পাবনায় দুই সহোদরের যুগান্তকারী উদ্ভাবন ‘দোতলা কৃষি পদ্ধতি’
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এ দেশে খাদ্যসঙ্কট যখন পিছু ছাড়ছে না তখন দেশবাসীর জন্য এক সুসংবাদ বয়ে এনেছেন এদেশের দুই কৃতী সন্তান। তারা একই সময়ে একই জমিতে দু’টি ফসল ফলানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় জনগণকে। আর এ পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘দোতলা কৃষি পদ্ধতি’।
এ পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু হলে কৃষিক্ষেত্রে বার্ষিক গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয় হবে বলে আশা করেন পদ্ধতির উদ্ভাবকরা।
সম্পর্কে সহোদর জাফর সাদেক ও মো: আব্দুল্লাহ সাদেক এ পদ্ধতির আবিষ্কার্তা। কৃষিবিদ জাফর সাদেক পাবনার আটঘরিয়া কলেজের কৃষিশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক আর মোঃ আব্দুল্লাহ সাদেক বিশ্বব্যাংকের সাবেক কনসালট্যান্ট ও স্বশিক্ষিত জ্যোতির্বিদ।
কৃষিতত্ত্ব ও জ্যোতির্বিদ্যার সফল প্রয়োগে তারা দোতলা কৃষি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এক্ষেত্রে উদ্ভিদের ২৪ ঘণ্টার খাদ্য উৎপাদনের জন্য ন্যূনতম ৮ ঘণ্টাব্যাপী সূর্যালোকের প্রয়োজনীয়তার কৃষিতাত্ত্বিক সূত্রকে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কৃষিবিদ জাফর সাদেক এ পদ্ধতি উদ্ভাবনে তিনটি মাঠ গবেষণা পরিচালনা করেও সফল হয়েছেন।
একই জমিতে একই সময়ে ভিন্ন উচ্চতায় দু’টি ভিন্ন ফসল ফলানোর পদ্ধতিকেই তিনি দোতলা কৃষি পদ্ধতি নামে অভিহিত করেছেন।
শনিবার দুপুরে পাবনা প্রেসকাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষিবিদ জাফর সাদেক দুই ভাই উদ্ভাবিত দোতলা কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে সংবাদকর্মীদের অবহিত করেন। এ সময় পাবনা সিটি কলেজের অধ্যাপক খতিব মাহবুবুর রহমান, পাবনা প্রেসকাবের সাধারণ সম্পাদক উৎপল মির্জা, সাংবাদিক কামাল আহমেদ সিদ্দিকীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষি বিষয়ে তার উদ্ভাবিত পদ্ধতি সম্পর্কে জাফর সাদেক জানান, ২০০৮ সালের মে মাস থেকে ২০০৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রাথমিক গবেষণায় তিনি নিশ্চিত হন যে, বাংলাশের যে কোনো স্থানে যে কোনো আকারের ও আকৃতির জমিতে ঠিক উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ভূমি থেকে ১৩ ফুট পরপর ৫ ফুট উঁচু ও ৪ফুট চওড়া মাচা নির্মাণ করলে জমিতে অনধিক আড়াই ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট একটি এবং মাচায় লতা জাতীয় আরেকটি ফসল ফলানো সম্ভব।
সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আরও জানান, তিনি ও তার ভাই দোতলা কৃষি পদ্ধতি উদ্ভাবনে তিনটি মাঠ গবেষণা পরিচালনা করেন। তারা প্রথমে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের মোঃ রওশন আলীর জমিতে মাচায় কভারক্রপ হিসিবে পটল ও মাটিতে বেসক্রপ হিসেবে মরিচ আবাদ করে কাক্সিত ফল পান। পরে সিরাজগঞ্জে মাচার ছায়ায় বেসক্রপ হিসেবে প্রতি বিঘায় মিনিকেট জাতের ২২ মণ ধান ফলান।
এছাড়া নওগাঁ জেলার বদলগাছি ইউনিয়নের ডাঙ্গিসারা গ্রামের দীনেশ সিং-এর ৭ কাঠা জমিতে মাচায় লাউ, মাটিতে বিআর-২৮ জাতের ধান আবাদ করেন। ওই জমিতে ধানের ফলন পাওয়া যায় ৮ মণ, যা বিঘার হিসাবে ২৩ মণ। এ হার জাতীয় গড় ফলনের সমান। আমন মৌসুমেও একই জমিতে বিনা-৭ জাতের ধান আবাদ করে সাড়ে ৬ মণ এবং কভারক্রপস হিসেবে মাচায় ২৪৯টি লাউ আবাদ করেন। এ হারে বিঘার হিসাবে লাউয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭২০টি।
সাদেক ভাতৃদ্বয় পরিচালিত গবেষণায় দাবি করা হয়, দোতলা কৃষি পদ্ধতিতে মাচার ত্রেফল জমির মোট পরিমাণের ২৫% হওয়ায় একই সময়ে ওই জমির ব্যবহার ২৫% বেড়ে যায়। গবেষণায় তারা দেখিয়েছেন, এক বিঘা জমির কভারক্রপ (মাচা) থেকে উৎপাদিত ফসলের মূল্য দাঁড়ায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা বা হেক্টরে ১ লাখ টাকা। এ হিসেবে বাংলাদেশের মোট ৮২.৯০ লাখ হেক্টর আবাদি জমির ২৫% বা ২০.৭৩ লাখ হেক্টর জমিতে মাচায় লতা জাতীয় ফসল চাষ করে বার্ষিক ২০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা বা ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাড়তি আয় করা সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রতি বছর যেখানে ১.১৮% হারে আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে সে প্রোপটে দোতলা কৃষি পদ্ধতিা চালু করা হলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করেন আবদুল্লাহ সাদেক।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষিবিদ জাফর সাদেক তাদের দুই ভাইয়ের উদ্ভাবিত ‘দোতলা কৃষি পদ্ধতি’ দেশব্যাপী চালু করার জন্য সরকারের সুদৃষ্টি ও আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
সাংবাদিক সম্মেলন শেষে কৃষিবিদ জাফর সাদেক বাংলানিউজকে বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে মূল ফসলের অনুসঙ্গ হিসেবে অতিরিক্ত ফসল একই জমিতে একই সময়ে আবাদ করার কারণে কৃষককে খুব বেশি অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হবে না।’
তিনি জানান, দোতলা কৃষি পদ্ধতি উদ্ভাবনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও তাদের একান্তভাবে সহযোগিতা করেছেন নওগাঁর মহাদেবপুর-বদলগাছি আসনের সংসদ সদস্য ড. আকরাম এইচ চৌধুরী।
View this link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



