| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
যুগে যুগে পৃথিবী অনেক সভ্যতা দেখেছে। বাহ্যিক ভাবে দেখলে মনে হতে পারে এগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ রূপে আলাদা, বিচ্ছিন্ন। কিন্তু একটু নিবিড় ভাবে দেখলে দেখা যায়, কিছু ব্যাপারে এদের সবার মধ্যে একটা প্যাটার্ন আছে। অবাক করার মত মিল আছে এদের ভিতর। সময়, ও দূরত্বকে ছাপিয়ে কিছু ব্যাপারে তারা এতটাই সুষম, যে মনে হতে পারে, তারা হয়ত একি ঘটনা দেখেছে আর নিজের পারিপার্শ্বিকতার সাথে মিলিয়ে তার বর্ণনা দিয়েছে।
বাস্তব উদাহরণ দেই একটা, ধরুন ১০ বছর সময় ব্যবধানে জন্ম নিয়েছেন আপনি, আর আপনার ভাই। আপনি বড় হয়েছেন বাংলাদেশে, আর আপনার ভাই অস্ট্রেলিয়ায়। আপনাদের আচার আচরন, চলা-ফেরা,ব্যক্তিত্ব, বিশ্বাস এমনকি নৈতিক মূল্যবোধ, সবই একে অপরের থেকে ভিন্ন হবে। এটাই স্বাভাবিক। এই সুত্রটা কিন্তু আমাদের সভ্যতার ক্ষেত্রেও খাটে। সময়ের পার্থক্য যেখানে হাজার হাজার বছর, আর দূরত্ব পৃথিবীর এ মাথা থেকে ও মাথা, তাদের মৌলিক বিষয়াদি একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন না হওয়াটাই কিন্তু কঠিন একটা ব্যাপার। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, তাদের বিশ্বাস, তাদের আচার আচরন, এমনকি তাদের উৎসব গুলোও অনেক ক্ষেত্রেই একে অপরের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানব সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে আমাদের সবার অল্পবিস্তর ধারনা আছে। তাই হোমো স্যাপিয়েন্সের সৃষ্টির সেরা জীব হয়ে ওঠার গল্পটা একটু ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে নেই। আগুন আবিষ্কারের পরে অনেক দিন গেল, হালকা পাথর ছুড়াছুড়ির স্টেজ পার হয়ে আমরা লাঠির মাথায় পাথর বাধা শিখলাম। অপজেবল গ্রিপ আমাদের আর সকল নিকটাত্মীয়দের তুলনায় অস্ত্র চালনায় পারদর্শী করে তুলল। আমরা আশরাফুল মাখলুকাত গেমের লেভেল ওয়ানে চলে এলাম। তাই নানা প্রয়োজনে জন্ম নিল কমিউনিকেশনের ফার্স্ট স্টেপ, ভাষা। "উ,আ,আউ" ছেড়ে আমরা যখন মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা পেলাম, তখন আমরা উঠে এলাম গেমের দ্বিতীয় লেভেলে। এই লেভেলে প্লেয়ার রা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল। একা নিজের গুহায় বাস করার যুগ শেষ। সোশ্যালাইজিং এর দ্বারপ্রান্তে চলে এলাম আমরা। এখন ৫০ জন নেংটি পড়া জংলীকে একসাথে রাখা, এবং মাত্র ২৫ জন অর্ধভুক্ত নারি দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য আমাদের লিডারদের দরকার পরল নতুন এক পন্থার।
যখন মানুষের ভিতর শৃঙ্খলা আর পারস্পারিক সম্মানবোধ থাকে না, তখন শান্তি বজায় রাখতে পারে কেবলমাত্র ভয়। আর সেই নেসেসারি ইভিল ভয় এর জোগান দিতে জন্ম নিল ধর্ম। আর প্রতি ধর্মের প্রধান ভিত্তি হল উপাসনা। নতুন ধর্মের প্রথম প্রশ্ন, কাকে উপাসনা করবো আমরা?
প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে একটু আবহ তৈরি করে নেই। মুসা (আঃ) এর আগে যত ধর্ম ছিল, তা সবই ছিল লোকাল ধর্ম। অনেকটা লোকাল এক্সচেঞ্জ বক্সের মত। এক এক এলাকায় এক এক এক্সচেঞ্জ। তো, আমাদের সভ্যতা গুলো ছিল লোকাল। তাই তাদের ধর্ম গুলোও আলবৎ লোকাল ছিল। লোকাল হোক আর ইউনিভার্সাল, সব ধর্মেরই কিছু ব্যাসিক প্রোপার্টিস থাকে। এক বা একাধিক উপাস্য, বিশ্বাস, ও নানা আচার অনুষ্ঠান।
আসলে ধর্ম আর বিশ্বাসের সাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে নানা আচার অনুষ্ঠান। সাধারণ ভাবে চিন্তা করে দেখুন, ইন্ডিয়ায় মানুষ যে উৎসব পালন করে, সেন্ট্রাল আমেরিকার উৎসব বা আচার অনুষ্ঠান তার চেয়ে অবশ্যই আলাদা হবে। আফ্রিকান উপকূল আর ইউরোপের মানুষ অবশ্যই একরকম ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে একই রকম অনুষ্ঠান পালন করবে না। অতি সাধারণ একটা সমাধান, তাই না?
আসলেই কি এত সাধারণ? যা আমরা ভাবি, তার পুরোটাই কি সত্য? চলুন একটু খুতিয়ে দেখি।
আজকের আলোচনার রেফারেন্স পয়েন্ট আমাদের খুব চেনা একটা অনুষ্ঠান। শ্মশান দীপাবলি। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কালীপুজোর দিন তাদের মৃত আত্মীয়দের স্মরণ করে। তাদের সমাধিতে দীপ প্রজ্বলন করে, আর অনেক খাবার দাবার নিয়ে যায়। তাদের বিশ্বাস, এই দিনে তাদের প্রিয়জনেরা মর্তে ফিরে আসে। যখন তারা দেখে তাদের পরিবার তাদের মনে রেখেছে, তারা খুশি মনে আবার স্বর্গলোকে ফিরে যায়। অপ্রসাঙ্গিক একটা তথ্য দিয়ে রাখি, উপমহাদেশ তথা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্মশান দীপাবলি পালিত হয় বরিশাল এর “মড়ক খোলা শ্মশানে”। রেফারেন্স সেট হয়ে গেল, এবার চলুন কম্পেয়ার করে দেখি।
প্রথমেই যাবো উত্তর আমেরিকা মহাদেশে। রুপকথার দেশ মেক্সিকো। মেক্সিকোতে স্প্যানিশ ভাষাভাষী জনতা একটা উৎসব পালন করে নভেম্বরের এক তারিখ। নাম, “ডিয়া ডে মুইয়েরটস” (Dia de Muertos)। ইংলিশ অনুবাদ The Day of the Dead। তারা এইদিনে নিজেদের পরলোকগত স্বজনদের স্মরণে তাদের কবরে মোমবাতি জ্বালায়। তাদের সুখস্মৃতি নিয়ে আলোচনা করে। কারণ এটা না করলে তাদের প্রিয়জনেরা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে পাতালের নরকে। আর তাদের মনে করলে তারা স্বর্গে থাকবে, চির অম্লান বদনে। মিলটা অভাবনীয় না?
অ্যাজটেক সভ্যতায় ও কিন্তু এমন একটা দিন ছিল। অনেকটা প্রাচীন আর সভ্যতার প্রাইমারী স্টেজে থাকার কারণেই হয়ত তারা দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মৃতদের স্মরণ করতো না, তারা মৃত্যু দিবস উদযাপন করত ধুম ধাম করে। আর হ্যা, তারাও শিখা প্রজ্বলনে বিশ্বাসী ছিলেন। এটা আমাদের সেকেন্ড রেফারেন্স পয়েন্ট।
All souls day, পালনকাল, ২ নভেম্বার। উৎসবটা অনেকগুলো সভ্যতাকে একই সুতায় বাধবে, তাই একটু বড় করে লিখি। ক্যাথোলিক ধর্মের এত প্রসার পাওয়ার পিছনে অন্যতম একটা কারণ হল এর ফ্লেক্সিবিলিটি। নতুন কোন সমস্যা এলেই এর উচ্চপর্যায়ের ধর্মযাজকেরা মিলে একটা মিটিং করে নতুন ধর্মীয় নীতি বের করে নিতে পারে। এই প্রথার শুরু তাদের জন্মলগ্ন থেকেই। রোমান দেব দেবীরা তখন তাদের ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে। তারা তখন লোকাল গড, তাদের ক্ষমতা তাদের এলাকায় সীমাবদ্ধ। মানব সভ্যতা ততদিনে ইউনিভার্সাল গডের কনসেপ্ট পেয়ে গেছে। এলাকায় তাদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ না, তারা সার্বজনীন। রোমান সম্রাটরা বুঝতে পারলেন, লোকাল গড দিয়ে দোকান বেশিদিন চলবে না। তাই তারা যীশুখ্রিষ্টের প্রচারিত ধর্মের সাথে নিজেদের প্যাগান ধ্যান ধারণার খিচুড়ি পাকিয়ে নতুন দোকান দিয়ে বসলেন। তাই ক্যাথোলিক বিশ্বাসে মিশে আছে প্রাচীন গ্রীক, রোমান আর কেল্টিক সভ্যতার অনেক বিশ্বাস। তাই তাদের দিবস গুলোও পাচমেশালি। কেল্টিক সভ্যতায় একটা ভয়ঙ্কর রাত ছিল। যে রাতে মৃত, অশুভ শক্তি আর অপদেবতারা তাদের ও তাদের ফসলের ক্ষতি করতে ঘুরে বেড়াত। নিজেদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে তারা মুখোশ পড়ত (আজকের হ্যালোইন), আর ফসল বাঁচাতে যজ্ঞ করত। মৃত শক্তির ভিতর তাদের পূর্বপুরুষেরাও ছিল। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের খুশি করারও ব্যবস্থা করতেন। ফাস্ট আর সেকেন্ড রেফারেন্স, দুটোর সাথেই মিলে যাচ্ছে, তাই না?
দিন গেল, কালের বিবর্তনে মানুষ আরও সভ্য হল। তারা তাদের পূর্বপুরুষদের সম্মান দিতে শিখেছে এতদিনে। নিজের পূর্বপুরুষদের ভয়ে মুখোশ পড়াটা তাদের আত্মসম্মানে বাঁধে। তাই তৈরি হল নতুন এক দিনের। যে দিন পূর্বপুরুষের কবর দর্শন করতে যাবে তার আত্মীয়েরা, মৃতদের জন্য প্রার্থনা করবে। আসলে একই দিনের ২টি ট্র্যাডিশন ভেঙে হ্যালোইন আর All souls day সৃষ্টি হল। আরও একটি দিন পালন হয় মাঝে, সেইন্টদের জন্য। সে ব্যাপারে পরে একদিন লিখব। হ্যালোইনের মুখোশ পরাটা নিছক ছেলে খেলা বনে গেল আর তার ২ দিন পরে স্থান পেল পূর্বপুরুষেরা। যাই হোক, জনপ্রিয় বিশ্বাস মতে তাদের নিকটজনদের বিদেহী আত্মা মর্তে নেমে আসে এই দিনে। সামান্য কিছু পার্থক্য সহ এই অনুষ্ঠান পালন করে বাইজেনটাইন, ইহুদী, রোমান ক্যাথোলিক, অ্যাংলিকান কমিউনিয়ন ও প্রটেসটানট চার্চের অনুসারীরা। হ্যাঁ, এতগুলো ভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী লোক। মিলটা নিজেই করে নিন।
এবার এশিয়ায় ফিরে আসি। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা হল চীনা সভ্যতা। তাদের একটা উৎসবের নাম, কুইংমিং (Qingming Festival) এই উৎসবের দিনে চাইনিজ রা তাদের মৃত আত্মীয়দের কবরে যায় প্রার্থনা করতে। কারণ এই দিনে স্বর্গ মর্তের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে। বিভিন্ন নামে এই উৎসবের হুবহু কিছু উৎসব পালন হয় জাপান ও কোরিয়াতেও।
আবার সেই পুরনো প্রশ্ন। কিভাবে এই সভ্যতা আর ধর্ম গুলো একই বিশ্বাস নিয়ে, প্রায় একই সময়ে, একই রকম অনুষ্ঠানের সৃষ্টি করল? তারা সবাই কি একই ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত, না এসব কেবলই Coincidence? এত হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও, একে অপরের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ না থাকা সত্বেও, কিভাবে তারা একই সময়ে একই ধরণের অনুষ্ঠান পালন করতো, তা আসলেই রহস্যজনক। সেই রহস্যের কিনারা করতে যুগে যুগে মানুষ অনেক থিওরি দিয়েছে। থিওরিগুলো আরও প্যাঁচানো ও চাঞ্চল্যকর। তবে থিওরি গুলো ফলে গেলে আমাদের বিশ্ব ইতিহাস আবার নতুন করে লেখার দরকার পরতে পারে।
©somewhere in net ltd.