আজকাল সময়ের সাথে দৌড়ে চলতে হচ্ছে। তার মধ্যে আমার এক লেখায়
ব্লগার মাহবুব সুমন মন্তব্য দিল, সে ঢাকায়। দেখা করতে চায়। একই কলেজের এলামনাই। পরিচয় ব্লগেই। একই কলেজের বলে ডাকে বড় ভাই বলে। ব্লগেই পরিচয়। ভার্চুয়াল পরিচয়ের চ্যালেঞ্জ বেশী। কারণ, ভার্চুয়াল প্রোফাইল আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার প্রোফাইলে মাঝে মিল খুঁজে পাওয়া একটু কস্টকর। অক্ষরে অক্ষরে একটা মানুষের বিমূর্ত চেহারা সামনা সামনি দাঁড় করালে অনেক সময়ই হোঁচট খেতে হয়। তাই, বাসা থেকে বেরোলাম এক ঝুঁড়ি কৌতুহুল নিয়ে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে ব্লগিং করলেও বাংলা ব্লগের সবার দৌড়ের আদ্যোপান্ত সুমনের এক্কেবারে ঠোটস্থ। বাঙ্গালী, বিহারী, জার্মান, অস্ট্রেলিয়ান, বিলেতী, দেশী সব ব্লগারের সাথে রয়েছে তার বিশেষ সখ্যতা আর অন্তরঙ্গতা। এধরনের মিশুকি মানুষ বড্ডো বিরল। খুবই ইন্টারএক্টিভ ব্লগার হলে মাঝে মাঝে চ্যালেঞ্জে পড়তে হয় তা অবশ্য সুমন ভালভাবেই জানে। তাই জিমেইলে যোগাযোগ হলো। প্রথমে ঠিক হলো দেখা হবে আড়ং-এ। তারপর বললাম, আড়ং-এ একটু সমস্যা আছে। রাপা প্লাজাতেই দেখা হবে। সেখান থেকে অন্য কোথাও যাওয়া যাবে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টা।
যেমন কথা তেমন কাজ। এবার মাহবুব ব্লগে দিয়ে দিল তার মোবাইল নাম্বার। বলল, টি শার্ট, নেভী ব্লু প্যান্ট, সাথে বউ আর মাথায় ....। এর মধ্যে সে একবার মন্তব্যের ঘরে জানিয়ে দিল, ত্রিভুজকে নিয়ে আসবে কি না? আমি উততর দিলাম, আনলে মজাই হবে। আর অনেকের মতো বাংলা ব্লগে ত্রিভুজের অবদান অনেক বেশী। তাই তার সাথে দেখা হওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল। ব্লগে মন্তব্যের ঘরে অনেকেই জানাল, তারাও আসতে চায় আড্ডায়। আমি সবাইকে বলে দিলাম, মাহবুব সুমনের সাথে আলাপ করে ঠিক করে নিতে। কো অর্ডিনেশন করা বড্ডো কঠিন কাজ। নিজের ঘাঁড়ে সেটা কখনও টেনে আনতে চাই না।
শুক্রবার বিকেল হতেই তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলাম। রিকশা করে লালমাটিয়ার ভেতর দিয়ে ২৭ নাম্বার রোড হয়ে রাপা প্লাজাতে আসলাম ছ'টা কুড়িতে। রিকশা থেকে নেমে প্রমাদ গুণলাম পকেটে হাত দিয়ে। মোবাইল ফোনটা আনা হয়নি। কি বিপদ!!! আজকাল নিজে এতো ভুলো মনা হয়েছি যে কোথাও শুধু নিজের হাত পা নিয়ে যেতে পারলেই ধন্য মনে হয়। এদিকে সাতটার দিকে সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে। বিপদ আর কাকে বলে!! শপিং কমপ্লেক্সগুলোতে লোকজন জটলা করে বসে থাকে এই সময়টায়। সময়টা আসলেই খারাপ ছিল।
প্রথম তলার এস্কিলেটরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। হঠাত মনে হলো, সুমনকে যে ইমেইল দিয়েছি রাপাতে আসার জন্য সেটা কি সে পড়েছে? মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই পড়ার কথা। খুব চটপটে ছেলে। সবকিছুই তার চোখে পড়ে এটা হয়তো অনেকর চোখেই পড়ে না। রাপাতে পরিচিত কাওকে চোখে পড়ল না। এস্কিলেটর দিয়ে উঠে এলাম দোতলায়। শাড়ীর দোকানের সামনে দু'জন দোকানদার তাকিয়ে রইল আমার দিকে। চোখে হাজারো জিজ্ঞাসা। ভাবটা এরকম, "ভাইজান কি ছাগল হারাইছেন"? হঠাত দেখি ত্রিভুজের মতো হেংলা পাতলা একটা ছেলে হেঁটে আমার দিকে আসছে। চেহারা দেখে নিশ্চিত যে, এ ত্রিভুজ না হয়ে যায় না। তার মানে, সুমনও আশেপাশে ঘুপচি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। মজা নিচ্ছে। আমার দিকে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে ফেলল। আমি কিছু না ভেবেই বোকার মতো জিগ্যেস করে ফেললাম, "কে, ত্রিভুজ না কি"?
ছেলেটা ত্রস্ত পায়ে সোজা হাঁটা দিল। কিন্তু কানে বাজল তার কমেন্টটা, "চশমা পড়লেই কি ত্রিভুজ মনে হয় না কি"? মাথাটা ঝিম করে ধরল। ব্রেন সেলগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এনালাইসিস করে বলল, "এই ছেলে ত্রিভুজ না হয়ে যায় না"? অনেকটা দৌড়েই পিছু নিলাম। দেখলাম, হেংলা পাতলা ছেলেটা টের করতে পেরে দ্রুত দোতলায় বাম দিকের সুসজ্জিত কসমেটিকস আর চুড়ির দোকানের ভেতর ঢুকে পড়ল। মনোযোগ দিয়ে সে চুঁড়ির ডিজাইন দেখছে। মহা তাজ্জবের ব্যাপার। অন্য পাশে ক'টা কলেজ বয়সী শপিং করছে। মনে হলো ত্রিভুজ তার কোন আপুর জন্য চুঁড়ি কিনছে অথবা আমাকে এভয়েড করার জন্য ভান করছে। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল দোকানের বাইরে আমার আকীর্ণ দাঁতের হাসি। চশমার ফাঁক দিয়ে তার রাতজাগা রক্তঝরা চোখ দেখে মনে হলো, এখনই আমারে দাবড়ানি দেয়। প্রমাদ গুণলাম। শাড়ীর দোকানের সেলসম্যান দু'জন আমার ত্রিভুজের পেছন নেয়াটাকে ভালভাবে দেখেনি। তারা দেখলাম,আমার দিকে হেঁটে আসছে।
এবার সত্যি সত্যি আমি ঘাবড়ে গেলাম। ভয়ে হাত পা পেটের ভেতরে ঢোকার জো। নারীঘটিত মামলায় জেলে যেতে রাজী আছি, কিন্তু পুরুষ ঘটিত...। ইয়ে ছি...। আর নিরাপদ ভাবলাম না। সেলসম্যান দু'জনকে আর নিরাপদ মনে হলো না। দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, সেলসম্যানগুলোর এখন চোখ ঢেকে দিয়েছে কালো চশমায়। বুঝতে আর বাকী রইল না। আপাতত সুমনের নিকুচি করে আমি নিজেই ত্রস্ত পায়ে নীচের দিকে নামলাম এস্কিলেটর ধরে। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।
২৭ নাম্বারের মোড়ে এসে রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরতে থাকলাম। মনে মনে প্রমাদ গুণলাম, কাজটা একটু রিস্কী হয়ে গেছে। হুট করে কারও সাথে দেখা করার প্ল্যানটা মোটেও ভাল না তা হাড়ে হাড়ে টের করলাম। দেখা হবে সুমন অন্য কোন সকালে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

