মেঘনাপাড় স্কুলে মাশরুম প্রকল্পে নিয়োজিত শিক্ষার্থীবৃন্দ।
কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা (খণ্ড-২)
কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা ধারণা (খণ্ড-১)
বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ বলা হলেও এটি একটি দরিদ্র দেশ। দারিদ্র্যের কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে কর্মে নিয়োজিত করতেই বেশি উৎসাহী। তাই প্রথমেই কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষা প্রয়োগের প্রচেষ্টা হাতে নিতে হবে। এতে করে দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে নিশ্চিত। বিষয়টি অনেকটা এরকম হবে- কর্মসংস্থানের জন্য মাইক্রো বিজনেস স্থাপন করে এর আওতায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানমূলক মাইক্রো বিজনেস গড়ে তোলা হবে। শুধু দরিদ্র, বঞ্চিত এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্যই প্রাথমিক অবস্থায় এ উদ্যোগ নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় লক্ষ্মীপুর জেলার মজু চৌধুরী হাটে মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন স্থাপন। পাশাপাশি তাদের জন্য মাশরুম প্রকল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
আমাদের দেশের শিক্ষানীতি কেন্দ্রীয়ভাবে আরোপিত। ফলে শিক্ষানীতিতে নমনীয়তার সুযোগ নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রয়োগ না করার ফলে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশের একেক জেলায় গড়ে ওঠা সংস্কৃতি, কৃষ্টি, পরিবেশ, কর্মসুযোগ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তায় স্থানীয় চাহিদানুযায়ী কারিকুলাম তৈরি করে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করি তবে সেটা হবে অনেকটা বাস্তবসম্মত।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যাক। বাংলাদেশের জামালপুর জেলা সুচিকর্ম জনিত হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত। জামালপুর জেলার অনেক উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি গ্রামেও ঘরে ঘরে মেয়েরা হাতে সেলাই করে ছেলেদের পোশাক, মেয়েদের পোশাক, নকশি কাঁথা, চাদর, পর্দা, বেডশিট, সোফার কভার সহ আরো অনেক কিছু তৈরি করছে এবং এগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয় করছে। তবে এটি হচ্ছে অনেকটা অসংগঠিত ভাবে। কর্মীরা তেমনভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হওয়ার কারণে তাদের তৈরি পোশাক আড়ং, নিপুণ, কুমুদিনী, অঞ্জন, কে-ক্র্যাফট, কারুপণ্য ইত্যাদি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানের দিক দিয়ে পেরে উঠছে না। প্রশিক্ষণবিহীন মেয়েদের উৎপাদিত পণ্যের মান যে একেবারে খারাপ তা কিন্তু বলা যাবে না। ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ুয়া অনেক মেয়ে আছে যারা এরকম হস্তশিল্পজাত সামগ্রী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ সরকার দেশব্যাপী ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুবিধাসহ ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান করছে। এটি স্রেফ অনেকটা খয়রাতি সাহায্যের মতো। এই উপবৃত্তির টাকা পাওয়ার লোভে ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে সত্য তবে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার মান বাড়েনি। উপবৃত্তিকে ঘিরে অনেক দুর্নীতিরও ডালপালা গজিয়ে উঠেছে। উপবৃত্তি ধারণাটিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। উপবৃত্তির অর্থ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। বাংলাদেশের একেকটি জেলার একেকটি ‘স্থানীয় পণ্য’ চিহ্নিত করে পণ্যটিকে লোকাল কারিকুলামের আওতায় পাঠদানের ব্যবস্থা করে তা করা যায়। পাঠদানের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
যে বিষয়টি বলার জন্য এই গৌরচন্দ্রিকা তা হল, শিক্ষা ক্ষেত্রে লোকাল কারিকুলাম পদ্ধতির প্রচলন। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নতুন ধারণা। বিদেশে যেমন থাইল্যান্ডে এজাতীয় একটি কর্মসূচি প্রচলিত আছে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে এটি সফল ভূমিকা পালন করছে। আমাদের ধারণা একটু ব্যতিক্রমধর্মী। এ ধারণার মূল কথা হচ্ছে- একটি পরিপূর্ণ শিক্ষালাভের পাশাপাশি আয়বর্ধনমূলক কোন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা। এতে শিক্ষার্থী যেমন নিজেই নিজের পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করতে পারবে পাশাপাশি পরিবারকেও অর্থনৈতিক সহায়তা দিতে পারবে। অর্থাৎ শিক্ষার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে ও ‘লোকাল কারিকুলাম’ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। লোকাল কারিকুলামের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে আসা সম্ভব। এতে জাতীয়ভাবে অনেক শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। শুধু হস্তশিল্প নয়, স্থানীয়ভাবে আমাদের দেশে এমন অনেক পণ্য উৎপাদিত হয় যে, এগুলোকে যদি স্থানীয়ভাবে কারিকুলামের আওতায় এনে পাঠদান করা হয় এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় তবে শিক্ষার্থীরা যেমন বাস্তব জ্ঞান লাভ করবে পাশাপাশি একটি ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং আত্ম কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা নানারকম পণ্যদ্রব্যের জন্য বিখ্যাত। যেমন কোন অঞ্চলে প্রচুর আম-আনারস হয়, কোন অঞ্চলে পেয়ারা, কোন অঞ্চলে নারিকেল কিংবা অন্যকিছু উৎপাদিত হয়। হস্তশিল্প ছাড়াও আমাদের দেশ আরও অনেক ধরনের শিল্পে সমৃদ্ধ। এরকম অনেক শিল্প আছে যেমন- মৃৎশিল্প, পোল্ট্রি শিল্প, হ্যাচারি শিল্প, মৎস্য শিল্প, কাষ্ঠ শিল্প ইত্যাদি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া। এগুলো অসংগঠিত ভাবে গড়ে ওঠে বলে এদের বাজার সীমিত এবং দেশব্যাপী অপরিচিত। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার ৬৪ টি পণ্যকে চিহ্নিত করে এগুলোকে স্থানীয়ভাবে কারিকুলামের আওতায় এনে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ করে দেই তাহলে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা সক্ষম হবো। শিক্ষা ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত পদ্ধতি আমাদের দেশের সম্ভাবনাময় বিভিন্ন স্থানীয় শিল্প, পণ্য বা সেবাকে ব্যাপক পরিচিত করে তুলতে পারে। নদী মাতৃক আমাদের এই দেশে অব্যবহৃত জলাশয়গুলোকে লোকাল কারিকুলামের আওতায় এনে ‘ভাসমান পদ্ধতির চাষাবাদের’ প্রবর্তন ঘটিয়ে কৃষি ক্ষেত্রেও বিপ্লব আনা সম্ভব। ঢাকা শহরে পরিকল্পিতভাবে রুফ গার্ডেনিং বা ছাদে বাগান করণ এর মাধ্যমেও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশের উপকার সাধন করা যায়।
লোকাল কারিকুলাম এবং অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতাঃ
জামালপুর সদর উপজেলার মেষ্টা ইউনিয়ন সুচিকর্ম জনিত হস্তজাত শিল্পের জন্য বিখ্যাত। ধরা যাক, এই ইউনিয়নের সবকটি স্কুল এবং কলেজকে লোকাল কারিকুলামের আওতায় আনা হল। তাদের সিলেবাসে অন্তত ১০০ নাম্বারের একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হল সুচিকর্ম বিষয়ক। বিষয়টিতে তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক অংশ সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত থাকবে। গবেষণার ফলাফল বলে দেবে কোন অংশে কত নাম্বার থাকবে। তবে ব্যবহারিক অংশটির সাথে উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক থাকবে। শিক্ষার্থীদের বিষয়টি পাঠদানের পাশাপাশি দায়িত্ব প্রদান করা হবে উৎপাদন করার। একজন ছাত্রী একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যতগুলো পোশাক উৎপাদন করতে পারবে তার উপর ভিত্তি করে ব্যবহারিক অংশের নাম্বার প্রদান করা হবে। প্রকল্পের পক্ষ থেকে তাদের পোশাক উৎপাদনের ডিজাইনসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু সরবরাহ করা হবে। প্রতিটি ছাত্রীর উৎপাদিত পণ্য বাজার মূল্যে কিংবা প্রকল্প নির্ধারিত মূল্যে প্রকল্প কর্তৃক নগদে ক্রয় করা হবে। দেশীয় বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিচিতিকরণসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদনের দায়িত্বে থাকবে প্রকল্পের বিপণন বিভাগ।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বাণিজ্য বা কমার্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতি বছর এমবিএ, সিএ, আইসিএমএ কিংবা বাণিজ্যে অন্যান্য প্রফেশনাল ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শত শত শিক্ষার্থী বেরুচ্ছে। সরকারি চাকরিতে এই প্রফেশনালদের তেমন কোন আকর্ষণ নেই। সরকারও চাকরি ক্ষেত্রে তাদের মেধা কাজে লাগানোর কোন ব্যবস্থা রাখেনি। বাণিজ্যে প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীরা একমাত্র সরকারি এলিট শ্রেণীর চাকরি বিসিএস পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন না। হলেও আমার মনে হয় খুব কম। বাণিজ্যের এই চটপটে তরুণ প্রফেশনালদের কাজে লাগাচ্ছে কর্পোরেট সংস্থা। ব্যাংক, বীমা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি, প্রিন্ট মিডিয়া, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইত্যাদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই তরুণ চটপটে প্রফেশনাল দের মেধাকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা লুটে নিচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে এই শ্রেণীর পেশাজীবীদের যদি কাজে লাগানো যেতো তাহলে আমরা সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে আজ অন্য রূপ দেখতে পেতাম। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই মেধাবী Commerce personnel -দের মেধাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আরো আধুনিক হতে পারি। যুগের পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। একটি আধুনিক ঝকঝকে বেসরকারি অফিস এবং একটি হাল আমলের সরকারি অফিসের তুলনা করলে বোঝা যাবে ‘বাণিজ্য শিক্ষা’ কি জিনিস।
বাণিজ্যে দক্ষ এই পেশাজীবীদের লোকাল কারিকুলাম সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাপক সরকারি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। বাজারে সরকারের অনেক ধরনের বন্ড আছে। প্রাইজ বন্ড, সিকিউরিটি বন্ড ইত্যাদি। শিক্ষা ক্ষেত্রে এরকম একটি বন্ড সিস্টেম চালু করেও পুঁজির যোগান দেয়া যায়। Education Bond নামে এই বন্ড শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই বন্ডের অর্থ শিক্ষার উন্নয়নে এরকম আরো নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে। তাই সরকারের এ ক্ষেত্রে আলাদা করে বিনিয়োগ ও করতে হবে না। প্রকল্পগুলো প্রাথমিকভাবে ছোট আকারের হবে এবং প্রকল্পের আয় থেকেই সম্প্রসারণের কাজ হবে, তাই প্রাথমিক অবস্থায় বেশি বিনিয়োগেরও প্রয়োজন হবে না। উপযুক্ত ছাত্রী না পেয়ে প্রতিবছর প্রকল্পগুলোর যে বিশাল অর্থ অবিতরণকৃত অবস্থায় ফেরত যায় তার একটি অংশ দিয়েও এধরনের প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। প্রাথমিক শিক্ষা সেক্টরে সরকারের একটি বিশাল জনশক্তি রয়েছে যা একেবারে দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। গ্রামের এই নিরীহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সৎ ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানমূলক শিক্ষার আওতায় এনে নিষ্কলুষ উপার্জনের পথ্য খুলে দেয়া যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে এরকম একটি ধারণার প্রয়োগ হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
সমাপ্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

