সাদামাটা জীবনের পদাবলী
১. তেল চিটচিটে কালো ধোঁয়া আর স্যাঁত-স্যাঁতে ঘর। দেয়াল জুড়ে যেন আলকাতরা মাখা। গা ঘিন-ঘিন করা কালচে তেলাপোকা আর বিদঘুটে টিকটিকির সহবস্থান। পাশাপাশি দুটি মাটির চুলা জ্বলছে। সেই ভোর বেলা থেকে নানা কসরৎ করে জ্বালাতে হয়। কয়লা আর আমলি কাঠের উপর কেরসিন ঢেলে আগুন জ্বালাতে হয়। দপ করে জ্বলে ওঠে। আবার নিভে যায়। তারপর সরু একটা চোঙা দিয়ে জোরে জোরে ফুঁ দিতে হয়। প্রতিদিন ফুঁ দেয় যে মানুষটি তার গায়ে হাড্ডির উপর এক পরত চামড়া বসানো। গায়ের রঙ একসময় হলদেটে ছিল। তবে গনগনে আগুনের আঁচের সাথে গাঢ় বন্ধুত্বের সুবাদে এখন তা তামাটে হয়ে গেছে। চুল তার উশকো খুশকো। কপালে পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে। এক সময় ভারী একটা কড়াই চুলা থেকে নামায় গায়ের সবটুকু শক্তি বিসর্জন দিয়ে। তারপর উঁচু পিড়িতে দপ করে বসে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ছ্যাড়া ময়লা শাড়িটা দেখে বোঝার উপায় নেই তার আসল রঙ ও নকমা কী ছিল। সেই শাড়ির এক কোনা ছ্যাড়া আচল দিয়ে কপালের ঘাম মোছে।
২. স্বামীর একমাত্র অবলম্বন সততা। পরিবারে অর্থের জোগান দিতে পারেনা বলে স্ত্রীকে ভোর থেকে রাত অব্দি ঐ ঘরেই থাকতে হয়। দেবর বলে - বৌদি ভাত, ননদ বলে - বৌদি আমার কমলা রঙের জামাটা, ভাশুর বলে - কী হলো এখনও চা হয়নি,শ্বশুর বলে - বৌমা আমার কাশের ওষুধ, শাশুড়ি বলে - আমার পানের কৌটাটা .........। স্বামী তার নিষ্পলক দেখে যায় স্ত্রী একবার এ ঘরে তো অন্যবার অন্য ঘরে কেবল ছুটছেই তো ছুটছে।
৩. স্বামী-স্ত্রীতে কখনও একে অপরকে ‘তুমি’ করে ডাকা হয়নি। এই যে, ওই যে ইত্যাদি ভাববাচ্যেই কথা সারা হয়। তারপর স্বামী তার সততাটুকু গচ্ছিত রেখে ও চার সন্তানকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সুরঙ্গে ফেলে দিয়ে চিরতরে চোখ বন্ধ করেন।
৪. অতপর সেই সব আত্মচিৎকার ও আশ্রয়হীন মানুষের নিয়ত অন্ধকারের গল্প। সন্তানদের কেউ কোলে, কেউ স্কুলে, কেউ বা কলেজের বারান্দায় ভয়ে ও জড়তায় হাঁটছে। তবে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার শক্তি আছে তাঁর। এই নির্মম সমাজ তাকে নত করতে পারেনি। প্রথমে বড়টাকে পাঠায় শহরে রোজগারের তাগিদে। মেঝোটা লেখাপড়ায় ভালো। সেও পড়তে যায় শহরে। সেঝোটা একদিনের জেদাজেদিতে সেই যে নিজের জন্মস্থান ছেড়ে শহরে এলো আর ফিরলো না। স্বামীর মৃত্যুর পর সেই নারীর স্থান হয়েছিল এক পরিত্যাক্ত জীর্ণ ঘরে। ফুটো চাল বেঁয়ে বৃষ্টির জল পড়ে। ঘর-দোর ভাসিয়ে যায়। সেইসব ভাসমান জীবনের পদাবলী লেখা হয় শহরের কোনো এক প্রান্তে এসে।
৫. এখনও সেই নারী আগুনের তাপে নিজেকে সেঁকে নেয়। তবে দেবর, ননদ, শ্বশুর-ভাশুর নয় ; চার সন্তানের উদরপূর্তিতে। আগুনের হলদেটে লাল আভায় কখনও দিকশূন্য চোখে তাকিয়ে থাকে। মাথায় রূপালী এলোমেলো চুল। কথা বলতে চাইলে কথা বলে। বেশিরভাগ সময় নিরবেই কেটে যায় সময়। কখনও হাসে কখনও বা হাসার চেষ্টা করে মাত্র। হাসলে পরে পান খাওয়া খয়েরি দাতগুলি ভেসে ওঠে। নিজের নামটুকু লিখতে বললে অনিহা প্রকাশ করে। তবে দায়ে পড়লে নিজের নামটি গুটিগুটি অক্ষরে লিখতে গিয়ে বর্ণমালাগুলোকে সমতল থেকে পাহাড়ে তুলে দেয়। তারপর কাগজ সোজা করে ধরে চোখ-মুখ কুঁচকে বলে - ইশ ! আজকাল একদমই চোখে দেখি না।
মা, তোমার চার সন্তান ঠিকঠাক চোখে দেখেতো ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


