অঃপর আমি ও সুমন ছেলেটির কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলাম ও তাকে দু-একটা সান্ত্বনার বাক্য দিয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম এবং পরবর্তী সমেয় আমরা দুজনই সম্মতিক্রমে এক জায়গায় এসে পৌঁছলাম যে, ছেলেটির জীবন নিয়ে আমাদের যে নাটক তৈরি করার কথা ছিল তা আর করব না, কারণ তার জীবনের ঘটনা তেমন একটা বৈচিত্র্যময় মনে হয়নি যাতে করে আমাদেরকে তেমন একটা নাড়া দিতে পারে এবং আমরা যতদূর জানি এমন স্থূল ঘটনা শহরের অলিতেগলিতে অহরহ, অসংখ্য মানুষের জীবনেই ঘটে থাকে- কেননা আমরা জানি প্রত্যেক মানুষের জীবনই এক একটা গল্প-উপন্যাস, সিনেমা-নাটক; তাছাড়া আমরা দুজন ছাড়া ছেলেটিকে যারা চিনি অথবা চিনি না অথবা চিনলেও যারা তার জীবনের সব ঘটনা জানি না, তাদের জন্য সংক্ষেপে তার জীবনীটা বলা যেতে পারে- তবে এত অগোছালোভাবে সে তার জীবনের বর্ণনা করেছে এবং প্রায় সময়ই ঘটনার খেই হারিয়ে আবেগ আপ্লুত বা উদাসীন হয়ে গেছে যে, তাতে করে অযথা সময় নষ্ট হওয়ার চেয়ে তাকে বারবার নস্টালজিয়ায় ফেলে দেয়া আমাদেরকে অনেক বেশি অস্বস্থিতে ফেলে দেয় এবং চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে নাটক তৈরি করা না হোক- নিদেনপক্ষে গল্প লিখে তা ছাপার অক্ষরে দেখার যে আকাঙ্ক্ষা তার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছিল তা আমাদের ভাবনায় নতুন খোরাক জোগায় এবং আমরা দুজনে সম্মতিক্রমে এক জায়গায় এসে পৌঁছি যে, তার ঘটনাটা গল্প আকারে ছাপাবো এবং তাকে তা দেখিয়ে বলবো প্রতিটি মানুষই চূড়ান্ত অর্থে একা এবং মানুষে মানুষে কখনো বিভাজ্য হয় না, ভাগফল সব সময় এক থেকে যায়।
তাই কোনো এক দুপুরে এক থালা ডাল ভাত নিয়ে বসা ছেলেটি পাশের ঘর থেকে নাকে বিরিয়ানীর গন্ধ পায়, জ্যেঠাতো ভাইয়ের মাংসের হাড্ডি চেবানোর শব্দ শুনতে পায়; মা তাকে সান্ত্বনা দেয় - যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার, পূজার দিনে রকমারি সুদৃশ্য পোশাক পরা পাড়ার সব বন্ধুরা এক এক করে সবাই ঘর থেকে বের হয় পোশাকের চাকচিক্য ও অহংকারের নীরব প্রতিযোগিতা নিয়ে; চোখে তাদের আনন্দ উচ্ছ্বাস, অথচ ওরা তিন ভাই বসে আছে বাবার প্রতীক্ষায়- ঘরে পায়চারি করে এবং বারবার রাস্তার পাশের জানলা দিয়ে তাকায়, বাবা আসে না; প্রতীক্ষার পর প্রতীক্ষা, কখন বাবা তাদের জন্য নতুন জামা নিয়ে আসবে- কখন তারা বের হবে; মণ্ডপে প্রতিমা দেখার সময় বয়ে যায়। অবশেষে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ক্লান্ত শরীরে বাবা ঘরে ফেরেন, হাতে এক জোড়া শার্ট; তিন ভাই - দুই শার্ট। ভাগাভাগি হয়। সবাই সবাইকে দিতে চায়। মনে মনে সবাই পেতে চায়। অবশেষে ছোট ভাইটি তার পুরনো জামা থেকে বেছে নেয় একটা শার্ট। সেটা পড়েই বের হয়। নতুন জামা আর তার পড়া হয় না। মা তাকে সান্ত্ব¡না দেয় - যা আছে তাই নিয়ে খুশি হওয়ার। ছেলেটি খুশি হয়। অতঃপর কোনো একদিন হুট্ করে বাবা মারা যায়। চলে যায় ঈশ্বরের প্রতি তার জমানো তীব্র বিশ্বাস। নিজেকে মুক্ত করে দেয় পূজাকেন্দ্রিক হাজারও সামাজিকতা থেকে। আর সবার মতোই ছেলেটি একসময় বড় হয়। আর অনেকের মতো হুট্ করে প্রেমও আসে তার জীবনে। আবার কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেকের মতো হুট্ করে ভেঙেও যায়। তবে এখন আর তার মায়ের সান্ত্বনা লাগে না। জীবনে অনেক অনেক কিছু না পাওয়ার স্বাদ পেতে পেতে এতদিনে সে শিখে নিয়েছে - যা পেয়েছিল, অতটুকুই তার জন্য ছিল। যা পায়নি তা তার কখনোই ছিল না। জীবন ঘষে সে শিখেছে কাছাকাছি আসা মানেই সবকিছু কাছে আসা নয়। ফলে সে এখন একা এবং চূড়ান্ত অর্থে একজন সাদা কালো মানুষ, যে নাকি ফুটপাত থেকে একটা রঙিন চশমা কিনে চোখে লাগিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়ায় এবং রঙিন রঙিন মানুষ দেখে আর সন্ধ্যার আগে আগে চোখ থেকে চশমা খুলে নীরবে ঘরে বসে সস্তা প্রেমের কবিতা লিখে যায়.....
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সকাল ১১:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


