somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি রম্য বিবাহিত (পুরুষ) গল্প

২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ রাত ১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


রি-কন্ডিশন গাড়ি

বাল্যকাল হইতেই আমার মনের গোপন গহীনে একটি সুপ্ত বাসনা লালিত হইয়া আসিতেছিল, আর তাহা হইল, বড় হইয়া আমি একখানা প্রাইভেট গাড়ির মালিক হইব। গাড়িটির কন্ডিশন কি হইবে বা কোন কোম্পানির হইবে অথবা কি রঙের হইবে তাহা নিয়া যদিও কখনোই ভাবিয়া দেখি নাই, তবে গাড়ির মালিক হইবার সুপ্ত বাসনা যে ক্রমশঃ আমার সমস্ত মন জুড়িয়া ঘুরিয়া বেড়াইত তাহা নিশ্চিত করিয়া বলিতে পারি। হউক তাহা-"রি-কন্ডিশন কিংবা ত্রি-কন্ডিশন"। এমনকি একেবারেই চতুর্কন্ডিশন হইলেও আপত্তি থাকিবেনা- এইরূপ মনোভাব লইয়া যে কোনরকম একটা গাড়ির মালিক বনিয়া যাইবার স্বপ্নজাল বাল্যকাল হইতেই বুনিয়া চলিয়াছি।

কিন্তু শুধু স্বপ্নজাল বুনিলেই তো চলিবে না, সেই জাল দিয়া স্বপ্নটিকে তো ধরিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। কিন্তু পিতৃদেবের আর্থিক দুরাবস্থার কারণে 'স্বপ্ন ধরিবার ব্যবস্থা দূরে থাক- স্বপ্নকে ধামাচাপা দিয়া রাখাই উত্তম বলিয়া সাব্যস্ত করিলাম। বাল্যকাল অতিক্রম করিয়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গমনোপযোগী বয়সকাল পার হইয়াও যখন-"কন্ডিশন মোটরগাড়ি দূরে থাক", একখানা রি-কন্ডিশন মোটরসাইকেলও জোটাইতে পারিলাম না, এইবার সত্যি সত্যি স্বপ্নটিকে চাপা দিয়া ধরিয়া, ধামার মধ্যে ভরিয়া অর্থাৎ ধামাচাপা দিয়া রাখিলাম।

এতোদিন ধামাচাপা দিয়া স্বপ্নটিকে ঠিকই চাপিয়া রাখিতে পারিয়াছি, কিন্তু এইবার সুপ্ত বাসনাটিকে আর পাহাড় চাপা দিয়াও চাপিয়া রাখিতে পারিলাম না। কারণ এতদিনে আমি বাবার গলগ্রহ হইতে মুক্ত হইয়া নিজেই উপার্জনক্ষম হইয়াছি। এক্ষণে মনের ফাঁক-ফোকর গলিয়া “কন্ডিশন” নাহোক নিদেনপক্ষে একখানা “রি-কন্ডিশন” গাড়ির মালিক হইবার ইচ্ছা আবার উঁকিঝুঁকি মারিতে লাগিল। অনেক কষ্টে-সৃষ্টে চাকরির পয়সা বাঁচাইয়া, বাসে বাদুর ঝোলা ঝুলিয়া অফিসে যাতায়াত করিয়া, রিক্সা-স্কুটারের পরিবর্তে হন্টনপূর্বক গন্তব্যস্থলে গমণ করিয়া যেই পয়সা জমাইলাম, অংক কষিয়া দেখিলাম তাহা দ্বারা বড়জোর ‘চার-পাঁচ বার হস্তান্তরিত হইয়াছে’ এই ধরনের প্রাগৈতিহাসিক যুগের লক্কর-ঝক্কর মার্কা ভট্ভটির মালিক হওয়া যাইবে।

কিন্তু ভবিষ্যতে এই ভট্ভটির যত্নআত্মিসহ মাসিক তেল বাবদ খাই-খরচ মিটাইতে গিয়া আমার সারা মাসের বেতন উৎসর্গ করিলেও যে কোন লাভ হইবে না, তাহা শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিলাম। গাড়ি কিনিলে- অফিস এবং অন্যান্য জায়গায় যাতায়াতে মাসে এক মোটা অংকের অর্থ বাঁচিয়া যাইবে ভাবিয়া এতদিন যে স্বপ্ন দেখিয়া আসিতেছিলাম, তাহা অচিরেই ভুল প্রমাণিত হইল। উপরন্তু, এইরূপ আশংকা হইতে লাগিল যে, তেলের দাম লিটারপ্রতি দুই-চার-ছয় টাকা বাড়িলে গাড়ির ভাড়া লাফ দিয়া মাথাপিছু যেইভাবে দশ-বিশগুণ বাড়িয়া যায়, তাহাতে গাড়ির মালিক হওয়া তো দূরে থাক ভবিষ্যতে বাদুর ঝোলা হইয়াও গাড়িতে চড়িতে পারিব কী না, আল্লাহ্ মালুম!

কোন রকমেই গাড়ীর মালিক হওয়া যাইবে না বুঝিতে পারিয়া হাল ছাড়িয়া দিলাম। বন্ধু-বান্ধব আমার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের হাল ছাড়া ভাব দেখিয়া, আমাকে বিবাহ করাইয়া স্ত্রীর সাথে একত্রে হাল জুড়িয়া দিবার পায়তাড়া করিতে লাগিল। একবারেই গায়ে পড়িয়া, বিনা পয়সায় পরামর্শ দিয়া চলিল যে, বিয়ের বাজারে আমার দাম নাকি কোরবানীর হাটের সবচেয়ে দামী গরুটির ন্যায়, তাই মওকা বুঝিয়া একখানা দামী শ্বশুর খুঁজিয়া লইলেই তো ‘বাল্যকালের স্বপ্ন পুরণ’ করিবার ল্যাঠা চুকিয়া যায়। কিন্তু বিয়ের বাজারে কোরবানীর হাটের পশু হইয়া, শ্বশুর খুঁজিতে মন সায় না দেওয়ায় আমার স্বপ্ন স্বপ্নই রহিয়া গেল, চতুর্চক্রযানের মালিক বনিবার বাসনা আর পূরণ হইয়া উঠিল না।

মনে মনে কত আশা পোষণ করিয়াছি, আহা! যদি একখানা আলাদিনের যাদুর চেরাগ হাতে পাইতাম। এক ঘষাতেই দৈত্য আসিয়া গাড়ি-বাড়ীর মালিক করিয়া দিয়া যাইত। কিন্তু তাহা তো আর হইবার নহে। অনেক হিসাব-নিকাশ করিয়া আমি শেষমেশ বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে, মাস শেষে বেতনের অংশ হিসাবে যাহা পাই তাহা দিয়া নিজকে কোনমতে ভদ্রস্থভাবে চালাইতে পারিলেও টু-পাইস্ নামক বাড়তি উপাদান বেতনের সহিত যোগ করিতে না পারিলে গাড়ির মালিক হওয়া তো দূরে থাক, জীবন হইতেই অনেক কিছুই বিয়োগ করিয়া ফেলিতে হইবে।
টু-পাইস নামক বাড়তি উপাদানটির উৎস সন্ধান করিতে গিয়া যাহা বুঝিলাম তাহার সারমর্ম হইল "ইহা একটি কঠিন আর্ট"। আর দক্ষ আর্টিস্টরাই একমাত্র এইরূপ 'টু-পাইস' কামাই করিতে পারে। মক্কেলকে ফাইলের প্যাঁচে ফেলিয়া 'টু-পাইস' তো দূরে থাক 'ওয়ান পিস' ও যে আমার দ্বারা কামানো সম্ভব নহে, তাহা এতদিনে বুঝিয়া গিয়াছি। তাই মনের বাসনাকে এইবার ধামাচাপা বা পাথর চাপা কোনটিই না দিয়া, একেবারেই গাড়িচাপা দিয়া মারিয়া ফেলিলাম। গাড়ির স্বপ্ন জীবন হইতে বিয়োগ তথা মাইনাস করা গেলেও সময় থাকিতে থাকিতে বিবাহ নামক বিষয়টিও যদি জীবন হইতে মাইনাস হইয়া যায়, তাহা হইলে কপালে দুর্ভোগ আছে ভাবিয়া বিবাহ করিবার মনস্থির করিয়া ফেলিলাম। বিবাহের পাত্রী হিসেবে 'গাড়ি-বাড়ি আছে এমন পয়সাওয়ালার দোষে দোষী' নয় কিন্তু 'বিদূষী' এইরূপ পাত্রী খুঁজিয়া বাহির করিয়া বিবাহের আসরে উপস্থিত হইলাম।

বিবাহের কবুল পাঠ করা শেষে আমার এক বন্ধু আমাকে গোপনে বিবাহ আসরের এক কোণে ডাকিয়া লইল। আমাকে এই নির্জনে এক কোণে ডাকিয়া আনিবার হেতু জিজ্ঞেস করিলে বন্ধুটি চারিদিকে একনজর চক্ষু বুলাইয়া অতি সন্তর্পণে ফিসফিস করিয়া কহিল-
বন্ধু, এ তুই কি করিয়াছিস্?
-কেন, কি করিয়াছি?
এইযে, একটু পূর্বে তুই কাজী সাহেবের হস্তস্থিত পেট মোটা নিকাহ রেজিস্ট্রার খাতাটিতে দস্তখত দিয়াছিস্।
-হ্যাঁ দিয়াছি, তাহাতে কি হইয়াছে? বিবাহ করিতে হইলে সবাইকে এইরূপ দস্তখত জাতীয় নাকে খত দিতে হয়, তাই আমিও দিয়াছি, তাহাতে দোষের কিছু হইয়াছে কি?
নাহ্! দোষের কিছু হয় নাই, বন্ধুটি একখানা বড় করিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া হতাশার ভঙ্গীতে বলিল,- 'তবে তুই একখানা রি-কন্ডিশন গাড়ির মালিক হইয়াছিস'।
বুকটা ছ্যাৎ করিয়া উঠিল, আবারও সে-ই গাড়ি! রি-কন্ডিশন গাড়ি!! বন্ধুর কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া বন্ধুর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাইয়া রহিলাম।
আরে বেকুব, বুঝলি না? বন্ধুটি আমাকে বুঝাইতে লাগিল,- "বিবাহ নামক আসরটি হইতেছে পুরাতন গাড়ির বাহারি রঙের বাজার, আর কনে হইতেছে সেই বাজারের নতুন চক্চকে রি-কন্ডিশন গাড়ী। চক্চকে রি-কন্ডিশন গাড়িতে চড়িয়া প্রথম প্রথম হাওয়া খাইয়া ঘুড়িয়া বেড়াইতে ভাল লাগিলেও কয়দিন পর টের পাইবি, রি-কন্ডিশন গাড়ি কাহাকে বলে? আজকে গাড়ির পার্টস নাই তো কাল টায়ার পাংচার, একদিন তেল নাই তো আরেকদিন ইঞ্জিন নষ্ট। সেইদিন বুঝবি, রি-কন্ডিশন গাড়ি মানে কী কষ্ট!"
বন্ধুর কথা শুনিয়া হতভম্ব হইয়া পড়িলাম। এই বিপদ হইতে উদ্ধারের একমাত্র ত্রাতা ভাবিয়া বন্ধুর হাত চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, এক্ষণে কেন? এই কথা একটু আগে কেন বললি না! তাহা হইলে তো আর রি-কন্ডিশন গাড়ির বোঝা ঘাড়ে চাপাইতাম না, আগেই মানে মানে কাটিয়া পড়িতাম।
বেকুব দি গ্রেট! আমার চিরকুমার বন্ধুটি বিজয়ের হাসি মুখে আনিয়া বলিল,-'তাহা হইলে তো তোর রি-কন্ডিশন গাড়িতে চড়িবার আজীবন লালিত স্বপ্নটি কখনোই বাস্তবায়িত হইত না।' আমার হাত ছাড়াইয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইয়া বন্ধুটি আবার ফিরিয়া আমার কাঁধ চাপড়াইয়া বলিয়া উঠিল- ``Bravo! Go ahead my friend and enjoy your life with a re-condition car.”

৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×