| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আমি এখন হাসপাতালে । বেডে শুয়ে আছি । বুকের উপর ধবধবে সাদা চাদর । মাথার নিচে শক্ত বালিস।
বালিস এতো শক্ত কেনো ? বালিস হবে নরম, তুলতুলে । শুলেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবো । হচ্ছে না । বালিস শক্ত হওয়ায় বারবারই আমি ভেসে উঠছি । ঘুমানো দরকার । ঘুম আনার ছোট্ট একটা ট্রিকস আছে । ভেরা গোনা । হুমায়ূণ স্যারের বইতে পেয়েছি । তবে ভেরা গুনলে আমার ঘুম আসে না । গরু গুনি । সাদা গরু । শিংবিহীন নিরীহ গরু । ঘুমের আগে নিরীহ থাকে । স্বপ্নে এরা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে । প্রায় রাতেই শিংওয়ালা বলদের গুতো খেয়ে জেগে উঠি । এখনও সেটাই চাচ্ছি । শিংওয়ালা একটা বলদ এসে কেবিনে ঢুকুবে । গুতো দেবে । জেগে দেখবো আমি সুস্থ্য । বাসায় বেডের উপর শোয়া । পা দুটোও কাটা না । আগের জাগাতেই আছে ।
একটা দিন আগেও আমি ভার্সিটিতে গেলাম । সে দিনেরই কথা । তিতলীর ঠিক পাশের সিটে বসা । ম্যাচিং করে ব্লাক শার্ট আর তিতলীর ছিলো ব্লাক শাড়ি । ক্লাসে স্যার কি পড়িয়েছেন বলতে পারছি না । তবে তিতলী কবার হেসেছে বলে দিতে পারি । পুরো ক্লাসই হা হয়ে ছিলাম । এতো মায়া কোনো মানবকন্যার থাকতে পারে ? এ উইকেই প্রপোজ করবো ভেবেছি । হলো না । পঙ্গুত্বের সাথে তিতলীকে কেনো জড়াবো ! সেও জড়াবে না । বুদ্ধিমতী মেয়ে । পঙ্গু শুনেই কেটে পরেছে । সবার সাথে একবার দেখতে এসেছে । করুণা ভরা চোখে করুণা ঢেলে গেছে । আর না । এখন সে শুধুই বন্ধু । সেটাই স্বাভাবিক । সবার কাছে ছোটো হবে । ঝগড়ার মাঝে মৌটুসিও বলবে, 'তোর বিএফ তো পঙ্গু, পা নেই' । আমার তিতলীকে কেনো কথা শুনতে হবে ! অসম্ভব ।
রিতিও ফোন দিলো । ঠিক এক বছর দু মাস পর । অনেক্ষণ কথা হলো । বিএফ এর সাথে নাকি ব্রেকআপ হয়েছে । আগেও একবার শুনেছিলাম । পরে শুনি, না । ওটা অভিমান ছিলো । এবারও হয়তো অভিমানই । আমার সাথেও হতো । বড়ো বড়ো অভিমান । অভিমান না থাকলে রিলেশনের মজাটাই মাটি । শেষবার যখন ব্রেকআপ করলো, তখনও জাস্ট অভিমান ভেবেই রিলাক্সে ছিলাম । হঠাৎ তানিয়া একদিন ফোন দিলো, "ভাইয়া, রিতিকে দেখলাম আরেকটা ছেলের সাথে । ব্যাপার কি বলোতো ?" বিশ্বাস হচ্ছিলো না । পরে দেখলাম ঘটনা সত্য । ধানমন্ডি লেকে দেখা হয়ে যায় । পরিচয় করিয়ে দেয় । দেখলেই মনে হয় ছেলে ভালো । যেমন দেখতে, তেমন কোয়ালিটি । আমার থেকে ওই ছেলের সাথেই ওকে বেশি মানিয়েছে । ভেবে দেখেছি ওরও কোনো দোষ নেই । ওমন ছেলে পেয়ে যে হাত ছাড়া করবে, সে একটা আস্ত গাধী । আমার গার্লফ্রেইন্ড কেনো গাধী হতে যাবে !
সেদিন তানিয়াকে বলেছিলাম, ভূল দেখেছো । পরে নিজেকেও বলেছি, ভূল দেখেছো ।
তানিয়া এখন ইউকে তে থাকে । হাসবেন্ড ওখানেই জব করে । অনেকদিনে কথা হয় না । একবার ফোন দিলে কেমন হয় ? পা হাড়িয়েছি জানে না বোধহয় । চমকে দেয়া যাবে ।
রিং বেজেই যাচ্ছে । কেউ ধরছে না । তৃতীয় বারে এক পুরুষ কন্ঠ ধরলো । তার কথার কোনো আগামাথা পাওয়া গেলো না । রেখে দিলাম ।
দুপুরে ছোটো ফুপি এলো । কিছুই বলে নি । স্থির চোখে বসে ছিলো । চোখ বেয়ে টপটপ পানি ঝরছিলো ।
দারোয়ান কাকা এলো । এই লোকও কাঁদছে । এতো কান্নার ভীরে ড্রাইভার সেলিম কিছুটা অপ্রস্তুত । সে কান্নার চেষ্টা করছে । পারছে না । একে দেখে আমার হাসি পেয়ে গেলো । আমারও একবার হয়েছিলো । তখন ক্লাস এইটে পড়ি । কেউ কেউ ভাবে পিচ্চি ছেলে, কেউ ভাবে বুড়ো । দুঃসম্পর্কের এক দাদা মারা গেলেন । দেখতে গেলাম । গিয়ে দেখি সবাই কাঁদছে । সমবয়সী কাজিনরাও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে । লজ্জায় পরে গেলাম । নিজের মধ্যে বিষাদ আনার চেষ্টা করছি । আসছে না । স্মূতিগুলো মনে আনার চেষ্টা করছি । আসছেও । তবে সে জন্য কান্না করার লজিক আসছে না । কি আর করার ! চোখ দুটো ছোটো করে সিলিং এ তাকিয়ে রইলাম । পাঁচ মিনিটেই ফল , এক ফোটা জল ।
আমার রক্তের গ্রুপ এবি পজেটিভ । অনেক রক্ত লেগেছে । ডোনারদের মধ্যে রিমনও ছিলো । ক্লোজ ফ্রেইন্ড না । শুধু ফ্রেইন্ড । শুধু ফ্রেইন্ড না বলে এন্টি ফ্রেইন্ডও বলা যায় । এ ছেলে সব সময় আমার বিপক্ষে থাকে । সব কাজে । এক ধরনের স্নায়ু যুদ্ধ চালায় । আমি পঙ্গু হয়ে গেছি । মনে মনে ওর খুশি হবার কথা । কিন্তু ওকে দেখে মনে হলো কষ্ট পেয়েছে ; করুণা থেকে না, ভালোবাসা থেকেই । চোখ দেখলে বোঝা যায় ।
বরুনা ভাবিও এসেছিলেন । তার পিচ্চি মেয়েটাও ছিলো । রিংকু । দেখতে হুবহু ইংরেজের বাচ্চা । দেখলেই কোলে উঠবে । কোলে উঠে ঘুড়তে যাবে । চাচ্চু বলতে পারে না । ছাছু বলে । আজও কোলে উঠলো । উঠেই গা ছোড়াছুড়ি । থাকবে না । মায়ের কোলে যাবে । পিচ্চিটাও বুঝেছে কোথাও গন্ডগোল আছে । প্রথম বারের মতো নিজেকে অসহায় লাগলো । প্রায় কান্না চলে এসেছিলো ।
ফুল ভলিউমে মিউজিক ছেড়ে ডান্স করতে ইচ্ছে হচ্ছে । উপায় নেই । হাসপাতালে মিউজিকের সিস্টেম নেই । আর খোড়াদের জন্যেতো ডান্স করারও সিস্টেম নেই । হাতের উপর দাড়িয়ে কি ডান্স করা যায় ! যায়না বোধ হয় ।
সিগারেট খাওয়া দরকার । কার কাছে বলবো ? হসপিটালে ধূমপান নিষেধ । এর পরও বাবাকে বললে একটা ব্যাবস্থা করা যেতো । তিনিও যে কই আছেন ! পঙ্গু ছেলের আশেপাশে থাকতে হয় । ভূলে গেছেন ।
পরশুই এখান থেকে মুক্তি পাবো । বাসায় চলে যাবো । মুক্তি, তবে ঠিক মুক্তিও না । পাছার নিচে একটা হুইল চেয়ার থাকবে । এরা আমার পা দুটো নিয়ে নিয়েছে । বদলে একটা হুইল চেয়ার ধরিয়ে দেবে ।
আসলেই আমার পা নেই ! কেমন যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না । স্কুল ফুটবল টিমে ফরোআর্ডে খেলতাম । একবার ডিফেল্ডারের লাথিতে পা ভেঙে গেছিলো । তখনও তেমন কষ্ট লাগে নি । ভাঙে ভাঙুক । আছে তো । আবার জোড়াও লেগে গেলো । মা ছোটোবেলায় নখ কেটে দিতো । চামড়ায় লেগে একবার রক্ত বেড়োলো । আমার সে কি কান্না ! কান্না দেখে মাও কেঁদেছিলো । আজ আমি কাঁদছি না । কাঁদার মাঝে কোনো লজিক নেই । মাও কাঁদছে না । বোবা হয়ে গেছে ।
পা দুটো খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে । ডক্টরকেও বলেছিলাম । কিছু বলে নি । একটা বার শুধু দেখতাম । হাত ছোয়াতাম । ও দুটো তো আমারই পা ।
চোখ বন্ধ করে ফেলেছি । ঘুমিয়ে পরবো । স্বপ্ন দেখবো । স্বপ্নেই মজা । সেখানে আমি হাটতে পারি । দৌড়োতে পারি । ফুটবল মাঠে ফরোআর্ডে দাড়াই । কোনো হুইলচেয়ার লাগে না ।
©somewhere in net ltd.
১|
১৪ ই জুলাই, ২০১৬ দুপুর ২:৫৬
কাল্পনিক_ভালোবাসা বলেছেন: খারাপ লাগে নি। কিছু কিছু টাইপো আছে। ঠিক করে নিয়েন। তাহলে পড়তে ভালো লাগব।