| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বাংলাদেশ আজ এক গভীর প্রজন্মগত রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ক্ষমতার শুধু পালাবদলের আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং সময়ের বিচারে একটি প্রজন্মের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও বটে । এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে যেখানে কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। সংখ্যায়, চিন্তায় ও প্রত্যাশায় বাংলাদেশের তরুণরা আজ কেবল প্রভাবশালী নয়, বরং এক মননশীল রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে। তারা আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করে না যুক্তি, ন্যায়বোধ ও ভবিষ্যৎ চিন্তাই তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি। এই নতুন রাজনৈতিক চেতনার জন্ম হয়েছে ত্যাগ ও আত্মবলিদানের মধ্য দিয়ে, যার সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক প্রতীক শহীদ শরীফ ওসমান হাদীস। তার রাজনৈতিক চিন্তা ধ্যান ধারণা ও প্রজ্ঞা আমাদের তরুনদের দায়িত্ববোধকে আজ আরো গভীর ও দায়িত্বশীল করেছে। শহীদ হাদী প্রমাণ করেছেন তরুণরা কেবল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে না সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিতেও প্রস্তুত। শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর রক্ত তরুণদের রাজনীতিকে আবেগের গণ্ডি ছাড়িয়ে নৈতিকতা, সাহস ও সচেতনতার পথে নিয়ে গেছে যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনিবার্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে চার কোটি ভোটার যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে করছে। মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এই তরুণ জনগোষ্ঠী। তারা চাইলে দেশের যে কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে দিয়ে নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে সক্ষম। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য যেমন একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক অনিবার্য বাস্তবতা। এই তরুণদের একটি বড় অংশ আজো পর্যন্ত কখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আর কোনো উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যারা আজ ত্রিশ বা তার কিছু বেশি বয়সী, তারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হলেও গণতন্ত্রের সেই মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থেকেছেন দীর্ঘদিন। তারা দেখেছে নির্বাচন কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, কীভাবে ফলাফল আগেই নির্ধারিত থাকে এবং কীভাবে ভোট নামক সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে শুধুই সংবিধানের দোহায় দিয়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনও ছিল ব্যতিক্রমহীন। সেই নির্বাচন ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্বাচন, যার পরিণতিতে বাংলাদেশ দীর্ঘ পনেরো বছর একদলীয় কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট শাসনের অধীনে চলে যায়। এই সময়কালে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমান্বয়ে দলীয়করণ ও নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়েছে এবং ভিন্নমত দমনকে শাসনের নিয়মিত কৌশলে পরিণত করা হয়েছিল দেশের মানবাধিকার পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছিল । এই বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছে আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন একটি রাষ্ট্র দেখেছে যেখানে উন্নয়নের গল্প প্রচার করা হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল সবার ভাগ্যে জুটে নাই । উন্নয়নের নামে আমাদের তরণ প্রজন্ম দেখেছেন শুধুই মহাদূর্নীতি। তারা দেখেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহার করে আমাদের সকল মৌলিক অধিকারকে কিভাবে অবরুদ্ধ করা হয়েছে পরিবার ও দলীয়তন্ত্রের কাছে। তারা দেখেছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, কিন্তু একই সঙ্গে দেখেছে বেকারত্ব, আয়ের বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতা। ফলে তাদের কাছে এখন রাজনীতি মানে আর শুধু স্লোগান কিংবা আবেগ নয় তাদের কাছে রাজনীতি মানে জীবনের বাস্তব প্রশ্ন চাকরি, আয়, নিরাপত্তা, সম্মান, বাকস্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা কখনোই গৌণ ছিল না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চব্বিশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী গনঅভ্যুত্থান প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের পেছনে ছিল তরুণদের অগ্রণী ভূমিকা। তবে বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছে। তারা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে বড় হয়েছে। বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহ তাদের চিন্তাজগৎকে বিস্তৃত করেছে, প্রশ্ন করার সাহস দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার মানসিকতা তৈরি করেছে। এই তরুণরা আর অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাস করে না। তারা জানতে চায় রাষ্ট্র তাদের জন্য কী করছে, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পগুলো তাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলছে এবং ক্ষমতাসীনরা কতটা জবাবদিহির মধ্যে রয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক ভণ্ডামি এখন আর সহজে আড়াল করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে একটি বক্তব্য, একটি সিদ্ধান্ত কিংবা একটি ভিডিও মুহূর্তেই লাখো তরুণের কাছে পৌঁছে যায় এবং তা নিয়ে শুরু হয় বিশ্লেষণ ও সমালোচনা। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, বিরোধী মত দমন, গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ এসেছে তরুণদের কাছ থেকেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তরুণদের সাহস, উদ্যম ও আত্মত্যাগ। শেখ হাসিনার পনেরো বছরের স্বৈরশাসনের অবসান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের ফল। রাজপথে নেমে আসা তরুণরা প্রমাণ করেছে, তারা কেবল নীরব দর্শক নয় তারা ইতিহাসের সক্রিয় নির্মাতা। তাদের আত্মত্যাগের ফলেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসররা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা তরুণ সমাজকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে এবং তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে সচেতন করেছে।
আজ সেই তরুণরাই আবার একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের মুখোমুখি। পার্থক্য শুধু এই যে, এবার তাদের লড়াই রাজপথে নয়, ভোটকেন্দ্রে। ব্যালটই হবে তাদের প্রধান অস্ত্র। এই ভোটের মাধ্যমেই তারা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে গণতন্ত্রের পথে না আবার কোনো নতুন কর্তৃত্ববাদের ফাঁদে পড়বে। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর কোনো স্বৈরতন্ত্র, দমন-পীড়ন কিংবা ফাঁপা উন্নয়নে ও কল্পকাহিনী কিংবা গল্পে বিশ্বাস করতে চায় না। তবে এই বাস্তবতায় একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তরুণদের শক্তি যত বড়ই হোক, ঐক্য ছাড়া সেই শক্তি কার্যকর হবে না। সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার যদি সচেতনভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তাহলে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই তাদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু যদি তারা বিভক্ত থাকে, হতাশায় ভোটবিমুখ হয় কিংবা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার শিকার হয়, তবে সেই সুযোগ আবারও সুবিধাবাদীরা কাজে লাগাবে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব অপরিসীম। তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে কেবল নির্বাচনী ইশতেহারে কিছু জনপ্রিয় শব্দ জুড়ে দিলেই হবে না। প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছ নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ সংস্কৃতি, শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি এই বিষয়গুলোতে কার্যকর রোডম্যাপ ছাড়া তরুণদের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে প্রবীণ ভোটারদের ভূমিকাও উপেক্ষা করা যাবে না। প্রায় দুই কোটি প্রবীণ ভোটার নিয়মিত ভোট দেন এবং তারা সাধারণত স্থিতিশীলতা ও অভিজ্ঞতার দিকে নজর রাখেন। নির্বাচনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি তরুণদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রবীণদের আস্থার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে।
অঞ্চলভিত্তিক ভোটার বিন্যাসও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে তরুণ ভোটারদের আধিক্য জাতীয় রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আবার ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলেও তরুণদের ভোট হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফল নির্ধারণে নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। ফলে তরুণদের মনোভাব বোঝা মানেই গোটা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বোঝা। সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তরুণদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা শুধু ভোটার নয় তারা নতুন বাংলাদেশের রূপকার। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠবে আগামীর রাষ্ট্রকাঠামো। ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে চাইলেই তারা ইতিহাস বদলাতে পারে। এখন ভোটের মাধ্যমে সেই পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সময়। এই নির্বাচন তরুণদের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক দায়িত্ব নয় এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সচেতন সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ এবং ঐক্যবদ্ধ অবস্থানই পারে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে। তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশ একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র।
২|
১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:০১
মায়াস্পর্শ বলেছেন: প্রবীণরা জায়গা ছাড়তে চায় না।
©somewhere in net ltd.
১|
১২ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:০৭
রাজীব নুর বলেছেন: তরুনরা তো বেশির জঙ্গী হয়ে গেছে।