somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প

২৫ শে জুলাই, ২০০৯ রাত ১২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নৈঃশব্দিক আঁধার অথবা ঘুণপোঁকার গল্প
অঞ্জন আচার্য

১.
ডাক্তার শ্রেণিটাকে অর্ক যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। যদিও এদের অনেকের সাথে তার ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। তবে কেউ কেউ আহমাদ মো¯তফা কামাল। যারা সত্যিকারের ডাক্তার। অমায়িক ব্যবহার। অনেকের মতো রুগী পেলেই আনন্দে লাফিয়ে উঠেন না। বরং সহানুভুতিশীল হন। মধ্যবয়স্ক নিউরোলজিস্ট। ডাক্তার হিসেবে মোটামুটি নাম ডাক আছে। তাছাড়া গল্প-উপন্যাস লিখে ইতিমধ্যে খ্যাতিও পেয়েছেন। একসময় তিনি জিজ্ঞাসা করেনদেখুন মিস্টার অর্ক, আপনি এতক্ষণ যে প্রবলেমগুলোর কথা বললেন তা সাধারণত লেখক বা শিল্পীদের, আই মিন ক্রিয়েটিভ পারসনদের বেশি দেখা যায়। আপনি কী সেরকম কোনো কাজের সাথে ইনভোল্বড্?
না। কেন? রোগেরও আবার ডেফিনেশান আছে নাকি?
হা, তা কিছুটা আছে। এখানে সেনসিটিভিটির প্রশ্ন। সাধারণত ওদের সেনসিটিভিটি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে।
তাই? জেনারেল পিপলরা বুঝি এই প্রবলেম ফেইস্ করতে পারে না?
 পারে তবে এই কেইসে তা খুব রিয়েল। আচ্ছা, আপনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বা ভিনসেন্ট ভ্যানগগের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন?
দৃঢ় কণ্ঠে অর্ক উত্তর দেয়না শুনিনি (মিথ্যা। অর্কের এদের দু’জনের সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানা)।
ও আচ্ছা। আপনার বুঝি বই-টই খুব বেশি একটা পড়া হয় না, তাই না?
একদমই না। বলতে গেলে ভালো লাগে না। এই দু’একটা সস্তা প্রেমের উপন্যাস পড়েছি-এই যা!(আবার মিথ্যা, পাঠক হিসেবে সে সর্বভুক)
ওকে! একটা সিটিস্ক্যান করাতে হবে। আপাতত কিছু ওষুধ দিচ্ছি। আচ্ছা, এই প্রবলেমটা কত দিন ধরে চলছে?
খুব বেশি দিন না। হঠাৎ হঠাৎ হয়।
ডাক্তার কামাল জিজ্ঞাসা করে-কখন কখন?
এই ধরুন খুব ইমোশনাল কিছু ঘটলে।
যেমন?
কোনো পেইনফুল কথা...
বলুন, বলুন...
প্রসঙ্গটা হাল্কা করতে চায় অর্ক। বলেদেখুন, এটা আমার খুব সামান্য সময় থাকে। তারপর আবার ভালও হয়ে যায়।
ডাক্তার কামাল মাথা নাড়ায়। বলে-নিউরোসিসের ভাষায় এটাকে বলে...
কথা থামিয়ে অর্ক বলে-এটা বলে কী লাভ? প্রবলেমটা কী সেটা বলাই বেটার!
মোস্তফা কামাল লজ্জা পায়। বলে-হা, বর্তমানে কী অবস্থা?
বুঝিনি। অর্ক জিজ্ঞেস করে।
মানে, নিজের ভেতর কোনো চেইঞ্জ দেখছেন?
কিছুটা। আগে আমার মেমোরি খুব সার্প ছিল। বাট্ ইদানীং কিছুই মনে থাকে না। ঘনিষ্ট কারো নাম পর্যন্ত না। বেসিক্যালি এই জন্যই আসা।
আর কিছু?
মাঝে মাঝেই আউট অব কন্ট্রোল হয়ে পড়ি। তখন ব্রেন টেম্পারমেন্ট খুব হাই হয়ে যায়। ঠুন্কো ব্যাপারেও খুব রেগে যাই। কিছুক্ষণ পর রাগ নেমে গেলে খুব ক্লান্ত লাগে। তখন আর কিছু ভালো লাগে না...
দেখুন মিস্টার অর্ক, আমার ধারণা কোনো একটা ঘটনার পারপাসে আপনি দীর্ঘদিন হাইলি ডিপ্রেশানে ভুগছেন। সো....ব্রেনের একটা সাইট এফেক্টেড হয়ে পড়েছে। বাট্ নট্ সিরিয়াস। রিপোর্ট দেখলেই বুঝতে পারব। আচ্ছা, অনেস্টলি বলেনতো-মন খারাপ থাকলে আপনি কী করেন?
একটার পর একটা সিগারেট খাই। মাঝে মাঝে গান শুনি....এই.....
ওকে। বাট্ সিগারেট ছাড়তেই হবে। লাংকের অবস্থা নট্ সো স্ট্রং। আই থিংক ইউ মাস্ট বি কিওর এ্যাজ আরলি এ্যাজ পোসিবল...সব ঠিক হয়ে যাবে...
ঠোঁটের এক কোণে আঁড় হাসি রেখে অর্ক টেনে টেনে বলে-
তাই? সসস-ব ঠিক হয়ে যাবে??
এই হাসিতে স্পষ্টত বুঝা যায় সিগারেট সে ছাড়তে চায় না।






২.
অর্কের মন ভালো নেই। কারণ মা ভালো নেই। বিছানায় শুয়ে আছে। এই অবস্থা দেখতে ভালো লাগে না। ঘর থেকে বের হয়ে যায়। মোবাইলটা হাতে নেয়। ডায়েল করে প্রাচীর নম্বরে। স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে প্রাচী বলে-
হ্যালো, হে, কী ব্যাপার?
অর্ক চুপচাপ শুনে যায়। হ্যালো শুনেই বুঝতে পারে মুডের অবস্থা। এই মুড গত ছয় মাস ধরে চলছে। প্রাচী আবার বলে-হে, কিছু বলার আছে?
এক শব্দে অর্ক উত্তর দেয়-নাহ্।
ওকে। ফোন রাখব। এই কথা বলেই ফোন রেখে দেয়।
অর্ক আবার ফোন করে। এবার চিৎকার ভেসে আসে-হে, কি? কী হইছে? বলছি না কথা বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। ফাজিল কোথাকার!

এই হলো অর্কের প্রতি প্রাচীর বর্তমান শ্রদ্ধাবোধ। অথচ একসময় তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তার এতটুকু অপমান প্রাচী কোনো দিনই হতে দেবে না। বাট্ টু-ডে ইজ নট্ লাইক বিফোর....

৩.
রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার কামাল বলে-যা ভেবেছিলাম তাই। দ্যাটস্ নট্ অ্যা ভাইটাল কেইস। জাস্ট একটু কোয়াপোরেশান লাগবে।
ক্যামন? ভ্র“ কুঁচকে অর্ক প্রশ্ন করে।
আরও কিছু ওষুধ দিচ্ছি। নিয়মিত খাবেন। সিগারেট মাস্ট ছাড়তে হবে। নো টেনশান, ওটাকে ঝেরে ফেলুন। একটু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। আর সবচেয়ে ইম্পোর্টেন্ট হচ্ছে, চিয়ার্স! আই মিন অল টাইম হাসিখুশি থাকা। নেভার মাইন্ড, আপনার কোনো ভালো বন্ধু আছে?

অর্ক মাথা দুলিয়ে না জানায়। ঠোঁট কামড়ে ধরে।
ও...তাহলে পরিবারের কাউকে লাগবে যার সাথে আপনি সব কিছু শেয়ার করেন।
মা আছে। বাট্...
ওকে ফাইন। ওনাকেই নিয়ে আসবেন।
অর্ক বলেদেখুন, এ ব্যাপারে আমি কাউকেই জড়াতে চাচ্ছি না।
মানে? কি বলছেন? আরে আপনার এখনও পর্যন্ত কিছুই হয়নি। জাস্ট প্রিলিমিনারি স্টেজ। অল উইল বি ওকে। দেখুন মিস্টার অর্ক-লাইফ ইজ কালারফুল। তাছাড়া...
কথাগুলি তার খুব বিরক্তি লাগে। বলে-
তাছাড়া কী?
তাছাড়া বাঁচতেতো হবে তাই না?
শরীর একটু ঝাঁকিয়ে নাক দিয়ে একটা ‘হু’ শব্দ করে অর্ক। বলে-কে বলল আমি বাঁচতে চাই?
মানে! ডাক্তার কামাল বিস্মিত হয়।
ভয় নেই। সুইসাইড করার মতো দুঃসাহস নেই। (মনে মনে ভাবে আহ্-যদি হেমিংওয়ে বা ভ্যানগগের মতো সাহস থাকতো...তাহলেই...)

এইটুকুই কথা। অর্ক বেরিয়ে আসে চেম্বার থেকে। হাতে ধরা রিপোর্টগুলো ছিঁড়ে ড্রেনে ফেলে দেয়। একটা সিগারেট ধরায়। শরীর খুব ক্লান্ত লাগে। অনেক কিছু করার বাকি। প্রাচীর সাথে প্রথম দেখা রমনা থানার সামনে দাঁড়াতে হবে। প্রথম স্পর্শের দিন-সেই রাজবাড়ির সিঁড়িটায় উঠতে হবে। নেত্রকোণার সেই অজোপাড়াগাঁয়ে-যেখানে একসময় তীব্রটানে পকেটে সামান্য পয়সা নিয়েই ছুটেছিল তাকে এক পলক দেখতে-সেখানে যেতে হবে। শাহ্জালাল ভার্সিটির সেই পথ ধরে আবার হাঁটতে হবে। অনেক কিছু করার বাকি। সময় খুব কম। পা চালাতে হবে। দ্রুত চালাতে হবে। ক্লান্ত শরীর নিয়েই ছুটতে চায় অর্ক। খুব দ্রুত ছুটতে চায়। হাঁটতে থাকে-গতি বাড়ে-শ্বাস বাড়ে-আরো দ্রুত-আরো-আরো-হঠাৎ আছড়ে পড়ে রাস্তায়। বাম পায়ে চোট খায়। মাংস থেতলে যায়। পা বেয়ে রক্ত ঝরে। উঠে দাঁড়াতে চায়-পারে না। তীব্র যন্ত্রণায় চোখ মুখ কুঁচকে যায়। হাত দিয়ে পা চেপে ধরে । কেউ নয়-সেসময় কেউ নয়-কেন জানি শুধু আর্তনাদের ভেতর দিয়ে প্রাচীর কথা মনে পড়ে যায়.....

০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×