“দেখিতে গিয়াছি পর্বত মালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু,দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু” রাজশাহী থেকে খুব বেশি দূরে নয় অথচ এত বছর রাজশাহীতে থেকেও একটু দুরের পুঠিয়া এতদিনেও দেখা হয় নি।মনে একটা আক্ষেপ ছিল।অতঃপর এক শুক্রবার বিকেলে আমিন আর শরিফকে সাথে নিয়ে রওয়ানা দিলাম পুঠিয়ার দিকে। দিনটা গরমকাল হোলেও পড়ন্ত বিকেলে সুর্যের তাপ তেমন ছিল না।ক্রমে ক্রমে রাজশাহী বিশ্বাবিদ্যালয়, কাটাখালি,বানেশ্বর পেরিয়ে ৩০ কিলো মিটার দূরে পুঠিয়ায় পৌছলাম।সময় লাগলো প্রায় ৪৫ মিনিট।প্রধান সড়ক থেকে ডান দিকে মোড় নিয়েই দূর থেকে চোখে পড়ল উচু মন্দিরের চুড়া ।সরু রাস্তা দিয়ে আধ কিলোমিটার মত রাস্তা যাওয়ার পর একটা পুকুর পার হয়ে গিয়ে গাড়ী থামলো গিয়ে মন্দির চত্তরে। একতলা সমান উচু বেদির উপর মূল মন্দির।বাম দিকে মন্দিরে ঢুকতেই চোখে পড়ল প্রত্নতত্ব বিভাগের সাইনবোর্ড ।সাইনবোর্ড ছাড়া আর কোনো কিছুই চোখে পড়ল না প্রত্নতত্ব বিভাগের। বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন, মন্দিরের সেবায়েত বা পুরোহিত হবেন হয়তো।
হাতে অল্প কয়েক পৃষ্ঠার ছাপান বই। এই মন্দির, জমিদার বাড়ির ইতিবৃত্ত নিয়ে লেখা। সামান্য টাকার বিনিময়ে মিলল বইটা।পাশের পুকুরে সেদিন মাছ ধরার প্রতিযোগিতা চলছে। ২০/৩০ জন মাচা বেন্ধে বরশি ফেলে ছাতি মাথায় বসে আছে কখন বরশিতে টান পড়ে।এটা হল শিব মন্দির।তার পাশেই আরো একটা ছোট মন্দির এটা গোবিন্দ মন্দির।দুটোরই অবস্থা বেশ করুন।শিব মন্দিরের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। মন্দিরটা সাদা প্লাস্টার এ ঢাকা। রক্ষনাবেক্ষন নেই বললেই চলে। আবর্জনা এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।মন্দিরের আস্তরন খুলে পড়েছে ভিতরের ইট উকি মারছে ।এটি তৈরী হয়েছিল ১৮২৩ সালে।এরপর গেলাম রাজবাড়িত,বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১০ এর খেলা চলছে তখন। রাজবাড়িতেও তার ছোয়া, চারতলা ছাদে এক কোনে ব্রাজিল অপর দিকে আরজেনটিনার পতাকা উড়ছে। সামনের ফাকা মাঠে তখন চলছে বৈশাখি মেলা।লোক মুখে শুনলাম বেশ প্রাচীন এই মেলা, সেই জমিদার আমল থেকে চলে আসছে। বিভিন্ন কারু কাজ মা্টির পুতুল প্লাস্টিকের খেলনা, খাবারের দোকান, সব কিছুই আছে মেলাতে।জমিদার বাড়িতে দেখলাম সংস্কারের কাজ করছে প্রত্নতাত্বিক বিভাগ।বাড়ির ছাদে বেশ কিছু ভাঙ্গা মুর্তির ধ্বংসাবশেষ। শুনলাম ৭১ এর স্বাধিনতা যুদ্ধে ও গুলো লুট হয়েছে। বাড়ির একাংশ কোন এক কলেজের দখলে। প্রকান্ড গেট দিয়ে ঢুকলাম বাড়ির ভিতরে।সামনে প্রকান্ড উঠান। একটু দুরেই একই রকম বিশাল আরও একটা উঠান। দুটো আলাদা মহল। একটা থেকে আরেকটা তে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে।দোতলা তিন তলা মিলিয়ে অনেক ঘর।কিছুক্ষন ভিতরে ঘুরে বেরিয়ে এলাম।এর পর গেলাম কিছুটা দূরে মহারানির প্রাসাদে। এখন এটা পুরিত্যাক্ত, ছাদ নেই কোথাও কোথাও, ভিতরে আবর্জনা কাদা তে ভর্তি,বেরিয়ে এলাম একটু দুরেই অপূর্ব জোড়া মন্দির আহ্নিক মন্দির।
এর পর দেখলাম জগদ্ধাত্রী মন্দির।অপুর্ব সব মন্দির গুলো।সব কিছু সাক্ষী দিচ্ছে সেই পুরন দিনের পুরোনো গৌরব আর ঐতিহ্যের। ভাবতে অবাক লাগে এক সময়ের দৌর্দন্ডপ্রতাপশালী সেই জমিদার দেরকে যাদের দাপটে বাঘে ছাগলে এক ঘাটে পানি খেত। তাদের ঘরবাড়ী, মন্দির সবই আছে নেই শুধু জমিদাররা।
এই সব অপুর্ব স্থাপত্য অযত্নে অবহেলায় আজ ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে।ইউরোপ আমেরিকাতে তারা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখছে আর আমরা তা দেখার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করছি। লন্ডনের বৃটিশ মিউজিয়াম, প্যারিসের লুভর মিউজ়িয়াম বা টরন্টর “রয়াল ওন্টারিও মিউজিয়াম” এরা সাজিয়েছে আমাদের দেশের সংগ্রহ দিয়ে আর আমরা তিলে তিলে হারাচ্ছি এই অপুর্ব প্রত্নতাত্বিক স্থাপনা। পুঠিয়া সহজেই হতে পারে এক পর্যটন নগরী
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১১ রাত ১১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


