আজ আমি আপনাদের একটি ব্যর্থতা এবং সফলতার গল্প শোনাব। এই গল্পে ব্যক্তিগত কিছু বিষয় চলে আসতে পারে। যেহেতু ব্লগে দীর্ঘদিন ধরে বিচরণ করছি- তাই স্বাভাবিকভাবেই সম মানসিকতাসম্পন্ন কিছু ভার্চুয়াল বন্ধুর সাথে সখ্য গড়ে উঠেছে। একদম অচেনা হয়েও আমরা যেন কত আপন। প্রত্যেকের সুখ-দুঃখে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি আমাদের যার যা সামর্থ্য আছে তাই নিয়ে। এরকম অনেক উদাহরণ যেমন-কারও জন্য চিকিৎসা সহায়তা, শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি তো আমাদের এই ভার্চুয়াল কমিউনিটির প্রত্যক্ষ উদাহরণ। এছাড়াও আরও অনেক পরোক্ষ উদাহরণ আছে।
আমরা আমাদের লেখায়, আমাদের মননশীলতায় ব্লগকে সাজিয়ে রাখি- আপন মনের দর্পন হিসেবে। সম মানসিকতা সম্পন্ন বন্ধুরা কাছে না থেকেও বিচরণ করেন প্রত্যেকের মনের জগতে, তাদের লেখার মাধ্যমে। আমি কি লিখছি- তা দিয়েই নিশ্চয়ই আমার বিচার হবে।
আমি আমার ব্লগে মূলত দুইটি দিক নিয়ে সাজিয়েছি।
একটি হচ্ছে দেশকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে আমি কি ভাবছি।
আরেকটি হচ্ছে এজন্য আমি কি করছি।
দেশকে নিয়ে সমাজকে নিয়ে আমরা অনেকেই ভাবি। ভাবনা গুলো ব্লগে সাজিয়ে রাখি মনের মতো করে। আমরা যারা ব্লগে লিখে আমাদের ভাবনা প্রকাশ করার সুযোগ পাই- আমরা সৌভাগ্যবান। অনেকে আছেন দেশকে নিয়ে ভাবেন কিন্তু প্রকাশ করার সুযোগ পান না।
এখন এই ভাবনা প্রকাশ করার প্রচেষ্টা নিয়ে আমরা লিখে যাচ্ছি নিরন্তর। দেশকে সমাজকে নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি আমি কি করছি- এটি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমার কিছু কৈফিয়তের ব্যাপার এসে যায়।
মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতনঃ
মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন নিয়ে আমার প্রচেষ্টার অংশীদার আপনারা সবাই। অনেকে উৎসাহ দিয়ে সমর্থন দিয়ে আমাকে স্কুলটি তিলে তিলে গড়ার কাজে সহায়তা করেছেন। আমি শুরু করে ভেবেছি স্কুলটিকে কিভাবে একটি সুন্দর কমিউনিটির মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় আমার যখন কোন ক্যামেরা ছিল না, বর্ণনায় লিখেই আপনাদের জানিয়েছি। পরে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ক্যামেরা কিনেছি। এখন স্কুলের কোন বিষয় হলে ছবি তুলে তা দিতে পারি। মেঘনাপাড় স্কুলের শিশুদের ছবি দেখে আপনাদের উচ্ছ্বাস আমাকে ছুঁয়ে যায়। স্কুলটি ঘিরে একটি প্রাণের সাড়া পড়েছে আপনাদের মাঝে। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ।
আর ব্যর্থতা একটি ধারণা বাস্তবায়ন নিয়ে সময়ক্ষেপণ। এজন্য আমি নিজেকে যতটুকু না দায়ী করি, বেশি দায়ী করি আমার বিশ্বাসকে। স্কুলটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমি সামাজিক ব্যবসায়ের ধারণাটির উন্নয়ন ঘটাতে চাচ্ছিলাম। এজন্য এমপ্লয়মেন্ট ফোকাসড লারনিং নামে একটি যৌথ মূলধনী কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন করেছি। তিলে তিলে এটিকে গড়ে তুলছি। এর জন্য প্রাথমিক যে পুঁজি এবং জনবল প্রয়োজন তা নিয়ে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছি। আমার বিশ্বাস ছিল আমার কার্যক্রমের মূল পরিচিতি ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী পৌঁছানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে কোম্পানির বেতনভোগী একজন ওয়েবসাইট ডেভেলপার নিয়োগ দিয়েছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আমার সমস্ত স্বপ্নকে ভেঙে দিয়ে ডেভেলপার প্রস্থান করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগকে একেবারে শূন্য অবস্থায় রেখে। দীর্ঘ দেড় বৎসরের বিশ্বাস এত সহজে ভেঙে যাওয়ার নয়। তাই আমি ভেঙে পড়িনি। আবার নতুন করে শুরু করেছি। কিন্তু সময়ক্ষেপন হচ্ছে।
ইএফএলবিডি সম্মাননা বিষয়ক কৈফিয়তঃ
আপনারা যারা আমার লেখা মাঝে মাঝে পড়েন, তারা নিশ্চয়ই ইএফএলবিডি সম্মাননা সংক্রান্ত ঘোষণাটি পড়েছেন। খুব আশা নিয়ে উদ্যোগটি নিয়েছিলাম। আপনাদের পাঠানো লেখাগুলো নিজে পড়ে বাছাই করেছি। ব্লগের চারজন বিশিষ্ট ব্লগার বন্ধুকে মূল্যায়ন প্যানেলে রেখেছি। অনেকদূর অগ্রসর হয়ে গিয়েছিলাম। শুধু প্রয়োজন ছিল লেখার লিংকগুলো ইএফএলবিডির ওয়েবসাইটে দিয়ে জনমত যাচাই করা। পাশাপাশি প্রতিটি লেখা শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবক এর কাছে প্রিন্ট করে নিয়ে তাদের মূল্যায়ন নেওয়া।
কিন্তু একটি প্রচণ্ড ঝড়ে আমার পরিকল্পনাগুলো সব পিছিয়ে পড়েছে। তবে আমার কঠিন সংকল্প আমি এই অসমাপ্ত কাজটি সমাপ্ত করবোই ইনশাল্লাহ। একটু দেরী হতে পারে। তবে আমি এটি বাস্তবায়ন করবোই। মূল্যায়ন প্যানেলে যাঁরা ইএফএলবিডি সম্মাননার জন্য লেখা মূল্যায়ন করেছেন এবং নির্বাচিত লেখা পাঠিয়েছেন তাদের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আশা করি আমার এই সীমাবদ্ধতাটুকু বিবেচনা করে দেরীর জন্য ক্ষমা করবেন। আমি খুব শীঘ্রই আপনাদের সাথে যোগযোগ করবো।
সফলতা-ব্যর্থতার ধারণাঃ
দীর্ঘদিন ধরে আমি এবং আমার এক সহকর্মী (যিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন উচ্চ শিক্ষার্থে) আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছি। আমাদের দেশে দরিদ্ররা শিক্ষার সুযোগ পায় না। কিংবা বলা যায় সচেতনতার অভাবে তাদের শিক্ষাটা সম্পূর্ণ হয় না। শিক্ষা নিয়ে আমাদের গবেষণাটা ছিল এরকম-
শিক্ষা হবে কর্মসংস্থানমূলক। একজন শিক্ষার্থী যখনই শিক্ষার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে, তার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে থাকবে।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝানো যাক্-
লক্ষ্মীপুর জেলার মজু চৌধুরী হাটে গরীব জেলে শিশুদের জন্য স্থাপিত মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন। এই অঞ্চলে শত শত শিশু স্কুলে যায় না। স্কুলে না যাওয়ার পিছনে অর্থনৈতিক কারণও যেমন আছে তেমনি অভিভাবকদের সচেতনতারও অভাব আছে।
আমার গবেষণার বিষয় হচ্ছে স্কুলকে যদি শিক্ষার্থীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা আসতে পারে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটি খুবই সম্ভব।
এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন। আজ এ স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৪০ জন।
এই ১৪০ জন শিশু যদি এরকম সুযোগ পায় যে, তাদের শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হতে থাকবে- তাহলে তাদের শিক্ষালাভটা নিশ্চিত হবে। তাই নয় কি?
এখন কিভাবে শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করি।
ধরা যাক, মেঘনাপাড় স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মাশরুম প্রকল্প স্থাপন করা হলো।
বাছাই করা কিছু শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মাশরুম চাষে দক্ষ করে গড়ে তোলা হলো।
একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় (মাইক্রো বিজনেস কনসেপ্ট) শিক্ষার্থীদের দ্বারা মাশরুম উৎপাদিত হবে। উৎপাদিত মাশরুম বাজারজাত নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাথী-শিক্ষক-অভিভাবক সমন্বয়ে একটি মাইক্রো বিজনেস পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে।
মাত্র ৫ হাজার মাশরুম চারা যথাযথ পরিচর্যার মাধ্যমে ২ মাসে ১০০০ কেজি (কমপক্ষে) মাশরুম উৎপাদন সম্ভব যার পাইকারী বাজার মূল্য ১,২৫,০০০/- টাকা।
৫ হাজার চারা থেকে মাশরুম উৎপাদনে অবকাঠামো ব্যয়, সংরক্ষণ ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ মিলে যা ব্যয় হবে প্রথম দু'মাসের টার্মেই তা ফেরত আসবে। পরবর্তীতে শুধু চারা বাবদ ব্যয় হবে এবং লাভের পরিমাণ একই থাকবে। এ ব্যাপারে আমার আগের পোস্ট দেখুন-
মেঘনাপাড় স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য মাশরুম প্রকল্প স্থাপন
* মেঘনাপাড় স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য মাশরুম প্রকল্প স্থাপন
মাত্র ১,৪০,০০০/- টাকা বিনিয়োগ করেই ১ বৎসরে যা লাভ হবে তাতে স্কুলের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে স্কুলটি সচ্ছলতার সাথে চলতে পারবে। এ ব্যাপারে আমি আমার গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছি।
এ পর্যন্ত স্কুলটি স্থাপনে এবং প্রায় ১ বৎসর ৭ মাস পরিচালনায় মাত্র ১ লক্ষ ১ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় সীমিত অর্থ দিয়েও একটি স্কুল স্থাপন এবং পরিচালনা সম্ভব। এখন প্রয়োজন স্কুলের নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা করা।
আমি একটি স্বপ্ন দেখে চলেছি যে, মেঘনাপাড়ের শিক্ষার্থীরা সবাই শিক্ষিত হবে। তবে তারা শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করে নেবে। এ লক্ষ্যেই মাশরুম প্রকল্প স্থাপন।
স্কুলের জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তাঃ
স্কুল গঠনে আমার এই প্রচেষ্টাটিকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন। এজন্য আমি আন্তরিকভাবে আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার মনে হয় বিচ্ছিন্ন সহায়তা আমার এই উদ্দেশ্যটিকে আরও দীর্ঘায়িত করবে। তাই আপাতত স্কুলের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে কোন সহায়তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেকে স্কুলটিকে ফাউন্ডেশন বা এনজিও'র মত করে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকে বিদেশী সহায়তা নেওয়ার জন্য আমাকে তথ্য সরবরাহ করেছেন। সবার কাছে কৃতজ্ঞতা। দয়া করে কেউ ভুল বুঝবেন না।
কিন্তু আমি আরেকটু অপেক্ষা করতে রাজি আছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একটি পরিকল্পিত মাইক্রো বিজনেস ডেভেলপ করে ১ বৎসরের মধ্যেই মেঘনাপাড় স্কুলকে নিজস্ব আয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া সম্ভব। এবং ডোনারদের পুঁজিও ফেরত দেওয়া সম্ভব। এটিকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চাই। ১৪,০০০/- টাকা মূল্যের মাত্র ১০ টি শেয়ার মূল্য বাবদ ১,৪০,০০০/- টাকা হলেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব। আমি শুধু ১ বৎসরের জন্য এই চ্যালেঞ্জটি নিতে প্রস্তুত আছি। যদি ব্যর্থ হই- ভাববো আমি ভুল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলাম।
আমি এ ব্যাপারে একটি টাইম বাউন্ড অ্যাকশন প্ল্যানও করেছি।
মেয়াদ- ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১০ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১১।
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ থেকে আমার এই কর্মপরিকল্পনার যাত্রা শুরু। এদিন মেঘনাপাড় স্কুলে মাশরুম চাষ শুরু করা হবে। ১১ ফেব্রুয়ারি তারিখ থেকে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। চারা পরিচর্যা এবং ফলন সংগ্রহ পর্যন্ত এ প্রশিক্ষণ চলবে। এ ব্যাপারে সমস্ত কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ২০১১ সালের ১০ ফ্রেবুয়ারি এই প্রকল্পের সমাপ্তি ঘটবে।
আপনারা আমার এই পোস্ট পড়ে আশা করি আমার প্রচেষ্টাগুলোকে ভুল বুঝবেন না। এখানে আমার ব্যক্তিগত কৈফিয়ত ও সীমাবদ্ধতার মাঝে আমার প্রচেষ্টাগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমার সাথে যোগাযোগ করুন-
০১৭২৭-২৬২১৯৫
(আমি দুঃখিত যে অনলাইনে থাকতে পারছি না। আপনাদের যে কোন কৌতুহলী প্রশ্নের জবাব অনলাইনে আসলে দেবো।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

