বনানী মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আমার একটা পছন্দের ডিভিডি'র দোকান আছে। মাসে, দু'মাসে আমি সেখানে ঢুঁ দেই, নতুন মুভি কিনতে। দোকানটির বৈশিষ্ট্য এই যে ডিভিডি'র মান, ছবির প্রিন্ট ও সাউন্ড খুব ভালো থাকে। মাঝে মাঝে বিদেশি, একটু কম আলোচিত ছবিও ওখানে পাই। গতমাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন আবার গেলাম। বেশ কয়েকটা নতুন মুভি আনলাম যাদের মাঝে একটাকে নিয়ে আজকে না লিখে পারলাম না!
ছবিটার নাম আগোরা

আমাদের দেশে আগোরা বললেই একটা সুপার মার্কেটের কথা মনে পড়ে যেখানে টুথপিক থেকে শুরু করে খেলনা সাইকেল পর্যন্ত সবই পাওয়া যায়। ডিভিডি দেখে ভাবলাম, হয়তো সেই সুপার মার্কেট নিয়েই বিতং ছবি বানিয়েছেন আলেহান্দ্রো আমেনাবার। এই পরিচালকের বানানো মাত্র সাতটি ছবির মাঝে তিনটি ছবি দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। চিলি'র সৌভাগ্য, এমন একজন পরিচালক তাদের আছে যিনি প্রথাগত সিনেমার মধ্যেও সুররিয়্যাল ছবির মেজাজ নিয়ে আসতে পারেন। তাঁর প্রথম যে ছবিটা দেখেছিলাম, সেটি "আব্রে লোস ওহোস" (ওপেন ইয়োর আইজ)। (এই ছবিটির একটা হলিউডি-ভার্সন আছে, ক্যামেরন ক্রোয়ের বানানো, নাম- ভ্যানিলা স্কাই)। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে আলেহান্দ্রো এই ছবিটি বানিয়েছিলেন, যেটা ছবি দেখার সময়ে একবারও মনে হয়নি। ছবির এডিটিং, দৃশ্যবিন্যাস, পরপর বাস্তব-পরাবাস্তবের মধ্যে সংলাপগুলো, চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব এতোটাই জটিল-সরল রূপ নিয়েছে যে মন্ত্রমুগ্ধ হতেই হয়। যে বছর "আব্রে লোস ওহোসে"র রিমেক "ভ্যানিলা স্কাই" মুক্তি পেলো, সেই বছরেই আলেহান্দ্রো আরেকটি ছবি বানালেন, এবারে ভৌতিক গল্প নিয়ে। এটার নাম "দ্য আদার্স"। এখানেও প্রথাগত হরর ছবির হাস্যকর রক্তারক্তি নেই, খুব চিৎকার চ্যাঁচামেচি নেই, কিন্তু অজান্তব একটা শিরশিরে ভয় দর্শককে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর ছবির শেষে একটা মারাত্মক মোচড় আমাকে এতোটাই ঘাবড়ে দিয়েছিলো যে ক্রেডিট শেষ হয়ে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরেও চুপচাপ বসেছিলাম!
"আগোরা" কেনার সময়ে তাই আলেহান্দ্রোর নাম দেখে বেশ উৎসাহিত হয়েই কিনলাম।
ছবির পটভূমি ৩৯১ খ্রিস্টাব্দের আলেকজান্দ্রিয়া নগরী। গ্রিক সভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল নারী, একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ এবং শিক্ষানুরাগী হাইপেশিয়াকে নিয়ে ছবিটা তৈরি। যদিও বিভিন্ন প্রচারণাতে তাঁর চাইতে বেশি বলা হয়েছে ক্রিশ্চিয়ানিটির অনুসারী এক যুবক এই ছবির মূল উপজীব্য (যে কিনা হাইপেশিয়ার দাস ছিলেন), ছবি দেখার সময়ে আমার সেটা মনে হয়নি। মূলত হাইপেশিয়ার নাম দেখে আমি তুমুল আগ্রহী হয়ে উঠি ছবিটা দেখার জন্যে। গ্রিক সভ্যতার যে জ্ঞানার্জন, তার শেষ প্রদীপ ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই আলেকজান্দ্রিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা অন্ধকারে পতিত হয়। খ্রিস্টান ধর্মের প্রবল ধর্মগুরুদের প্রতাপে রোমান প্রিফেক্টরা দলে দলে প্যাগান থেকে খ্রিস্টান হয়ে ওঠেন। ধর্মাচরণ, ধর্মপালন ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং এক দীর্ঘ কুৎসিত অন্ধকার যুগের বন্ধ্যা সময়ের শুরু হয়।
![]()
এতোক্ষণ মুভিটির সামনে ও পিছনে থাকা দুজন সবচেয়ে জরুরি মানুষ নিয়ে কথা বললাম। আলেহান্দ্রো আর হাইপেশিয়াকে ছাড়া মুভির বাকি অংশগুলো বুঝে উঠতে দ্বিতীয়বার দেখলাম ছবিটা।
"আগোরা" মানে বাজার। গ্রীক-রোমান সভ্যতায় কোন কমনপ্লেসকে ঘিরে যে বাজার গড়ে ওঠে সেটাকে আগোরা বলে। রোমের কলিসিয়ামের ধার ঘেঁষে যেমন আগোরা ছিলো, তেমনি আলেকজান্দ্রিয়ার প্যাগান ভাস্কর্যের (অর্থাৎ দেবদেবীদের মূর্তি যেখানে স্থাপিত ছিলো) চারিদিকেও একই ধরনের আগোরা গড়ে উঠেছিলো। খ্রিস্টধর্মের বয়স যখন প্রায় চারশ বছর, তখন আলেকজান্দ্রিয়া একটি কসমোপলিটান নগরী হয়ে উঠছিলো। একই সাথে সেখানে গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতার মিশেল আর ইহুদী, প্যাগান এবং নব্যআহূত খ্রিস্টান নাগরিকের একটা মিলনমেলা হয়ে উঠলো নগরটি। শাসন করতো রোমান প্রিফেক্ট, ধর্মানুসারে যারা প্যাগান ছিলেন। কিন্তু সিনেটের একটা বড়ো অংশ তখন ইহুদী এবং খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। যীশুর মৃত্যুর প্রায় চারশ বছর পরেও সামাজিক সৌহার্দ্যের মুখোশ খুলে তাদের মাঝে বিরোধ মাঝে মাঝেই দেখা দিচ্ছে। আবার নিরাকার ঈশ্বর বনাম মূর্তিমান দেবতার যে সংঘাত, সেখানে একদিকে ইহুদী-খ্রিস্টানদের অবস্থান, বিপরীতে প্যাগান শাসক।
আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত বাতিঘর আর পাঠাগার তখন সভ্যবিশ্বের প্রতীক, পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি ছিলো এই বাতিঘর! পাঠাগার যেমন ছিলো গ্রিক-রোমান সভ্যতার সকল জ্ঞানের সংগ্রহশালা, তেমনি প্যাগানদের উপাসনালয়ের স্থান। পাঠাগারের বইগুলো ছিলো হাতে লিখিত। মূল লেখকের লেখা একটি কপি থেকে পাঠাগারের শিক্ষার্থীরা আরো অনেকগুলো কপি করতেন। এভাবে বইগুলো সংরক্ষিত হতো। শিক্ষকদের বেশিরভাগই ছিলেন প্যাগান, পাঠাগারের ঠিক মাঝখানে প্যাগান দেবতা সেরাপিস, হোরাস, আনুবিস আর আইসিসের মূর্তি রাখা ছিলো। সারা শহর জুড়েই অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন ছিলো যেগুলো এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই!
হাইপেশিয়ার গবেষণার মূল প্রেরণা ছিলো জ্যোতির্বিদ্যা আর গণিত। পৃথিবীকে তখনও মনে করা হতো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র। তার চারপাশে সূর্য, মঙ্গল, শনি, বুধ এবং শুক্র হলো "পরিব্রাজক"(ওয়ান্ডারার)। টলেমির দেয়া মডেল অনুযায়ী, সকল ঘূর্ণনপথকে বৃত্তাকার কল্পনা করা হতো। সেক্ষেত্রে যেটা মূল সমস্যা ছিলো, তা হলো সূর্য এবং অন্যান্য পরিব্রাজকের আকারের ছোটবড় হওয়া। বৃত্তাকার পথে ঘুরলে সেটা হওয়ার কথা নয়। টলেমি এই সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন এই বলে যে, সবগুলো পরিব্রাজক পৃথিবীর চারপাশে ঘোরার সাথে সাথে নিজেদের একটা ছোট বৃত্তাকার পথেও ঘুরছে। এই কারণেই তার আকারের পার্থক্য আমাদের চোখে ধরা পড়ে। মনে রাখতে হবে, সেই সময়ে বৃত্ত ছিলো বিশুদ্ধতম জ্যামিতিক ক্ষেত্র। উপবৃত্ত, পরাবৃত্তকে মনে করা হতো অবিশুদ্ধ বা পার্থিব, বৃত্তাকার ছিলো স্বর্গীয়। এখনকার যুগে জ্যামিতিক ক্ষেত্রকে পবিত্র মনে করার ব্যাপারটা হাস্যকর মনে হলেও সে সময়ে এগুলো নিয়ে প্রশ্ন করা, বিরোধিতা করার জন্যে কাউকে মুক্তমনা হওয়া ছিলো খুবই জরুরি। বিজ্ঞানের প্রসারের প্রথম পদক্ষেপটাই ছিলো প্রতিষ্ঠিত সত্যের ব্যাখ্যায় প্রচলিত পদ্ধতিকে প্রশ্ন করা। জ্যামিতিক ক্ষেত্রের এই স্বর্গীয়/পার্থিব ভেদাভেদ করে অনেকদিন পর্যন্ত ভ্রান্তপথে চালিত হয়েছে গবেষণা। এখনও আমরা অনেকেই পড়াশোনা করার পরেও যেমন জ্যোতিষবিদ্যায় বিশ্বাস করি, পানিপড়া, তুকতাক, ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাসীও খুঁজলে পাওয়া যাবে! একমাত্র মানুষের পক্ষেই সকল যুক্তি ও বোধ বিসর্জন দিয়ে এমন অবিশ্বাস্য "শক্তি"র ওপর বিনাশর্তে বিশ্বাস করা সম্ভব।
ছবিটির প্রথমাংশের একটি দৃশ্যে হাইপেশিয়ার ক্লাসরুম দেখানো হলো। এখনকার মতো নয়, আলেকজান্দ্রিয়ার ক্লাসরুম অনেক বেশি 'ক্যাজুয়াল' ছিলো। সেখানে পাশাপাশি প্যাগান-ইহুদি-খ্রিস্টান সকলেই তাঁর কাছে পড়তো। তিনি পৃথিবী ও সৌরজগতের এই জটিল ঘূর্ণন ব্যাখ্যা করছিলেন। ওরেস্টিস (পরবর্তীতে রোমান প্রিফেক্ট হন তিনি, ধর্মে প্যাগান) নামের একজন বলে উঠলো, "এমন ঘূর্ণনের নিয়ম বানানোর আগে দেবতাদের উচিত ছিলো আমার সাথে পরামর্শ করে নেয়া"। সকলে হেসে উঠলো, ওরেস্টিস একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললো, "কারণ এতো জটিল করে বানানোর কী দরকার ছিলো? সবগুলো পরিব্রাজক কি একটা সরল বৃত্তপথেই ভ্রমণ করতে পারতো না? তাহলে তো অনেক সহজ হতো সবকিছু"। তার প্রশ্ন নিয়ে হাইপেশিয়া তখনও ভাবছেন, পাশ থেকে সাইনেসিস (পরবর্তীতে খ্রিস্টান বিশপ হন তিনি) আপত্তি করে উঠলেন, "ওরেস্টিস, তোমার কোন অধিকার নেই ঈশ্বরের সৃষ্টি নিয়ে এরকম হাসিতামাশা করার। তিনি মহান, তাঁর সৃষ্টির নিয়মকে তুমি প্রশ্ন করতে পারো না!"
ওরেস্টিস: "তোমার কি সমস্যা? একজন মানুষ কি তার মতামত জানাতে মুখও খুলতে পারবে না?"
সাইনেসিস: "তুমি আমাদের ঈশ্বরের সমালোচনা করছো, তার সৃষ্টির সমালোচনা করছো। এগুলো করে তুমি আমাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত করছো।"
ওরেস্টিস: "তোমরা এক কাজ করো, মরুভূমিতে চলে যাও। ওখানে তোমাদের অনুভূতিকে আহত করার কেউ থাকবে না।"
এই উত্তপ্ত কলহের মাঝে দাঁড়িয়ে হাইপেশিয়ার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করে। সাইনেসিসের দিকে তাকিয়ে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "সাইনেসিস, ইউক্লিডের প্রথম সূত্রটা কি?"
সাইনেসিস জবাব দিলো, "if two things are equal to a third thing, then they are all equal to each other."
হাইপেশিয়া: "এখন বলো, তোমরা দু'জন কি আমার কাছে সমান নও?"
ওরেস্টিস আর সাইনেসিস চুপ করে মাথা নাড়লো, অনেকটা অমোঘ সিদ্ধান্তের স্বরে হাইপেশিয়া বললেন, "যদি তোমরা দুজনেই আমার কাছে সমান হয়ে থাকো, তাহলে তোমরা একে অপরের কাছেও সমান। আমি বাকিদেরকেও বলি, যতোকিছু আমাদের বিভক্ত করে, তার চেয়েও অনেক বেশি জিনিশ আমাদের একত্র করে। বাইরে বাজারে যে সংঘাত, মারামারি, হিংসা, হানাহানি, সেগুলো আমাদের এখানে নেই। এখানে আমরা সবাই এক। উই আর ব্রাদার্স!"
ছবির বাকি অংশ দেখার আগেই আমি বুঝে ফেলি, এটি সম্ভবত আমার দেখা সবচেয়ে অসামান্য দৃশ্যের একটি। একই দৃশ্যে মৌলবাদ, ধর্মীয় কুযুক্তি, বিশুদ্ধ বিজ্ঞান-দর্শনের ক্ষমতা, আর সাম্যের বাণী মিলে মিশে এক হয়ে গেছে! তখন বুঝতে পারি কেন রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। কারণ এই ধর্মের সাহায্যে মানুষে মানুষে সবচেয়ে বেশি বিভেদ তৈরি করা যায়। কোন মানুষের অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞাকে খুব সহজেই নাকচ করে দেয়া যায়, ভিন্ন ধর্মের অপবাদ দিয়ে। অন্য যে কোন বিষয়ে মানুষের মাঝে যতোগুলো ভাগ করা সম্ভব, তার চেয়ে অনেক সহজে মানুষকে বড়ো বড়ো গ্রুপে ভাগ করে ফেলা যায় খালি ধর্মের পার্থক্য করলেই। একটু মিলিয়ে দেখলাম, এই ভারত উপমহাদেশে, আলেকজান্দ্রিয়ার সময়ের প্রায় ১৫০০ বছর পরে ঠিক এভাবেই ভাগ করা হয়েছিলো হিন্দু আর মুসলিম ধর্মের নামে। কতো সহস্র মানুষ সেসময়ে মারা গিয়েছিলো, তার কোনো হিসেব ইতিহাসে নাই!
এখনকার বাস্তবতায় হয়তো আমরা ধর্মীয় পরিচয়ের চাইতে মানুষের কথা, কাজের মূল্য কিছুটা বেশি দেই। কিন্তু আমাদের সভ্যতার গত তিন-চার হাজার সময়ে বারবার জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানের প্রসারে বাধা দিয়েছে ধর্ম। ধর্মানুভূতির কোমল ইন্দ্রিয়ে আঘাত পেয়েছে বলে যাজকদের, পাদ্রিদের, মোল্লাদের তলোয়ার আর বোমাতে মারা গেছে কাফের-নাস্তিক-বিধর্মী-ডাইনি (খেয়াল করলাম, এরা কোন মানুষ নয়, এরা কেবলই কতোগুলো নোংরা বিশেষণ!)। জেরুজালেম থেকে খ্রিস্টের মৃত্যুর পরে তাঁর বারো শিষ্যের হাত ধরে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার ঘটেছে। প্রায় সাত-আটশ বছরের অর্জিত গ্রিক-রোমান সভ্যতার বারোটা বাজাতে তাদের বেশিদিন লাগেনি। আলেকজান্দ্রিয়ায় ৩৯১ সালে পাঠাগার ধ্বংস হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো প্যাগান মূর্তিপূজারীদের অর্জিত বিজ্ঞানের বই, গবেষণার সরঞ্জাম! পাঠাগারের ভেতরে মূর্তিগুলো ভেঙে স্থাপনা হলো খ্রিস্টধর্মের নিরাকার ঈশ্বরের। প্রাচীন বাইবেল অনুযায়ী লিখিত হতে লাগলো শাসনের নিয়ম। নগরে চরে বেড়াতে লাগলো প্যারাবেলামি নামক মাস্তানেরা। এদের ঝোলায় থাকতো পাথর, কোমরে তলোয়ার। খ্রিস্টান ধর্মের প্রতাপে উচ্ছেদ হলো ইহুদিদের। তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রাচীন অভিযোগ, তারা খ্রিস্টকে ক্রশবিদ্ধ করেছে। তাই তারা অভিশপ্ত, নির্বাসিত! মেরে ভাগিয়ে আগোরা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো তাদের। এবং রোমান সরকার চেয়ে চেয়ে দেখলো কীভাবে ধর্মীয় বিশপ পরাক্রমশালী হয়ে ওঠে!
হাইপেশিয়া এই সকল উত্তেজনার মাঝেও জ্যোতির্বিদ্যার কাজ চালিয়ে গেছেন। অল্প কিছু বাঁচাতে পারা বই, কিছু গণিতের সরঞ্জাম দিয়ে তখনও চেষ্টা করছেন বিশ্বের সূত্র আবিষ্কারের। পৃথিবী এবং নক্ষত্রের ভ্রমণ নিয়ে তাঁর গবেষণায় বাধা হয়ে দাঁড়ালো খ্রিস্টান চার্চ। বাইবেলে বর্ণিত আছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড একটা চেস্ট, যার সর্বোচ্চে আছে স্বর্গ, সর্বনিম্নে পৃথিবী, এবং পৃথিবী সমতল চাকতির(!) মতো। সেই মতবাদের প্রতাপে টলেমির গোলাকার পৃথিবীর মডেলও বাতিল। এখন হাইপেশিয়া যদি বলে বসেন, পৃথিবী আসলে কেন্দ্র নয়, সূর্যকে ঘিরে ঘূর্ণায়মান একটি গ্রহমাত্র, তাহলে তা বাইবেলের সরাসরি বিরোধিতা করে বসে! হাইপেশিয়া ব্যক্তিগত বিশ্বাসে নাস্তিক ছিলেন, প্যাগান ধর্মের মূর্তিতেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। প্রখর প্রজ্ঞার এই দার্শনিকের কাছে দর্শনই ছিলো একমাত্র "ঈশ্বর", একমাত্র পূজনীয় স্বত্ত্বা। তাই অচিরেই তিনি চার্চের চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন। আর্চবিশপ সিরিল বাইবেল থেকে পাঠ করলেন স্রষ্টার অমোঘ বাণী, "নারীকে সৃষ্টি হয়েছে অবগুণ্ঠিত থাকার উদ্দেশ্যে, পুরুষের সহধর্মিনী হিসেবে, অনুচর হিসেবে। কোনো নারীর ক্ষমতার নিচে, নেতৃত্বের নিচে পুরুষ থাকতে পারে না। সেই নারী, যে আব্রু করে না, জ্ঞানের চর্চা করে এবং পুরুষকে নিয়ন্ত্রণ করে সে ডাইনি।" উদাহরণ হিসেবে সিরিল বললেন, যীশুখ্রিস্ট তাঁর বারোজন শিষ্যের মাঝে এজন্যেই কোন নারীকে রাখেন নাই। এই আলেকজান্দ্রিয়ায় একজন এমনই ডাইনি আছে যে কোন ঈশ্বরেই বিশ্বাস করে না, সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধিতা করে, পুরুষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। হাইপেশিয়া নামক সেই ডাইনির বিরুদ্ধে চার্চের সমন জারি হয়ে গেলো!
পরের গল্পটুকু বেদনাদায়ক। ক্রীড়নক রোমান প্রিফেক্টের (ওরেস্টিস) শত আপত্তি সত্ত্বেও হাইপেশিয়াকে চার্চ আটক করে ফেলে। প্রকৃত ইতিহাস থেকে মুভিটি এখানেই একটু সরে আসে। মুভিতে দেখানো হয় হাইপেশিয়ার পুরনো দাস তাঁর শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে, তাঁকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয়। তারপর সেই মৃতদেহের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারে প্যারাবেলামির মাস্তানেরা, খ্রিস্টের অনুসারীরা(!)। মূল ইতিহাসে, তাঁকে জীবন্ত অবস্থায় পাথর ছুঁড়েই মারা হয়, তারপরে তাঁর দেহ আলেকজান্দ্রিয়ার রাস্তায় ঘোড়া দিয়ে হিঁচড়ানো হয়। শিউরে ওঠার মতো নৃশংসতা? ইতিহাস বলে এটি কিছুই না। এর পরের প্রায় এক হাজার বছরের অন্ধকার মধ্যযুগে অনামী এমন অসংখ্য নারীকে ডাইনি অপবাদে মারা হয়েছে, পুড়িয়ে, পাথর ছুঁড়ে, চাবুক মেরে। কেবল নারীই নয়, জ্ঞান আহরণে আগ্রহী, বিজ্ঞান গবেষণার নিবেদিত যে কোন মানুষ যখনই ধর্মীয় সত্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন- তারা এরকম নির্মমভাবেই স্তব্ধ হয়ে গেছেন।
মুভি হিসেবে "আগোরা" এই চিরন্তন প্রশ্নগুলো উস্কে দেয়। ধর্মের শ্বাশত রূপ, মহান বাণী, সাম্যের প্রতিশ্রুতি কখনই প্রমাণিত হয়নি। যুগে যুগে ধর্মের পতন হয়েছে প্রতিষ্ঠিত একটি ধর্মকে হঠিয়ে। এই হঠানোর কাজটি সহজে হয়নি, মিষ্টি কথায় হয়নি। হয়েছে প্রবল প্রতাপে, নির্মম খুন-হত্যা-রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে। এই নির্মমতার ব্যাপারে একটা মজার পর্যবেক্ষণ হলো, বহুদেবতাবাদী ধর্মের চাইতে একেশ্বরবাদী ধর্ম অধিক নিষ্ঠুর। প্যাগান বা হিন্দুধর্মের পৌত্তলিকতার চেয়ে খ্রিস্টান বা ইসলাম অনেক বেশি দাপুটে। আর এই সকল ধর্মের বিপরীতে একা দাঁড়িয়ে আছেন গুটিকতক মানুষ- যাঁরা মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, যাঁরা বাকি সবার মতো একবাক্যে অমোঘ বাণী মেনে নেন না, যাঁরা প্রকৃত দর্শন, প্রকৃত বিজ্ঞানের পথে চলেন। মহাপ্রতাপশালী শাসক বা রাজার ধর্মকে অনায়াসে প্রশ্ন করতে পারেন। সকল ধর্ম-মত নির্বিশেষে, তাঁরা মানবসভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল অথচ সবচেয়ে অত্যাচারিত চরিত্র!
আলেকজান্দ্রিয়ার সিনেটে ইহুদী-প্যাগান-খ্রিস্টান সকল ধর্মের সভাসদ ছিলেন। এক উত্তপ্ত বিতর্কের সময়ে খ্রিস্টান এক সিনেটর বলেন, "এটা কেবল সময়ের ব্যাপার যে আপনারা একদিন খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করবেন। প্রিফেক্ট বুদ্ধিমান তাই তিনি এরইমধ্যে করেছেন। আপনারাও করবেন।"
হাইপেশিয়া উত্তর দিলেন, "আপনার স্রষ্টা আগের যে কোন দেবতার চেয়ে বেশি ন্যায়পরায়ণ, ক্ষমাশীল এরকম প্রমাণ করতে পারেন নাই। চার্চ এখন যে স্রষ্টার নামে হত্যা-লুঠ চালাচ্ছে সেটা আগের সকল দেবতার নামে ঘটে যাওয়া হত্যা-লুঠের চাইতে কম না। আমি কেন সময়ের সাথে আপনার ধর্মে বিশ্বাস করবো, যেখানে আপনি আমাকে সন্তুষ্ট করার মতো কোন প্রমাণ দেখাতে পারছেন না?"
উত্তর দিতে না পেরে সেই সিনেটর পালটা প্রশ্ন করলেন, "আপনি কেন স্রষ্টা ও ধর্ম নিয়ে কথা বলছেন। আপনি তো কোনোকিছুতেই বিশ্বাস করেন না!"
হাইপেশিয়া থেমে থেমে উত্তর দিলেন, "I believe in Philosophy."
****
স্টেজভ্যু থেকে ডাউনলোড লিঙ্কঃ http://stagevu.com/video/xzfwayteuqie
****
ছবির কিছু দৃশ্যঃ

পাঠাগারের ক্লাসরুমে পড়াচ্ছেন হাইপেশিয়া

সেরাপিসের মূর্তি, আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠাগারের মূল কক্ষ থেকে বের হয়ে আসছে দলে দলে প্যাগান, খ্রিস্টানদের মূর্তি অবমাননার 'সমুচিত' জবাব দিতে, তলোয়ার হাতে!

আলেকজান্দ্রিয়া শহর, বাতিঘর এবং হাইপেশিয়া

ধর্মে ধর্মে কোন্দল আর রক্তপাত!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


