somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়....

০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়

সঞ্জীব চৌধুরী, আপনার সাথে আমার পরিচয় ১৯৯৫ সালে। ফিচার পাতা মেলা’র সম্পাদক আপনি ভোরের কাগজে। ৯৬ এর অগাস্ট। আমি প্রায়ই যাই ভোরের কাগজে। টুশি (প্রয়াত রোজিনা মুস্তারীন) মেলা’য় কন্ট্রিবিউটর। আপনার মহাভক্ত সে। কোন এক সপ্তাহে টুশির লেখা ছাপা না হলে তার মন খারাপ থাকে। কোন কোন সপ্তাহে দুটো লেখা গেলে একটা লিখতে হয় ছদ্মনামে। তাতেও টুশির মন খারাপ হয়। ওর ধারনা আপনি আমাকে খুব বেশী পছন্দ করেন। মাঝে মাঝে আব্দার করে আমি যেন দাদাকে বলি ছদ্মনামটা ওর বেশী ভালো লাগছে না। আরেকটা নতুন নাম চাই তার। আপনার টেবিল ঘিরে পাখীর মতো কিচিরমিচির করে একঝাঁক তরুন তরুনী। তাদের দেখে অবাক হই। একটা ভ্যাগাবন্ড ধরনের মানুষকে ঘিরে সব স্মার্ট ছেলেমেয়েরা এতো কি কথা বলে। আপনার সাথে অনেক কথা বলার পর বুঝলাম যে এসব ছেলেমেয়েদের স্মার্টনেসের পেছনের মানুষটি আপনি। কারো ভাষা ঠিক করে দিচ্ছেন। কারো জন্য পোষাক এর টিপস। কাউকে শেখাচ্ছেন কি করে ইন্টারভিউ নিতে হয়। আধুনিক বাংলা ভাষার পাঠ দিচ্ছেন কাউকে, কারো বানান ভুল নিয়ে আপনার চিন্তার চিন্তা নেই। প্রেমে সফলতার পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রেমে ব্যর্থতার স্বান্তনা দিচ্ছেন। কারো মেসে থাকার খরচ জোগাতে একটা লেখা ছাপা চাই। সঞ্জীব চৌধুরী এদের বড়ভাই, বন্ধু, অভিভাবক। হঠাৎ আড্ডার মাঝখানে বলে উঠলেন একদিন, মেলাতে একটা স্বাস্থ্য নিয়ে মজাদার কলাম চাই। তাকালেন আমার দিকে। আমাকে সবসময় আপনি করে বলতেন আপনি।

-তুষার আপনি লিখবেন।

এতো অনুরোধের ভাষা নয়, নির্দেশ। এক সপ্তাহের মধ্যে লেখা নিয়ে হাজির আমি আপনার টেবিলে। আমাকে হাতে ধরে লেখার মজা পাইয়ে দিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। লেখা দেখে আপনার মহা উচ্ছাস। লেখার টাইটেল নিজের হাতে ঠিক করে দিতেন আপনি। আস্তে আস্তে আপনার বন্ধু হয়ে গেলাম আমি। কতো কথা আপনার সাথে। কতো গল্প। কতো দু:খের ভাগ। কতো দ্রুত চলে যাওয়া আনন্দের সময়। আমাকে জোরে ধমক দেয়ার অধিকার দিয়েছিলেন আপনি। কখনো কখনো আপনার সাথে ঝগড়াও করেছি। অভিমানের মেয়াদ খুব বেশী হলে এক ঘন্টা। টানা আড়াই বছর লিখে গেলাম ভোরের কাগজে। লেখাগুলো নিয়ে বই প্রকাশিত হবে। জানতে পেরে কিযে খুশী দাদা। নিজ হাতে বেছে দিলেন আপনার বিবেচনায় সেরা লেখাগুলো।

কখনো ভাবিনি আমার সঞ্জীবদাকে নিয়ে লিখতে হবে এইভাবে। হঠাত গান নিয়ে মেতে উঠলেন কবি। দলছুটের প্রথম অ্যালবামের গান সাদা ময়লা রংগীলা পালে প্রচারিত হলো শুভেচ্ছায়। প্রচারবিমুখ সঞ্জীব এর লাজুক উক্তি,

- তুষার, তারকা হইয়া যাচ্ছি নাকি?

নক্ষত্র ছিলেন আপনি। বুঝতে পারেননি কখনো। সূর্য় কখনো জানে না তার আলো আর উত্তাপের কথা। কার তাপ আর আলোর অপেক্ষায় বসে থাকে আমাদের মতো শীতার্ত মানুষ। সঞ্জীবদা আপনিও কখনো বুঝতে পারেননি কতো মনে অনায়াসে জ্বেলেছেন সৃষ্টির আগুন, কতো জীবনের অন্ধকার দুর করেছেন আপনার মনের আলোয়। কি যেন যাদু ছিল আপনার গলায়। বড় ভালবেসে গাইতেন আপনি। গলা দিয়ে নয়, আপনার গানের কথা আর সুর উঠে আসত হৃদয়ের গহীণ থেকে। খুব নরম মন ছিল। প্রিয়জনের দেয়া কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। কিন্তু প্রতিশোধ শব্দটি আপনার অভিধানে ছিল না। কতোজন নির্দয় নিষ্ঠুরতায় আপনাকে ব্যবহার করেছেন, সিঁড়ির মতো পদপিষ্ট করে উঠে গেছেন পার্থিব সাফল্যের চুড়ায়। আপনার শিশুর মতো সরল মনটাকে নিয়ে খেলেছেন যিনি, তাকে নিয়ে লিখেছিলেন গান। যেন গানটাই আপনার প্রতিবাদ।

আমি কাউকে বলিনি সে নাম, কেউ জানে না, জানে শুধু আড়াল।

কোনদিন তার বেদনার নামগুলিকে উচ্চারন করেননি আপনি। যেন সঞ্জীব এক আধুনিক ঋষি। আপনার কলম থেকে ঝরে পড়ত কালো অক্ষর নয়, কালো অশ্রু। অভিমান পুষে রেখে নিজেকে কষ্ট দিতেন । একটু ভালোবাসা পেলে শিশুর মতো খুশীতে টগবগ করতেন। যার সংগে একবার দেখা হয়েছে আপনার, সারাজীবন ভুলতে পারবে না আপনাকে, এমনভাবে কথা বলতেন। আমার এক ভাইয়ের সাথে একবেলা ভাত খেয়েছিলেন, মনে আছে আপনার? যখন সঞ্জীবদা, আপনি কোমায়, আমার ফোনে সেই ভাইয়ের উত্কন্ঠিত গলা চমকে দিয়েছে আমাকে।

- লোকটা খুব ভালো ছিল। উনার সাথে একদিন তোমার অফিসে খাবার টেবিলে আলাপ হয়েছিল। আমি তার কথা ভুলতে পারি নাই।

কি এমন ভালোবাসার শক্তি ছিল আপনার, যদি জানতাম! শুভেচ্ছা জোর করে বন্ধ করে দিল তখনকার শাসকেরা। আমার সেই হতাশার সময় ভরাট গলায় সাহস দিতে হাজির আপনি।

- দরকার হলে আমরা হলভাড়া করে টিকেট বেচে শুভেচ্ছা করব। দরকার হলে আপনি গান গাইবেন। দরকার হলে আমরা ব্যবসা করবো।

কতো বুদ্ধি দিয়েছেন, কতো সাহস, কতোবার কতো কাজে .... আমার সাধ্য নেই সবকিছু বলবার।

লেখক, কবি, গীতিকার, সাংবাদিক, সুরকার, কোনটা আপনার পরিচয়? সে রাতে কেন আমাকে ফোন করলেন না সঞ্জীব দা? দেহঘড়ির ডাক্তারটাকে আপনার মনে পড়ে নি তখন? নাকি আমি রাগ করে কিছু বলব আপনাকে, একথা ভেবেছিলেন? আমার বাসা থেকে এতো কাছে আপনার বাসা। আপনার এতো অভিমান হয়েছিল? আপনাকে একদিন বকেছিলাম বলে? ভালোবাসি বলেই তো বলেছিলাম আপনাকে ছেড়ে দিতে আতম্দহনের অশ্রুপান। এখন কি করে আমরা কাটাব একাকী দীর্ঘ রাত, কি করে হেঁটে যাব বিরান পথে?

রাত করে ঘরে ফিরলে আপনার মেয়ে কিংবদন্তী, জুতো হাতে ছুটে এসে কাকে বলবে - বাবা এসেছে, জুতো দাও। আমাদের জন্য না হয় মায়া হয়নি আপনার, কিংবদন্তীর জন্য?

কিংবদন্তীর মতো মানুষগুলো বোধকরি এমনি হয়। তারা শুধু ভালোবেসে যায়, ভালোবাসবার সুযোগ দেয়না কাউকে। আমাদের স্মৃতিতে আপনি থেকে গেলেন তরতাজা প্রানে ভরপুর হয়ে। আমরা বৃদ্ধ হবো, আপনার বয়স আর বাড়বে না। আমার মেয়ে গাইবে, তার মেয়ে গাইবে আপনার গান।

যখন শুনলাম আপনি হাসপাতালে, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। আপনি তখন গভীরতম ঘুমের মধ্যে গাইছেন....

আমি রাগ করে চলে যাব, ফিরেও আসব না.....
আমি কষ্ট পেয়ে চলে যাব, খুঁজেও পাবে না.....

আহ! তোমরা সবাই চুপ করো। আমার সঞ্জীবদা গাইছেন, তোমরা আমাকে গান শুনতে দাও।


৭০টি মন্তব্য ৩টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×