেনি। শুধু বসেছিল।
সেটাই ভালো লেগেছিল। সবচেয়ে বেশি।
কথা না বলা। শুধু থাকা।
কিন্তু মানুষ সবসময় থাকতে পারে না। তার নিজের জীবন আছে, কাজ আছে, সংসার আছে। সে চলে গেছে। রিয়াজ আবার একা।
বন্ধু চলে যাওয়ার পর রিয়াজ দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ শুনেছিল। তারপর শব্দ থেমে গেছিল।
নীরবতা।
আবার নীরবতা।
শহরের মধ্যে একটা মানুষ হাঁটছে।
রিয়াজ।
সে হাঁটছে। ফুটপাত ধরে। কোথায় যাচ্ছে? কোথাও না। শুধু হাঁটছে। কারণ ঘরে থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে, আর ঘরে না থাকলে কোথায় যাবে জানে না।
মানুষ আসছে-যাচ্ছে। সবার কোথাও না কোথাও যাওয়ার আছে।
সবার কারণ আছে।
রিয়াজের নেই।
একটা চায়ের দোকানে বসে। গরম ধোঁয়া ওঠে। রিয়াজ হাত দিয়ে ধরে কাপটা। উষ্ণতা লাগে হাতে। মানুষের হাতের উষ্ণতা না। চায়ের কাপের উষ্ণতা। কিন্তু তবুও উষ্ণতা।
পৃথিবীতে এটুকুই আছে এখন।
একটা চায়ের কাপের উষ্ণতা।
রিয়াজ বসে থাকে। দোকানের সামনে দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। একজন মেয়ে হাসছে ফোনে। একজন বুড়ো মানুষ ধীরে ধীরে হাঁটছে। দুটো বাচ্চা দৌড়াচ্ছে। একটা কুকুর শুয়ে আছে ছায়ায়।
পৃথিবী চলছে।
রিয়াজ দেখছে।
আকাশের দিকে তাকায়। নীল। পরিষ্কার। একটুও মেঘ নেই।
এই শহরে বৃষ্টি নেই।
সে কি আর কখনো ভালো হবে?
এই প্রশ্নটা রিয়াজ নিজেকে করে। প্রতিদিন। কখনো কখনো রাত তিনটায়, ঘুম না আসায় ছাদে উঠে। কখনো অফিসের বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। কখনো রাস্তার মাঝখানে হাঁটতে হাঁটতে।
ভালো হবে কি?
হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে মানুষ কষ্ট পেয়েছে। হাজার বছর ধরে মানুষ ভেঙে পড়েছে। প্রেম হয়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে, মানুষ হারিয়ে গেছে — এই গল্প নতুন না। এই কষ্ট নতুন না। হাজার বছর আগেও কেউ এভাবে বিছানার ফাঁকা অর্ধেকের দিকে তাকিয়ে থেকেছে। কেউ এভাবে একটা কাপে চা বানিয়েছে।
কিন্তু সেই জানাটা এখন কোনো সান্ত্বনা দেয় না।
কারণ অন্যদের কষ্ট জেনে নিজের কষ্ট কমে না।
কষ্ট সবসময় একক।
কষ্ট সবসময় শুধু তোমার।
হাজার বছরের ইতিহাসে কারো কষ্ট কাউকে বাঁচায়নি।
এক রাতে রিয়াজ ছাদে গিয়েছিল।
সেদিন রাত অনেক ভারী ছিল। ভেতরটা আরো ভারী। শুয়ে থাকতে পারছিল না। উঠে পড়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে ছাদে।
ছাদে দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়েছিল।
অনেক নিচে। রাস্তা। আলো। গাড়ি।
অনেক নিচে।
সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাস ছিল। শুকনো বাতাস।
তারপর মোবাইল বেজেছিল।
মা।
রাত তিনটায় মা ফোন করেছিল।
রিয়াজ ধরেছিল।
মা বলেছিল, "ঘুম হচ্ছে না। তোর কথা মনে পড়ছিল। কেমন আছিস?"
রিয়াজ বলতে পারেনি কিছু।
মা বলেছিল, "কথা বল আমার সাথে।"
রিয়াজ তখনো কিছু বলেনি।
মা বলেছিল, "বাবা।"
শুধু এই একটা শব্দ।
রিয়াজ ছাদ থেকে নেমে এসেছিল।
পরদিন সকালে।
রিয়াজ উঠেছিল। বাথরুমে গিয়েছিল। মুখ ধুয়েছিল।
আয়নায় তাকিয়েছিল।
সেই একই মুখ। চোখের নিচে কালো দাগ। শুকনো ঠোঁট। অগোছালো দাড়ি।
কিন্তু আজ কেন যেন একটু অন্যরকম লাগল।
কী অন্যরকম? জানে না। কিছু বদলায়নি। ব্যথা আছে। শূন্যতা আছে। ভার আছে। কিন্তু আজ — আজ শুধু একটু মনে হলো, এই মুখটা চেনা। এই মানুষটা কে — জানে না পুরোপুরি। কিন্তু সে এখানে আছে।
এখনো আছে।
রিয়াজ রান্নাঘরে গেল।
চা বানাল।
একটা কাপে।
চা নিয়ে জানালার ধারে দাঁড়াল। বাইরে তাকাল। সকালের আলো। রাস্তায় মানুষ। একটা কাক ডাকছে।
আকাশের দিকে তাকাল।
সাদা। পরিষ্কার।
কোথাও দূরে, দিগন্তের কাছে, একটুখানি — সামান্য — মেঘ।
ছোট্ট একটা মেঘ।
বৃষ্টি হবে কিনা জানে না।
হয়তো হবে না।
হয়তো সেই মেঘ উড়ে যাবে। মিলিয়ে যাবে।
কিন্তু মেঘটা আছে।
আজ আছে।
রিয়াজ চায়ে চুমুক দিল।
গরম।
২|
২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৬
স্বপ্নের শঙ্খচিল বলেছেন: এই সত্যটা মিথ্যা হয়ে যাবে।
...........................................................
সত্য কখনো মিথ্যা হয়না
এর উপর সময়ের প্রলেপ পড়ে, সাময়িক চাপা পড়ে
আবার কোন একদিন
পদ্ম ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয় সবার সম্মুখে ।
৩|
২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:২৬
রাজীব নুর বলেছেন: ভালো গল্প।
বাস্তব গল্প।
©somewhere in net ltd.
১|
২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:৪৫
হুমায়রা হারুন বলেছেন: +++++