| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সময় ১৭১৭ সাল। ফ্রান্সের মিসিসিপি কম্পানি স্টক মার্কেটে দাপটের সাথে রাজ করছে। আমেরিকার লোয়ার মিসিসিপি ভ্যালিকে ডেভলপ করার ঐশ্বরিক দায়িত্ব তাদের কাধে। আমাদের দেশেও এমন মহান দায়িত্ব নিয়ে অনেকে জলাভূমি আর নালা বিক্রি করে কিন্তু। এক নালা ২/৩ বারও বিক্রি করে।
এখন আমরা উক্ত কম্পানি খানাকে না চিনলেও অষ্টাদশ শতাব্দীতে সবচেয় কম সময়ে সবচেয়ে বেশি শেয়ার হোল্ডার জোগাড় করার রেকর্ড কিন্তু তাদেরই। তবে এই কম্পানির সাফল্যের প্রধান কারন ছিল তাদের মার্কেটিং পলিসি। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে বুনো আগুনের মত কিছু খবর ছড়িয়ে দেয়া হলো। আমেরিকার মিসিসিপির মাটি আসলে মাটি না, সোনা। উর্বরতা আর খনিজ সম্পদের দিক থেকে কোন অংশেই প্র্যাচ্যের চেয়ে কম না। একবার বসবাসের যোগ্য করতে পারলে মালিক পক্ষকে মোঘল হওয়া থেকে আটকায় কে!!!!
এ সবই কিন্তু আসলে আমাদের দেশের ডেসটিনি আর যুবকের দেয়া গাড়ি আর হেলিকপ্টারের সমতূল্য, মোফা!!! মার্ক টোয়েনের বই হাতে নেয়া লোকটাও জানে, ঐ সময়ে মিসিসিপিতে জলাভূমি আর কুমির ছাড়া ন্যাচারাল রিসোর্স ছিল হয়ত আদিম কিছু গাছপালা।
যাই হোক, গুজবের একটা মজার দিক হলো, এগুলো তারাতারি ছড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে সাইজেও বড় হয়। তাই মিসিসিপির অগাধ সম্পদের গুজব ছড়াতে লাগলো ঝড়ের বেগে এবং তার কাল্পনিক সেই সম্পদ পরিমানে বাড়তে থাকলো লাগামহীন ভাবে। মানুষের মুখে মুখে মিসিসিপি বন্য জলাভূমি থেকে স্বপ্নের স্বর্ণ সোপান হয়ে গেল। একটা উদাহরণ দেই, আগস্টে যেই শেয়ারের দাম ছিল ২৭৫০ লিভ (Livres ফ্রেন্চ কারেন্সি) ডিসেম্বরে সেই শেয়ারের দাম ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেল। ৩ গুনেরও বেশি। হুজুগে বাঙালী জাতি সেরা হলেও ফ্রেন্চরাও কিন্তু কম যায় না। সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে, চড়া সুদে ধার নিয়ে এমনকি বাড়ির আসবাব পত্র আর খানা খাদ্য বিক্রি করেও তারা শেয়ার কেনা শুরু করলেন। রাস্তার পাশে শুয়ে তারা মিসিসিপির সোনার খনির স্বপ্নে বিভোর। ধনী হওয়া কি সহজ? একটু ত্যাগ তো করতেই হবে। তাই না?
সমস্যা শুরু হলো ১৭২০ সালের শুরুর দিকে। বাংলা মুভির চিরচেনা ডায়লগ আবার প্রমাণিত হল, সত্যকে চেপে রাখা গেল না। মিসিসিপির আসল সম্পদ আর খনি পাব্লিকের সামনে প্রকট থেকে প্রকটতর হতে শুরু করলো। উর্বর জমি আর খনিজ সম্পদ যে ফাকি, সে খবর দ্রুত ছড়াতে লাগলো মার্কেটে। শিওর লসের মুখে পরে শেয়ার হোল্ডারদের মাথায় হাত। লেজ কাটা শিয়ালের লেজ তো আর ফিরে আসবে না, অন্যদের লেজট কাটা গেলে হয়। সবাই নিজেদের শেয়ার বিক্রি করা শুরু করলো। মার্কেট Available শেয়ার (বিক্রি হয়নি এমন শেয়ার) এর পরিমান যত বারে, শেয়ারের দাম তত কমে। অন্যদিকে নিশ্চিত ক্ষতির মুখে শেয়ার কেউ কিনতেও চায় না। এমত অবস্থায় মিসিসিপি কম্পানি নিজেরাই তাদের শেয়ার কিনতে শুরু করলো। এই জিনিস আজকের বাজারে সম্ভব না। বর্তমানে এমন সঙ্কটে পড়লে কম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করবে , না হয় তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালাবে। তবে মিসিসিপি কম্পানি পালায় নি, আবার মার্কেটে চাঙ্গা হতে চেয়েছে। এই উচ্চাভিলাষী চিন্তার প্রধান সাপোর্ট ছিল মিসিসিপি কোং এর ডিরেক্টরের রাজনৈতিক ক্ষমতা, পরের প্যারায় বিস্তারিত ভাবে লেখা হয়েছে। নিজেদের শেয়ার বেশি দামে কিনে কিনে কম্পানির লালবাতি জ্বলে গেল কিছুদিনের ভিতরেই। অথচ এখনো মার্কেটে শেয়ার পরে আছে অনেক।
এবার মাঠে এল নতুন খেলোয়ার। মিসিসিপি কম্পানির ডিরেক্টর জন ল। তিনি একাধারে ছিলেন মিসিসিপি কোং এর ডিরেক্টর, সেন্ট্রাল ফ্রেন্চ ব্যাংকের গভর্নর, ফ্রান্সের কার্যত অর্থমন্ত্রী (পদটার নাম ভিন্ন ছিল, কিন্তু কাজ অর্থমন্ত্রীর) এবং তৎকালীন রাজা পন্চদশ লুই এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ট্যালেন্টেড লোক বটে। জন সাহেবের নিজের কম্পনি যখন কাঙাল, তখন জন সাহেব শুরু করলেন নতুন পাগলামি। ফ্রান্সের অর্থনীতিকেও সে এই বাবলের ভিতর ঢুকিয়ে ফেললেন। ইচ্ছেমত টাকা ছাপানো শুরু হল। সরকারের তরফ থেকে সেই টাকায় শেয়ার কেনা শুরু করলেন। মূদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুয়ে গেল। দেশ ভেসে গেল দেনায়। শেষের দিকে অনেক অযাচিত শর্ত আর উচ্চহারের সুদেও ধার নিতে হলো ফ্রেন্চ প্রশাসনের। শেষরক্ষা তাও হলো না। অজস্র ছোট ব্যবসায়ী পথে বসে গেলেন। সুইসাইড ছিনতাই বা ছিঁচকে চুরীর এর মত কমন ঘটনা হয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হল আর একটা সত্বার, রাষ্ট্র ফ্রান্সের।
সমস্যা শেষ হবার পরে ফ্রেন্চ অর্থভান্ডারে সম্পদ বলতে আছে কিছু চড়া দামে কেনা মূল্যহীন শেয়ার। চড়া সুদে ধার নিয়ে নিয়ে দেশ কাঙালের পর্যায়ে। প্রতিবেশি রাষ্ট্ররাও সুযোগ নিচ্ছে দূর্বলতার। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালি রাষ্ট্র হয়েও ব্রিটেন, পর্তুগাল এমনকি ছোট ভুখন্ডের অধিবাসী বনিক ড্যানিশদের সাথেও তাল মিলাতে পারছে না তারা। অনান্য ইউরোপীয় দেশ যখন রাষ্ট্রজয় করছে পৃথিবীর আনাচে কানাচে, ফ্রান্স তখন প্রায় কিছুই করতে পারছে না। করবে কিভাবে, টাকা কই?? ফ্রেন্চ রাজতন্ত্রের পতনও কিন্তু এখানেই শুরু। ফ্রেন্চ রেভুলেশন এর আগুন লাগে কিন্তু মিসিসিপিতেই। কয়েক বছরের ব্যবধানে monarchy থেকে dictatorship এ শিফট হয়ে যায় ফ্রেন্চ রাজনীতি। এক মিসিসিপি বাবল, ফ্রেন্চ অর্থনীতিকে বহুবছর পঙ্গু করে রাখে!
মিসিসিপি বাবল পুঁজিবাদী বিশ্বের এমন এক ঘটনা, যা বার বার ঘটেছে। নানা দেশে, নানা রূপে। আমাদের দেশেতো কিছুদিন আগেও ঘটলো। তাও জন ল'রা বার বার ফিরে আসে, বার বার সফল হয়। কারণ আমরা সবাই ধনী হতে চাই। সবাই ধনী হতে একটু কষ্ট করতে রাজি।
Main Theme Courtesy: Sapiens- A Brief History of Humankind.
©somewhere in net ltd.