আমি যখোন হসপিটালেঃ
২৭ তারিখ ভোর রাতে সিংগাপুর চাংগি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোরট পৌছে আমাদের প্লেন থেকে নামতে এবং ইমিগ্রেশন পার হতে কোনোই অসুবিধা হলোনা! আমাদের ৩ জনের জন্য সমস্ত ইনফরমেশন আগেই হসপিটাল করতিপক্ষ সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স ও ইমিগ্রেশন বিভাগে দিয়ে রেখেছিল। যার কারনে আমাদের ফ্লাইট ল্যান্ড করার পরপরি এয়ার হোস্টেস এনাঊন্স করে সন্মানিত যাত্রীগন যেনো আমাকে ইমারজেন্সী ডোড় থেকে আগে বের হতে সহায়তা করেন! করতিপক্ষ আমার অসুস্থ্যতা নিয়ে যতোটা উদ্গ্রীব ছিল-প্রকৃতপক্ষে আমি অতোটা অসুস্থ্য ছিলামননা।
আমি ঢাকা থেকে যাবার পুরবে আড়ং থেকে ডক্টর, নারস’দের জন্য ছোট ছোট বেশ কিছু গিফট কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। যখোন যে আমার কাছে নতুন ডিঊটিতে আসতো তাদের গিফট দিতাম-ওরা খুব খুশী হতো। আমার মেইন ডক্টর টিমোথী লী’র জন্য একটা পিতলের রিকসা নিয়ে যাই-যা তিনি খুব লাইক করেছিলেন। তাছারা আমার অন্য ডক্টর মিঃ সুব্রামনিয়াম এর জন্য একটা নটরাজ মুরতি নিয়ে যাই-যা ঊনি আমাকে আগের বার বলে দিয়েছিলেন।
আমি চেঞ্জ করে হসপিটালের দেয়া ড্রেস পরি। ব্রেকফাস্ট দেয়া হলো ২ জনকে-যা আমরা ৩ জনে খেলাম। আমার খাবার হসপিটাল থেকেই নিরধারিত। কিন্তু আমার এটেন্ডেন্ট কি খাবে(যদি হসপিটাল থেকে খাবার খায়...ইচ্ছে করলে হসপিটালের খাবার নাও খেতে পারে)-তা আগে থেকেই জানিয়ে দেবার নিয়ম। যেহেতু আমার বঊ, ছেলে হোটেলে থাকবে-তাই হসপিটাল করতিপক্ষকে এই বিষয় আগেই জানানো ছিল। নাস্তার পরপরি আমার ট্রিটমেন্ট সেডিঊল আমাকে লিখিত ভাবে জানিয়ে দেয়া হলো।
শাওয়ার করে আমি টানা ৩ ঘন্টা ঘুমাই। লাঞ্চ করার পুরবেই আমার ব্লাড ইঊরিন নেয়া হল টেস্টের জন্য। ওখানকার সময় বিকেল ছয় টার সময় ডিনার টাইম(ঢাকার সময়ের সাথে ৪ ঘন্টা ডিফারেন্স)। প্রথম দিন আমাকে ডিনার দেয়া হলোনা রাতে আমার বোন ম্যারো নেয়া হবে বলে। আমার বোন ম্যারো নেয়া হবে লোকাল এনেসস্থিয়া করে-যার কারনে আমি কিছুটা ব্যাথা পাব, তখোন যেনো ডাক্তার নারসদের সহোযোগীতা করি-আগেই বলে দেয়া হয়।
আমাকে ও,টি রুমে নেয়া হলো। ডাক্তার, নারস সবাই আমার সাথে নানান রকম কথা বলছেন, হাসছেন-অন্য দিকে ২ জন নারস আমার যে সব যায়গা থেকে বোন ম্যারো নেয়া হবে সেই সব যায়গায় ইঞ্জেকশন পুশ করে অবশ করে নিচ্ছেন। প্রথমে আমার দুই পা এবং দুই হাতের বাহু থেকে ম্যারো বের করলেন। আমি যদিও ব্যাথা পাচ্ছিলাম-কিন্তু সল্প বসনা একজন নারস আমার সাথে কথা বলছিলেন খুব অন্তরংগ ভাবে। কখোনো কখোনো এমন ভাবে আমার মুখের উপর ঝুকে কথা বলছিলেন কিম্বা কোন কিছু নিচ্ছিলেন-তখোন আমি তার ববস দেখছিলাম! আমার সঠিক খেয়াল নেই-আমার মানষিক অবস্থা তখোন কেমন ছিল-তবে আমার ব্যাথার কথা মনে ছিলনা! আমাকে বসিয়ে রেখে আমার ব্যাক বোন একটা ড্রীল মেশিনে ফুটো করছিল ম্যারো নেবার জন্য। তখোন আমি অনেক ব্যাথায় কস্ট পাচ্ছিলাম। তখোন সেই অনিন্দ সুন্দরী নারস আমার মাথাটা/ মুখ একদম তার বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে রাখলেন। ইচ্ছে করেই তার নিপল দিয়ে আমার চোখের ভ্রুতে এবং নাকে ঘষা দিচ্ছিলেন!সাথে সাথে আমি আমার ব্যাথার কথা ভুলে যাই! আমি তার বুকের ভিতরে ধুক ধুক শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম.........হয়তোবা আমার বুকের ধুক ধুকানীর শব্ধটাও সেই নারস শুনে থাকবেন!
বোন ম্যরো নেয়া শেষ হবার পরও আমাকে প্রায় ২০/২৫ মিনিট ওটি-তে রাখে। ততক্ষন ওই নারস সহ আরো একজন নারস আমার সেবা যত্ন করছিলেন। আমার ঘুম পাচ্ছিলো। আমার রুমের মটোরাইজড বেডটা চালিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসে-আমাকে অনেক যত্নে বেডে শুইয়ে দেয়া হয়-নিয়ে আসা হয় আমার রুমে। আমাকে যখোন বেডে নেয়া হচ্ছিল-তখোন আমি আমার বৌ, ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। সামান্য কথা হয়। আমি ঘুম থেকে জাগি রাত ১০ টায়। তখোন আমাকে হাল্কা খাবার দেয়া হলো। আমার বায়প্সি রিপোরট পাবো ৭২ ঘন্টা পর। এই ৭২ ঘন্টা আমার ট্রাডিশনাল ট্রিটমেন্ট চলবে।
৭২ ঘন্টার ফেরে পরে আছি আমি! হসপিটাল থেকে প্রচুর ম্যগাজিন দেয়া হয় পড়ার জন্য-আমার পড়তে ভাল লাগেনা। ছেলে-ছেলের মা দুজনেই অনেক ম্যগাজিন নিয়ে আসে, কারটুন ছবি নিয়ে আসে-আমার কোন কিছুই ভালো লাগেনা! বৌ নানান রকম ফল, খাবার কিনে নিয়ে আসে-আমার ভালো লাগেনা। আমার মন ঊদাস! মন খুজে ফিরছে-সেই নাম নাজানা সল্প বসনা ললনাকে............আমি তার নাম জানিনা। সব নারসদের বুকে ‘নেইম ট্যাগ’ থাকলেও ওই মেয়েটির বুকে কোন নেইম ট্যাগ লাগানো ছিলনা! বোন ম্যারো নেবার পরও অনেক্ষণ কথা হয়েছিল-তখোনো নামটা জেনে নেয়া হয়নি! কাঊকে জিজ্ঞাষাও করতে পারছিনা একটা গোপন লজ্জায়। আমার মন ঊদাস! আমি মাঝে মাঝে আমার বেড ছেরে ঊঠে হাটা হাটি করি-এক তলা ঘুড়ে অন্য তলায় যাই। কৌতুহলী হয়ে নারসদের রুমে ঊকি দেই-কোথাও তাকে দেখিনা! কী এক আকরষণ! আমি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি-‘হিমু, তুমি তাকে খুঁজো কেনো? সে তোমার কে? তার সাথে তোমার কি সম্পরক? তোমার বয়স ৪৮ বতসর। তোমার বৌ আছে, ছেলে আছে-কেন তুমি ঐ মেয়েটার জন্য অমন আকুলি বিকুলী করছ’?
আমার মন কোনো প্রশ্ন শুনতে চায়না, কোনো প্রশ্নের ঊত্তরো দিতেও চায়না! আমার মন চায় সেই মেয়েটিকে আরো একবার নয়, বার বার দেখতে......... মন চায় তার নীবির স্পরশ পেতে! জানিনা নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি কেন এতো আকরষন!
৭২ ঘন্টা শেষ। আমার বায়প্সি রিপোরট খুব ভালো। আমার অসুখটা আর ছড়ায়নি বরং অনেকটাই কমে গিয়েছে! পুরব নিরধারিত সময় অনুযায়ী আমাকে ৫ সাইকেলের কেমোথেরাপী দেবার জন্য ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হলো। কেমোথেরাপী নেবার সময় অনেকের খুব ব্লাড বমি হয়, এক্সট্রা ব্লাড নিতে হয়। আমার ব্লাড গ্রুপ ও নেগেটিভ। খুব রেয়ার গ্রুপ। আমার ছেলেরও অ নেগেটিভ। এখোন পরযন্ত আমাকে ৪ বার ব্লাড দিয়েছে আমার ছেলে। কেমোথেরাপীর সময় এবং পরেও খুব বেশী যন্ত্রনা হয়। এই হসপিটালে বিভিন্ন রোগীদের প্রয়োজনীয় ব্লাড দেবার জন্য অনেক তালিকাভুক্ত সেচ্ছাসেবী ডোনার রয়েছেন।যখোন যার যে গ্রুপের ব্লাড প্রয়োজন সেই ডোনারের কাছে গিয়ে কিম্বা হাসপাতাল থেকে টীম গিয়ে ব্লাড কালেকশন করে নিয়ে আসে। আমার গ্রুপের বেশ কয়েকজন ব্লাড ডোনারকে স্টান্ডবাই রাখা হয়েছিল। যদিও এবার আমার এক্সট্রা ব্লাড নিতে হয়নি।অনেকগুলো ইঞ্জেকশন মিলিয়ে কেমো থেরাপীর ইঞ্জেকশন তৈরী করে স্যালাইনের মাধ্যমে শরীরে পুশ করা হয়। আমার জন্য বিভিন্ন ধরনের ৪৮ টা ইঞ্জেকশন একত্রিত করে কেমো থেরাপী দেয়া হয়েছিলো। আমি কেমোথেরাপীর পুরব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অসয্য কস্ট পাবার জন্য চোখ বন্ধ করে কিছু দোয়া দুরুদ পড়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম! হঠাত অসুধের গন্ধের মধ্যে একটা অন্য রকম সুবাস পেলাম। আমার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে কে যেনো বল্লো-“হাই! মিত্তার কবির, হাঊ আর ঊ” ? আমি চোখ মেলে তাকালাম-মাই গাড! এইতো সেই- যাকে আমি সারাক্ষন খুজেছিলাম লাস্ট ৭২ ঘন্টায়! যাকে আমি ৩ দিন খুঁজেও পাইনি-সেই কিনা আমাকে হ্যালো বলছে!! আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে!!!
আমি অপার বিস্ময় তাকিয়ে আছি তার দিকে! কী ভয়ংকর সুন্দর! কী সরবনাশা সুন্দর! আমি অনেক্ষন কথা বলছিনা-আমি শুধু তাকেই দেখছি। জানিনা এভাবে কতক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাত মনে হলো আমি বেহায়ার মতো, ক্যাব্লা কান্তের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। ততক্ষণে আমার স্যালাইন শুরু হয়ে গিয়েছে-যা আমি মোটেই খেয়াল করিনি। অথচ-অন্য সময় স্যালাইন পুশ করার সময় থেকে যতক্ষন আমাকে প্যাথেড্রীন ইঞ্জেকশন পুশ করে ঘুম না পড়ানো হতো-ততক্ষন পরযন্ত আমি কস্টে চিতকার করতাম! আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখি-ডক্টর ২ জন চলে গিয়েছেন। আমার পায়ের কাছে একজন আর মাথার কাছে সেই সল্প বসনা......সেদিন যেমন পাতলা ফিন ফিনে একটা ছোট জামা পরে এসেছিল-আজও তেমনটি। যখন সে কারনে অকারনে স্যালাইনের বোতলটা ধরতে হাত ঊচু করে-তখোন তার ঢোলা জামার নিচ থেকে আমি ব্রা হীন ববস দেখতে পাই...।আমি তার নাম জানতে চাইলাম। নাম বল্লো-জেনী ওয়াং। চায়নীজ, সিংগাপুরীয়ানরা এখোন ২ টা নাম ধারন করে। একটা চায়নীজ অরিজিনাল নাম অন্যটা ইংলিশ নাম-যা আমি আগে থেকেই জানি। এই মেয়েটার চায়নীজ নাম ওয়াং আর ইংলিশ নাম জেনী।
আমি তাকে জানতে চাইলাম-সেদিনের পর থেকে সে কোথায় গিয়েছিলো? তার বুকে ‘নেইম ট্যাগ’ নেই কেনো? জেনী বললো-তার ডিঊটি আই সি ইঊ (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইঊনিট) তে। সে সব সময় স্পেশাল ডিঊটি করে। যারা স্পেশাল ডিঊটি করে তাদের ‘নেম ট্যাগ’ না পড়লেও চলে। আমাদের এই আই সি ইঊ রুমটায় মোট ৬ জন পেশেন্ট আছে ভিন্ন ভিন্ন দেশের- কেঊ এসেছে ঊরোপ থেকে কেউবা মিডেলিস্ট থেকে। ২ সারিতে ৬ টা বেড। প্রতিটা বেড থেকে অন্য বেডের দুরত্ব ৫ ফিট হবে যা একটা সুন্দর পরদা দিয়ে পারটিশন করা। আমার পাশের বেডের পেশেন্ট যার বয়স আমার থকে অনেক কম ফিলিপিন্স থেকে এসেছে। তার সাথে আমার ভালো ভাব হয়েছে। তারপরের বেডে একজন এরাবিয়ান বয়স ৭০ হতে পারে কিম্বা ৮০-ও হতে পারে-যিনি খল্লত খল্লত করে কাঁশী দেন-শুনলে মনে হয় যেন সিংহ গরজন করছে! তার একটা পা কাটা। এই বেটার বৈশিসঠ হচ্ছে-কতক্ষণ পর পরি ঊঠে বসা এবং নারস ডাকা। লোকটা নারসদের প্রতি এমন করে তাকিয়ে থাকে-যেনো চোখ দিয়ে নারসগুলোকে গিলে খাচ্ছে। তার সব মনোযোগ নারসদের দিকে। ৬ জন পেশেন্টের জন্য ১৮ জন নারস। প্রতি শিপ্টে ৬ জন করে ৮ ঘন্টা ডিউটি করে চলে যায়। বলতে গেলে বেশীর ভাগ নারস ফিলিপিনো, চায়নীজ, থাই এবং ভিয়েত্নামীজও আছে। কোনো একজন নারস কোনো একজন পেশেন্টের জন্য নিরধারিত নয়। জেনী যেমন আমাকে দেখাশুনা করছে-আবার অন্যদেরও দেখছে। আবার অন্য নারসরাও আমাকে সেবা দিচ্ছে! জেনী যখোন আমাকে সেবা করে-তখোন আমার ভালো লাগে-কিন্তু যখোন অন্য পেশেন্টের কাছে যায়, তাদেরকে অনেক আদর করে কথা বলতো-তখোন আমার খুব খারাপ লাগতো।
আমি লক্ষ্য করছি ঐ এরাবিয়ানটা এক এক করে সব নারসদের ডেকে কি যেনো বলে-মেয়েগুলো হি হি করে হাসে......বেটা তার সাইড ব্যাগ থেকে মুঠো ভরতি ডলার বখশিশ দিচ্ছে! আমার কিম্বা অন্য যেকোন প্যাশেন্টের সাথে কোন ব্যাগ নেই-টাকা থাকাতো দুরের কথা। অন্য একজন নারসের দ্বারা লোকটা জেনীকেও ডেকে নিয়ে গেলো। জেনী তাকে কিযেনো বলে আবার আমার কাছে এলো। আমি জেনীর সাথে কথা বলতে বলতে একটু খানি ন্যাপ (হালকা ঘুম) নিচ্ছিলাম। জেগে দেখি- সেই বুড়ো এরাবিয়ানটা বসে আছে আর জেনী তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে দুজনে কিচির মিচির করে কি যেনো বলছে......... অন্য নারসগুলো দেখেও দেখছেনা-সবাই নিরবিকার!এটা যেনো কন বিষয়ইনা!
আমার কেমোথেরাপী নিতে চার দিন লেগেছিলো। আমি ওই চার দিনে খুব কস্ট পেয়েছি-কিন্তু জেনীর সাথে কোন কথা বলিনি।
জেনীকে আমার খুব অসয্য লাগছে। যখোন তার ডিঊটি পড়ে তখোন আমার অসুখের যন্ত্রনা বেড়ে যায়! বন্ধু দিবসের আগের দিন আমাকে আমার রুমে নিয়ে আসে। আমাকে আমার ডক্টর নারস অনেকেই ফুলের তোড়া দিয়েছিলো। জেনীও দিয়েছিল। জানিনা কেনো-আমার কাছে জেনীর ফুলের তোড়াটাই সব চাইতে খারাপ লেগেছিলো! ওর দেয়া ফুলগুলোয় কোনো সুবাস ছিলনা!
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


