বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অহংকার। এদেশের গর্ব। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, বন্যাসহ বিভিন্ন সংকটাপন্ন মুহূর্তে দুর্গত মানুষের পাশে দাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে সেনাবাহিনী। সবাই যেখানে ব্যর্থ, সেনাবাহিনী সেখানে শক্ত হাতে হাল ধরে সফলতা দেখিয়ে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ ভালবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তেমনিভাবে আন্তজার্তিক শান্তি রক্ষী মিশনে বিভিন্ন দেশে কাজ করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনী। দেশের মানুষের আশা আকাঙক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। তাই যে কোন মূল্যে অটুট ও অক্ষণ্ন রাখতে হবে সেনাবাহিনীর মর্যাদা।
আমার মনে পড়ে, শৈশবে আমাদের বাড়ির পাশে জঙ্গলে শীত কালীন প্রশিক্ষণে এসেছিল সেনাবাহিনীর একটি দল। সামরিক সাজসজ্জার প্রশিক্ষণ মহরার প্রতি কী অদম্য কৌতূহল আমার- যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্র প্রত্যক্ষ করছি। আমি সময়-সুযোগ পেলে তাদের কাছে ঘেষাঁর চেষ্টা করতাম। ওরাও স্নেহ ভালোবাসায় মাঝে মাঝে বুকে তুলে নিতো। সেনাবাহিনীর অদ্ভুদ রঙের মোটা কাপড়ের স্পর্শ আমাকে রোমাঞ্চিত করেতো। এপর কত বছর অপেক্ষায় থেকেছি-আবারও আমাদের বাড়ির পাশের জঙ্গলে ট্রেনিং-এ আসবে আর্মিরা। বড় হবার পরও যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তাম তখনও শীতকাল এলে আমার কৌতূহলী চোখ যেন তাদেরই খুঁজে ফিরতো। দূরের কোন মাঠে আর্মি এসেছে শুনলে সেখানেই ছুটে যেতাম। কী দারুণ প্রশিণের কলা কৌশল! ভাবতাম, আমিও যদি ওদের একজন হতে পারতাম! সেসময় সৈনিক হবার স্বপ্নও দেখতাম।
কিন্তু বড় হয়ে সেনাবাহিনীর সংস্পর্শে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমার সে রঙিন স্বপ্নগুলো ধূসর হয়ে গেলো। গৌরবময় রোমাঞ্চকর জীবনের অধিকারী সেনাবাহিনীর প্রতি আমার ব্যক্তিগত আস্থা ও ভালোবাসায় চিঁড় ধরলো।
২০০৭ সালের ১/১১ প্রোপটে সে বছরের জুন- জুলাই থেকে সারাদেশে সেনাবাহিনীর পরিচালনায় শুরু হয় জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার কাজ। আমি অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এ প্রকল্পে কিছু দিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেসময় খুব কাছ থেকে দেখা সৈনিকদের কিছু কাজ,কর্ম,আচরণের বহিঃপ্রকাশ আমাকে হতাশ করে।
জাতীয় পরিচয় পত্র ও ছবিসহ ভোটার তালিকার প্রকল্পে নিয়োজিত প্রুফ রিডার, টিম লিডার ও কম্পিউটার অপারেটরদের নিয়ে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে প্রশিক্ষণ শুরু হলো। কিছু সেনা অফিসারের আচরণে মনে হলো, তারা ছাড়া এদেশের সাধারণ উচ্চ শিতি সবাই তাদের চেয়ে নিচু শ্রেণীর। আমাদের চেয়ে সৈনিকরা বেশি বোঝে এটাই যেন তাদের আচরণে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করতো । আমাদের মধ্যে অনেকে ছিল উচ্চ শিক্ষিত-সদ্য মাস্টার্স পাশ করে বেড়িয়েছে এমন। অথচ সামষ্টিকভাবে নির্দেশনা দেবার সময় কিছু সেনা অফিসার আমাদেরকে তুমি বলে সম্বোধন করতো। কেউ কোন অনিয়ম করলে তার ব্যাপার কঠোর ব্যবস্থার হুমকি দেয়া হতো। এমনকি ভোটারের তথ্য সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত উপজেলা নির্বাচন অফিসারসহ শিক্ষা অফিসার, কৃষি অফিসারসহ সব সরকারী কর্মকর্তারা ভয়ে আতঙ্কে তটস্থ থাকতো- কখন কোন ভুলের জন্য হেনস্থা হতে হয়। মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করতো প্রাইমারী ও হাইস্কুলের শিক্ষকরা । গ্রামের মানুষদের কাছে এরা অনেক সম্মানিত। এরকম অনেক শিক্ষককে ঠুনকো ভুলের জন্য নাজেহাল হতে দেখেছি। ঝিনাইদহ সদরের চণ্ডিপুর হাইস্কুলের কেন্দ্রে এক তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষককে ১৫ মিনিট দেরিতে আসার জন্য নর্দমার পানিতে নামিয়ে দাড় করিয়ে রাখা হয়। একই কেন্দ্রে কয়েকজন ভোটারের আসতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে ছবি তুলতে পারে নি- এজন্য তাদের সূর্য্যরে দিকে তাক করে দাড় করিয়ে রাখা হয়। আমার গ্রামের এক ভোটারকে সন্দেহ করা যে, তার ১৮ বছর বয়স পূর্ন হয় নি। এজন্য তাকে আটকে রাখা হয়। বলা হয়, তার অভিভাবকদের ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য পুলিশে দেওয়া হবে। গ্রামের সবাই জানতো সে আঠারোর্ধ কিন্তু ভয়ে কেই কথা বলতে সাহস পেল না। আমি সেনা অফিসারকে গিয়ে বললাম, আমি তাকে চিনি,সে আমার গ্রামের ছেলে,সে ভোটার হওয়ার উপযুক্ত । আমার কথা শুনে আশ্বস্থ হয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং আমার অনুরোধে পরের দিন তাকে ভোটার করা হয়। ঝিনাইদহ সদরের বংকিরা প্রাইমারী স্কুলের কেন্দ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত এক সার্জেন্ট ছবি তোলার প্রথম দিনে তথ্য সংগ্রহকারী সব শিক্ষকের সামনে লাঠি ও দড়ি রেখে বললেন, ভালো ভাবে কাজ করবেন যদি কোন ভুল ধরা পড়ে তাহলে এই দড়ি দিয়ে বেধে লাঠি দিয়ে পেটানো হবে। এসব সৈনিকদের অধিকাংশ ছিল এসএসসি পাশ অথচ ডিগ্রি পাশ/এমএ পাশ শিকরা ভয়ে তাদের স্যার বলে সম্বোধন করতো। আমি মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে তথ্য সংগ্রকারী শিক্ষকদের বলতাম কেন আপনারা সৈনিকদের স্যার বলে সম্বোধন করেন? জবাবে তারা বলতো, ‘আমাদের উপর দিয়ে কেয়ামত বয়ে যাচ্ছে, আমাদের নাওয়া, খাওয়া, ঘুম সব হারাম হয়ে গেছে- আমরা এথেকে রক্ষা পেলে বেঁচে যাই।’ ১৬ ডিসেম্বর’০৭ সৈনিকদের একটি গাড়ি ঝিনাইদহ সদরের কূঠিদুর্ঘাপুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো এসময় একটি গ্রাম্য যান নসিমনের কারণে রাস্তা পার হতে দেরী হওয়ায় সৈনিকরা নসিমনের চালককে মারধর করে, এসময় যারাই প্রতিবাদ করেছে তাদের উপর চড়াও হয়েছে সৈনিকরা। এর কয়েক দিন আগে কূঠিদুর্ঘাপুরের পাশের একটি কেন্দ্রে একজন ভোটার ছবি তোলার সময় বলে ফেলে, আমি অন্য এক জায়গায় যেখানে কর্মরত আছি, সেখানে তথ্য পূরণ করেছি কিন্তু ছবি তোলা হয় নি।- এখানে ভোটারা হলে কোন সমস্যা আছে কিনা?
একথা শোনার পরে তাকে ধরে সৈনিকরা শুরু করে চর থাপর কিল ঘুষি । তার বৃদ্ধ মা তাকে বাচাঁতে আকূতি মিনতি করলে তাকেও নাজেহতাল হতে হয়।
ঝিনাইদহে এরকম অনেক ঘটনা আছে-যা লিখে শেষ করা যাবে না। মজার বিষয় হলো,সেনা অফিসাররা আমাদেরকে ভোটারদের সঙ্গে ভালো আচরণের নির্দেশনা দিতো অথচ তারাই করতো অসদাচরণ। মাঝে মধ্যেই বিকেলে আমাদেরকে মাঠে লাইনে দাড় করিয়ে রেখে সেনা অফিসাররা নির্দেশনা দিতো । কখনো কখনো মাগরিবের নামাজের সময় পার হয়ে যেত,বার বার হাত তুলে দৃষ্টি আকষর্ণ করার পরও সেদিকে তারা ভ্রুক্ষেপই করতো না । একবার নামাজের জন্য আমরা কয়েকজন সময় চেয়ে বের হয়ে এক মেজরের সঙ্গে দেখা, তিনি বললেন, কোথায় যাচ্ছ তোমরা? আমারা জানালাম , ‘মাগরিবের নামাজে যাচ্ছি ।’ তিনি আমাদের কথায় কর্নপাত না করে আমাদেরকে সভাস্থলে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। সেনা অফিসারের এহেন আচরণে আমি বিশ্মিত হলাম। ভাবতাম, এদেশের মানুষের সেনাবাহিনীর প্রতি যে বিশ্বাস,আস্থা ও ভালোবাসা তা যদি এভাবে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এদেশের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বলে আর কী থাকবে? সে দিনের ঘটনার পর আমি ভোটার তালিকা ও ন্যাশনাল আইডি প্রজেক্টে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কেউ হয়তো মন্তব্য করতে পারেন,আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিশেষ কোন রাগ-বা ক্ষোভের কারণে বিষোদগার করছি। কিন্তু আমি যা বলছি- বাস্তবতার উপলব্ধি থেকে বলছি।
২০০৭ সালের ৩০ নভেম্বর । তখন আমি একটি জাতীয় দৈনিকের কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের এক শিক্ষক কাসে ছাত্রীদের নিকাব পড়ার বিষয়ে অশালীন মন্তব্য করেন ও তার ক্লাসে নিকাব পড়ে আসতে নিষেধ করেন। স্বাভাবিকভাবেই ঔ শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্রছাত্রী মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং তারা ঐ শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এ বিষয়ে আমি পত্রিকায় একটি রিপোর্ট করি। পত্রিকায় প্রকাশিত এ নিউজের বিষয়ে আমাকে কুষ্টিয়া সেনা ক্যাম্প থেকে তলব করা হয়। মোবাইলে আমাকে বলা হয়, ‘আপনি যে নিউজটি পত্রিকায় করেছেন এটি কি সঠিক? আপনি কি তখন ক্যাম্পাসে ছিলেন? ইত্যাতি ইত্যাদি.. মেজর রিফাত স্যার আপনাকে কল করেছেন, আজ আপনি তার সঙ্গে দেখা করেন।’ আমি বললাম, আমি ব্যস্ত আছি পরে দেখা করবো। আমাকে বলা হলো, ‘আপনাকে আজই আসতে হবে।’ আমি বেশ অবাক হলাম ,উদ্বিগ্নও। পত্রিকার প্রকাশিত নিউজটি ভালোভাবে দেখলাম, সব তথ্য ঠিক আছে কিনা? কোথাও কোন অসঙ্গতি আছে কিনা? প্রকৃত অর্থেই সংবাদটি বস্তুনিষ্ঠ ছিল। এতে অতিরঞ্জিত কিছু ছিল না। তাহলে একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সেনা ক্যাম্প থেকে কেন তলব করা হলো?
আমি তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সভাপতি। সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যরা বলল, বিষয়টি রহস্যজনক এর পেছনে কোন ষঢ়যন্ত্র থাকতে পারে। কেউ কেউ বলল, ঔ শিক্ষক হয়তো আপনার বিরুদ্ধে সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ করেছে। দীর্ঘ পরামর্শ শেষে সিদ্ধান্ত হলো সাংবাদিক সমিতির সবাই যাবো সেনা ক্যাম্পে। আমার পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক আমাকে বললেন, ‘সারা দেশে আমাদের বেশ কয়েকজন রিপোর্টারকে আর্মিরা হেনস্থা করেছে। আমাদের সঙ্গে সার্বণিক যোগাযোগ রাখবেন,এবিষয়ে কখন কী হচ্ছে জানাবেন।’ সন্ধ্যায় আমরা মেজর রিফাতে সঙ্গে দেখা করতে কুষ্টিয়া শহরে গেলাম। সেনা ক্যাম্পে মেজর রিফাতের কক্ষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। মেজর রিফাত বললেন, ‘নিউজটি আপনি কেন করলেন? ধর্মীয় এমন একটি বিষয় নিয়ে দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে । বিষয়টি আমাদের কেন জানালেন না । এনিয়ে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হলে এর দায়িত্ব কে নেবে.’. ইত্যাদি ইত্যাদি ।
আমি বললাম, নিউজ করা আমার পেশাগত দায়িত্ব । আপনাকে জানানোর দায়িত্ব আমার নয়। এজন্য ডিবি, এনএসআই, ডিএসবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোক রয়েছে। আর এনিয়ে দেশের পরিস্থিতি খারাপ হলে এর দায়িত্ব ঔ শিক্ষকের যে বোরকা ও নেকাবের ব্যাপারে বাজে মন্তব্য করে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছে।’ অনেক কথার পর তিনি বললেন, ‘আমি পারছোনাল ইন্টারেস্টে আপনাকে ডেকেছি।’ এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করলেন।
আমরা বুঝলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে তার তেমন কোন ধারণাই নেই। আর আমাকে কল করে তার ক্ষমতার অযাচিত বাড়াবাড়িই তিনি করেছেন। সেময় এরকম ক্ষমতার বাড়াবাড়ির শিকার দেশের কত মানুষ কতভাবে যে হয়েছে তার কোন হিসাব নেই। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতো না। তখন এদের আচরণে মনে হতো দেশে বুঝি সামরিক শাসন চলছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর দুর্নীতি,অনিয়ম,সন্ত্রাস,দারিদ্র,পানি- গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নিয়ে বার বার ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ হয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে বলতে শুনতাম, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র অচল, এদেশে দরকার সামরিক শাসন, আর্মিরাই পারবে এদেশের মানুষকে সাইজ করতে’...
২০০৭ সালের জানুয়ারী মাসের পূর্ব পর্যন্ত আমরা মানুষের মুখে মুখে এসব কথা শুনতাম। কিন্তু ২ বছরের জরুরি অবস্থার জাতাকলে পীষ্ঠ হয়ে এদেশের মানুষ বুঝে গেছে সামরিক শাসন কী জিনিস!
বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেক হতাশাব্যঞ্জক হলেও এখন আর কাউকে সামরিক শাসনের কথা বলতে শুনি না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


