ইপ্তি মা বাবার এক মাত্র সন্তান।বাবা একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। মা গৃহিনী। তিন জনের খুব গোছালো সুখী সংসার। ছাত্র হিসেবে ইপ্তি আইডল হতে পারে অন্য ছাত্রদের। এলাকেতেও সে খুব ভাল ছেলে হিসেবে পরিচিত। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ছোট বেলা থেকেই ঢাকাতেই বড় হয়েছে।
সুমি, বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে এবং পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। তারা ৩ ভাই বোন। সুমি থাকে চট্রগামে। সে এখন কলেজে পড়ছে। পরিবারের ছোট সদস্য যদি মেয়ে হয় তাহলে সে কত আদরের হয় বড়দের কাছে তা মোটামুটি আমারা সবাই জানি।
ইপ্তির সাথে সুমির পরিচয় ঘটে নেটের মাধ্যমে। কথা বলতে বলতে দুজন খুব ভাল বন্ধুতে পরিনত হল। শুরুর দিকে কেউই কারও ছবি দেখেনি। যখন বন্ধুত্বটা অনেক গভীর হল তখন ইপ্তি সুমির কাছ তার ছবি দেখতে চাইল। সুমি তখন বল্ল এতদিনে যখন কেউই কাউকে দেখিনি তখন একবারই দেখব যদি কখনো দেখা হয়।ইপ্তিও আর জোর করল না।
এই ভাবেই চলছিল। মোবাইলে কথা বলা, এস এম এস শুধু ফেবু ছাড়া। তারা ইচ্ছে করেই কেউ কাউকে ফেবুতে এ্যাড করেনি। সবই হবে দেখা হওয়ার পর। কিন্তু দেখা কিভাবে হবে ?? দুজন যে দুজায়গায় থাকে। তাতে কি ?
ইপ্তি ২দিনের জন্য চট্রগ্রাম চলে গেল।দুজনের জেন প্রহর শেষ হচ্ছে না। দুজনই ভাবছে দেখতে কে কেমন হবে। ইপ্তি ভাবতে লাগল চোখ বন্ধ করে ..."সুমি, সু......মি , ভাবতে লাগল,তার চোখ কেমন হবে, মুখ কেমন হবে...সুমি কাল কি পরে তার সামনে আসবে, সুমি কি টিপ পরবে? টিপ ইপ্তির অনেক পছন্দের। ইপ্তির যেন আর ঘুম আসছে না। "
আর সুমি তার ও ঘুম যেন বলছে আজকি রাত না হলেই হত না। সে ইপ্তিকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। ইপ্তি দেখতে কেমন , মনে হতেই....না, আগে থেকেই কিছু ভাববনা। পরে যদি না মিলে কষ্ট পাওয়া লাগবে। আগে দেখা হোক তারপরই ভাবা যাবে। দুজন মিলে ঠিক করল কাল দুপুরের দিকে দুজন দেখা করবে। কে কি পরে আসবে তাও ঠিক। ইপ্তি পরবে জিন্স আর সাদা টিশাট। সুমি পরবে লাল রং এর সেলোয়ার কামিজ। খোপায় থাকবে ফুল আর কপালে লাল টিপ। টিপ এর কথা শুনেতো ইপ্তির আর তর সইছেনা। কখন ভোর হবে , কখন ভোর হবে ????
রাত তিনটায় ইপ্তির মোবাইল বেজে উঠল। ঢাকা থেকে ফোন এসেছে। এত রাতে নাম্বার দেখেই ভয় পেল। এত রাতে তো ফোন করার কথা না। ফোন টা রিসিভ করতেই তার বাবার কন্ঠস্বর শুনল। তোমার বড়চাচা স্টোক করেছেন। এখন হসপিটালে আছে। তুমি কাল ভোরেই রওনা দাও। ওনার অবন্থা আশংকাজনক। ডাক্তার নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। ইপ্তি কি করবে বুঝতে পারছে না। বড় চাচা তার অনেক প্রিয়। আর চাচা চাচী দুজনেই তাকে অনেক আদর করেন। তাদের কোন সন্তান না থাকাতে তারা ইপ্তিকে নিজের ছেলের মতই দেখেন।
কি করব ? সুমি কে কি একটা ফোন করব ? না থাক । ও ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। আর ও অনেক কষ্ট পাবে। আরো কষ্ট পাবে যখন শুনবে আমি কাল দেখা করতে পারবনা। যখন কষ্টই পাবে থাকুক না আরেকটু বেশী সময় সুখের মধ্যে। সকালে না হয় বলব।
ভোর বেলায় ইপ্তি ঢাকায় রওনা দিল। দুপুরের মধ্যে পোঁছে যাবার কথা। বাস এ উঠতেই সুমিকে একটা এস এম এস করে দিল। "আমাদের বুঝি এইবার আর দেখা হল না, আমাকে ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে বড় চাচা রাতে স্ট্রোক করে হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন।তবে আজ যা যা পরার কথা ছিল তাই পরেছি, আর তুমিও তাই পরে থাকবে সারাদিন"।
সমি যখন এস এম এস টা পড়ল তার অনেক দিনের বুনো স্বপ্ন যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেল। সারাদিন সুমির মন খারপ ছিল। সে সেভাবে সেজেছে ঠিকই কিন্তু যার জন্য সে যখন থাকবে না তখন এই সাজগোজ তার কাছে অসহ্য লাগছিল। তার পর ও খুলছিল না, না খোলাতেও সে অজানা এক আনন্দ খুজে ফিরল।হয়ত বা ইপ্তি চেয়েছে তাই সে খুলতে পারছে না ।
ইপ্তি দুপুরের পর হসপিটাল এ আসল। ততক্ষনে তার চাচা আর নেই। নিস্তব্ধতা চারিদিকে ঘিরে আসল। নিজে কে সামলে নিয়ে ইপ্তি তার চাচিকে ছেলের মত করেই সান্তানা দিল। ওদিকে দুপুরের পর থেকে ইপ্তির কোন কবর না না পেয়ে সুমির ও মন খারাপ।
রাতে ইপ্তি সুমি কে ফোন করল। দুজন দুজনের ভাগ্যকেই মেন নিল। এই ঘটনার জন্য। আবার দুজনের কাথা বলা এস এম এস করার মধ্যদিয়ে প্রেম মধুময় হযে উঠল। দুজনের মনে মনে প্রতিজ্ঞা সামনাসামনি না দেখার আগ পর্যন্ত কেউ কারো ছবি দেখবান।
ছয় মাস পর........
আবার ইপ্তি চট্রগামে দুদিনের জন্য। সুমির সাথে দেখা করবে। আবার একই ভাবে স্বপ্ন বুনন। একই ভাবে দুজনের চিন্তা একই ভাবে জামা কাপড় পরার আয়োজন। তবে এই বার ইপ্তি জিন্স আর শট পাঞ্জাবী পরবে আর সুমি পরবে গাঢ় লাল রং এর শাড়ি। সবই ঠিক । এইবার দেখা করার সময় বিকাল বেলা।
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস..দুপরের পরই সুমিদের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।এলাকায় প্রভাব বিন্তার কে কেন্দ্র করে দুই গ্রুফের মধ্যে মারা মারি হয়েছে। কয়েক জন কে আশঙ্কা জনক অবস্থায় হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। এই অবস্থায় বাসা থেকে কোন ভাবেই বের হওয়া যাবে না। আর ইপ্তি ও চাচ্ছে না সুমি এখন বাসা থেকে বের হোক।
তার পরদিন সকাল বেলা দেখা করবে। এরপর ইপ্তি বিকালে ঢাকায় রওনা দিবে। যাই বার বুঝি দেখা হবে। চাপা কষ্ট মনে চেপে রেখে দুজনের কালকের আনন্দের দিকে তাকিয়ে থাকল।
ইপ্তি একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে। অপেক্ষকার পহর গুনছে। কোন ভাবেই যেন সময় যেতে চাইছে না। থমকে আছে যেন ঘড়ির প্রতিটি কাটা। ইপ্তি ইচ্ছে করছে সব ঘড়ির কাটা গুলোকে সি ঘুরিয়ে দিতে। যেন তাড়া তাড়ি সময় চলে যায়। এমন সময় ইপ্তির মোবাইলে একটা এস এম এস আসল।
এস এম এস টা পড়তেই তার সব আনন্দ নিমেষেই ফিকে হয়ে গেল। আজও বিদাতার কি অদ্ভুত আচরনের কারনে তাদের দেখা হচ্ছে না।
সুমি যখন রেডি হচ্ছিল তখন তার ভাই তাদের বাসার ছাদ থেকে পড়ে যায়। সবাই এখন তাকে নিয়ে বস্ত। এখন সবাই মিলে হসপিটাল যাচ্ছে।
ইপ্তি ঠিক কাকে দুষবে ? নিজের ভাগ্যকে ? নাকি বিধাতাকে ?? কেন বার বার তার সাথে একই ঘটনা ঘটতেছে। আবার ও মনের কষ্ট নিয়ে তার ঢাকায় আগমন।
যেহেতু দুর্ঘটনায় কারোই হত নেই তাই দুজনই বাস্তবতা কে মেনে নিল। আবার সেই একই নিয়মে তাদের প্রেম চলতে লাগল। দুজনের মনের মিল এতটাই ছিল যে কেউ কারো সম্পর্কে কিছু ভাবলে বেশীর ভাগই মিলে যেত।
এইভাবে দেখতে দেখতে তাদের সম্পর্কের বয়স দেড় বছর পার করল।সুমি কলিজ ছাড়িয়ে এখন বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। তাই সে ঢাকায় চলে এল। এইবার তো তাদের দেখা করা খুবই সহজ। দুজনই ঢাকায়। যে কোন সময় ই দেখা করা যাবে।
তাই দুজনেই একটা দিন ঠিক করল। আর তা হল ইপ্তির জন্ম দিন। আর সুমির সাথে দেখা হওয়াটাই হবে ইপ্তির জন্মদিনের সেরা উপহার। আবার ও দুজনে মিলে আগের নিয়মে ঠিক করল কিভাবে কোথায় দেখা হবে। এই বার ইপ্তির কোন চেঞ্জ না হলেও সুমির শাড়ি বাদ পড়ল।
দুজনই ঠিক করল বিকাল পাঁচটায় একটা রেস্টুরেন্টে দেখা করবে। ইপ্তি আগেই পোছে গিয়েছে । আর অপেক্ষা করতে লাগল। এইবার সে কিছুই ভাবতে চাচ্ছে না। বসে বসে রাস্তায় তাকিয়ে দেখছিল । ওপাশ থেকে একটা মেয়ে রাস্তা পার হয়ে এই পাশে আসতে ছিল। পরনে তাই ছিল যেমনটি সুমির পরার কথা ছিল। যদিও সে শিউর না, তার পরও সে ভাবতে লাগল এই মেয়েটিই যেন সুমি হয। এক দেখাতে সুমি কে সে যেরকম বেভেছে তার চেয়ে বেশী সুন্দুরী মনে হতে লাগল।
কিন্তু ভাগ্য আর বিধাতা এমন সময় বুঝি তাদের দুজনের সাথে নির্মম খেলাটা খেলে পেলল। ভাবতে ভাবতে একটা চিৎকার ইপ্তির কান ভেদ করে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখে সে মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে আর চার পাশে মানুষ।
ইপ্তি হতভম্ব হয়ে ছুটে গেল। কিন্তু সে তো সুমি কে দেখেনি কিভাবে চিনবে ?? কিছু লোক সুমিকে পাশ্ববর্তী একটা হসপিটালে নিয়ে গেল। ইপ্তি আবার ও আগের জায়গায় ফিরে আসল। কিন্তু সুমি আসছে না কেন ??? সে সুমিকে ফোন করতে লাগল।
যারা হসপিটাল নিয়ে যাচ্চিল তাদের মাঝে এক জন ফোন রিসিভ করে বলল তারা এই ফোনের ব্যবহার কারীকে হসপিটাল নিয়ে যাচ্ছে। আপনি তাড়াতাড়ি হসপিটাল চলে আসুন।
ইপ্তি হসপিটাল গেল । মনে কোন আনন্দ ছিল না। এক অজানা ভাবানা নিয়ে হসপিটাল গেল। সুমির হাতে পাযে মাথায় বেন্ডিজ করা। সে ঘুমাচ্ছে। হসপিটাল থেকে সুমির বাসায় খবর দেওয়া হল। সুমির এক আত্মীয় হসপিটালে এলেন।
উনি ভেবে চিলেন ইপ্তি তাকে হসপিটালে নিয়ে এসেছে। ততক্ষনে সুমির জ্ঞান ফিরেছে। ইপ্তি নিজের পরিচয় না দিয়ে , সুমির সাথে কিছুক্ষন কথা বলে বাসায় চলে আসল। আর আসার সময় একটা এস এম এস দিল।
"আমি যা ভেবেছি তুমি তার চেয়ে অনেক সুন্দর। আমি ই ইপ্তি"।
দোয়া রইল তাদের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ১০:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



