আজকে আমার প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সমাপ্তি হলো। দুপুরে খররোদে দাঁড়িয়ে রেজাল্টটা নিয়ে যখন বের হলাম সামনে একদম কেউ ছিল না। বাল্যকালের এক বন্ধু যে কিনা আমার সাথেই পড়েছে এতগুলো দিন, তার সাথে পথে ভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে গিয়েছিল, এবং আমি রেজাল্ট আনতে যাচ্ছি শুনে সে আমার সাথী হয়েছিল। সে মৃদুস্বরে অভিনন্দন জানাল। বাবা মা কে ফোন করে জানালাম, পাশ করে গেছি। তারপর কাছের কিছু বন্ধুদের। আমার স্বরে হয়ত আনন্দের উচ্ছ্বাসটা একটু কম ছিল। বেশি ছিল স্বস্তি আর বুক থেকে একটা পাষাণভার নেমে যাওয়ার আরাম।
আমার ব্যাচমেটরা সবাই ছয়মাস আগেই পাশ করে গেছে, সবাই কোথাও না কোথাও চাকরি শুরু করেছে, কেউ কেউ বিদেশ যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মাস্টার্সটা সবাই যে বাইরে করতে চায়! এমনকি আমার মতই যারা এখনও শেষ করতে পারেনি তারাও চাকরিতে ঢুকে গেছে! আমিই খালি পুরা ছাত্র। তাও আবার ল্যাগার!! যারা এখনি বাইরে যাবে না বা কখনই বাইরে যাবে না তারাও অনেকে ভর্তি হয়েছে বুয়েটেই। আমি ক্যাম্পাসে গেলে দেখি, দুপুরে ওরা মাস্টার্সের ক্লাসে যায়। আমি হয়ত তখন পুরোনো রি-টেক করা কোর্সের আঁতিপাতি বুঝার জন্য স্যারের কাছে যাই। যে ডিপার্টমেন্টে ঢোকার সময় একটা গর্বের অনুভূতি হত, সেখানে এই ক'দিন যেতে একটা চরম কুণ্ঠা কাজ করেছে। জীবনে এরকম পরিস্থিতিতে আসলে না পড়লে বুঝা যায় না যে কতটা অসহায় লাগে!!
আজ সকালে উঠেই দৌড়েছি রেজাল্টের জন্য। হলের মেস-চার্জ দেয়া হয় নাই সময়মত, তাই আমি ডিফল্টার। আগে গিয়ে ব্যাংকের লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম। ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিলাম। সময়মত এই কাজটা করলে সরাসরি রেজাল্ট টা হাতে পেতাম। যাই হোক করিনাই এটা পুরোপুরিই আমার দোষ। সবসময়ই একটু ঢিলাঢালা গা-ছাড়া থাকি। সেখান থেকে হলে ফিরে বললাম ডিফল্টারের লিস্টে নামটা কেটে দেন। দিল, কিন্তু যে কাগজটা দরকার সেটাতে আবার হলের প্রোভোস্টের সই লাগবে। সেটার জন্য অপেক্ষা দুপুর ১২টা পর্যন্ত। ভাবলাম রুমে ফিরে একটু রেস্ট নেই। হঠাৎ মনে পড়ল যে আচ্ছা! আমার আইডি-টা কই???
সারা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজে পেলাম না। রাগে দুঃখে তখন চুল ছেঁড়াটাই বাকি। আইডি ছাড়া রেজাল্ট নাই। কি করি কি করি!! শেষে ঠিক করলাম জি.ডি. করে আসি। ওটার কপি দেখালে তা আইডি-র সমান। অগত্যা রওনা দিলাম শাহবাগ থানার উদ্দেশ্যে। আমার কপালে তখনও ভোগান্তি অনেক বাকি ছিল!!
জি.ডি. করে তাড়াহুড়া করে ফিরছি হল-এ। আসতে আসতে ১২.৩০!! দেখি ততক্ষণে কাগজে সই হয়ে গেছএ ওটা আর জি.ডি.র কপি নিয়ে দৌড় এক্সাম বিল্ডিং-এ। রেজাল্ট!! ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম আমার পরীক্ষার ফি দেয়া হয়নাই। আমি ঐটারও ডিফল্টার। তাই আবার রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, সেখান থেকে ফর্ম নিয়ে আবার ব্যাংক! এবারে দেখি অত ভীড় নাই। ১টা বাজার একটু বাকি, মিনিট বিশেক। আমার তখন চিন্তা যেন কোনভাবে টাকা জমা দিয়ে রেজাল্ট নিতে পারি লাঞ্চের আগে। কিন্তু কপালের নাম গোপাল! কাউন্টারে আয়েশী ভঙ্গিতে টাকা গুনছেন কর্মকর্তা। বেশ কয়েক বান্ডিল গোনা হয়ে গেল, আমরা যে কয়েকজন টাকা জমা দেবার জন্য দাঁড়িয়ে আছি সেদিকে কোনই খেয়াল নেই। শেষে থাকতে না পেরে বলে বসলাম, ভাই, আপনি তো এই গোনাগুনির কাজটা পরেও করতে পারবেন, আমাদের টাকাটা নিয়ে নেন? কে শোনে কার কথা। উনি চলছেন দুলকিচালে, মোগল বাদশার শেষ বংশধর হয়ত!! যাই হোক, শেষে উনার দয়া হলো, আমাদের টাকা জমা নিলেন। সরকারি ব্যাংকের এই এক সমস্যা, কাস্টমারদের ব্যাপারে কোন মাথাব্যথাই নাই।
যাই হোক, কথা সরে যাচ্ছে। আমি এরপরে তাড়াতাড়ি দৌড়ালাম রেজিস্ট্রার বিল্ডিং-এ। কিন্তু ঐ ব্যাংকের অফিসারের কল্যানে একটা বেজে গেছে, সবাই লাঞ্চে। আমার টেনশন তখন মাথা ছাড়িয়ে চুলের ডগা দিয়ে বাষ্প হয়ে বের হচ্ছে। সকাল থেকে অভুক্ত শরীরে এরকম দৌড়াদৌড়ি করছি, ভ্যাপসা রোদে দরদর করে ঘামছি, সব ছাড়িয়ে রেজাল্ট কী হবে সেই দুশ্চিন্তায় আমি মারা যাচ্ছি। তারপর অপেক্ষা, ক্লান্তিকর, অসহনীয় অপেক্ষা। শেষমেশ দু'টা বাজল, অফিস খুলল, আমি আমার ক্লিয়ারেন্স পেলাম, সেটা নিয়ে রেজাল্ট অফিসে গেলাম। বুকের মধ্যে তখন ঢাকের বাজনা। যাবার পথে সেই স্কুলজীবনের বন্ধুর সাথে দেখা। সব শুনে আমার সাথে ট্যাগ হলো সে।
ফাঁকা করিডোর রেজাল্ট অফিসের সামনে, লোকজন নেই বেশি একটা। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই কখন খুলবে? বলল, আড়াইটা। আরো অপেক্ষা। সাথে বন্ধু থাকায় নানান কথা বলে তবু মনোযোগ একটু অন্যদিকে সরানো গেল। কিন্তু মাথার পেছনে তখনও সিরসির করে একটা চিন্তা চলছে। একটা সময় অপেক্ষা শেষ হলো, জগতের আর সকল ব্যাপারের মতই। রেজাল্ট কার্ডটা হাতে পেয়ে উল্টে দেখিনি প্রথমে, এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সামলে নিলাম নিজেকে, তারপর উল্টে দেখি... আহা!!
জীবনে হাতে গোনা দুএকটা রেজাল্ট হবে যেটা দেখে এতটা খুশি হয়েছি, কিন্তু সে সবগুলোই অনেক ভালো ছিল, এটা ভয়াবহ খারাপ! তাতে কী ই বা যায় আসে??
বের হয়ে বাবা মা-কে জানালাম। নিজেকে অনেক নির্ভার লাগছিল। চোখের সামনে বুয়েটের কংক্রীটের রাস্তাটা আবার পুরোনো রূপে সুন্দর হয়ে গেল। তারপরের সময়টুকু এখন পর্যন্ত একেবারে ভাসমান কাটছে। নিজেকে হঠাৎই বড় বড় মনে হচ্ছে। জানি এসবই শিশুতোষ ভাবনা, কেটে যাবে হয়ত কালকেই। একঘেঁয়ে দিন রাত আবার ফিরে আসবে। তবে এইমুহূর্তে সেটার মূল্য এতই বেশি যে এখানে লিখে রাখতে বড় মন চাইল।
বিদায়।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


