কুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ঘটনা কারও অজানা নয়। তবে এটা আকস্মিকও নয়। এমনটি হবারই কথা ছিল।
শুরু থেকেই বলি। কুয়েটে আমি প্রথম পা রাখি ২০০৫ এর ডিসেম্বরে।ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে সবচেয়ে ভালো লেগেছিল এর একেবারে ঝামেলা মুক্ত পরিবেশ। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল ২০০৬ এর মার্চে। সে বছর আউট গোয়িং ব্যাচের বি এস সি কোর্স শেষ হয়েছিল ৩ বছর ৮-৯ মাসে। আমাদের দেশে কোনো সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যা কিনা অনেকটাই অকল্পনীয় ছিল।
তখন ছাত্র রাজনীতির বালাই ছিল না। প্রথম ২ বছর কোনো মিছিল মিটিং স্লোগান-পোষ্টার বা রাজনৈতিক ব্যানারের চিহ্ন মাত্র দেখি নি। আমরা কি খুব খারাপ ছিলাম? ছাত্র রাজনীতি না থাকায় কি তখন কী কেউ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হতে পারে নি? বরং প্রত্যেকেই নিজ নিজ সম্মান নিয়ে চলেছে। আর এখন?
২০০৮ এর মাঝামাঝি থেকেই শুরু হলো রাজনীতির নামে কিছু মানুষের স্বার্থ উদ্ধারের সূচনা পর্ব। বর্তমান ভিসি এবং তখনকার DSW শিবেন্দ্র শেখরদের ইন্ধনে শুরু হলো রাজনীতি। বলা হলো রাজনীতি করা নাকি অধিকার। তাদের ডান হাত বাম হাত হিসেবে কয়েকজন ছাত্রকে বেছে নেয়া হলো। এমন সব ছাত্রদেরকেই প্রথমে বেছে নেয়া হলো যাদের রেজাল্ট ছিল খুবই খারাপ। এদের একজন প্রয়াত মেহেদী (সিভিল)। ভাবতে খারাপ লাগে,অত্যন্ত ভালো মনের এই ছেলেটিকে ব্যবহার করে কিছু লোক নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে।আর মেহেদীর ভাগ্যে জুটেছে নষ্ট জীবন আর মদ খেয়ে মৃত্যুর মত লজ্জ্বা।
সাধারন বিবেকবান ছাত্ররা কখনই ছাত্র রাজনীতির পক্ষে ছিল না। হলে হলে যখন ছাত্র লীগের কমিটি গঠন শুরু হলো, হলের সবচেয়ে কর্মঠ আর সক্রিয় ছাত্রদের কেউ-ই তাতে যোগ দেয়নি। দিয়েছে এমন ছেলেরা যারা মদ গাজায় ২ বছর কাটিয়ে দেখে রেজাল্ট শিটে সব ব্যাকলগের বাহার।
কিন্তু তাতে কি আসা যায়? বড় জোড় ১০% এসব ছাত্রে পেছনে ছিল প্রশাসন আর সরকারের গভীর থেকে সমর্থন।
হাসি আর আড্ডায় মুখরিত কুয়েট প্রকম্পিত হতে শুরু করল রাজনৈতিক স্লোগানে। ছাত্রলীগের ব্যানার পোষ্টার আর মিছিলের শো ডাউন। অনেকের মুখের প্যাটার্নই বদলে গেলো ক্ষমতার দম্ভে।
একদিনের একটা ঘটনা বলি। পরের দিন ক্লাস টেস্ট। সন্ধ্যার পর সবাই মিলে পড়ছি। আর হলের পাশেই অডিটরিয়ামের সামনে শুরু হলো আওয়ামী লীগের সমাবেশ আর মাইকে বক্তৃতা। সেখানে উপস্থিত মদ গাজা খোর ছাত্রবৃন্দের(!!) সামনে ঘোষনা দেয়া হলো, পাশ করলেই ছাত্রলীগের ছেলেদের চাকরী দেয়ার দায়িত্ব আ.লীগের নেতাদের। কি মুলা ঝুলানো হয় আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। তবে আপনাদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, সেই সমাবেশে উপস্থিত ছাত্রলীগের নিবেদিত প্রান এক কর্মী কিছুদিন আগে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী থেকে বিতাড়িত হয়েছে চুরির অপরাধে। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে- ঝাকের পাখি ঝাকেই চলে।
কুয়েটের প্রশাসন যন্ত্রও আজিব। আজিব না, আসলে নির্জীব। যেকোনো পরিস্থিতির একমাত্র সমাধান-‘ভার্সিটি বন্ধ’, ‘হল ভ্যাকেন্ট’।
নিজের রুমের দরজার সামনে ছাত্রলীগের স্টিকার লাগাতে না করায় বাইরে থেকে ক্যাডার এনে অপমান করা হয়েছিল আমাদের ব্যাচের সবচে নিরীহ ছেলেটিকে।প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হয়নি। প্রশাসন অপরাধীকে প্রশ্রয় দিয়েছে।
হলে এসে ছাত্র পিটিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। প্রতিবাদ দানা বাধার আগেই হল ভ্যাকেন্ট করে অপরাধীকে প্রশ্রয় দিয়েছে প্রশাসন। এখন এত প্রশ্রয় পেয়ে ছাত্রলীগ যে সাধারন ছাত্রদের পেটাতে রামদা নিয়ে আসবে এতে অবাক হবার কিছু নেই। বরং এরপর পিস্তল-একে ৪৭ না নিয়ে আসলেই অবাক হবো।
ছোট দুটি প্রশ্ন করি।
১। আমাদের সময় সিভিলের ছেলেরা খাজা হলে আর ইলেকট্রিক্যালের ছেলেরা রশিদ হলে থাকত। একবার সিভিল আর ইলেক্ট্রিক্যাল তথা খাজা আর রশিদ হলে মারামারি হওয়ায় সিস্টেম বদলে হল শাফল করে দেয়া হল। এখন আমার প্রশ্ন, ছাত্র রাজনীতির কারনে এইযে এত গুলো ছেলে মার খেল, এখন কেন সিস্টেম বদলে ছাত্র রাজনীতি উঠিয়ে দেয়া হবে না??
২। ২ জানুয়ারী ছাত্রলীগ আর পুলিশের যৌথ পিটুনির শিকার হল ভবিষ্যতের ইঞ্জিনিয়ারেরা। এই দায় ভার কার? ভিসি যদি মানুষের জাত হয়ে থাকেন, তবে পুলিশের হাতে তার ভার্সিটির হবু ইঞ্জিনিয়ারদের মার খাওয়ার ঘটনার লজ্জায় এখনই তার পদত্যাগ করা উচিত।
আমাদেরই আশে পাশের কিছু মেরুদন্ডহীন মানুষ আর উপর মহলের কিছু সুবিধাবাদীর ছায়ায় কুয়েটে যে বিষবৃক্ষ বড় হয়েছে,তার কালো ছায়া আজ ক্রমশ সব কিছু গ্রাস করছে।
কিছু করার এখনই সময়।ইতোমধ্যে অনেক দেরী হয়ে গেছে। বর্তমান আর সাবেক সব কুয়েটিয়ান,আর দেশের শিক্ষাঙ্গনের শুভাকাঙ্খী সবাইকে এক হবার আহ্বান জানাই।বুয়েটিয়ানরা এক্ষেত্রে অলরেডি একটা নজির গড়েছে।
আমাদের সর্বজন স্রদ্ধেয় হাশেম স্যারের ফেসবুক স্ট্যাটাসটা বার বার মনে পড়ছে-
“অনেক সাধের কুয়েট তুমি,
কোথায় চলে যাও......”

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

