মার্চ মাসের শেষার্ধ। শীত বিদায় নিয়েছে আরো আগেই। প্রকৃতিতে বৈশাখ মাঝে মাঝে জোরালো বাতাস বইয়ে জানান দিচ্ছে সে আসছে। ঠিক এমনি সময় অফিস সিদ্ধান্ত নিল কক্সবাজার ভ্রমণের। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত মার্চের শুরুর দিকটায় নেয়া হলেও হোটেল বুকিং ও সেখানে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভ্রমণে আগ্রহীদের তালিকা তৈরী, যাতায়াতের জন্য গাড়ি রিজার্ভ করা, যে কয়দিন সেখানে অবস্থান করবো সে কয়দিনের অফিসের কাজগুলো গুছিয়ে নেয়া প্রভৃতিতে কালক্ষেপণের কারণে যাত্রার সময় মার্চের শেষটায় নির্ধারণ করা হলো। যথারীতি আমরা গাড়িতে উঠলাম। যখন আমরা রওনা হলাম তখন রাত প্রায় এগারোটা। আয়জনটা বেশ বড়। তাই মনের মধ্যে আনন্দ-ঘন্টাটিও বাজছিল বেশ করে।
কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করলো সামনের হেড লাইট জ্বালিয়ে, রাতের আঁধার কেটে কেটে। চালক সাবধানতার সাথে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। ভোর ছ’টায় আমরা চট্রগ্রাম পোঁছলাম। মাঝখানে কুমিল্লায় একটা যাত্রাবিরতি হলো। সেখান থেকে সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিলাম।
ভাবতেই ভালো লাগছিল আমরা সেই সমুদ্র সৈকতে যাচ্ছি যেটি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, যার আয়তন প্রায় ১৫০ কিঃ মিঃ। বঙ্গোপসাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ হাজার হাজার মেইল পথ পাড়ি দিয়ে এসে যে সৈকতে বিলীন হয়ে যায় সে সমুদ্র সৈকতে পা রাখতে যাচ্ছি আমরা। আমাদের গায়ে পরশ বুলিয়ে দিবে, চুল এলোমেলো করে দিয়ে হৃদয়ে বইয়ে দেবে আনন্দের ঢেউ। আমরা সেই সৈকতে যাচ্ছি যেটির নামকরণ হয়েছে ১৭৯৮ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী কর্তৃক ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের (Hiram Cox) নামানুসারে।
ঢাকা থেকে প্রায় ৪০৮ কিঃ মিঃ পথের ২৬৪ কিঃ মিঃ অতিক্রম করে প্রথম ধাপে আমরা চট্রগ্রাম শহরে পৌঁছলাম। সেখান থেকে যখন আরো ১৪৪ কিঃ মিঃ পথ পাড়ি দিতে শুরু করলাম, তখন আমাদের সামনে দিবসের জন্ম পরবর্তী শৈশব পেরুনো কিশোর সূর্যালোক। চোখে এসে ধরা দিতে লাগলো সবুজে ঢাকা পাহাড় আর টিলা। পাহাড়ী পথ বেয়ে গাড়ি যখন চলছিল, তখন মনে হলো সবুজে ঘেরা এ এক অন্য পৃথিবী। তবে পুরো পথই যে পাহাড়ী তা নয়, সমতলও রয়েছে। জানার প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমরা পা রাখলাম কক্সবাজারের মাটিতে। গাড়ি থেকে নেমে উঠলাম হোটেলের রুমে। বেশ সাজানো-গুছানো রুম। রুমের বারান্দায় দাঁড়ানোর পর যখন সমুদ্রের ঢেউ দৃষ্টিতে এসে ধরা দিল, তখন আর বিলম্ব সইছিল না সমুদ্রের পানিকে স্পর্শ করার। তবুও কিছুটা সময় নিলাম দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করার জন্য। আমাদের হোটেল থেকে সমুদ্রের পানির স্পর্শ পেতে পায়ে হেটে মাত্র ৮-১০ মিনিটের পথ যেতে হয়। ক্লান্তি দূর করে হালকা খাবার খেয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম স্বপ্নের সেই সমুদ্র সৈকতে। সমুদ্রের শোঁ শোঁ করা মুক্ত বাতাস, ঢেউয়ের গর্জন, বিশাল ঝাউবন, সুবিশাল পাহাড়, চিকচিক করা বালি, বালির ওপর ঘোড়ায় চড়া, পানিতে গোসল করা, বোটে চড়ে সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে আসা, সুবিশাল ঢেউয়ের সাথে লড়াই শেষে বীচের ভেজা বালিতে গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নেয়া- এ সব কার না ভালো লাগে। ঢেউয়ের সাথে আসে বালি, শামুক-ঝিনুকসহ নানা কিছু। সকলের সাথে মজা করে কুড়ালাম আমিও। মনে পড়ে যাচ্ছিল ছোট বেলার সেই আম কুড়ানোর কথা।
কক্সবাজার ভ্রমণের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। তবে বছরের পুরোটি সময় দিনে এমন কি রাতের প্রায় পুরো সময় জুড়েই এখানে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিচরণ থাকে। রাতের বেলায় সোডিয়াম আলোর ঝলকানিতে সমুদ্র-তীর এলাকায় সৃষ্টি হয় আরেক অপরূপ দৃশ্যের। আরো ভালো লাগে চাঁদের আলোয় বীচে বসে সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগিয়ে বাদাম খেতে খেতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা। তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকালে শুধু মনটাই বিস্তৃত হয় না, মনের সকল কালিমাও যেন ধুয়ে দূর হয়ে যায় সমুদ্রে।
কক্সবাজারের রূপ-লাবণ্য আমাকে এতটাই বিমোহিত করে রাখলো যে দিনগুলো পার হয়ে কিভাবে যে আমাদের ফেরার সময় হলো তা বুঝতেই পারিনি। যতটুকু সময় ছিলাম ততটুকু সময় কক্সবাজারের রূপ-লাবণ্য নিয়ে বৃহৎ কিছু লিখতে গিয়ে তেমন কিছুই লেখা হলো না। যখন হচ্ছিলোইনা, তখন ভাবলাম আগে তো ভক্ষণের ব্যাপার, পরেই না হয় পুষ্টিগুণ বিচার। অবশেষে আমারা ভরপুর এক স্মৃতির খাতা নিয়ে চললাম আমাদের গন্তব্যে। যদিও শামুক-ঝিনুকের বিভিন্ন জিনিস এবং বার্মিজ মার্কেট থেকে কেনা বিভিন্ন পণ্য সঙ্গে ছিল তবুও বুক পকেটে রাখা এলোমেলো শব্দে সৈকতে বসে লেখা ক’টি পংক্তি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে সঙ্গে এলো চিরস্মৃতি হিসেবে-
।।১।।
কক্সবাজার তোমার রূপে
করছে সবে স্নান
মুগ্ধ করা রূপটি তোমার
হয় না যেন ম্লান।
।।২।।
তোমার রূপে সবার বুকে
বইছে খুশীর বন্যা
রূপের রাণী কক্সবাজার
তুমি যে অনন্যা।
==০==

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

