কিশোরী পল্লীর একটা ইতিহাস আছে। এ ইতিহাস না জানলে পরে গল্পের আসল মজা পাওয়া যাবে না। তা হলে চলো আগে ইতিহাসটা জেনে নিই।
কিশোরী পল্লীর পাশের গ্রামটি কাজের মেয়ের গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। শহর থেকে সাহেবরা গাড়ি করে চলে আসত এ গ্রামে। এখানে আসামাত্রই পেয়ে যেত কাজের মেয়ে। ছোট, বড়, মাঝারী যে ধরনের মেয়ে চাইবে তাই এসে হাজির। পিতা মাতারাও খুব আগ্রহ করে দিয়ে দিত মেয়েদের। তিনবেলা খাবে আর সাহেব খুশি হয়ে কিছু দিলে সেটাকে বাড়তি পাওনা মনে করত তারা। কাজের মেয়ের এই আকালের যুগে এত সহজে কাজের মেয়ে পেয়ে গেলে কে না খুশি হয় বলো? সাহেবরা পছন্দ মতো কাজের মেয়ে নিয়ে খুশি মনে চলে যেত শহরে।
এ গ্রামের মেয়েগুলো ঠিকমতো বড় হবার আগেই বিয়ে দিয়ে দিত। এগারো বারো বছর বয়স থেকেই শুরু হত বিয়ে দেওয়ার আয়োজন। কোনোমতে পাত্র একটা পাওয়া গেলেই হলো। কয়েকজন লোক ডেকে বসে বিয়ে পরিয়ে দিত। মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মা-বাবারা হাফ ছেড়ে বাঁচত।
এ গ্রামের পিতা মাতা আর ভাইয়েরা মেয়েদেরকে মনে করে পরের ঘরের মানুষ। যতদিন সে বাপ ভাইয়ের ঘরে থাকে ততদিন মনে হয় অন্যের ঘরের মেয়েকে বেহুদা খাওয়াচ্ছে তারা। যত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় করা যায় তত মঙ্গল।
কিন্তু এর ফল খুব ভাল হয় না।
এই কিশোরী মেয়েরা যখন স্বামীর ঘরে গিয়ে উঠে তখন সংসারের কাজ ও কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয় তাদের। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ ও পরিবারের অন্য সবার মন যুগিয়ে চলতে হয়। আর যদি সে পরিবারের সবার মন যোগিয়ে চলতে না পারে তখন তাকে সইতে হয় অনেক দুঃখ-কষ্ট। এছাড়া অল্প বয়সে মা হওয়ার পর শরীর যায় ভেঙ্গে। নানান অসুখ-বিসুখ নিয়ে তাকে সংসারের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়। তারপর আছে যৌতুকের জন্য নানান যন্ত্রণা আর লাঞ্ছনা। দেখা যায়, কেউ কেউ স্বামী শাশুড়ির অত্যাচার-নির্যৃাতনে অতিষ্ঠ হয়ে চোখের জলে চলে আসে বাপের বাড়িতে। স্বামীর বাড়ি হতে বাপ-ভাইয়ের সংসারে আসার পর তার মুখ আর মনটা অনেক ছোট হয়ে যায়। তারা যে সারাদিন খাটুনির পর খেতে দেয় তাই তো বেশি। সে তার দুঃখ-কষ্টের কথা কারো কাছে বলতে পারে না। কতো বড় কষ্টের মধ্যে পড়ে আছে এ গ্রামের মেয়েরা!
একদিন হলো কি, এমনই কষ্ট সইতে না পেরে একটা মেয়ে নাম মিনারা, মনের দুঃখে রাতের বেলা বাইরে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘরের পেছনে আছে একটা শেওড়া গাছ। সে তার কষ্টের কথা সেই গাছের কাছে বলতে বলতে কেঁদে ফেলল। সে গাছকে বলে, আমি যদি একটা মেয়ে না হয়ে তোমার মতো একটা গাছ হতে পারতাম! নইলে যদি বাড়ির এ কুকুরটার মতো হতে পারতাম। এ কুকুরটার কতো আদর। তাকে ডেকে ডেকে আদর করে খাবার দেয়। সে কত আনন্দ ফুর্তি করে। তাকে ধমক দিলে সে ঘেউ ঘেউ করে উঠে বাড়ি মাথায় তোলে। এই কুকুরের মতো হলেও ভাল ছিল। আমার অনেক কষ্ট। কাউকে বলতে পারি না। এভাবে বেঁচে থাকতে আর ভাল লাগে না। এখন আমি কী করব? হে গাছ তুই আমাকে বলে দে, এখন আমার কী করা উচিৎ। আর সহ্য হয় না।
গাছটি কিছুই বলে না।
মেয়েটি নিজেকে নিজে মেরে ফেলার জন্য ফন্দি করতে লাগল।
এমন সময় গাছের ডালাপালা নেড়ে চারদিক কাঁপিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো ভয়ংকর এক দৈত্য। কিন্তু মিনারা দৈত্য দেখে একটুও ভয় পেল না বরং তার একটু ভরসা লাগল এই ভেবে যে, এ দৈত্যটা যদি তাকে নিয়ে মেরে ফেলে, তাহলে সে এ কষ্ট হতে বেঁচে যায়। সে মনে মনে খুব খুশি হয়ে গেল।
দৈত্যটি চোখ বড় করে বলে, এই মেয়ে এতো রাতে একা একা কী করছিস এখানে? আমাকে দেখে ভয় পায় না জগতে এমন মানুষ আমি দেখিনি। আমাকে দেখে ভয় না পেয়ে পিটপিট করে তাকিয়ে আছিস যে? এতো বড় দুঃসাহস তোর?
মেয়েটি বলে, দুঃখে বাঁচি না। আমি আছি মরার তালে আর তুমি আমাকে দেখাও ভয়? এ সময়ে তুমি এসে ভালই করেছ দৈত্য। আমাকে এখান থেকে তুলে অন্য কোথাও নিয়ে যাও নইলে আমাকে একটা আছাড় দিয়ে মেরে ফেলো।
মেয়ের মুখে এমন ভয়ানক কথা শুনে দৈত্যের কান আর গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে চোখ গোল করে তাকিয়ে বলে, এই মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কি বলছিস এগুলো? ডর-ভয় নেই তোর? তুই মৃত্যুর জন্য রেডি হয়ে আছিস? কী কারণে মরতে চাস তুই, খুলে বল আমাকে।
মিনারা হাত নেড়ে বলে, এত কারণ জেনে লাভ কি তোমার? তুমি না দৈত্য? তুমি মানুষকে ভয় দেখিয়ে, মানুষের ঘাড় মটকে রক্ত খাওয়া, ঘরবাড়ি ভেঙ্গে আনন্দ ফুর্তি করো এগুলোইতো তোমার কাজ, নাকি? এখন আমি তোমার হাতে মরার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে আছি, তো এত প্রশ্ন করছ কেন তুমি? আমি কি তোমারও অরুচি হয়ে গেলাম? শুধু আমি না, তুমি সারা গ্রাম ঘুরে এমন একটি মেয়েও পাবে না, যে বেঁচে থাকতে চায়। যাও, ঘুরে দেখে এসো। তবে আমাকে মেরে তার পর যাবে তুমি। দেখা যাবে, তারা তোমাকে পেয়ে এমনভাবে ধরেছে যে, তুমি আর ছুটতে পারছ না। তাদেরকে মারতে মারতে বেলা শেষ, পরে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলবে, মিনারা গো, অনেক চেষ্টা করলাম। তারা আমাকে এমন করে ধরল যে, আমি আর ছুটতে পারলাম না। তাদেরকে মারতে মারতে বেলাও গেল শেষ হয়ে আর আমিও কাহিল হয়ে পড়েছি। আজ না কাল মারব নে তোকে। তা হতে দেবো না আমি।
দৈত্য মিনারার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। দৈত্য বলে, আমি আমার ২০০ বছরের জীবনে তোর মত এমন মেয়ে দেখিনি যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে মরণের জন্য জান পেতে দেয়।
দৈত্য বলে, তোমরা হলে গিয়ে সৃষ্টির সেরা। তোমরা নিজেরা যেমন পরিবর্তন হতে পারো আবার ইচ্ছা করলে পরিবর্তন করতেও পারো। তোমার চারদিকে যা কিছু দেখছ, এ সবই তো তোমাদের সেবা করার জন্য। আহারে, আমি যদি কেনোমতে খালি একটা মানুষ হতে পারতাম!
দৈত্যটি বলে, আচ্ছা মরবেই যখন তো মরার আগে ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য শেষমেষ একটু চেষ্টা করে দেখ। কষ্টের কাছে হেরে না গিয়ে কষ্টকে জয় করতে পারিসা কি না। সেটা তুই ইচ্ছা করলেই পারবি।
ইচ্ছা করলেই পারি? কীভাবে দৈত্য? বিষ্ময়ের সাথে মিনারার প্রশ্ন।
অশিা, কুসংস্কার আর অভাব অনটনের মধ্যে পড়ে আছিস তোরা। মানুষ হওয়ার মজা কি জিনিস, তাই তো তোরা জানতে পারলি না। তোদের কষ্ট তোদেরই দূর করে লুটে আনতে হবে মানুষ হওয়ার সুখ। তোরা যে কঠোর পরিশ্রম করছিস, তাতে তোদের কোনোও ভাগ নেই, অধিকারও নেই। সমস্যাতো এখানেই।
তাহলে শোন্, ওই যে একটা বন দেখা যাচ্ছে, তোরা সেই বনে চলে যা। সেখানে প্রথমে তোদের থাকার, পড়ার আর কিছুদিনের খাবারের ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারি। মানূষ হয়ে মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য যা করতে হয় তা করতে হবে তোদেরই। কি পারবি না, বল?
পারবো না কেনো? সারাদিনরাত কতো পরিশ্রম করি, কতো কষ্ট করি। এরচেয়ে বেশি তো আর কিছু না।
দৈত্যটি মুখ বাড়িয়ে আস্তে করে বলল, ঠিক আছে মিনারা, তাহলে সারা গ্রামের মেয়েদেরকে গোপনে বলে দে, বনে চলে যেতে। বলে দে নিজের পায়ে দাঁড়াবার কথা, মানুষের মর্যাদা নিয়ে আনন্দে বেঁচে থাকার কথা। আমি গেলাম।
দৈত্যটি লাটিমের মতো পাক খেয়ে উধাও হয়ে গেল।
মিনারা পরেরদিন গোপনে গোপনে এ কথাগুলো গ্রামের সকল মেয়ের কানে কানে পৌঁছে দিল। সবাই রাজি হয়ে গেল। নতুন জীবন রচনার আনন্দে তারা টগবগ করতে লাগল।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গ্রামের মা বাবারা থ হয়ে গেল। একি? মেয়েরা কোথায়? কারো ঘরে একটি মেয়েও নেই। প্রথমে তারা একটু খুশিই হয়েছিল এই ভেবে যে, যাক বেঁচে গেলাম।
কিন্তু কদিন পরে তারা পড়ে গেল মহাবিপদে। তারা কাজে মেয়েদের পায় না। এখন বুঝতে পারছে মেয়েরা কত কাজই না করত। পিতা মাতারা অসহ্য হয়ে মেয়েদের সন্ধান করতে লাগল। কিন্তু এতণে মেয়েরা চলে গেছে বনে।
মেয়েরা বনে গিয়ে হাতে কোদাল খুন্তি নিয়ে ছোট ছোট পাহাড় কেটে ছোট ছোট মাটির ঘর বানালো। নানা জাতের গাছ লাগাল। দেখতে দেখতে ফল ফসলে ভরে উঠেছে বন। মেয়েদের হাতের ছোঁয়ায় যেন বনে প্রাণ ফিরে এলো। চারদিকে চকচকে তকতকে সুনসান পরিবেশ। যেন বন নয়; একটা স্বপ্নপুরী। কাজ শেষে বইপত্তর নিয়ে পড়তে বসে যায় তারা। মনের আনন্দে পড়ালেখা করে।
দৈত্য মেয়েদের কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে গেল। দৈত্য নিজে যতটা না ভাবছিল মেয়েরা তারচেয়ে বহুগুণে সুন্দরভাবে এগিয়ে চলেছে। চারদিকে পড়ালেখা, কাজকর্ম, বাগান, ফুল-ফসলে ভরে গেছে বন। বনে ফুলের গন্ধে, ফসলের আনন্দে ফুর্তির বান ছুটেছে। কয়েক বছরেই মেয়েরা পড়ালেখা করে শিতি ও সচেতন হয়ে উঠেছে। মেয়েরা পড়ালেখা করে। বনে স্কুল কলেজ খুলে বসেছে। দেখতে দেখতে একটি বন হয়ে উঠল শিতি মেয়েদের বন। সবাই মিলে এ বনের নাম রেখেছে, কিশোরী পল্লী।
সাহেবরা শহর থেকে কাজের মেয়ের জন্য এল। মা বাবারা বলে দিল, দেখুন, এ গ্রামে কোনো কাজের মেয়ে নেই।
সাহেবরা বলে, মেয়ে নেই মানে? এতো এতো মেয়ে, এরা গেল কই?
মা বাবারা বলে, এখন মেয়েরা থাকে বনে। তারা আলাদা হয়ে গেছে। ওই যে একটা বন দেখা যায়, ওটাই হলো হল মেয়েদের হাতে গড়া কিশোরী পল্লী। সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন।
সাহেবরা সেখানে গেল। তারা কাজের মেয়ের কথা বলল।
কিশোরী পল্লীর মেয়েরা বলল, দেখুন এখানে অন্যের বাসায় কাজ করার মতো কোনো মেয়ে নেই। এখানে সবাই যেমন শিতি তেমনি সচেতন আর কর্মঠ।
তারা সাহেবদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কিশোরী পল্লী দেখাল আর সব কথা খুলে বলল। সাহেবরা সবকিছু জেনে একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল। মেয়েরা পারে এত কিছু করতে?
কিছুদিন পরে আবার এলো সাহেবরা। মেয়েরা সাহেবদের দেখে চোখ কুচকে বলল, কি চাই জনাব?
সাহেবরা জবাব দিল, দেখুন আমরা এখানে কোনো কাজের মেয়ের জন্য আসিনি। আমরা এসেছি ছেলের পাত্রী খোঁজার জন্য।
তো আপনার ছেলে কী পাশ আর কী করেন তিনি?
সাহেব বলল, ছেলেটা পড়ালেখা করেনি সত্য তবে তার অনেক অর্থসম্পদ আর বাড়ি-গাড়ি আছে। জীবনে সে কষ্ট করেনি। যে টাকা পয়সা আছে, তাতে তার চদ্দগোষ্ঠী বসে খেলেও ফুরাবে না।
পল্লীর কিশোরীরা বলল, দেখুন, শিার কাছে অর্থ কিছু না। এখানে অশিতি ছেলের উপযুক্ত কোনো পাত্রী নেই। শুধুমাত্র অর্থের জন্য আমরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়নি।
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল এই কিশোরী পল্লীর কিশোরীদের আদর্শ মানুষ হয়ে উঠার কথা, আতœবিশ্বাসী আর সাহসী হয়ে উঠার কথা।
এখন বড় বড় শিেিতরা পাত্রীর জন্য চলে আসে এই কিশোরী গ্রামে। তারা বলে, জীবনে শিা আর অর্থ হয়েছে অনেক। এখন শুধু কিশোরী পল্লীর একটা মেয়ে হলেই ষোআেআনা পূরণ হয়।
কিশোরী পল্লীর মেয়েদের অনেক দাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

