পারিবারিক সহিংসতার অপ্রকাশিত অধ্যায়- পুরুষ নির্যাতন
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
(কিছুদিন আগে সংসদে পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গভীর চিন্তার অবকাশ রাখে। তাই আমি এ বিষয়টির উপর আপনাদের গঠনমূলক বিতর্ক আশা করছি। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সব ব্লগার বন্ধুরা মন্তব্য করুন। )
পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন এবং এর বাস্তবতা
পারিবারিক সহিংসতা বর্তমান বিশ্বে একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এরূপ সহিংসতা নানান রূপে, নানান ভাবে আবির্ভূত হয়ে সমাজ এবং মানবীয় উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এরূপ সহিংসতার বিষয়টিকে প্রায়শঃই সামাজিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয়। শুধু তাই নয় পারিবারিক সহিংসতার পুরো বিষয়টিকে আমাদের সমাজে তেমনভাবে গুরুত্বারোপও করা হচ্ছে না।
পারিবারিক সহিংসতার দু’টি রূপ। প্রথমতঃ পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর নির্যাতন বা সহিংসতা। দ্বিতীয়তঃ নারী কর্তৃক পুরুষের উপর নির্যাতন বা সহিংসতা। এছাড়াও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর নির্যাতন বা সহিংসতাও পারিবারিক সহিংসতার অন্তর্ভুক্ত। এখনকার আলোচনায় শুধু পুরুষ বা নারীর উপর নির্যাতন বা সহিংসতার বিষয়টিই আলোচনা করব।
পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর নির্যাতন বা সহিংসতার বিষয়টি নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং এরূপ নির্যাতন বা সহিংসতা রোধকল্পে রাষ্ট্রীয়ভাবেও নানান আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং অসহায় শ্রেণী বিবেচনা করে নারীকে সুরক্ষার জন্য সময়ে সময়ে কঠোর থেকে কঠোরতর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এর প্রয়োগও ঘটানো হচ্ছে। এরূপ আইন প্রণয়ন এবং তা কঠোর প্রয়োগের ফলে যে সমাজে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বিপরীতভাবে এরূপ আইনের অপপ্রয়োগ দ্বারা যে সমাজের আর একটি অংশকে উপেক্ষা করা হচ্ছে তা কি আমাদের সমাজ সংস্কাররকদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না ?
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে নির্যাতিত নারীর প্রতিপক্ষ হিসেবে পুরুষকেই দাঁড় করানো হয়। যুগে যুগে নারীরা নির্যাতিত হয়ে আসছে পুরুষ কর্তৃক, সাধারণ্যে এটিই প্রচলিত। কিন্তু নারী কর্তৃক পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি তেমনভাবে কখনোই আলোচনার পাদ- প্রদীপে আসেনি। পত্র পত্রিকায়ও এ সংক্রান্ত খবরগুলো খুব কমই আসে। আসলেও তা নারীর পক্ষে সাফাই গাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই আসে। কখনো বা পুরুষ নির্যাতনকারী নারীকে বীরাঙ্গনার আসনে বসিয়ে তাকে এরূপ কর্মকাণ্ডের জন্য বাহবা ও দেওয়া হয়। এতে করে যে প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকারকেই ভূলুন্ঠিত করা হচ্ছে সে ব্যাপারে সমাজ সংস্কারক বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য কী ?
পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি আমাদের সমাজে তেমনভাবে স্বীকৃতি পায়নি যদিও বাস্তবে এরূপ নির্যাতনের চিত্রটি ভয়াবহ। এরূপ স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-
১) আমাদের সমাজে নারীকে সবসময়ই কোমল স্বভাবের এবং শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত নারীদের প্রতি প্রচলিত ধারণা এই যে, তারা কখনোই সহিংস আচরণকারী হতে পারে না। এর ফলে নারী কর্তৃক নির্যাতিত হয়েও একজন পুরুষ কারো কাছেই তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে পারে না।
২) নির্যাতিত হয়ে পুরুষ আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে গেলে কিংবা গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ডাক্তারের নিকট গেলে তারা বিষয়টিতে তেমন গুরুত্ব আরোপ করে না বা অনেক সময় হেসেই উড়িয়ে দেয়। মাথায় বা শরীরে গুরুতর জখম নিয়ে নির্যাতিত পুরুষ থানা-পুলিশ বা ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে “বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে আহত হওয়া” বা “দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোন কারণে আহত” হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে বিষয়টিকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করে।
৩) নারীকে সুরক্ষার জন্য প্রণীত কঠোর কঠোর আইনও পুরুষকে উল্টো হেনস্থা হওয়ার আশংকায় নির্যাতনের বিষয়টি চেপে থাকতে বাধ্য করে। নারী নির্যাতন বিষয়ক আইনের স্পর্শকাতরতার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নির্যাতিত পুরুষদের পক্ষাবলম্বন করতে ইচ্ছুক হয় না।
৪) প্রকৃতিগতভাবেই পুরুষরা নারীদের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী হওয়ায় নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করতে তারা লজ্জ্বাবোধ করে। নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে অন্য কারো সাথে আলোচনা দূরে থাক বিষয়টি তারা স্বীকারই করে না।
৫) নারী কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে বিষয়টি প্রকাশ পেলে সমাজে বা কর্মক্ষেত্রে তারা হাসির পাত্র হয়ে উঠবে এই আশংকায় যথাসম্ভব বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে। লোক লজ্জ্বার ভয়ে নির্যাতন সহ্য করেও পুরুষ কর্তৃক সংসার ধরে রাখার চেষ্টার ফলে ‘পুরুষ নির্যাতন’ বিষয়টি তেমনভাবে প্রকাশ্যে আসে না।
৬) আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা এই যে, নির্যাতিত নারী তার অসহায়ত্বের কারণে কিংবা ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার ভয়ে নির্যাতন সহ্য করেও সংসারে টিকে থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু একজন পুরুষের তো এই ভয় নেই। তাই “নির্যাতিত পুরুষ নির্যাতন সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে”- এটি অবিশ্বাস্য।
৭) খুব সম্ভবত একজন নির্যাতিত পুরুষ তার সঙ্গিনীর চেয়ে কম আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন হয়ে থাকে। পৌরুষত্বের দুর্বলতার কারণে সঙ্গিনী কর্তৃক নির্যাতনটাকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়ে সমাজ-সংসারের ভয়ে সে চুপ থাকে।
৮) পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে পুরুষ নিজে তার দায়ভার এড়াতে পারে না। এরূপ সহিংসতার ক্ষেত্রে তারও কিছু দায়ভার আছে মনে করে সে বিষয়টি চেপে থাকতে পছন্দ করে।
৯) “সাময়িক উত্তেজনার কারণে সহিংসতা ঘটেছে” “ভবিষ্যতে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে” -এইরূপ আশায় পুরুষরা বিষয়টি প্রকাশে তেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।
১০) যদি ভবিষ্যতে সঙ্গিনীর সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় তবে নির্যাতনের বিষয়টি নাড়াচাড়া করলে শুধু তিক্ততারই সৃষ্টি হবে, ভবিষ্যত সংসার জীবনের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, উপরন্তু সন্তানদের উপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে- এই আশংকায় নির্যাতনের বিষয়টি তারা চেপে যেতে চায়।
পুরুষ কর্তৃক এরূপ নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকৃতির কারণেই “পুরুষ নির্যাতন” বিষয়টি আমাদের সমাজে এখনও তেমনভাবে স্বীকৃতি পায় নি। পত্র-পত্রিকায় পুরুষ নির্যাতন সংক্রান্ত যে দু’চারটি ছিটে-ফোঁটা সংবাদ স্থান পায় তা পড়লে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। পুরুষ নির্যাতন সংক্রান্ত এরূপ সংবাদ পত্রিকার পাতায় স্থান না পেলেও সমস্যাটি যে দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এরূপ সমস্যার কারণে সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব সমাজকে আরও বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে-এটি অনস্বীকার্য। তাই সমস্যাটি নিয়ে সমাজ গবেষকদের খোলামেলা হওয়া উচিত। মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও এ ব্যাপারে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা উচিত। শুধু নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে প্রণীত আইন-ই যে সমাজে শৃঙ্খলা আনয়ন করবে সমাজ সংস্কারকরা তা এখন আর মনে করেন না। তদুপরি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের অপপ্রয়োগের ফলে পুরুষরা যে ভুক্তভোগী হচ্ছে না তারই বা নিশ্চয়তা কি ? সমাজের এক অংশের জন্য প্রণীত আইনের কারণে অন্য অংশের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হবে- এটি কখনোই কাম্য নয়। তাই সংবিধান স্বীকৃত পন্থায় নারী পুরুষ সমানাধিকার আনয়নে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইনের পাশাপাশি পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন প্রণয়নও এখন সময়ের দাবী। এতে করে সমাজে বিশৃঙ্খলা অনেক কমে যাবে এবং নারী-পুরুষ পরস্পরের প্রতিদ্বন্ধী নয় বরং মানুষ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।
চলবে...
১৬টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এমন কেন?
একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।