এক
গল্পটা আমাদের এই শহরের। আমাদের চিরচেনা আলোক ঝলমলে শহরের। প্রতিদিন সকালে অসংখ্য মানুষ ঘুম থেকে ওঠে এই শহরে। অনেকে অনেক আগে থেকেই আছেন, কেউবা নতুন এসেছেন। সবাই ব্যস্ত, প্রচন্ড ব্যস্ত। জীবনের কোনো খেয়াল নেই, কে মরলো, কে বাঁচলো সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এখানে আমাদের মধ্যবিত্তের জীবন অনেক কালারলেস। সেই একঘেয়ে চাবি দেয়া পুতুলের মত জীবন। ৯টা-৫টা অফিস। পরিবার সামলান। বউয়ের সাথে সংসার নিয়ে ঝগড়া করা আর রাত্রি হলেই এক বিছানায় ঘুমানো। কত্ত বোরিং।
যার কথা বলব বাস্তব জীবনে তিনি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা একজন অতি সাধারণ মানুষ। হয়তো আমাদের বা আপনাদের কাছে তার জীবনের কোনো গুরুত্ব নেই। কিন্তু শেষ বিচারে তাকে আপনাদের খারাপ লাগবে না। অন্তত ঘেন্না করবেন না। ঘেন্নার প্রসঙ্গ কেন আনলাম সেটা অবশ্য গল্প শুরু করলেই বুঝতে পারবেন। গল্পে তাকে 'নায়ক' নামে সম্মোধন করব। হয়তো কোনো চরিত্রের নাম হিসেবে খুব একটা শ্রুতিমধুর নাম না তারপরও।
নায়কের বয়স আনুমানিক ২৩/২৪। উচ্চতা ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, ওজন ৬৮ কেজি। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনিই আমাদের গল্পের নায়ক, অন্ধকারের কীট। বিরক্ত হবেন না, প্লিজ। আমি আস্তে আস্তে তার ব্যাপারে বলব। একটু কষ্ট করে ধৈর্য্য ধরে শুনতে হবে এই যা।
দুই
গল্পের শুরু র্যাবের রিমান্ড রুমে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রক্তাক্ত নায়কের পানি চাওয়ার মধ্যে দিয়ে। যার ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কনেষ্টবল পানি নিয়ে আসবে। যে কনষ্টেবল জানে যে রাত আরেকটু পার হলেই ভোররাতের দিকে এই রুমের ফ্লোরে পড়ে থাকা ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীকে নিয়ে তার স্যারেরা অস্ত্র খুঁজতে বেরুবে এবং এসময় এই সন্ত্রাসীর বন্ধুরা তাকে ছাড়াতে এলে গুলি বিনিময়ের সময় এই সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে মারা যাবে। তাকে যা জিজ্ঞেস করার তা ইতোমধ্যেই জিজ্ঞেস করা হয়ে গেছে। তারও যা বলার তা সে বলে দিয়েছে।
মুখের ভিতর বাহির অনেক জায়গায় ফেটে যাওয়ায় পানিটুকু খেতে তার অনেক কষ্ট হয়। পানিটুকু খাবার পর গাল-ঠোটের রক্ত মুছতে মুছতে সে কনষ্টেবলকে তার পাশে বসার জন্য বলে। কনষ্টেবল বসে তার পাশে, যদিও বাস্তবতা এটা মেনে নেয় না তবুও যেহেতু এটা গল্প তাই সে বসবে। নায়কের খুব ভয় লাগছে, মৃত্যুভয় তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সে খুনের আসামী এবং সে সত্যিই খুন করেছে, এবং এই মূহুর্তে তার অনেক ভয় লাগছে। তার মায়ের কথা মনে পড়ছে, বড় বোনটার কথা মনে পড়ছে। বৃ্দ্ধ বাবার কথা মনে পড়ছে। তার এখন শৈশবের কথা মনে পড়ছে।
নায়কের বেড়ে ওঠা যে এলাকায় সেখানকার জনবসতি খুব বেশি না। এখানে একটা খেলার মাঠ আছে। নায়কের জীবনে এই খেলার মাঠ অনেক গুরুত্ব বহন করে। ছোট বেলায় তার অনেক বন্ধু ছিল, যাদের সাথে সে খেলত, স্কুলে যেত, আপনার আমার মতই। পড়তে তার অতটা ভালো লাগত না। ক্লাস পালিয়ে ঘুড়ি উড়াতে কিংবা লাটিম ঘুরাতে ভালোবাসত সে। খুব ভালো ক্রিকেট খেলত বলে পাড়ার ক্লাব থেকে কয়েকবার এলাকার বাইরে খেলতেও গিয়েছিল। তবে সেটা কিশোর বয়সে, যে কিশোর বয়সে সে প্রথম প্রেমে পড়েছিল। হ্যা তার জীবনেও প্রেম এসেছিল।
তিন
রিমান্ড রুম, একটু বেশিই যেন অন্ধকার। রুমে বসে আছেন সেই কনষ্টেবল এবং আমাদের গল্পের নায়ক। কনষ্টেবল বৃদ্ধ মানুষ, চাকুরীর শেষদিকে চলে এসেছেন। পুলিশ থেকে বিশেষ বিবেচনায় র্যাবে পোস্টিং দিয়েছে। কেন বিশেষ বিবেচনায় তাকে র্যাবে পোস্টিং দিয়েছে সেটা অবশ্য তার কাছে এখনো রহস্য। তাও আবার রিমান্ড রুমের দায়ীত্ব, পুরো চাকুরী জীবনে তিনি রিমান্ড রুমের ধারে কাছে খুব একটা যাননি। মানুষ হয়ে মানুষকে পশুর মত মারছে এটা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। অথচ এখন এই বয়সে এসে তাক র্যাবের রিমান্ড রুমে ডিউটি দিতে হচ্ছে তাও রাত জেগে। ভালো খবর হল তার চাকুরী জীবন প্রায় শেষ। এটাই হয়তো তার শেষ ক্রসসায়ার দেখা হচ্ছে। আচ্ছা এটা কি ক্রসফায়ার না খুন ?
নায়ক এখন চলে গেছে আজ থেকে ঠিক সাতদিন আগে। পরিচিত এক চায়ের দোকানে। মাত্রই এক কাপ চা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়েছে সে। চা-সিগারেট একসাথে খেতে পারে না সে। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, পরিবেশটা বেশ ঠান্ডা। একটু আগে একটা ফোন এসেছিল নায়কের মোবাইলে। একটা খুন করতে হবে। এ পর্যন্ত সে খুন করেনি। তবে অনেক বড় বড় অপরাধের সাথে সে যুক্ত ছিল। কিন্তু খুন এবারই প্রথম।
একটা ঘোরের মধ্যে আছে সে। এতদিন ধরে যার আন্ডারে সে কাজ করে এসেছে তার ফোন ছিল। যে ওকে অনেক বড় একটা বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিল। তার প্রতি একটা দায়বোধ থেকেই সে তার জন্যে কাজ করে। কাজ বলতে মূলত রাজনৈতিক কাজ। এই বিপক্ষ দলের কাউকে মারধর করা, টেণ্ডার ড্রপ করা। এর বাইরেও কিছু খারাপ কাজও সে করেনি তা না। কিন্তু তাই বলে খুন !!! একটু অবাকই হয়েছিল। তবে তার বিশ্বাস ছিল সে সহজেই কাজটা করে ফেলতে পারবে, নিজের সাহসের উপর একটা বিশ্বাস তার আগে থেকেই ছিল। সবাই তার একটু বেশি খাতির করত ওই সাহসটার কারণে।
সাহসটা নায়কের ছোটবেলা থেকেই। একবার ঘুষি মেরে একজনের দাত ফেলে দিয়েছিল। অবশ্য এর জন্যে পরে তাকে বেশ কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল, কিন্তু তাতে কি, ও মেরে খুব শান্তি পেয়েছিল। আর একবার খেলার মাঠে বিপক্ষ দলের আম্পায়ার চুরি করছিল, ওদের জেতা ম্যাচটা হারিয়ে দিচ্ছিল সে। তখন স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে আম্পায়ারের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। এজন্যে অবশ্য অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল ওকে তখন। আর একবার সিনেমা হলে ওর প্রিয় নায়িকাকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করায় অনেক বড় মারামারি করেছিল। সেবার থানা-পুলিশ করতে হয়েছিল।
চার
রিমান্ড রুমের ঠিক পাশের ঘরেই বসে আছে সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব। কলেজে থাকাকালীন সময়ে বাম রাজনীতি করা এই ভদ্রলোক এখন পুলিশে আছেন। সেখান থেকেই র্যাবে। এই ইউনিটের ক্রসফায়ারের কাজগুলো আপাতত তিনিই করছেন। র্যাবে ঢোকার আগে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। মানুষ মারতে এখন আর তেমন সমস্যা হয় না। আর যাদের মারছেন তারা তো সবাই সমাজেরই শত্রু, অন্ধকারের কীট। এদের মারলে সমাজের লাভ বৈ ক্ষতি নেই। সাধারণ মানুষও খুশি। মানুষ তো এদের মরণে মিষ্টি বিলায়। র্যাব যাদের ধরে আনে তাদের সবাই যে দোষী তা না, কেউ লিস্টে থাকে তাদের এনে ভয় দেখিয়ে মারধর করে ফিসের(!!!) বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়। অনেকেই জানে কিন্তু কেউ কিছু বলে না। কে যাবে ওদের সাথে বাগরা বাধাতে। জান বাঁচল সেই তো অনেক কিছু। অনেকে আছে যাদের ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ ফাসিয়ে দেয়। পরিচিত থাকার কারণে কিংবা উপর মহল থেকে নির্দেশ আসার কারণে এই ফরমায়েশটা খাটতে হয়। তবে আজকের কেসটা একটু ভিন্ন। একে মারতে হবে সেটা উপর মহলের নির্দেশ এবং একে ফাসিয়ে দেয়া হয়েছে। এত কিছু জেনে অবশ্য সাব-ইন্সপেক্টর সাহেবের কিছু যাবে আসবে না। বরং অপারেশনে যেতে যেহেতু এখনো ঘন্টা দেড় বাকী আছে তাই তিনি একটু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে নিচ্ছেন।
নায়কের মায়ের কথা মনে পড়ছে। মায়ের হাতের পিঠার কথা মনে পড়ছে। মাকে অনেকদিন দেখে না সে। ছোটবেলায় শত দুষ্টামী সত্বেও রাতের বেলা মায়ের কাছে গেলে সব দোষ মাফ হয়ে যেত। খুব ছোট থাকতে মা রাতে গল্প বলতেন। গল্পগুলো অনেক মনে করার চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না। মায়ের হাতের রান্না শেষ কবে খেয়েছে মনে করতে পারছে না। ওর কাজ-কর্ম পছন্দ না হওয়ায় মা ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল শেষদিকে। আচ্ছা ও যদি এখন ওর মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ওর মা কি ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারবে???
পাঁচ
আপনাদের একটা মেয়েদের স্কুলের সামনে নিয়ে যাই। এখানেই নায়ক জীবনের কিছু মূল্যবান দুপুর ব্যয় করেছেন। এই স্কুলে নায়কের প্রেমিকা পড়ে। প্রেমিকা বললে অবশ্য ভূল হবে, আমাদের নায়কই তাকে পছন্দ করতেন। মেয়েটাও বোধহয় করত, তবে বলেনি কখনো। আমরা কখনো জানতেও পারিনি মেয়েটা পছন্দ করত কিনা। মেয়েটা এখন স্বামীর সাথে বিদেশে থাকে। মেয়েটার প্রতি নায়কের কখনোই কোনো রাগ ছিল না, বরং নিজের প্রতি রাগ ছিল। ভালোবাসার কথা যে বলতে পারে না তার প্রেম করার সখ থাকাও পাপ।
হয়তো প্রেমিকা বা এই ভালোবাসার কথা আমাদের এই মৃত্যুর গল্পে অপ্রাসঙ্গিক তারপরও আমাদের জানা প্রয়োজন কারণ এই প্রেমের কারণেই হয়তো নায়কের জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। হয়তো নায়ক সন্ত্রাসী না হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে পারত, যার মৃত্যুতে প্রতিবাদ আর শোকের বন্যা বয়ে যেতে পারত। পত্রিকায় খবর আসত "পুলিশের গুলিতে মেধাবী ছাত্রের মৃত্যু"।
ছয়
সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব কনস্টেবলকে ডাকেন। আসামীকে রেডী করতে বলেন। ফোর্সও রেডী করতে বলেন। একটু পরে বের হবেন অস্ত্র খুঁজতে (!!!) নির্দেশ দেয়া শেষ হলে দু’দিন আগের কথা মনে পড়ে তার। একটা বড় ধরণের রাজনৈতিক হত্যাকান্ড হয় তার একদিন আগে। ওরা অবশ্য জানত কে কাজটা করিয়েছে। কিন্তু খুনী কে সেটা জানত না। নতুন কেউ। যে ক’জনের এই কাজটা করার সম্ভাবনা ছিল তাদের সবাইকেই খুনের সময় অন্য কোথাও দেখা গিয়েছিল। এছারাও ওদের নিজস্ব সোর্স দিয়েও খোঁজ নিচ্ছিল ওরা। এবং শেষমেশ সবকিছু পরিস্কারও হয়ে যায় ওদের। এই সময় উপর থেকে ফোন আসে। কেস চলে যায় র্যাবের হাতে। বলা হয় আসামীকে 'ক্রস' দিতে হবে।
যিনি খুন হন তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যবসায়ী। সামনের কাউন্সিলর নির্বাচনে তার প্রার্থী হবার কথা ছিল। এছারা এলাকার বেশকিছু টেন্ডার তিনি বাগিয়ে নিয়েছিলেন সম্প্রতি। এতে কিছু মানুষের ক্ষতি হয়। তাদেরই একজন নায়কের আশ্রয়দাতা, গডফাদার। তিনিই নায়ককে দিয়ে খুনটা করান। এখন ব্যপারটা বেশি মাখামাখি হওয়ায় একটু চাপা দিচ্ছেন আরকি।
তার অবশ্য চিন্তা নেই, নায়ককে দিয়ে তিনি যতটা আশা করছিলেন তার চেয়ে বেশি পেয়েছেন। নায়কের পরিবারেও তেমন পিছুটান নেই। পরিবারের সাথে যোগাযোগও ছিল না শেষদিকে। এদিকে থেকে বাঁচা গেলেন। টাকা-পয়সা খরচ করতে হবে না। আর কাজ করানোর জন্য তো নতুন কিছু ছেলে আছে, ওদের দিয়ে করিয়ে নেয়া যাবে। তবে ভেবেছিলেন বের করে আনতে পারবেন। কি আর করা আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
শেষ
রাত তখন সোয়া তিনটা ভোর হতে এখনো অনেকখানি বাকী। নায়ককে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে র্যাবের একটি গাড়ি। কালো পোশাকে এই গাড়িটিতে থাকা মানুষগুলোকে দেখতে যমদূতের মতন লাগে। গাড়িতে থাকা নায়কের মনে অবশ্য এখন এই চিন্তা নেই।
ছোট বেলায় বাবা বলতেন,
“দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে স্বাস্থ্য খারাপ হয়। সবসময় মনে রাখবি
Early to bed, early to rise,
Makes a man healthy, wealthy and wise.”
অনেকদিন ভোরের সূর্য দেখেনি সে। এদেরকে বললে কি এরা ভোরের সূর্য দেখতে দেবে ?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১০:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


